সুতপন চট্টোপাধ্যায়
ইলিনা
আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের নোংরা ফেলা হয় সকালে আবাসনের বাইরে। সাত সকালে সব ফ্ল্যাট থেকে হাউসকিপিং-এর ছেলেরা ডাম্প করে, দশটা নাগাদ কর্পোরেশানের গাড়ি এসে তুলে নিয়ে যায় পরিত্যক্ত জিনিস। সকাল থেকেই নীরু ঢুকে যায় এই ময়লার পাহাড়ের মধ্যে। সে কাঁচের শিশি কুড়োয়। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। নোংরার ভিতর থেকে কাঁচের শিশি পেলেই সে ব্যাগে চালান করে। এখানে এক মিনিট দাঁড়ানো যায় না দুর্গন্ধে। কিন্তু নীরুর কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।
আশেপাশের অনেক বাড়ি আগে সে ঘুরে বেড়াত । এখন আর দরকার হয় না।
–কী করিস এই শিশি দিয়ে?
প্রশ্ন করি একদিন। সে উত্তর দেয়,
–সাবান জলে ধুয়ে, পরিষ্কার করে রোদে শুকোই। তারপর কেজি দরে বিক্রি করি।
–কে কেনে?
–ফোড়ে আছে। সব এক লপ্তে নিয়ে নেয়। এগুলো আবার ডাক্তারিতে যায়।মাল ভর্তি হয়ে আবার বাজারে আসে।
–তাই নাকি? কী করে জানলি?
–আমার খুড়তুতো দাদাই তো এর ব্যাবসা করে। ভালো কামাই। আমরা ভালো রেট পাই। আমার ইস্কুলের মাইনেটা হয়ে যায়।
–তুই ইস্কুলে পড়িস?
–হুম।
–বাড়িতে কে কে আছে?
–বাবা। মা কবে বাড়ি ছেড়ে অন্য বাপের সঙ্গে বিহার চলে গেছে।
–বাবা কী করে?
–সে কোন কাজ করে না। বসে বসে শুধু ঝিমোয়।
আমার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখ হয় নীরুর। ময়লার মধ্যে দাঁড়িয়েও ঝকঝকে সাদা দাঁতে একগাল হেসে বলত,
–ভালো আছো কাকু?
অনেক দিন আর নীরুকে দেখি না। সকালে বাজারে যাবার সময় গেট থেকে বেরিয়েই আমার ওই নোংরা ডাম্পারের দিকে চোখ চলে যায়। দু-একজন প্লাসটিক কুড়োয়, কিন্তু নীরুকে চোখে পড়ে না। আসে না হয়তো কোনও কারণে। যেমন হয়। না দেখা হলে স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যায়। নীরুও তেমনি আর মাথায় আসেনি। অনেক দিন পর একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম,
–হ্যাঁরে, নীরু আজকাল আসে না?
ছেলেটি বলল,
–না। সে এই কাজ করে না। কোথায় গেছে জানিও না।
না জানাই স্বাভাবিক। কে আর কার খোঁজ রাখে আজকাল!
আমার বদলি হয়ে গেছে মাদ্রাজে। প্রায় কুড়ি বছর কেটে গেছে সেখানে। দক্ষিণ মাদ্রাজের এক শান্ত, নিরিবিলি কলোনিতে আমাদের বাস। বাড়ি বদলাইনি। সমুদ্রের ধারে, গাছপালা ঘেরা এমন ফ্ল্যাট বেসান্ত নগরেই দুর্লভ। কলকাতায় আমার ফ্ল্যাটে প্রথম কিছুদিন ভাড়া দিয়েছিলাম, এখন ফাঁকা আছে। ভাড়াটেরা বাড়ির যত্ন নেয় না। আমরা বছরে কিছুদিনের জন্য আসি। ক’দিন থাকি। তাকিয়ে দেখি সেই একই ব্যবস্থা। সকালে আবাসনের ময়লার মধ্যে দু-তিন জন জিনিস কুড়ানি।
২)
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পারথ বিমানবন্দরে বিমানটি নামল বিকেলে। নতুন মহাদেশের অচেনা জায়গায় আমার ভিতরে বিপুল শিহরণ । আম্বাতুরে অবস্থিত যে বিশাল কেমিক্যাল কোম্পানিতে আমি চাকরি করি,তাদের অনেক বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ চুক্তি আছে। সেই রাস্তায় অনেক বিদেশি প্রোডাক্ট এদেশে নিয়ে এসেছে। আমি এবার সেই উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। পিটার আসবে আমাকে নিতে। সে আমাকে নিয়ে আজ রাতে ব্রাসউড্ হোটেল ও রিসর্টে নামিয়ে দেবে। কাল থেকে আমাদের মিটিং শুরু। পিটারের বাবা বেরি কাল একেবারেই মিটিং-এ দেখা করবেন বলে আগেই জানিয়েছেন। আমার কোনও অসুবিধা নেই। আমি বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই এক মুখ হেসে পিটার অভ্যর্থনা করল,
–ওয়েলকাম টু পারথ। নাইস টু মিট ইউ।
আমি এক বিশুদ্ধ বায়ুমণ্ডলে বুক ভরে নিশ্বাস নিলাম। করমর্দন হল আমাদের। গাড়িতে পিটার সময় নিল আধঘন্টা। হোটেলে পৌঁছে লাগেজ নিতে এগিয়ে এল তিন জন। লাগেজগুলো ট্রলিতে তুলে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতেই আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। পৃথিবীর এই প্রান্তে কারা হিন্দিতে কথা বলে? আমি হিন্দিতে প্রশ্ন করলাম,
–আপনারা কোথাকার লোক?
একজন অকপটে উত্তর দিল, উত্তর প্রদেশের মির্জাপুরের। এক একে বারোজন গ্রাম থেকে চলে এসেছে চাকরির কাজে।
–কেমন আছেন এখানে?
এক গাল হেসে বলল লোকটি,
–খুব ভালো, খুব ভালো। ইচ্ছে করে না দেশে যেতে। তাই চার-পাঁচ বছর অন্তর যাই। এখানেই সব।
আমি যে হোটেলটায় উঠেছি তার পাশেই বিখ্যাত পারথ ক্রিকেট মাঠ। ভারতের সঙ্গে ম্যাচ আরম্ভ হবে পরের দিন। এই হোটেলেই ভারতীয় প্লেয়াররা উঠেছে। আমার শরীরে একটা বাড়তি শিহরণ। কাগজের পাতায় যাদের দেখেছি তাদের সামনাসামনি দেখা হয়ে যাবে যে কোনও সময়। আর তা না হলে তো ব্রেকফাস্টের সময় হবেই। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। চরম উত্তেজনায় রাত কাটল সেদিন।
ক্রোমলীন কেমিক্যালসের অফিসে আমার মিটিংটা খুব জরুরি। আমার কোম্পানির সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টায় ভারতে উৎপাদন করা যাবে এমনই এক চুক্তি তৈরি করার আলোচনায় ও নীতি নির্ধারণের জন্য আমি এসেছি। এই কোম্পানিটার নামযশ আছে, দীর্ঘদিনের গবেষণার ইতিহাস আছে। নানা ক্ষেত্রের ভালো ভালো প্রোডাক্ট বানায়, পৃথিবীর অনেক দেশে রপ্তানি করে। আমরা আমদানি করব না। আমরা তৈরি করব ওদের প্রযুক্তির সাহায্যে। অনেক সম্ভবনা আছে ভারতের বাজারে। তাই অনেক গবেষণা করেই এতদূর আসা। পিটার এই কোম্পানির ভবিষ্যৎ মালিক।
মিটিংরুমে বেরি ক্রোমলীন সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। বেরি যেহেতু ম্যানেজিং ডিরেকটর সেই জন্য তিনি কথা কম বলেন, তার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরাই শুরু করল। একে একে। তাদের মধ্যে একজন মহিলা। ইলিনা, এই কোম্পানির ফিনান্স হেড। সে কেবল লক্ষ করছিল আমাদের কথোপকথন। প্রায় সারা দিন নানান বিষয়ের ওপর আলোচনা করে আমি হোটেলে ফিরলাম। পরের দিন আবার ল্যাবরেটরিতে আলোচনা।
দুদিনের মিটিং সেরে একটা দারুণ সমঝোতায় পৌঁছে আমরা দিনের শেষে শ্যাম্পেন দিয়ে সেলিব্রেট করছি। বেরি আমাকে বললেন,
–তোমার কালকে আমার বাড়িতে ডিনারে নেমতন্ন। আমার স্ত্রী হলেন এক্স মিস পারথ। সে আপ্যায়ন করবে।
আমি ধন্যবাদ জানালাম বেরিকে। মানুষটা প্রাণখোলা ও সহজ । আমাকে তিনি বাড়িতে নেমতন্ন না করতেও পারতেন।
৩)
পিটার আমাকে নিয়ে গেল বাড়িতে। আমাকে ছেড়ে সে কী একটা জরুরি কাজে চলে গেল। বলে গেল,
–বেরি তোমায় হোটেলে পৌঁছে দেবে। রিলাক্স।
আমি বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই দু হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন মিসেস বেরি।
অপুর্ব সুন্দরী, এখনও এই বয়সে তার দিকে তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। আমাকে তার বারে নিয়ে গিয়ে বললেন,
–অল আর ইয়োরস্। এনজয়। রাতে বাড়ির পিছনের বাগানে বারবিকিউ আছে। নাইট ইজ অলসো ইয়োরস।
এবার বেরি ঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে ইলিনা। পরনে মাখন রঙের স্কার্ট, চোখে গোল চশমা । পরিচয় করিয়ে দিলেন,
–তুমি মিট করেছ অফিসে । শি ইজ মাই ডটার, ইলিনা।
ইলিনা হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বলল, হাই। শান্ত,পরিচ্ছন্ন, বুদ্ধিদীপ্ত ইলিনা আমার দিকে তাকিয়েই চোখ নিচু করল দু’বার। আমার দৃষ্টি এড়াল না। তারপর সে চলে গেল ভিতরে।
দেওয়ালে একটি ফ্যামিলি ট্রি টাঙানো ছিল। বেরি আমাকে ডেকে বললেন,
–দেখো আমাদের সঙ্গে ভারতের অনেক দিনের সম্পর্ক।
আমি অবাক হয়ে তাকাই। বেরি বললেন,
–দেখো, এই ভদ্রলোককে দেখতে পাচ্ছ?
আমি সেই মানুষটির ছবির দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁর নামের নীচে লেখা আছে “মেয়র অফ্ বম্বে”। তারপর দুটি সালের উল্লেখ। বেরি বললেন,
–আমার দাদু তোমাদের বম্বের মেয়র ছিলেন। আমাদের পুর্বপুরুষ অনেক বছর ভারতে কাটিয়েছে। তারপর আর ইংল্যান্ডে ফিরে যায়নি। চলে এসেছিল এই শহরে। অনেস্টলি, ইন্ডিয়ার প্রতি আমার একটু উইকনেস আছে বলতে পার। আমরা ভারতের অনেক শহরে গেছি। তোমার শহর মাদ্রাজের স্মৃতি বহু বছর আগের ।
তরপর আমরা ফিরে এসেছি নিজের জায়গায়। এক সময় বেরি বলল,
–ইলিনাকে আমরা এনেছি কলকাতা থেকে।মাদার টেরেসাকে আমরা ভীষণ ভালোবাসি। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই কলকাতায় পঁচিশ বছর আগে। গ্র্যান্ড হোটেলে ছিলাম। সেখানে কার ওয়াশরুমে কাজ করত ইলিনা। আমার মেয়ে নেই। ওকে দেখে কেমন যেন মনে হল, এমনই কাউকে মেয়ে হিসেবে পেলে মন্দ হয় না!
–কোলকাতা থেকে? তারপর? কী ভাবে নিয়ে এলেন?
আমার আগ্রহের বাঁধ ভেঁঙে গেছে। বেরি জানালেন,
–ওকে জিজ্ঞাসা করলাম। আমাদের সঙ্গে যেতে রাজি আছে কিনা? রাজি হল। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ওকে নিয়ে এলাম। ইলিনা আমার ছেলের থেকেও বিশ্বস্ত। ও চাটার্ড। ব্রিলিয়ান্ট। ও আমার কোম্পানির সেক্রেটারি ও ফিনান্স দেখে । আমার সঙ্গে অফিসে যায়। লোকের মধ্যে একটু লাজুক, কিন্তু কাজে সে দারুণ স্মার্ট।
ঠিক এই সময় মিসেস বেরি উঠে পড়লেন। অনেকটাই পান করেছেন। শরীরটা টলছে। বেরি বললেন,
–তুমি বারবিকিউতে চলে যাও। নেচারের মধ্যে রেস্ট নাও। ইলিনা ওখানে আছে।
বলে আবার একটা পেগ নিলন। সেটা যে কত নম্বর গুনিনি।
বারবিকিউতে পিটার, পিটারের ফিঁয়াসে, বেরির বান্ধবী, মিসেস বেরির বন্ধু , ইলিনা আর আমি। হালকা একটা মিউজিক চালিয়েছে পিটার। বড় ছেলে আমেরিকায় থাকে বেরির। একবার দুঃখ করে জানালেন যে এই প্রান্তের মানুষ খুব মিশুকে হয়। তারা ইংরেজদের মতো নাক উঁচু নয়। প্রাণ খোলা। রাখঢাকের বালাই নেই। গানের তালে তালে সবাই নাচতে আরম্ভ করল। হালকা হাওয়া দিচ্ছে। বাড়ির পিছনে উন্মুক্ত বাগানের মধ্যে এক টুকরো মাঠে আমরা ক’জন। আমাদের দু পাশে সার সার নানান বাহারি ফুলের সমারোহ, একদিকে নানা সবজির গাছ আর মধ্যমণি হয়ে বাগানের মধ্যে একটি ছাতিম গাছ। তার নীচে আমাদের সকলকে কেমন আধো অন্ধকারে রহ্যসাবৃত লাগছে। মিষ্টি প্রসাধনের গন্ধ উড়ে আসছে উপস্থিত মহিলাদের শরীর থেকে। সবাইকে একসঙ্গে পেয়ে অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন মিসেস বেরি। তিনি সকলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আহ্বান করলেন পানীয়ের টেবিলের দিকে। তারপরই পানাহার আরম্ভ হল। ইলিনা তার সবটাই তদারকি করছে। তীক্ষ্ণ নজর তার প্রায় সকলের ওপর। গানের তালে তালে সবাই নাচতে আরম্ভ করল। আমার আবার নাচ আসে না। আমি ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছি। হঠাৎ ইলিনার গলায় চমক ভাঁঙল। খুব কাছে এসে ইলিনা বলল,
–আপনাকে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আপনি মাদ্রাজ থেকে এসেছেন, তাই সঙ্কোচ হচ্ছে। কিছু যদি না মনে করেন !
–না, না বলুন। কোনও অসুবিধা নেই। নিঃসঙ্কোচে বলতে পারেন।
–আপনাকে আমার খুব চেনা একজনের মতো দেখতে। মুখে ভীষণ মিল।
–তাই নাকি? কে তিনি? আমার কন্ঠে বিস্ময় ।
–কলকাতার ঢাকুরিয়ায় নির্মলা অ্যাপার্টমেন্টে আমার এক কাকু ছিল। হুবহু তার মতো দেখতে আপনাকে।
আমার মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল। চমকে উঠলাম আমি। আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে, তুমি সেই নীরু না?
ইলিনা একগাল হেসে বলল,
–চিনতে পেরেছেন তাহলে?
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
