প্রীতন্বিতা

ব্ল্যাক হোলও আলো দেয়

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে আমরা সবাই কিছু না কিছু জানি। মহাবিশ্বের এই রহস্যময় বস্তু নিয়ে এর আগে এখানে অনেক কিছু বলাও হয়েছে। যখন অতিকায় কোন তারা তার সমস্ত জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে তখনই ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়। সূর্য বা অন্য যে কোন তারার আলো আসলে তাদের কেন্দ্রস্থলে সংঘটিত লক্ষ লক্ষ কোটি পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফল। কেন্দ্র দেশের লক্ষ লক্ষ ডিগ্রী তাপমাত্রা সঞ্চিত হাইড্রোজেন পরমাণুকে হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিকিরণের জন্ম দেয়‌। কিন্তু কোন এক সময় কেন্দ্রের সঞ্চিত সমস্ত হাইড্রোজেন ফুরিয়ে যেতে বাধ্য। তখন আর নিউক্লিও ফিউশন ঘটতে পারে না। এই অবস্থায় বহির্মুখী বিরুদ্ধ শক্তি অন্তবর্তী মাধ্যাকর্ষণের প্রবল টান সামলাতে পারেনা এবং তারাটি নিজের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়ে গুটিয়ে যেতে থাকে। এভাবে ভেঙে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে যেতে গোটা তারাটি একটি মাত্র বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় এবং এমনই প্রচন্ড হয়ে ওঠে তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যে আলো পর্যন্ত তার মধ্য থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। এই কারণে ব্ল্যাক হোল আজ পর্যন্ত দেখা সম্ভব হয়নি, কেবল তত্ত্বগতভাবেই এর অস্তিত্ব আছে বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা যে ব্ল্যাক হোলের রয়েছে অসীম ঘনত্ব ও অসীম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। একইসঙ্গে এখানে অপরিসীম স্থিতাবস্থা বা এনট্রপি বিরাজ করে। এই চিরকালীন স্থিতাবস্থার জন্য ব্ল্যাক হোলের মধ্যে কোনরকম পরিবর্তন ঘটবে না যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। 

এর করাল গ্রাস থেকে যেহেতু আলোরও বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না ব্ল্যাক হোল তাই বিশ্বজগতের অন্ধকারতম বস্তুপিণ্ড। কিন্তু সম্প্রতি আশ্চর্য তথ্য জানা গেছে। ব্ল্যাক হলো নাকি হতে পারে আলোকের উৎস। ব্ল্যাক হোলের যে সব গ্যাস তার মধ্যে চলে যায় তার অসম্ভব উষ্ণতায় উত্তপ্ত হয়ে তীব্র এক্সরে বিকিরণ করে। উষ্ণতার পরিমাপ কিন্তু অকল্পনীয়, সূর্যের চেয়ে অন্তত হাজার গুণ। 

কোন গ্যাস যদি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে পড়ে তো শক্তি হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে তার দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আলো উৎপন্ন করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা যে ব্ল্যাক হোলের চৌম্বক ক্ষেত্রই এভাবে আলোর জন্ম দিয়ে থাকে। গ্যাসের মধ্যে চুম্বক ক্ষেত্র ঘর্ষণজনিত কারণ ঘটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার মতো একটা হাওয়া তৈরি করে। হিসেব করে দেখানো হয়েছে যে বিগ ব্যাং ঘটার পর থেকে বিশ্ব জগতে যত বিকিরণ সৃষ্টি হয়েছে তার অন্তত ৫০ ভাগের উৎসব ব্ল্যাকহলের মধ্যে বস্তুপিণ্ডের পতনজনিত ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের মিচিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মহাকাশ বিজ্ঞানী ব্ল্যাক হোল কিভাবে মহাবিশ্বের আলো উৎপন্ন করে এই গবেষণায় মগ্ন। চন্দ্র অবজারভেটরির মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা এই প্রথম দেখাতে পারলেন যে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন চৌম্বকক্ষেত্রই এই অদ উজ্জ্বল চোখ ধাঁধানো আলো উৎপন্ন করে। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া উপগ্রহের পাঠানো তথ্য থেকে গবেষণা করে জানা গেছে যে বস্তুপিণ্ড ব্ল্যাক হলে পরে সূর্যের হাজার গুণ বেশি উত্তাপে উত্তপ্ত হয়ে অসম্ভব উষ্ণ গ্যাস উৎপন্ন করে। এইসব গ্যাসকে ব্ল্যাক হোলের চৌম্বক ক্ষেত্র নিজের মধ্যে আকর্ষণ করলে জন্ম নেয় আলোকমালা। ব্ল্যাক হোলের মধ্যে পতনের সময় পদার্থ এক্স রশ্মিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। প্রত্যেকটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সূর্যের তুলনায় কোটি কোটি গুণ বেশি ভরসম্পন্ন একটি ব্ল্যাক হোল। 

ভিন্ন ভিন্ন শক্তি সম্পন্ন এক্স রশ্মি নির্গত হয় আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সির জে ১৬৫৫ ব্ল্যাক হোল সিস্টেম থেকে। ভিন্ন শক্তি সম্পন্ন এক্স রশ্মি পর্যবেক্ষণ এক্স-রে স্পেকট্রোস্কোপি নামে পরিচিত। উপগ্রহের পাঠানো তথ্য থেকে দেখা গেছে যে ওই ব্ল্যাক হোল সিস্টেমটি সঙ্গী তারকাটির দেহ থেকে বস্তুপুঞ্জ গিলে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিকিরণ উদগীরণ করছে। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে ব্ল্যাক হোলটির ডিস্ক থেকে নির্গত হাওয়ার গতিবেগ ও ঘনত্ব কম্পিউটার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী চৌম্বক ক্ষেত্র তাড়িত হওয়া সংক্রান্ত ভবিষ্যৎবাণীর সঙ্গে মিলে যায়। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *