তুষার বরণ হালদার

লেখক পরিচিতি 

(তুষার বরণ হালদার নদীয়ার আড়ংঘাটা গ্রাম থেকে স্কুল শিক্ষা শেষ করে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা  সম্পন্ন করেন। পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি পান নদীয়া জেলার অসংগঠিত শিল্প ও শ্রমিকদের ওপর গবেষণা করে । গবেষণা কর্মের ওপর ভিত্তি করে দুটি বই এবং  বিভিন্ন গ্রন্থ ও জার্নালে বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের জন্য তিন বার পুরস্কৃত হন। এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য। বর্তমানে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত দক্ষিণবঙ্গের একটি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক।) 

ননীগোপাল মজুমদার (১৮৯৭ – ১৯৩৮)

সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হবার আগেই যার জীবন চলে গিয়েছিল দস্যু ঘাতকদের হাতে, যার নাম স্যার মার্ক অরেলস্টাইনের মত বিশ্ব বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভূ পর্যটকের সঙ্গে একই সাথে উচ্চারিত হয় তিনি হলেন ননীগোপাল মজুমদার। অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলায় তিনি ১৮৯৭ সালের পয়লা ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডাক্তার বড়দা প্রসন্ন মজুমদার ছিলেন ওই অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। তিনি ১৯১৪ সালে প্রবেশিকা এবং ১৯১৬ সালে আই.এ পাস করে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে সংস্কৃত ভাষায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯১৮ সালে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে বি.এ. পাস করলেন। ভালো ফল করার জন্য তিনি একটি রৌপ্য পদক ও বৃত্তি পেয়েছিলেন। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. তে একটি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছিল নাম প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ননীগোপাল সেই বিভাগেই ভর্তি হন। সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই বিভাগে তিনি এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন।
  এম.এ পাস করার পরে ননীগোপালকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই বিভাগেই পড়ানোর দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁর ছাত্র থাকাকালীন সময়ে ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল বিখ্যাত পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং কাশিপ্রসাদ জয়শোয়ালের-এর মতন প্রাজ্ঞ  ব্যক্তিদের সঙ্গে। তাঁদের সাহচর্য ননীগোপালকে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্বের প্রতি আকৃষ্ট করে। ছাত্র পড়ানোর পাশাপাশি তিনি নিজের গবেষণা কর্ম চালিয়ে যান। এম.এ. পাস করার আগেই সংস্কৃতে লেখা তাম্র শাসন এবং শিলালিপি প্রভৃতির পাঠদ্ধার করে এবং ওই বিষয়ে নানা প্রবন্ধ লিখে তিনি শিক্ষিত সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময় তিনি ভারতীয় বজ্র সাধনার ওপর একটি দুর্লভ গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখে পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছরই পেয়েছিলেন প্রেমচাদ – রাইচাঁদ বৃত্তি এবং মোয়াট পদক। তিনি গবেষণার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে মৌর্য যুগের প্রায় ২০০ বছরেরও আগে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ইরানের বংশদ্ভূত  আখামেণীয় বংশের শাসকদের অধিকারে ছিল। প্রাচীন লিপিকে খানিকটা ভারতীয় রূপ দিয়েই ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে খ্রিস্টের জন্মের ৫০০ বছর পরেও স্থানীয় লিপি হিসাবে ওই সমস্ত অঞ্চলে এবং ভারতের প্রভাবাধীন মধ্য এশিয়ার নানাস্থানে ওই লিপির প্রচলন ছিল। ফলত মৌর্য এবং কুষাণ সম্রাটদের বহু শিলালিপি খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা এবং সে কারণে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের নানা তথ্য এই লিপি পাঠোদ্ধারের ফলেই সম্ভব হয়েছিল। কারণ ননীগোপাল খরোষ্ঠী জানতেন। তাঁর এই গবেষনা কর্মটি A List of Kharosthi Inscriptions নামে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল।
   ১৯২৮ সালে ননীগোপাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে রাজশাহী শহরের বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির প্রত্নশালার অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। আসলে লিপিমালার পাঠোদ্ধার এবং অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক কাজকর্ম তার কাছে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত অধ্যাপক-এর জীবনের থেকে বেশি কাম্য মনে হয়েছিল। ওখানে কাজের সময় তিনি নালন্দায় পাওয়া দেব পালের একটি তাম্র শাসনের পাঠোদ্ধার করে ‘Nalanda Cooper Plate of Devpala Dev’ নাম দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। তাছাড়া তিনি প্রাচীন বাংলাদেশের চন্দ্র বর্মন এবং সেন প্রভৃতি রাজবংশের যে সমস্ত তাম্র শাসন এবং শিলালিপি সে সময় পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছিল, তার পাঠোদ্ধার এর পর সম্পাদনা করে ‘ of Bengal, Vol. II’ নাম দিয়ে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর কাজের প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট ছিলেন সেকালের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সর্বেসর্বা স্যার জন মার্শাল, মার্শালের উৎসাহে তিনি মহেঞ্জোদারো উৎখনন অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক কাজকর্মে ননীগোপালের অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য মার্শাল তাকে স্থায়ীভাবে ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি উচ্চ আসনে নিয়োগ করেন। এরপর ১৯২৭ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত মহেঞ্জোদারো এবং সন্নিহিত অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান পরিচালনা করে সিন্ধু উপত্যকায় আমরি, আমিলানা, বাঁচানি, এবং থারো পাহাড় প্রভৃতি প্রত্ন সামগ্রীতে সমগ্র স্থানগুলি আবিষ্কার করেন। শুধু আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত না থেকে তিনি ওই সমস্ত স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং পাওয়া জিনিসপত্রের প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণ সহ ‘Explorations in Sindh’ নামে একটি অসাধারণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন।
   ১৯৩১ সালে মহেঞ্জোদারো খননকার্যের পর তিনি কর্মসূত্রে চলে আসেন পূর্বাঞ্চলে।এখানেও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন যার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ছিল হুগলি জেলার মহানাদ অঞ্চলের খননকার্য পরিচালনা করে বহু প্রাচীন প্রত্ন সামগ্রী যা খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর গুপ্ত যুগের বলে তিনি প্রমাণ করেছিলেন। অবিভক্ত বগুড়া জেলার প্রাচীন পৌন্দ্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়ের কাছে তিনি গোকুলগ্রামের মেয়েরজিপিস খনন করে পাওয়া প্রচুর প্রত্ন এবং একই সময়ে দিনাজপুরের হিলি রেলস্টেশনের কাছে বহু গ্রামের ঢিপি, শিব মন্ডপ খনন করে গুপ্ত যুগের তাম্র শাসনের আবিষ্কার তার খ্যাতিকে আরো বৃদ্ধি করেছল। এরই মাঝে একাধিকবার তিনি বিহারের চম্পারন জেলার লওড়িয়া নন্দনগরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য পরিচালনা করেছিলেন সেখানে বহু সংখ্যক প্রত্ন সামগ্রীর রহস্য উন্মোচন করেছিল। তার কাছেই সম্রাট অশোক নির্মিত তেত্রিশ ফুট দীর্ঘ বালি পাথরের নির্মিত স্তম্ভ এবং এবং সেই দম্ভ শীর্ষে মন্টাকৃতি যুক্ত পিথীকার ওপর একটি সিংহমূর্তি বর্তমান ছিল যদিও হঠাৎই ১৯০৫ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ সেখানে খননকার্য অসমাপ্ত রেখে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন পর ননীগোপাল সেখানে তিনবার প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্য পরিচালনা করে পাহাড়পুরের মতন বিশাল পুরাকীর্তি আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে ননীগোপাল কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যক্ষের পদে নির্বাচিত হন। পদাধিকার বলে সে সময় অধ্যক্ষের দায়িত্যের মধ্যেই পড়তো সমস্ত পূর্বাঞ্চলের প্রত্নতাত্বিক অভিযান পরিচালনা করা। তিনি ১৯৩৮ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগকে বলেন যে সিন্ধু অঞ্চলে আরো অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। যাই হোক পুরাতত্ত্ব পরিষদ এ ব্যাপারে তাকে ছমাসের ছুটি মঞ্জুর করেছিল। তিনি তাঁর কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে সিন্ধু প্রদেশের দাজ জেলার মানচার হ্রদের উত্তর-পশ্চিমের এক নিভৃত স্থানে তাবু খাটিয়ে খনন কাজ শুরু করেন।
   ওই বছরেই ১১ই নভেম্বর তখন ভোরের আলো কেবল ফুটেছে, হঠাৎ একদল উপজাতি দস্যু তাঁবুর মধ্যে ঢুকে এলোপাথারি বন্দুক থেকে গুলি চালাতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ইতিহাসবেত্তা তরুণ প্রত্নতাত্ত্বিক ননীগোপাল। তখন তাঁর বয়স ৪১ বছর পূর্ণ হয়নি। তাঁর অন্যান্য সহকর্মীরাও আহত হয়েছিলেন। দস্যুরা তাঁবুর ভেতর থেকে টাকা পয়সা লুটপাট করে চলে গেল। কিছুদিন আগেই ননীগোপাল পত্র মারফত তাঁর এক বন্ধুকে জানিয়েছিলেন যে তার দৃঢ় বিশ্বাস ওই অভিযানের ফলে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে বৈদিক আর্য সভ্যতার একটা যোগ সূত্র তিনি বার করতে পারবেন। আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁর অকালে চলে যাওয়ার ফলে সে কাজ আর কেউ করতে পারেনি। প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর ক্ষণস্থায়ী জীবনে যে কাজ তিনি করে গেছেন তাতে বিস্মিত হতে হয়। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পত্রিকায় তাঁর অসাধারণ সব কাজের নানা বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার সম্পর্কে তাঁর আরেকটি বিস্ময়কর কীর্তি সাঁচি স্তুপে পাওয়া সম্রাট অশোকের সময় থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সমস্ত অনুশাসনের পাঠ নির্ণয় করা এবং সে বিষয়ে মন্তব্য এবং তার ইংরেজি অনুবাদ করা। এমন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অকাল প্রয়াত ভারতবিদ্যা চর্চার একজন অগ্রণী পথিক আজ আমাদের কাছে বলা যেতে পারে প্রায় সম্পূর্ণরূপেই  বিস্মৃত।  প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *