পাঠক মিত্র
শতবর্ষ পরে কবি সুকান্ত এবং ….
শতবর্ষ পরে কবি সুকান্ত এবং ….
কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মশতবর্ষে পদার্পণ করলেন গত ১৫ আগস্ট । তাঁর স্মরণে কোন আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ সেভাবে দৃষ্টিগোচর হয়নি । স্বাধীনতা দিবসের আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের উদ্দীপনার মাঝে কবির জন্মশতবর্ষ শব্দহীন থাকাটাই স্বাভাবিক। এই স্বাধীনতা মানুষের শোষণহীন সমাজ দিতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে রাজনৈতিক তর্ক থাকতে পারে । কিন্তু কৃষক শ্রমিক আজও কি তাঁদের শ্রমের মূল্য পাচ্ছে ? এই প্রশ্নের উত্তর কি একেবারে অচেনা, অজানা ? চলমান সমাজে তা অচেনা নয় । কবির সময় আর এখনকার শোষণের চরিত্র এক নয় । কিন্তু সমাজে মানুষ যে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয় বা হচ্ছে তার উদাহরণ দিতে এখন আর খুঁজতে হয় না । এই বঞ্চিত মানুষদের জন্য কিশোর কবির কলম কথা বলেছে l রক্তের, ঘামের আর চোখের জলের ধারায় যাদের জন্ম তাদের কথা বলেছেন কবি । তাদের জেগে ওঠার কথা বলেছেন । বঞ্চিত মানুষ তাঁর কাছে বিদ্রোহের দূত । ‘কলম’, ‘সিঁড়ি’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘সিগারেট’ উপমার কবিতা যা সেই দূতকে আহ্বান জানায় । সেই বিদ্রোহে তাদের ঠিকানার সন্ধানে কবির কলম বিদ্রোহের ঝড় তুলেছে । ঝড়ই তো বলতে পারে, পোষমানাকে অস্বীকার করো, অস্বীকার করো বশ্যতাকে । এই বশ্যতা অস্বীকার করতে না পারলে নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ডাকতে হবে-সেই কথাই কবি বলেছেন । ‘ধূর্ত, প্রবঞ্চক যারা কেড়েছে মুখের গ্রাস/তাদের করেছ ক্ষমা, ডেকেছ নিজের সর্বনাশ ।’ সেই সর্বনাশের রাস্তা দিয়ে এই ধূর্ত প্রবঞ্চকদের কাছে হাত পেতে যেতে হয় যা প্রবল অন্যায় বলে কবি সাবধান করেছেন । ‘তুমি যে পেতেছো হাত; আজ মাথা ঠুকে বারে বারে / অভিশাপ দাও যদি, বারংবার হবে তা নিষ্ফল–/তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল ।’ সমাজের স্তরে ন্যায় অন্যায় প্রশ্ন তুলে ধরে কিশোর কবি শুধু কিশোরদের বার্তা দেয়নি । তাঁর সেই বার্তা সকলের জন্য । ‘মিঠেকড়া’ কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি ছাড়ার ছন্দে সেই বার্তা দিয়েছেন । ‘পুরোনো ধাঁধা’, ‘ভেজাল’, ‘ব্ল্যাক-মার্কেট’, ‘পৃথিবীর দিকে তাকাও’, ‘ভালখাবার’ ছড়া ও কবিতা আজকের সময়কে ভ্রুকুটি না করে পারে না । ‘ভালখাবার’ কবিতার শেষ লাইনে ধনপতি বলছে, ‘..সবচেয়ে ভাল খেতে গরীবের রক্ত।।’ আজকে এই ধনপতি র দেখা কি মেলে না ? এই সময় গরীবের জন্য রাজনীতি ধনপতি কে নেই। তবে গরীবকে হাত পেতে থাকতে হবে । অথচ কবি চেয়েছেন,’…গরীবের দেশে সইবে না তারা/ বড়লোকদের হাত ।’
বড়লোকদের হাত থেকে গরীবের অধিকার বাঁচাতে তিনি শুধু কলম ধরেননি, তিনি নিজে রাজনৈতিক লড়াইয়ের কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন । কবি তদানীন্তন বামপন্থী আদর্শের সাথে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন । কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘আমি কবিতা ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছিলাম, কিন্তু সুকান্ত কবিতা নিয়েই রাজনীতিতে এসেছিল।’ পঁচাত্তর বছর আগে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় অধ্যাপক শীতাংশু মৈত্র লিখেছিলেন ‘জনসংগ্রামের কবি সুকান্ত’ । এই প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন, ‘..শোষণের অবসানেই সর্বমানবের কল্যাণ । আজ যে শ্রেণী সেই শোষণের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে ব্যাপৃত, সেই শ্রেণীতে কর্মে উদ্দীপ্ত করে সুকান্ত তার কবিধর্ম পালন করে গিয়েছে । তাই সে বিশিষ্ট শ্রেণীর হয়েও সকলের । আর, এমন লোক আজকের সমাজে ক’জনা যারা বলতে পারে, আমরা আমাদের শ্রমের মূল্য পেয়েছি, সুকান্ত আমাদের কবি নয় ।’
সাম্যবাদের সাথে কবিসত্তার একাত্ততার বিরল নিদর্শন বাংলা কাব্যজগতে তাঁর স্বল্প জীবনে তিনি রেখেছেন । ‘সুকান্ত প্রসঙ্গ’ গ্রন্থের সম্পাদনে অশোক ভট্টাচার্য বলেছেন সুকান্ত ‘এক সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী কবি ।’ সেই বাস্তববাদ শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের সর্বাঙ্গীন সংগ্রাম । এই সংগ্রামে শোষক আর বঞ্চিতের সত্যিকার চরিত্রলিপি তৈরি করেছেন কবি । এ সম্পর্কে বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক বদরুদ্দিন উমর সুকান্তকে গোর্কির সাথে তুলনা করেছেন । উমর বলছেন, ‘গোর্কিকে সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় ।…তিনি তা করেছিলেন অত্যন্ত সচেতনভাবে, শোষক শোষিতের সত্যিকার চরিত্র ও পারস্পরিক সম্পর্ককে নিজের সাহিত্যের মধ্যে রূপদান করে । শ্রেণী সংগ্রামের বাস্তবচিত্রকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরে তিনি তাদের এই সংগ্রামকে তার পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন । বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রে গোর্কি যে কাজ সম্পন্ন করেছিলেন সুকান্ত বাংলা কবিতার ক্ষুদ্রতর পরিধির মধ্যে সেই কাজই সম্পন্ন করেছিলেন ।’ তাঁর কাব্য প্রকৃতি সাহিত্যে নবজন্মের সূচনা করেছে বলে স্বীকারোক্তি করেছেন মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর কথায়, ‘..গভীরতা, ব্যাপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদির সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসাবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি গীতি কবিতা পর্যন্ত । সুকান্তর কবিতায় তাই বাংলা কাব্য-সাহিত্যের নবজন্ম হল ।’ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ হয়েও সাহিত্যে সুকান্তের অবদানকে অকুন্ঠচিত্তে স্বীকৃতি জানিয়েছেন । তিনি লিখেছেন, ‘ রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন সর্বমানুষের জীবনযাত্রার মর্মকথাটিকে সহজভাবে উদ্ঘাটিত করতে আকাশ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসতেই হবে ।…যখন সমাজের মনকে জড়তায় অসাড় করে তোলে তখন স্বপ্নের যোগনিদ্রা হতে কবিকে জাগতে হয় । শেষ জীবনে বাংলা কাব্যের এই নবজন্মের জন্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতীক্ষা করেছিলেন । শেষ জীবনে বাংলা কাব্যের এই নবজন্মের জন্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতীক্ষা করেছিলেন । কিন্তু তখন ভঙ্গি-সর্বস্ব ‘শৌখিন-মজদুরি’ তাঁর প্রত্যাশাকে ব্যঙ্গ করেছিল । এ সম্বন্ধে আমার যতটুকু পড়াশোনা আছে তাতে আমার মনে হয়েছে যে সাধারণ মানুষের প্রাণ ধারণের গ্লানি সহজ মর্যাদায় প্রথম বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে সুকান্তের কাব্যে ।’ সুকান্ত মানুষের কথাই বলেছে বাস্তবের মাটিতে নেমে । কিন্তু এমন বাস্তব মাটিতে কবির এই পথচলা কবি বুদ্ধদেব বসুর কাছে আদৃত হয়নি । সুকান্তের কবিশক্তির প্রতি আস্থা রেখে জাত-কবিদের ক্লাশে মার্কা দিয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত সুকান্তের কাব্য বিকাশের পথ অবরুদ্ধতা দেখেছেন । তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘বস্তুত, ধনিকের দ্বারা শ্রমিকের রক্তশোষণ সুকান্তর রীতিমতো একটা ম্যানিয়া হয়ে উঠেছিল ; সর্বত্রই সে যেন বিরোধিতা দেখছে, আর তার থেকে পালাতে গিয়ে বার বার ডুব দিচ্ছে ভাবালুতায় ।…আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এ-সব রচনা সুকান্তর স্বাধীন স্বচ্ছন্দ কর্মপ্রসূত । সৈনিক পঙতিতে বন্দী হলে, কোনো মতবাদের দাসত্ব স্বীকার করলে, কবিশক্তির স্বাভাবিক বিকাশ কী-ভাবে অবরুদ্ধ হয় তারই উদাহরণ সুকান্ত। ‘ অথচ কবি মণীন্দ্র রায় সুকান্তের কাব্য প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি(সুকান্ত) প্রকৃত অর্থেই একজন সমাজ সচেতন নতুন যুগের কবি বলেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এদেশে যতোই তীব্র হবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাও ততো নতুন নতুন ব্যঞ্জনা ও প্রেরণায় ভাস্বর হয়ে উঠবে ।’
নবজাতকের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধের ‘ছাড়পত্র’ লিখে যে ইতিহাস হতে চেয়েছিলেন সেই ইতিহাসের পাতায় আজ অন্ধকার । অন্ধকারের আতঙ্ক। আর সেই আতঙ্কের আড়ালে বাঁচে মানুষের জীবন ।
‘এ শহর আতঙ্ক ছড়ায়’ বলে কবি সুকান্ত তাঁর সময়কে তুলে ধরেছিলেন । তুলে ধরেছিলেন যুদ্ধ আতঙ্কের শহরকে । সেই আতঙ্কে পথ উপভোগ করেছে এক নির্জনতা । সেই নির্জনতায় মানুষের আতঙ্ক । কবি লিখলেন —-
‘সন্ধ্যার আলোর বন্যা/আজ আর তোলে নাকো/জনতরণীর পাল/শহরের পথে ।/ট্রাম নেই, বাস নেই—-/সাহসী পথিকহীন/এ শহর আতঙ্ক ছড়ায় ।’
কিন্তু আজও এক যুদ্ধ । শত্রু দেশে দেশে । আতঙ্ক পথে পথে । বিশ্বজুড়ে । আতঙ্ক মানুষে মানুষে । শত্রুকে চিনিয়ে দেওয়ার এক খেলা চলছে দেশে দেশে । যত চেনা হয়ে উঠেছে তবু তত চেনা মানুষের থেকে প্রতিটি মানুষ সরে থাকে অচেনা মানুষের মতো । এই শত্রুতা এমন পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে, আজ মানুষই যেন মানুষের শত্রু । হয়তো পৃথিবীর এই নতুন শত্রু তাচ্ছিল্য ভরে বলছে, ‘ এ আর নতুন কথা কি । তোমরা মানুষেরা চিরকাল ত এভাবেই ছিলে । চিরকাল বলতে তোমরা নিজেদেরকে যত সভ্য করে গড়ে তুলেছ, তত তোমাদের মধ্যে শত্রুতা বেড়েছে । তাই আমি নতুন কিছুই করিনি । তোমাদের ভাষায় ‘হিংসা’ বলতে যা বোঝায়, তা কি আমার মধ্যে আছে । আমি তোমাদের কাবু করার কৌশল করেছি মাত্র । কিন্তু আমার সে কৌশলের কাছে তোমাদের সভ্যতা এত নগণ্য, সে তোমরা আজ বুঝতে পারছো তো ।’
সত্যি পৃথিবীর এই নতুন শত্রু ‘হিংসা’ শব্দটার অর্থ বদলে দিয়েছে । তার সংক্রমণের চরিত্রটাই হল হিংসা । সেই হিংসার ছোবলে সারা মানবজাতি ।
কবি ভট্টাচার্য তাঁর সময়ে বলা কথা অন্যভাবে হলেও আজকের সময়ে তার অন্যমাত্রা নিয়ে সেই কথাটা বলা যায়—
‘পৃথিবীময় যে সংক্রামক রোগের,/আজকে সকলে ভুগছে একযোগে…।’ শুধু সংক্রামক রোগে ভোগা শুরু নয় । এই রোগের আতঙ্কে মানুষ বিচ্ছিন্ন । বিচ্ছিন্ন মানুষের থেকে কেড়ে নিয়েছে কাজ । কেড়ে নিতে চলেছে খাদ্য । কিন্তু খিদে কেড়ে নিতে পারে নি । এক ধরণের মানুষের লোভ কেড়ে নিতে পারে নি । লোভের অস্ত্র দিয়ে এরা কেড়ে নেয় মানুষের অন্নবস্ত্র। যে লোভে দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে মানুষের বেঁচে থাকার রসদ । একদিকে মানুষের খিদে আর একদিকে একধরনের মানুষের লোভ যখন সরল অনুপাতে চলতে থাকে, তখন কবি সুকান্তের কথাগুলো যেন নতুন করে প্রসঙ্গ ফিরে পায় ।
‘একদা দুর্ভিক্ষ এল/ক্ষুধার ক্ষমাহীন তাড়নায়/পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁষি সবাই দাঁড়ালে একই লাইনে/ইতর ভদ্র, হিন্দু আর মুসলমান /একই বাতাসে নিলে নিঃশ্বাস ।/চাল, চিনি, কয়লা, কেরোসিন?/এ সব দুষ্প্রাপ্য জিনিসের জন্য চাই লাইন ।’
সত্যি । আজকে লাইন সর্বত্রই । যে লাইনে জাতপাত নেই, ধর্ম নেই, ইতর-ভদ্র নেই, সৎ-অসৎ নেই । এ লাইন বেঁচে থাকার লাইন । তাই একদিন কবি সুকান্তের কলম তার যে ছবি এঁকেছিল, এখন যেন যে কোনো মুহূর্তে তৈরি হতে চলেছে তারই প্রতিচ্ছবি ।
‘আশ্চার্যের অন্বেষণে প্রতি মনে আদিম আগ্রহ/রাস্তায় রাস্তায় আনে প্রতিদিন নগ্ন সমারোহ;/বুভুক্ষু বেঁধেছে বাসা পথের দুপাশে,/প্রত্যহ বিষাক্ত বায়ু ইতস্তত ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসের।’
এই সময়ের যুদ্ধে বুভুক্ষু ছবি বিক্ষিপ্তভাবে দেখা দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে পথের দুপাশে । এই ছবি যদি বাসা বাঁধে, তার চরিত্রের ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাস বলে দেয় দেশ আবার এক অন্ধকারে ডুবে যাবে । কবি সুকান্তের আঁকা ছবিটা তখন হয়তো আবার বেঁচে উঠবে ।
‘আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,/জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে,/দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল, /প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল ।’
দুর্ভিক্ষের মিছিলে জীবন্ত প্রাণ নিরন্ন, এনে দেয় অনিবার্য মিল । এই মিল শহরে গ্রামে দিনে দিনে বয়ে চলে । বয়ে নিয়ে চলে দুর্দিন । যে দুর্দিনে নিরন্ন জীবন বিপন্ন । সেই দুর্দিনে বিপন্নতার ছবি যারা নিঃশব্দে তৈরি করে, তারা আভরণহীন । কবির কথায়–
‘মধ্যবিত্ত ধূর্ত সুখ ক্রমে ক্রমে আভরণহীন /নিঃশব্দে ঘোষণা করে দারুণ দুর্দিন/পথে পথে দলে দলে/কঙ্কালের শোভাযাত্রা চলে,/দুর্ভিক্ষ গুঞ্জন তোলে/আতঙ্কিত অন্দরমহল ।’
অন্দরমহল আতঙ্কিত হলেও বারে বারে কৃপণ পৃথিবী লোভের অস্ত্র দিয়ে কেড়ে নেয় অন্নবস্ত্র । এই লোভে এক বিশাল অংশ বিপন্ন হয়ে পড়ে । এই বিপন্নতায় লড়াই তাদের করতে হয়, করে যেতে হয় । কখন হয়তো তারা জেতে, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে জিতে যায় ঐ লোভীর দল । এই দল লোভে গড়ে তোলে তার দুর্গ,গম্বুজ ও প্রাসাদ । আর চারপাশে বুভুক্ষু দলের ভীড় । কবির ভাষায়- ‘নগরে ও গ্রামে জমেছে ভীড়/ভগ্ননীড়—-/ক্ষুধিত জনতা আজ নিবিড় ।’
এই অভাবী ক্ষুধিত জনতা বাঁচার লড়াই করে । কিন্তু তাদের এই লড়াইয়ের বিরুদ্ধে চলে লোভের লড়াই । সেই লড়াইয়ে হারতে হয় অভাবী মানুষদের । কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর সময়কে যেভাবে তুলে ধরেছিলেন, তা আজকের সময়ে তার প্রতিফলন অন্য রূপে হলেও, তবু বলা যায় —
“সামান্য কয়েকজন লোভী /অনেক অভাবীর বিরুদ্ধে /আর স্বাস্থ্যবানদের বিরুদ্ধে /ক্ষয়ে যাওয়ার দল/সূর্যালোকের পথে যাদের যাত্রা /তাদের বিরুদ্ধে তাই সাপেরা/অতীতে অবশ্য এই সাপেরা জিতেছে বহুবার”
এই সাপেদের লোভের বিষাক্ত বায়ু যখন বইতে থাকে তখন কবিকে বলতে হয় –
‘তাই নিত্য বুভুক্ষিত মন/চিরন্তন /লোভের নিষ্ঠুর হাত বাড়াল চৌদিকে/পৃথিবীকে /একাগ্রতায় নিল লিখে ..।’
এই একাগ্রতায় কবি নিজের অসহায়তার কথা ব্যক্ত করেছেন–
‘তোমাকে ফেলে এসেছি দারিদ্র্যের মধ্যে /ছুঁড়ে দিয়েছি দুর্ভিক্ষের আগুনে,/ঝড়ে আর বন্যায়, মারী আর মড়কের দুঃসহ আঘাতে/বারবার বিপন্ন হয়েছে তোমাদের অস্তিত্ব । ‘
মানুষের সংকট আরো গভীর হয়ে পড়ছে । তা বলতে গিয়ে কবি বলেছেন–
‘রোগের প্রাসাদ ওঠে সেখানে প্রতিটি ঘরে,/মানুষ ক্ষুধিত আর শেয়ালের উদর ভরে;/এখনো রয়েছে কোটি মরণের পথ চেয়ে..।’
বিপন্ন মানুষের অস্তিত্বে পৃথিবী হতবাক, যতই তারা ক্ষুধার্ত কাকের মত কা-কা করুক । কবির কথায়–
‘বিফল চিৎকার তোলে বুভুক্ষার কাক
— পৃথিবী বিস্ময়ে হতবাক ‘
তবু এই অভাবী মানুষের অবস্থার কথা কবি শুনিয়েছেন মহামানবদ্বারে । তিনি বলেছেন–
‘আমার দেশেতে আজ মরে লোক অনাহারে
এসেছি তাদের তরে মহামানবদ্বারে—-
লাখে লাখে তার আজ পথের দুধের থেকে
মৃত্যু দলিত বশে পথকে ফেলেছে ঢেকে ।’
মৃত্যু দলিত মহাশ্মশানের পথে পথে কবি মহামানবের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন কোটি কোটি নরনারী শিশুর ক্ষুধা নিবারণে ।
‘ক্ষুধিতের সেবার সব ভার/লও লও কাঁধে তুলে-/কোটি শিশু নরনারী /মরে অসহায় অনাদরে/মহাশ্মশানে জাগো মহামানব /আগুয়ান হও ভেদ ভুলে ।’
কবি সবাইকে আহ্বান করেছেন সকল ভেদাভেদ ভুলে । কিন্তু সব ভেদাভেদ ভুলতে বললেও একটি ভেদাভেদ যে থেকেই যায় তা কবি না বলে পারেন নি । মজুতদারের লোভ বিপন্ন মানুষকে আরো বিপন্নতা ও অসহায়তার থেকে যে ঠেলে দেয় কবি তা বারে বারে বলেছেন । তাই মানুষ আর মজুতদার – এই ভেদ যুগ যুগ ধরে যে থাকবে কবি তা ব্যক্ত করেছেন ।
‘তারপর বহু শত যুগ পর/ভবিষ্যতের কোনো যাদুঘরে /নৃতত্ত্ববিদ্ হয়রান হয়ে মুছবে কপাল তার,/মজুতদার ও মানুষের হাড়ে মিল খুঁজে পাওয়া ভার ।’
মানুষ আর মজুতদারের ভেদাভেদ যতদিন থাকবে ততদিন মানুষ বিপন্ন থাকবে নানাভাবে । তবু মানুষ বিপন্নতার মাঝে তাদের লোভহীন জীবনকে বয়ে নিয়ে যায় । কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সে ছবি তুলে ধরে জীবনকে জাগিয়ে রাখতে চেয়েছেন । বলেছেন–
‘দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে/এ গ্রামের লোক আজো সব কাজ করে/কৃষক-বধূরা ঢেঁকিকে নাচায় পায়ে/প্রতি সন্ধ্যায় দীপ জ্বলে ঘরে ঘরে ।’
শোষণ যন্ত্রের তালে লোভহীন মানুষের জীবনসংগ্রামে প্রাণহীন প্রাণ বয়ে চলার ছবি যে শিল্পীর তুলিতে ফুটে ওঠে তাঁর কি আলাদা পরিচয় থাকতে পারে । আবার শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শোষিতের দূত চিহ্নিত করলেই তাঁর আলাদা পরিচয় ? এই পরিচয় থেকেই কবি সুকান্ত বামপন্থী কর্মী হিসেবে পরিচিত বলেই কি তিনি স্বাধীনতার উৎসবের আলোয় অবহেলিত ? প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
