অমিতাভ সরকার

যদি স্মরণে আসে মোরে

জগন্ময় মিত্র

একজন তরুণ গায়ক এসেছেন  এইচএমভির রিহার্সাল রুমে। সামনে স্বয়ং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। উনি তখন এইএমভির প্রধান ট্রেনার। ওইরকম মহীরূহের সামনে তরুণটি প্রচণ্ড নার্ভাস। পরিস্থিতি সহজ করে দিলেন কবি নিজেই। প্রথম পরিচয়তেই ‘তুই’ সম্বোধনে আপন করে নিলেন। সেদিন তরুণটি তার নিজের লেখা এবং সুর করা ‘যদি বাসনা মনে/দিবে দহন জ্বালা’। নজরুলের খুবই ভালো লাগলো। তিনি ওই রুমে বসে ওই একই সুরের ওপরে লিখে ফেললেন, ‘শাওনও রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে।’ তরুণটি ওই গান সুরে বসিয়ে গেয়ে শোনালে নজরুল তো খুশিতে আত্মহারা। ১৯৩৯ সালের ১৮ই মে তারিখে এই গান দিয়ে তরুণ গায়কের প্রথম রেকর্ডিং হলেও রয়্যালটির কারণে গানটি শিল্পীর দ্বিতীয় রেকর্ড হিসেবে বেরোলো। বলাই বাহুল্য, তরুণটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন।

সেদিনের সেই তরুণটির নাম জগন্ময় মিত্র। 

১৯১৮ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর কলকাতা চেতলায় মামার বাড়িতে ওঁর জন্ম। তার একমাস আগেই পঁচিশ বছর বয়সে বাবা যতীন্দ্রনাথ মিত্রর অকালমৃত্যু হয়েছিল। বাবাকে দেখার সুযোগ হয়নি। তাই ছোটবেলাটা মামার বাড়ির দাদু- দিদা, কিংবা বাবার দিকের বিভিন্ন  পিতৃস্থানীয় মানুষজন, ঠাকুর্দা-ঠাকুমা -এঁদের সবার স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যে দিয়েই   অতিবাহিত হয়েছে। এঁরা কলকাতার আপার সার্কুলার রোড থেকে বাসস্থান পরিবর্তন করে বালিগঞ্জে চলে এসেছিলেন। বাড়িতেই পড়াশোনা শুরু। তারপর  বালিগঞ্জের জগবন্ধু ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। চেতলা বয়েজ এইচ.ই. স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। তারপর ওঁর লেখাপড়ার পরবর্তী পর্যায় সম্বন্ধে আর কিছু জানা যায়নি। কলকাতার কোন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, কতদূর কী পড়াশোনা চলেছিল- এইসব তথ্য অন্ধকারেই রয়ে গেছে। তবে ওঁদের বাড়িতে গানের চর্চা ছিল। কাকা পঞ্চানন মিত্র হারমোনিয়াম বাজানোয় দক্ষ ছিলেন, ওস্তাদের কাছেও গান শিখতেন। শিশু জগন্ময়ের তখন থেকেই গান শোনার অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছিল। ঠাকুর্দা বিধুভূষণ মিত্রও গানের সমঝদার মানুষ ছিলেন।  

ছোটোবেলায় বড়দের চোখ এড়িয়ে ‘বার-বাড়ির ওস্তাদদের ঘরে’ গিয়ে ওস্তাদদের কাছ থেকে শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের বিভিন্ন তান, হরকত, রাগরাগিনী কিংবা  তবলাবাদকদের কাছ থেকে তবলার বোল ইত্যাদি শেখার চেষ্টা করতেন। বিনিময়ে ওদের ধুম্রশলাকা গুরুদক্ষিণা দিতে হতো। 

প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে প্রথাগতভাবে সঙ্গীত শিক্ষার শুরু। কেশব মুখোপাধ্যায়ের কাছে ধ্রুপদ খেয়াল ঠুংরি শেখা শুরু। কিশোর বয়সে ডি.এল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায়ের কাছেও গান শিখেছেন। পণ্ডিচেরী চলে গেলে উনি সতীর্থ ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে কিশোর জগন্ময়ের সঙ্গীত শিক্ষার দায়িত্ব দিয়ে যান। কিশোর বয়স থেকেই কণ্ঠসঙ্গীতে ওঁর সহজাত দক্ষতা সবার চোখে পড়তে থাকে। 

১৯৩৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে সবাইকে চমকে দিয়ে জগন্ময় মিত্র ধ্রুপদ, ঠুংরি, বাউল, কীর্তন, রাগপ্রধান গানের সব বিভাগেই প্রথম স্থান অধিকার করেন (আধুনিক বাংলা গানে তৃতীয় স্থান লাভ করেছিলেন।)। তখনকার সমাজে গানকে জীবিকা হিসেবে নেওয়া, বা প্রকাশ্যে গান গাওয়াকে খারাপ চোখে দেখতো। বাড়ির বড়রাও সেটাই ভাবলেন। কিন্তু লাভ কিছু হলো না। ততদিনে কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতে জগন্ময় মিত্রের নাম ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুদিন পর এলাহাবাদের প্রয়াগ সঙ্গীত সম্মেলন আয়োজিত ‘অল ইন্ডিয়া মিউজিক কম্পিটিশনে’ অংশগ্রহণ  করে ‘খেয়াল’ বিভাগে আবারও প্রথম হলেন। এই প্রতিযোগিতায় আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন বিচারক। সবার প্রভূত প্রশংসা লাভ করেন। কিন্তু অবাঙালি উচ্চারণে জগন্ময় মিত্রের নাম হয়ে গেল জগমোহন মিত্র। সংবাদপত্রেও ওঁর এই নাম ব্যবহৃত হতে থাকলো। বিষয়টা তাদের দৃষ্টিগোচরে এলেও ‘জগমোহন’ নামই বহাল রইলো। ফয়জাবাদ গোরখপুর মিরাট লখনউ- উত্তরপ্রদেশের নানা জায়গায় গান শোনানোর ডাক পেতে থাকলেন।  এলাহাবাদ-লখনউতে থাকাকালীন ডি.সি.দত্ত, এবং পণ্ডিত শম্ভু মহারাজের কাছে ঠুংরি এবং খেয়াল শিখতে থাকেন। এখানেই কুন্দনলাল সায়গলের সঙ্গে তাঁর আলাপ এবং বন্ধুত্বের সূচনা। লখনউ থেকে কলকাতায় এসে গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানিতে যোগ দিলেন। এখানেই তাঁর প্রিয় ‘কাজীদা’-র (নজরুল) সঙ্গে আলাপ। ‘চীন ও ভারত মিলেছি আমরা’, ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’, ‘প্রথম প্রদীপ জ্বালো’, ‘আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে’,’সংঘ শরণ তীর্থযাত্রা’, ‘খেলা শেষ হলো শেষ হয় নাই বেলা’(জগন্ময় মিত্রের রেকর্ড করা শেষ নজরুল সঙ্গীত)- জগন্ময় মিত্রের নজরুল সঙ্গীতের এই কয়েকটি মাত্র রেকর্ড বেরিয়েছিল।  দুঃখের জীবনে নজরুল সবসময় ওঁর পাশে থেকেছেন। যেমন- ঠাকুর্দা (যিনি পিতৃহীন জগন্ময়কে অনেক ভালোবাসা যত্ন দিয়ে মানুষ করেছিলেন) মারা গেলে জগন্ময় মিত্র প্রচণ্ড শোকে রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন, নজরুল সেটা জানতে পেরে ওঁকে গ্রামোফোন  অফিসে ডেকে বুঝিয়েছিলেন, যার ফলে জগন্ময় আবার গান শুরু করেন।

রবীন্দ্রনাথ নজরুল ছাড়াও অন্যান্য গীতিকবি যেমন -অজয় ভট্টাচার্য, প্রণব রায়, শৈলেন রায়, সুবোধ পুরকায়স্থ, মোহিনী চৌধুরী- সবার লেখাতেই গান গেয়েছেন। জগন্ময় মিত্র নিজের লেখা এবং সুরকৃত কিছু গানের রেকর্ডও বর্তমান। সুরকারদের মধ্যে হিমাংশু দত্ত, রাইচাঁদ বড়াল, দুর্গা সেন, কৃষ্ণচন্দ্র দে, গোপেন মল্লিক, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, অনুপম ঘটক, অনিল বাগচী ইত্যাদি আরো অনেকের সুরে গান গাইলেও  কমল দাশগুপ্তকে জগন্ময় মিত্র খুব শ্রদ্ধা করতেন। ওঁর থেকে ‘রেকর্ডিং লাইনের টেকনিক’ যেমন- সাবলীল, প্রাণবন্তভাবে সঙ্গীত উপস্থাপনার নানা ধরন ইত্যাদি অনেক কৃৎকৌশল রপ্ত করেছিলেন। 

জগন্ময় মিত্র মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গান গাওয়ার সুযোগ পান। প্রথমে কোনো পারিশ্রমিক না পেলেও পরে প্রতি প্রোগ্রামে পাঁচ টাকা করে সাম্মানিক দেওয়া শুরু হয়। বেতার মাধ্যমে জগন্ময় মিত্রের গান বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ওঁর  জনপ্রিয়তার পিছনে রেডিওর বড় ভূমিকা ছিল। রেডিও আর্টিস্টদের সম্মান ও সাম্মানিক নিয়েও ওঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল।  

১৯৪৩ সালের এপ্রিল মাসে বিবাহের কয়েক মাসের মধ্যেই   স্ত্রীর মৃত্যু হয়। বছরদুয়েক পর ১৯৪৫ সালের ২৪শে মে দেবেন্দ্রনাথ দে-র কনিষ্ঠা কন্যা গীতার সঙ্গে জগন্ময় মিত্রের বিয়ে হয় (সুন্দরী বিদুষী গীতা দে রীতিমতো ভালো গান গাইতেন, সেইসময়কার বড়ো ওস্তাদদের থেকে গানের তালিম নিয়েছিলেন, গায়িকা হিসেবে তাঁর নিজস্ব পরিচয়ও ছিল। অনাদি ঘোষ দস্তিদারের পরিচালনায় ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’,’হে মোর চিত্ত পুণ্যতীর্থে’- এইচএমভি থেকে এই দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত জগন্ময় মিত্রের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে রেকর্ড করেছিলেন। সাংসারিক দায়িত্বপালন, সন্তানদের ঠিকমতো মানুষ করা, স্বামীকে সঙ্গীত সাধনায় যথাযথ সহায়তা করা- এসবের জন্য গীতা দেবীকে গানের জগত ত্যাগ করতে হয়। একই উদাহরণ সুরকার রাহুল দেব বর্মনের মা মীরা দেববর্মনের ক্ষেত্রেও বলা যায়।) 

এই দম্পতির সংসারজীবন ছিল সুখের। এঁদের তিন পুত্র এবং দুই কন্যা। 

পঁচাশি বছরের দীর্ঘ জীবনে জগন্ময় মিত্র রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তো বটেই, ঋষি অরবিন্দ, মহাত্মা গান্ধী থেকে পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উমাশঙ্কর জোশি, রাজনীতিবিদ জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রভৃতি অনেক বিখ্যাত মানুষকে গান গেয়ে শোনানোর সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। আগে থেকেই তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত থাকলেও মহত্মা গান্ধী নোয়াখালী আন্দোলন চলাকালীন বেলেঘাটা অবস্থানকালে জগন্ময় মিত্রের স্বকণ্ঠে গীত, ভজন শুনে অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন। 

গান্ধীজীর অনুরোধে ১৯৪৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর সুরকার নিতাই ঘটকের তত্ত্বাবধানে শিশুদের জন্য সাত মিনিটের ‘সপ্তকা রামায়ণ’ রেকর্ড করেন। এই গান খুবই প্রশংসিত হয়।

দিলীপকুমার রায়ের সূত্রে শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমেও যুক্ত হয়েছিলেন। একসময় পণ্ডিচেরিতে আশ্রমবাসী হতেও চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্রীমায়ের নির্দেশের ফলে তা হয়নি। 

গুজরাটের মন্ত্রী ফতে সিং রাও গাইকোয়াড়, মুর্শিদাবাদের লালগোলার রাজা ধীরেন্দ্রনারায়ণ, বরোদার মহারাজা জগন্ময় মিত্রের বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন।  

বেতার, গ্রামোফোন, সিনেমা, জলসা, শেষজীবনে টেলিভিশন সব জায়গাতেই গান গেয়েছেন।                                          

গুরু ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু। সুরসাগর হিমাংশু দত্তের বদান্যতায় তাঁরই সুরারোপিত ‘পাপের পথে’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসাবে বাংলা সিনেমায় জগন্ময় মিত্রের গান গাওয়া শুরু। দেবকী বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, নীরেন লাহিড়ী প্রভৃতি পরিচালকদের সিনেমায় কাজ করেছেন। দ্বৈতকণ্ঠের সহশিল্পীদের মধ্যে কানন দেবীর কথা জগন্ময় মিত্র নিজে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

‘সাতমহলা স্বপনপুরী’(ব্রাহ্মণকন্যা),

‘জীবনতারা হারিয়ে’(অবতার),’তুমি প্রেমতীর্থে’(অবতার),’নদীর দুটি তীরে’(জীবনসঙ্গিনী),’পরদেশী কোকিলা’(শহর থেকে দূরে),’জীবননদীর তীরে চলে’(মায়াজাল), ‘শ্যামল সুন্দর নওল কিশোর’(দুর্গেশনন্দিনী), ’গাঁয়ের মাটি ডাকে’(বঞ্চিতা),’কে এলো হাতে বাঁশি’(রংবেরং), ‘ও তুই ডাকিস মিছে’(মানে না মানা)- বাংলা সিনেমায় তাঁর গাওয়া অবিস্মরণীয় কিছু গানের উদাহরণ।       

তবে ওঁর প্রথম রেকর্ড হিসেবে যে গান দুটো বেরিয়েছিল, সেগুলি ছিল- প্রণব রায়ের কথা এবং কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘প্রিয় হতে প্রিয়তর’ এবং ‘তোমার মতন কত না নয়ন’। পরবর্তীকালে জগন্ময় মিত্র আর যা কিছু নজরুলসংগীত রেকর্ড করেছিলেন, তখন নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু বিদ্রোহী কবির উদারতা, সান্নিধ্যলাভ, মমত্ববোধ -জগন্ময় মিত্র সারা জীবন মাথায় করে রেখেছেন। নিজের লেখা স্মৃতিকথার নামও দিয়েছিলেন ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’।

আগেই উল্লেখ করেছি, এই গান দিয়েই জগন্ময় মিত্র সঙ্গীতজগতে বিশেষ পরিচিতি পেলেন। কিন্তু এরপর ঘটনারও আরও কিছু বাকি ছিল। এই সময় গীতিকার প্রণব রায় দুটো বাংলা কাব্যগীতি লিখেছিলেন। সুরের দায়িত্বে ছিলেন কমল দাশগুপ্তের ভাই সুবল দাশগুপ্ত। উনি গানদুটো কে এল সায়গলকে দিয়ে রেকর্ড করাতে চাইছিলেন। হয়তো সেটাই হতো, কিন্তু মাঝে চলচ্চিত্রের কাজে কুন্দনলাল সায়গল হঠাৎ বোম্বে চলে গেলেন। ব্যস, এবার কাকে দিয়ে রেকর্ড করাবেন? সায়গলের মতো ঐরকম দরদভরা কণ্ঠ আর কোথায়? এইচএমভির তৎকালীন কর্মকর্তা হেমচন্দ্র সোম সুবল দাশগুপ্তের কাছে জগন্ময় মিত্রের নাম সুপারিশ করলেন। রেকর্ডও হলো। কিন্তু সুরকারের পছন্দ হলো না। পরের মাসে আবার রেকর্ড হলো। ১৯৪২ সালের পুজোর গান হিসেবে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই অকল্পনীয় হিট হলো। গানদুটি ছিল-’সাতটি বছর আগে’ এবং ‘সাতটি বছর পরে’। বাংলা রেকর্ডের এটিই ‘প্রথম গল্প-গান’। এই দুটো গানের রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল। বিখ্যাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীকেও খ্যাতির বিড়ম্বনা সামলাতে হয়েছিল। গীতিকার সুরকার গায়ক-তিনজনেই তখন অবিবাহিত, কিন্তু গানদুটোর নাম হয়ে গেল ‘বউ মরা গান’। কটূক্তি, প্রেমনিবেদন, চরিত্রদোষ- মানুষ যে যার মতো নানা কথা বলতে লাগলো। গানের রেকর্ড নিয়ে এইরকম অদ্ভুত বিরল ঘটনা কখনো কোনো যুগেই সম্ভবত  ঘটেনি। 

উক্ত রেকর্ডের প্রায় বছর ছয়েক পরে জগন্ময় মিত্রের আরেকটি রেকর্ড বেরোলো ‘চিঠি’(‘সাতটি বছর আগে’, ‘সাতটি বছর পরে’-র মতো প্রণব রায়ের কথা আর সুবল দাশগুপ্তের সুরে এটাও একটি গল্প-গানের রেকর্ড।)। প্রথম ছ’মাসে আশি হাজার রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল(সুরকার সুবল দাশগুপ্ত এ খবর শুনে বলেছিলেন, জগন্ময় মিত্র ওঁর প্রত্যাশা মতো পুরোটা ভালোভাবে গাইতে পারেননি, তাহলে রেকর্ড এক লাখের ওপর বিক্রি হতো।)। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, জগন্ময় মিত্রের ‘চিঠি’ রেকর্ডটি বাংলা কাব্যসঙ্গীতের ইতিহাসে রেকর্ড যুগ থেকে ক্যাসেট যুগ পর্যন্ত আজ অবধি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হ’য়েছে এবং সবচেয়ে বেশিবার শোনা হয়েছে।   

এছাড়া অন্যান্য রেকর্ডের মধ্যে ‘মেনেছি গো হার মেনেছি’,’ভুলি নাই ভুলি নাই’,’আমি স্বপন দেখেছি কাল রাতে’,’গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে যায়’,’স্বপ্ন সুরভি মাখা’-ইত্যাদি গান জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে কালের সীমা পেরিয়ে আজও কালজয়ী হয়ে গেছে। 

প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড ‘ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী’ এবং ‘একদা তুমি প্রিয়ে’। গানদুটো শুনে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং খুশি হয়েছিলেন। কবিগুরুর সঙ্গে জগন্ময় মিত্রের কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছিল, দুজনের মধ্যে একটা সহজ সম্পর্কও গড়ে ওঠে। পরের দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করার জন্য কবির অনুমতি পাওয়া গেলেও তাঁকে শোনানোর আর সুযোগ হয়নি(কারণ রেকর্ড বেরোনোর আগেই রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হন।) জগন্ময় মিত্রের দ্বিতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডটি ছিল- ‘মম যৌবন নিকুঞ্জে গাহে পাখি’ এবং ‘সে আসে ধীরে।’ জগন্ময় মিত্র সব মিলিয়ে মোট একুশটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড করেছিলেন (বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডও সেগুলো অনুমোদন করে।) 

বাংলার বাইরেই জগন্ময় মিত্রের বেশি নাম ছিল(শোনা যায়, এইচএমভির কর্মকর্তাদের সঙ্গে  মতবিরোধ, কটুক্তি -এর অন্যতম কারণ ছিল। জগন্ময় মিত্র  অভিমানী, স্পষ্ট কথার মানুষ ছিলেন। আত্মসম্মানবোধও ছিল প্রবল। সেই যে কলকাতা থেকে পাকাপাকিভাবে চলে যান, আর কলকাতায় ফিরে আসেননি। বাকি জীবন বম্বেতেই থেকে গেছেন।)    

১৯৫০ সালের শেষদিকে বোম্বে চলে এসে ফিল্মিস্তান কোম্পানিতে সুরকার হিসেবে অল্প কিছুদিন কাজ করেন। চিত্রপরিচালক জ্ঞান মুখার্জির ‘সরদার’(১৯৫৫) চলচ্চিত্রে জগন্ময় মিত্র সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ পান। সিনেমাটিও হিট হয়, গানগুলোও বেশ জনপ্রিয় হয়। দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তী ছবি ‘আতিশ’ তৈরির আগেই জ্ঞান মুখার্জির হঠাৎ মৃত্যু হলে জগন্ময় মিত্রের ওই সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনার কাজও বাতিল হয়ে যায়। আর কোনো হিন্দি চলচ্চিত্রে জগন্ময় মিত্র সুর দেননি। কিন্তু কলকাতাতেও ফিরে এলেন না, বোম্বেতেই হিন্দি গীত, গজল, ভজন গেয়ে সঙ্গীতপ্রেমীদের মন জয় করলেন। বোম্বেতে তিনি  ‘জগমোহন’ নামে বিখ্যাত হয়ে গেলেন। দেশে-বিদেশে প্রচুর জায়গায় গান গেয়ে বেরিয়েছেন। কানাডা, পূর্ব আফ্রিকা, ব্রিটেনে পেয়েছেন সম্বর্ধনা, বিবিসিতে গান শুনিয়েছেন এবং সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই আমলে তাঁকে ‘Jagmohon – the father of Hindi geet’- নামে অভিহিত করা হতো। সারা ভারতবর্ষে অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। কমল দাশগুপ্ত, পণ্ডিত গণপত রাঁও, কালীপদ সেন, এমনকি নিজের সুরে কবীর, ফৈয়াজ হাশমি, হসরত জয়পুরী, রাজেন্দ্র কিষান, মধুরাজ, কাইফ ইরফানি, রমেশ পন্থ, পণ্ডিত মাথুর, আঞ্জুম ভূষণ প্রভৃতিদের লেখা অনেক গীত, গজল, ভজন গেয়েছেন। ‘চাঁদ হ্যায় মেহমান অ্যায় দিল’, ‘মন তেরি তরফ কিউ যাতা হ্যায়’, ‘তুম ওহি হো যো মেরে’,’নিরাশ মে আস প্রভু মেরা’,’ও বর্ষাকে প্যহেলে বাদল’, ‘রাধা মেরে নাম সে তেরে’- ইত্যাদি গান জগমোহননের কণ্ঠে কালজয়ী হয়ে গেছে। হিন্দি গীত গাওয়ার ব্যাপারে কিংবদন্তী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে জগন্ময় মিত্র ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। 

বন্ধুপ্রতিম হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘জগন্ময় মিত্রর হিন্দি গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। জগমোহন নাম নিয়ে যেসব গীত, গজল, দাদরা ভজন গোটা দেশে তখন চলছে।’ পঙ্কজকুমার মল্লিক বলেছিলেন, ’সুধাকণ্ঠ জগন্ময় তুমি। জগজ্জনের সম্মুখে জগতের মহিমা কীর্তন করে নিরবচ্ছিন্ন সুখ ও শান্তিতে জীবন যাপন করো।’

প্রভাবতী দেবী সরস্বতী তাঁর ‘তীর্থপথিক’ উপন্যাসটি জগন্ময় মিত্রকে উৎসর্গ করেন। গুরু দিলীপকুমারও এই প্রিয় ছাত্রটিকে খুব ভালোবাসতেন। সারা জীবনের সঙ্গীত সাধনায় সম্মানও পেয়েছিলেন। বাংলা ১৩৫৩ সালের ১৮ই জ্যেষ্ঠ ভট্টপল্লী পণ্ডিতসমাজ তাঁকে ‘সুরসাগর’ উপাধি প্রদান করে। বিদেশেও প্রভূত সম্মান পেয়েছেন। 

ভারত সরকার তাঁকে দিয়েছে ‘পদ্মশ্রী’। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিযুক্ত সঙ্গীতের পরীক্ষকের দায়িত্বও সামলেছেন।

তবে এসবের থেকেও শ্রোতাদের ভালোবাসা, তাঁর গান শোনার জন্য মানুষের আগ্রহ -এসবই তিনি শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। তবে এইচএমভি অনেক বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পীকে ‘গোল্ডেন ডিস্ক’ দিয়ে সম্মানিত করলেও জগন্ময় মিত্রকে বাদ দিয়েছেন। এতে উনি খুবই ব্যথিত হন।  

অভিমান নিয়ে কলকাতা ছেড়েছিলেন। চেতলার বাড়িও বিক্রি করে দিয়ে জুহুতে থাকতেন।   

তবে মাঝেমধ্যে যে কলকাতায় অনুষ্ঠান করতে আসেননি, সেটাও নয়। টাকাপয়সা, খ্যাতি -সব পেলেও মনের মধ্যে একটা অভিমান থেকেই গিয়েছিল।   

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গর্ভধারিনী মা চলে যান। স্ত্রী মারা যান ওইবছরই ৩রা নভেম্বর। যে মা ষোল বছর বয়সে বিধবা হয়ে একমাত্র ছেলেকে বড় করে তুলেছিলেন, সেই ‘সর্বত্যাগিনী’ মা তাঁর কাছে ছিলেন ঈশ্বরেরও ওপরে। আর জীবনের সমস্ত দুঃখে-সুখে যিনি ছত্রিশ বছর একসঙ্গে থেকে তাঁকে পথ চলতে সাহায্য করেছিলেন সেই সহধর্মিণীকে হারিয়ে যে কষ্ট পেয়েছিলেন, আর কোনোদিন তা লাঘব হয়নি। জীবনের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ নারীকে হারিয়ে বাকি জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।  

আবারও পণ্ডিচেরী যেতে চেয়েছিলেন, এমনকি  মানসিক শান্তির জন্য আশ্রমে গিয়ে থেকেও ভালো লাগেনি, নিজের ঘরেই ফিরে আসেন। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর তিনি আরও বাইশ বছর জীবিত ছিলেন। 

তবে কলকাতা থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনের বহু বছর পর আশির দশকে কলকাতার সঙ্গে আবার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। মাতৃভূমির সঙ্গে সেই টানটা কিছুটা হলেও জোড়া লেগেছিল। বৃদ্ধ বয়সে উপনীত, শরীরও আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছে না, কিন্তু সুমধুর কণ্ঠ, তেমনি তার সুর -এগুলো কিন্তু আগের মতোই ছিল। কলকাতায় এসে তখনো এক ঘন্টা অনুষ্ঠান করেছেন, সবার আশীর্বাদ কুড়িয়েছেন। এই সময়ে কলকাতা টেলিভিশনের জন্যেও গান গেয়ে গেছেন। ১৯৮৪ সালে রবীন্দ্র সদনে উর্দু গজল, গীত, টপ্পা, বাংলা গান- সবমিলিয়ে তেইশটি গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন। ফিরোজা বেগম,  সতীনাথ মুখোপাধ্যায় থেকে বিমান মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় – সবাই জগন্ময় মিত্রকে গায়ক হিসাবে অনেক উচ্চ আসনে বসিয়েছেন। বিস্মিত হতে হয়, যে পরিণত বয়সেও তিনি সাবলীলভাবে কী করে ওইরকম উচ্চমানের গান পরিবেশন করে যেতেন! আজও ইউটিউবে টেলিভিশনের সেইসব মুহূর্ত দেখতে পাওয়া সম্ভব। 

আশ্চর্য এটাই, যে, বাঙালি হয়েও বাংলা থেকে বাংলার বাইরে জগন্ময় মিত্রের পরিচিতি বেশি। তিনি বেশি সম্মান লাভ করেছেন অবাঙালি শ্রোতাদের কাছেই। ওঁর গাওয়া প্রচুর গীত, ভজন আছে – আমরা হয়তো তার খবরও রাখিনি, আজও রাখি না। ২০০৩ সালের ৩ রা সেপ্টেম্বর বোম্বের জুহুর বাড়িতে ওঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হিন্দি গীত, ভজন তো বটেই,  আধুনিক বাংলা গানের একটা অবিস্মরণীয় যুগের যবনিকাপাত ঘটে।       

আজও অনেকেই জগন্ময় মিত্রের সুদীর্ঘ সাঙ্গীতিক জীবন সম্বন্ধে  অবগত নন। অনেকে ঠিকমতো চেনেনই না, বা নামটুকু হয়তো জানেন। বেশিরভাগ মানুষই জানেন না, যে, নজরুলের ‘শাওন রাতে যদি’ বিখ্যাত এই গানটির সুরকার জগন্ময় মিত্র। বাঙালি হয়ে যদি বাংলা গানের ইতিহাসকেই না মনে রাখি, তাহলে সামনে এগোব কীভাবে? 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

কৃতজ্ঞতা: ১. শাওন রাতে যদি, স্মরণে আসে মোরে -জগন্ময় মিত্র

২. কালি ও কলম – জগন্ময় মিত্র প্রণয়-বিরহের যুগলবন্দী, আবুল আহসান চৌধুরী

৩. উইকিপিডিয়া, গুগল এবং অন্যান্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *