রঙ্গন রায়
দীপশিখার বিয়ে ঠিক হয়েছে। খবরটা শোনার পর থেকেই, হিরণ্ময়ের আর তার সাথে দেখা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হল না। মেয়েটি তার প্রেমিকা ছিল না, তার প্রতি কোনওদিন হিরণ্ময়ের হৃদয়ে দোলা ওঠেনি, কিচ্ছু না। কিন্তু তবুও তারই বয়সী একটি মেয়ে সিঁথিতে সিঁদুর চড়িয়ে ড্যাঙড্যাঙ করে ঘুরে বেড়াবে, তা সে সহ্য করতে পারবে না। এরকম কেন হয় জানে না। কিন্তু হয়। এটা কি একটা রোগ? হিরণ্ময়ের অবশ্য অনেক রকম রোগই আছে। যেমন রাত্রিবেলা সে কিছুতেই ঘুমোতে পারে না। অনেক রাত্রে কান পেতে শুনেছে, একটা পাখি ডাকে। সেই ডাকের এমনই মায়া, আর ঘুমোতেই ইচ্ছে করে না। ভোরে অজস্র পাখির ডাক পেরিয়ে সে ঘুমোতে যায়।
তবে সারারাত ধরে বই পড়ে। ওটাও একটা রোগ। কখনও সখনও মনে হয় চব্বিশ ঘন্টা ধরেই বই পড়তে থাকি। পৃথিবীর কত বই-ই তো পড়া হল না। এমনকি প্রিয় লেখকদেরই সব বই শেষ করতে পারেনি। ইদানিং বইয়ের প্রচণ্ড দাম। হাত দেওয়াই যায় না৷ ওদিকে লাইব্রেরি গুলোতে আবার সব বই পুরনো পুরনো। হিরণ্ময়ের চকচকে টাটকা গন্ধওলা বই খুব প্রিয়।
ক-দিন হল কলকাতা থেকে নিজের মফস্বল শহরে ছুটি কাটাতে এসেছে সে। সকাল সন্ধ্যা বই পড়া আর নাটক লেখার চেষ্টা ছাড়া তেমন কোনও কাজ নেই৷ এরকমই একদিন সন্ধেবেলা পাড়ার লাইব্রেরিতে গেছিল হিরন্ময়। আমাদের কাহিনিটাও সেদিনেরই।
লাইব্রেরি যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য বুদ্ধদেব গুহর মারকাটারি উপন্যাস ‘একটু উষ্ণতার জন্য’। বইটা পুরনো, তবে সদ্যই বইমেলা থেকে কিনেছেন লাইব্রেরিয়ান চ্যাটার্জী জেঠু। মলাটের চলটা এখনও উঠে যায়নি। কিন্তু হাজার খোঁজাখুঁজি করেও কিছুতেই পাওয়া গেল না সে বই। ওই বইটি বাদে সব বই রয়েছে। এদিকে লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার সময় রাত আটটা। ঘড়িতে এখন সাতটা চল্লিশ বাজে। অগত্যা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিজনের রক্তমাংস’ বইটাই ইস্যু করে বেরিয়ে এল হিরণ্ময়। নিচে নেমে যেই সাইকেলের তালাটা খুলতে যাবে, অমনি একটা স্কুটি এসে থামল। একজন মধ্যবয়স্ক লোক। ডিকি থেকে একখানা বই বের করে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে উঠে ভিতরে গেলেন।
হিরণ্ময় লোভীর মতো চেয়ে চেয়ে দেখল বইটা। ‘একটু উষ্ণতার জন্য’। ইশ! আর একটু পর বেরোলেই বইটা পেয়ে যেত সে। এখনও অবশ্য এই বইটা ফেরত দিয়ে ওটা নিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু চ্যাটার্জী জেঠু কী ভাববে? তাছাড়া সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের বই বাদ দিয়ে… শত হলেও হিরণ্ময়ের সবচেয়ে প্রিয় লেখক সন্দীপন। নাঃ! এখনই বাড়ি গিয়ে বইটা পড়া শুরু করে দেবে সে। রাত জেগে বই কাবার করে কালকে লাইব্রেরি খোলার সাথে সাথে এসে চেঞ্জ করে নিয়ে যেতে হবে। এত রাত্রে যখন কেউ বই ফেরত দিচ্ছে, তখন আজই আর কেউ নিয়ে নেওয়ার চান্স নেই। মনে মনে এই চমৎকার সলিউশনটা বের করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। অতঃপর সাইকেলে উঠে গতি বাড়াল। এবং ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তিটা। চেনটা শুধু পড়েই গেল না, একেবারে ছিঁড়ে গিয়ে, জড়িয়ে মড়িয়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।
রাত প্রায় আটটা বাজে। এদিককার পাড়াগুলো সবসময়ই নির্জন থাকে। এখন আরও নির্জন। দোতলা তিনতলা সব বাড়ি, সোডিয়াম ভ্যাপারের আলো আর রাস্তার কুকুর ছাড়া কেউ কোথাও নেই। বড় বড় গাছ গুলোর তল ঝুপসি অন্ধকার। বেকুবের মতো কিছুক্ষণ চেন নাড়াচাড়া করে, দুহাতে কালি লাগিয়ে একসা দশা। আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিরণ্ময় ভাবছিল কী করা যায়, ঠিক তখনই স্কুল লাইফের বন্ধুদের একটা পুরো গ্রুপ হইহই করতে করতে যাচ্ছিল সেখান দিয়ে। হিরণ্ময়কে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। বন্ধু যখন বাইরে থাকে, মাঝেমধ্যে শহরে আসে, তখন তাকে হুট করে দেখলে রীতিমতো হইচই ফেলে দেওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হিরণ্ময় পড়ে গেল বিড়ম্বনায়। কারণ এদের সাথে আড্ডাই মারা হয় না বহুদিন। একটা সময়ের পর বন্ধুবৃত্তটাও অন্য হয়ে যায়। লিমিটেডও হয়ে যায়। মেন্টালিটি ম্যাচ না করলে, ভাল লাগে না। অথচ এরা সব একইরকম আছে।
সাইকেল সাড়াবার ব্যবস্থা করে দেবে বলে-টলে তাকে একপ্রকার জোর করেই ওদের সঙ্গে বাসস্ট্যান্ডের ঠেকে নিয়ে চলল ওরা। ওখানে নাকি মেকার আছে। হিরণ্ময় বুঝতে পারল, ‘একটু উষ্ণতা’ পাওয়ার তার দফারফা হল।
খানিক্ষণ পরের কথা। আড্ডা সিগারেটে গড়াগড়ি দিতে দিতে রাত হয়ে গেছে। এদিকে সত্যিসত্যি এবার ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ হিরণ্ময়ের সারা শরীর আকুলি বিকুলি করতে শুরু করল হঠাৎ। জ্বর আসছে নাকি! চোখটা কেমন যেন ঝাঁঝা করছে। ছ্যাক করে গালে হাত দিয়ে উষ্ণতা টের পেল সে। আর এখানে থাকাটা মোটেই ঠিক নয়। এখন তার বিছানা দরকার। একটা ফটফটে বিছানা। জ্বর-টর হলে ভালই লাগে হিরণ্ময়ের। রোগ বলেও মনে হয় না। কারণ বাড়িতে খাতির তো বাড়েই, মানে যা ইচ্ছে খেতে চাওয়া, এবং কানে ইয়ার ফোন গুজে আরামে শুয়ে শুয়ে ‘অডিওস্টোরি’ শোনা। আহা! এরই নাম তো জীবন! কিন্তু আজকে প্রথমবার জ্বরের ওপর খুব রাগ হল তার। আর কি সময় পেল না জ্বর আসার? এখন সে বাড়িতে ফিরে সন্দীপনের বইটা শেষ করবে কী করে? দেরি হয়ে যাবে না? বইটা ফের হস্তান্তরিত হয়ে যাবে তাহলে!
এরকম মাঝে-মাঝে একেকটা দিন আসে। যেদিন সমস্ত পূর্ব-পরিকল্পিত ব্যাপার স্যাপার গুলো গুবলেট হয়ে যায়।
“আজ চলি, বুঝলি! তোরা তো এই বাস স্ট্যান্ডেই বসিস! কাল আসব তাহলে আড্ডায়।”
হিরণ্ময়ের কথা শুনে উপল তার টিশার্ট পরা কাঁধে হাতটা রেখে কী একটা বলতে গিয়ে অবাক হয়ে গেল, “একী! তোর গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে পুরো!”
উপলের কথায় সবাই মূহুর্তের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে উঠল। অন্তর্জিৎ বলল, “চ, আমি তোকে পৌঁছে দিয়ে আসি বাড়িতে।”
সাথে সাথে প্রতিবাদ করল হিরণ্ময়, “নানা! আমি এটুকু চলে যেতে পারব, তাছাড়া এখন তো আর সাইকেলের চেন ছেঁড়াও নেই।”
দীপ্তাংশু বলল, “এই জ্বরে তুই সাইকেল নিয়ে একা একা যাবি! মাথা খারাপ নাকি!”
কেউ বেশি ভালবাসলে বা ফর্মালিটিজ দেখালে তা যে অস্বস্তিকরও হয়ে ওঠে, তা এরকম পরিস্থিতিতে না পড়লে বোঝা যায় না। হিরণ্ময় বেশ বুঝতে পারছে, তাকে এরা একা একা কিছুতেই যেতে দেবে না। শেষমেশ এতক্ষণ চুপ করে থাকা রোশন বলল, “আমার আজকে ভাল লাগছে না। তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব। আমিই ওকে পৌঁছে দিচ্ছি। ওদিক দিয়ে আমিও বাড়ি চলে যাব।”
খানিক অসহায়ের মতোই সাইকেলে উঠল হিরণ্ময়। কেউ তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে, এটা সে চায় না। ইগোতে লাগে।
কিছুদূর দুজনেই চুপচাপ সাইকেল চালাতে চালাতে এল। স্কুলে ওদের মধ্যে খুব একটা সখ্য কোনও কালেই গড়ে ওঠেনি। একটা স্কুলে সবার সাথেই যে সমান ভাবে বন্ধুত্ব হবে তা তো আর হয় না! কেউ কেউ শুধু ক্লাসমেট থাকে, রোশন হল তেমনই। হিরণ্ময়ের এমনিতেই জ্বরে মাথা বোঁ-বোঁ করছে। কথা বলতে ইচ্ছেও করছে না।
হঠাৎই আনন্দপাড়ার নির্জন রাস্তায় একটি মেয়ের অবয়ব চোখে পড়ল তার। পেছন থেকে কি অপূর্ব যে লাগছে! লম্বা ঘন চুল। শাড়ি পরেছে। অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা ফর্সা পিঠ জুড়ে। যে যতই আধুনিকতার বালাই দিয়ে শার্ট-প্যান্ট বা অন্য পোশাক পরুক না কেন, মেয়েরা শাড়ি পরলেই প্রকৃত নারী হয়ে ওঠে; কিন্তু…কিন্তু কোথায় যেন তাকে আগেও দেখেছে হিরণ্ময়। খুব চেনা। তাহলে চিনতে পারছে না কেন? তবে কি জ্বরের প্রকোপ বাড়ল? সাইকেলটা থামিয়ে কপালে হাত দিয়ে একবার টেম্পারেচার মাপল হিরণ্ময়। আর ঠিক তখনই দেখল, রোশন তার পাশে নেই। সে আচমকা সাইকেলে গতি বাড়িয়ে মেয়েটার পিছনে গিয়ে ব্রেক কষেছে। চমকে ঘুরে তাকাল মেয়েটা। ওহ্, সে দেখা বড় ভয়ানক।
তার চোখের তারায় অবাক বিস্ময় আর এক অদ্ভুত ক্লাসিক আলো। যে আলোর কোনও ব্যাখ্যা নেই। হ্যালোজেনের হলদে রেখা এমন ভাবে কপালের লাল সিঁথিতে স্পার্ক করছে, যা সহসা বর্ণনা করা যায় না! যতই হিরণ্ময় নাটক লিখুক, মঞ্চের বেবি, ফলো, হলো, শাওয়ার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকুক; বাস্তব পৃথিবীর নাটকীয় পশ্চার কখন যে কীভাবে সার্থক হয়ে ওঠে, তা কি কেউ বলতে পারে! কিন্তু হিরণ্ময় দীপশিখাকে আর কোনওদিন দেখতে চায়নি!
রোশনকে কখনও মন দিয়ে চেনার চেষ্টাই করেনি হিরণ্ময়। কিন্তু আজ দেখল, রোশন বেশ সাহসী পুরুষ। সটান দীপশিখার হাত ধরে ফেলে সে বলল, “এরকম কেন করলি? আমি কী করেছিলাম? বল! উত্তর দে?”
পৃথিবীকে নীরব করে দিয়ে, দীপশিখা মাথা নত করে ঠান্ডা গলায় বলল, “তুই কিছু করিসনি। করেছে আমাদের ধর্ম।”
দিকচক্রবাল জুড়ে যুগে যুগে–মানুষ ব্যর্থ হয়–ব্যর্থ হয় প্রেম, মানবধর্ম। এসবের হিসেব শহর কখনও রাখেনি। রাখেও না। হিরণ্ময়ের কাছে সবকিছুই হঠাৎ পরিস্কার হয়ে গেল। সে বুঝল, কেন রোশন তাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বায়না করছিল এত। কারণ সে জানে হিরণ্ময়ের পাড়াতেই দীপশিখার বাড়ি।
কিন্তু দৃশ্যটি ভাল লাগছে না তার; এক হলুদ হ্যালোজেন রাতে একটি হলুদ বিষাদ। রাত্রির আকাশ আলো করে ফুটে আছে অসংখ্য জারুল ফুল। স্বর্গীয় কান্না হয়ে ঝুলে আছে আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো অমলতাস। হিরণ্ময়ের হঠাৎ শীত করে উঠল। একটু হাওয়া দিল কি? ছমছম করে উঠল যেন সমগ্র শরীর। একটু ওম দরকার তার। একটু উষ্ণতা দরকার। রোশনের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, এক্ষুণী কেঁদে ফেলবে। বাদললাঠির মতো ঝরে পড়বে তার প্রস্তরীভূত অশ্রুবিন্দু। তারও একটু উষ্ণতা প্রয়োজন।
আচমকাই কোনও কোনও অসুন্দর দিনের শেষেও অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে যায়। আসলে সারাটা দিনই তো আর খারাপ হতে পারে না কারোর! ভাল কিছু থাকেই। থাকতে বাধ্য। হিরণ্ময় দেখল, তার বিয়ে হয়ে যাওয়া সাতাশ বছর বয়সী বান্ধবী দীপশিখা নির্জন আনন্দপাড়ার হ্যালোজেন আলোয় আচমকা রোশনকে জাপটে ধরে উষ্ণতার বন্যা বইয়ে দিতে লাগল শরীরে শরীরে। এই পাপ মধুর। এই পাপ কষ্টের সুখ। চোখে তার হীরক খণ্ডের মতো দুর্লভ অশ্রু। ওম। যেন নির্বাপিত প্রদীপের জ্বাজ্জল্যমান আলোক।
হিরণ্ময়ের মনে হল, এই আলোকে তার ঘাম হচ্ছে। জ্বরটা ছেড়ে যাচ্ছে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
