রম্যরচনা

অধ্যায় : ১০

অকারণে লোকেরা সব শত্রু হয়ে যায়। ঠেকাতে পারে না সে। লোকজনকে এড়িয়ে চলা তো আর সম্ভব নয়। এড়িয়ে চলার অনেক উপায়ের কথা ভেবে দেখেছে সে। কয়েকটি উপায় কাজে লাগাতে চেষ্টাও করেছে। ফল হয়নি কিছুতেই। উল্টে নাকাল হতে হয়েছে। পরে সে ভেবে ভেবে বুঝেছে, লোকজনকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয় কিছুতেই। সে রাস্তায় না বার হতে পারে, কোন বিশেষ কায়দায় তার বাড়িতে লোকজনের আসাও না হয় আটকানো গেল ধরা যাক, কিন্তু নিজে কি সে কোন লোকের সংশ্রব একশ শতাংশ এড়িয়ে যেতে পারবে? সেটা যে অসম্ভব তা কোন লোকের সঙ্গে পরামর্শ না করেও বোঝা গেল। একা থাক আর যাই থাক, বেঁচে তো থাকতে হবে। আর বেঁচে থাকতে হলে দোকানে-বাজারে যাওয়া ছাড়াও হাজারটা এমন কাজ নিত্যদিন আছে যাতে কোনো না কোনো লোকের সংস্পর্শে যেতেই হবে। এড়াবার কোন উপায় নেই। এমনই যাঁতাকলে মানুষ আটকা পড়ে গেছে। ভেবেচিন্তে নিজেকে নিজেই এমন জালে জড়িয়ে ফেলার এই যে নষ্টামি এ দেখলেই বোঝা যায় যে মানুষ নামক প্রাণীটি কোনক্রমেই সুবিধের পাত্র নয়। তার হাড়ে হাড়ে বদমাইশি। না হলে নিজেকে নিজে ফাঁদে ফেলার বুদ্ধি আর কোন জীবের হয় জগতে? মানুষ ছাড়াও রয়েছে হাজার হাজার প্রাণী, তাদের সমাজে। যে কেউ ইচ্ছে হলে একা একা থাকতে পারে, অকারণে তাকে কেউ খোঁচায় না বা তার শত্রু হয়ে যায় না।

এই যেমন খুঁচু খুঁচু নিপাত। তার সঙ্গে কথা বলার কোন দরকারই ছিল না। সে তার ভাই-বান্ধব নয়, চেনা-জানাও নয় কেউ। তার পাড়াতেও থাকে না। থাকে কোন্ চুলোয় জানা নেই। যেখানে খুশি থাকুক, তার সঙ্গে দেখা হওয়া কপালে ছিল বলেই দেখা হল। কপালে ছিল বা উপযুক্ত কারণ ঘটেছিল। চুল-দাড়ি বড় হয়েছিল বলে সেসব কাটতে গিয়েছিল হাচিয়া ফাল।  খুঁচু খুঁচু নিপাত হল সেই সেলুনের মালিক। লোকের চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া তার কাজ। দাড়ি সে চেষ্টাচরিত্র করে নিজেই কাটতে শিখেছে বাধ্য হয়ে, যদিও কাটতে গিয়ে হামেশাই গালের নানা জায়গা কেটে ফেলে রক্তারক্তি কান্ড ঘটে যায়। আসলে একটা ব্লেড একবারের বেশি দুবার ব্যবহার করতে গেলেই এমন বিপত্তি। একবার দাড়ি কাটলেই যদি ভোঁতা হয়ে যায় কাঁহাতক প্রত্যেকবার নতুন নতুন ব্লেড কেনা যায়? নিজে নিজে ব্লেড বানানোর কোন উপায় সে খুঁজে পায়নি। গাল-টাল কেটেও না হয় দাড়ি কামানো গেল, কিন্তু নিজের চুল নিজে সে কাটতে পারে না কিছুতেই। বিশেষ করে, মাথার পিছন দিকের চুল। তাদের শত চেষ্টা করেও বাগে আনা যায় না। তাই চুল কাটাতে তাকে সেলুনে যেতে হয়েছিল। সঙ্গে দাড়ি কামানোটাও সেরে আসবে ভেবেছিল। চুল কাটার সঙ্গে দাড়ি কামানো ফাউ হিসেবে একই খরচে পাওয়ার একটা সুপ্ত বাসনাও ছিল মনে, কিন্তু খুঁচু খুঁচু নিপাত এমনই গম্ভীর ও বিটকেল প্রকৃতির লোক যে মুখ ফুটে মনের কথাটা তাকে বলতে সাহস পায়নি সে।

তার চুল আবার তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। ঘনঘন চুল কাটতে যাওয়ার হাঙ্গামা ছাড়াও খরচ আছে। তাই সে বলেছিল চুলটা যেন ছোট করে ছাঁটা হয়। চুল ছোট করে কাটো আর বড় করে, যেমনই কাটো না কেন তার জন্য খরচ বাড়াকমার ব্যাপার নেই। সে তো আর বিশেষ কোন স্টাইল করে চুল কাটতে যাচ্ছে না। কিন্তু খুঁচু খুঁচু নিপাত যা বলল শুনে তার আক্কেল গুড়ুম। সে বলল, 

‘স্টাইল করো আর না করো, আমার কাছে চুল কাটার সাইজ অনুযায়ী দাম। চুল যত ছোট কাটাবে তার দাম তত বেশি।’

এ আবার কী কথা? সে প্রবল প্রতিবাদ জানালো। খুঁচু খুঁচু নিপাত বলল, 

‘আমার কাছে চুল কাটার এটাই নিয়ম। চুল যত বেশি ছোট করে কাটাবে তার দামও তত বেশি। যত বড় করে ছাঁটাবে দাম তত কমতে থাকবে। আর এমন করতে করতে যদি না কাটিয়ে চুল পুরোপুরি বড় রেখে দাও যেমনকে তেমন তো কোন দামই দিতে হবে না। আমার এটাই নিয়ম। দেখো এবার কী করবে।’

এই নিয়ে একটু তর্কাতর্কি করেও বিশেষ লাভ হলো না তখনই। যদিও বোঝা গেল যে খুঁচু খুঁচু নিপাত নিঃসন্দেহে এক শত্রু তবুও রাজি না হয়ে উপায় ছিল না। অন্য নাপিতরা যে মিত্র হবে তার গ্যারান্টি কোথায়? এরপর কি চুল কাটার সঙ্গে ফাউ হিসেবে দাড়ি কামানোর কথাটা বলা যায়? বাধ্য হয়ে হাচিয়া ফালকে চুল ও দাড়ি কাটার জন্য আলাদা আলাদা দাম দিতে হলো।

খুঁচু খুঁচু নিপাত যে কী পরিমাণ শত্রু সেটা বোঝা গেল পরে। তাকে যে দেখে সেই তার চুল কাটা নিয়ে নানা মন্তব্য শোনায়। চুল তো সবাই কাটে, তা নিয়ে অন্যদের এত ব্যস্ত হওয়ার কোনো কারণ থাকার কথা নয়। তার চুল কাটা নিয়ে সবাইকে অত মাথা ঘামাতে দেখে সে ভাবল সবাই তার শত্রু বলে সে যে চুল কেটেছে এটা কারো গায়ে সহ্য হচ্ছে না। চুল কেটে সে ধোপদুরস্ত হয়েছে দেখে শত্রুরা সব হিংসেতে জ্বলেপুড়ে মরছে। তারপর একজন তাকে দেখে শেষমেশ বলল, 

‘বাহ্বা-বাহ্, খাসা চুল কেটেছো। দশ জনকে নেমন্তন্ন করে দেখাবার মত।’

আরেকজন বলল, 

‘যা চুল কাটিয়েছ তার একটা এগজিবিশন করতে পারো। লোকে খরচ করে দেখতে আসবে এমন চুল কাটা মাথা। তোমারও দু’ পয়সা আয় হবে।’ 

এসব শুনে তার সন্দেহ হলো। চুল কাটার পর সে আর আয়নার সামনে দাঁড়ায়নি। এবার বাধ্য হয়ে বাড়ি এসে আয়নাতে নিজেকে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ। সারা মাথার চুলে অজস্র গর্ত। আসলে ওইসব গর্তের জায়গাগুলিতে চুল খুবই ছোট করে কাটা। দেখলে মনে হবে যেন সারা মাথা থেকে খুবলে খুবলে চুল কেটে নেওয়া হয়েছে। 

খুঁচু খুঁচু নিপাত লোকটাকে শত্রু মনে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে এতটা শত্রুতা করতে পারে সেটা হাচিয়া ফালের কল্পনাতেও ছিল না। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *