সুপর্ণা সরকার
(এক)
পূর্বপল্লী রোড। চার মাথার মোড়ে দাঁড়ালে যেদিকে সূর্য অস্ত যায়, সেই সোজা রাস্তায় প্রথম গলির বাঁকে অবস্থিত মায়নাগুড়ির জাগ্রত শীতলা মন্দির। মন্দিরের দেওয়াল ঘেঁষে পকেট গলির শেষ মাথায় দৈবের আলো পার করে একটা সাদা রঙের বাড়ি। খোলা দরজা দিয়ে হাওয়ায় দোল খাওয়া পর্দার আড়ালে দেখা যাচ্ছে গৃহকর্মব্যস্ত এক রমণীর মৃদুমন্দ পদক্ষেপে যাতায়াত। ওর নাম দেবপমা। প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি রত সৃজনের সদ্য বিবাহিতা বউ। দ্বিরাগমন থেকে ফিরে বিয়ের ছুটি কাটিয়ে আজ আবার ব্যাংকে জয়েন করবে সৃজন। তারই তোড়জোড়ে ব্যস্ত প্রথম দিনের সংসার।
সৃজনের ২৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তার এযাবৎ কালের সেরা সময় এ দশ দিন। দেবপমাকে বিয়ে করার পর। খুব সাধারণ একটি মেয়ে দেবপমা। ঠিক যেমনটা চেয়েছিলো সৃজন। শিক্ষিত, সভ্য এবং একটা ছিমছাম মেয়ে। সৃজন বুঝতে পারে শুধু সমাজের চোখেই নয় অন্তর থেকে সাধারণ হওয়া এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কাজ। তাই দেবপমাকে দেখে যতটা মুগ্ধ হওয়া হয় অন্তর গহ্বরে তারথেকেও অধিক গ্লানি কাজ করে সবসময়। সদ্য যুবতী হয়ে ওঠা নিতান্তই ধীর-স্থির শান্তশিষ্ট প্রকৃতির আদ্যপান্ত লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে দেবপমা। গ্রামে বড় হয়ে ওঠা। স্নাতকোত্তর পাশ করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। শহরের চঞ্চলতা ওর মনন ও উদ্ভাবনকে তখনো ব্যস্ত করে তুলতে পারেনি। এইরকম কাউকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে খুঁজছিল সৃজন এতোকাল।
দেবপমার যখন ৬ বছর বয়স তখন ওর বাবা নিরুদ্দেশ হন। মেয়েদের ঋণ শোধ করে আসা বাড়ির অন্ন যতই সুস্বাদু হোক না কেন মোটা চালের ভাতের মত গিলতে অসুবিধা হয় এই ভেবে একমাত্র কন্যাকে নিয়ে শশুর বাড়িতেই থেকে যান দেবপমার মা। মায়ের সঙ্গে পিতাহীন পিতৃগৃহের যৌথ পরিবারে সংযত জীবন যাপন এবং সেই মানিয়ে নেওয়া আবহে বড়ো হয়ে ওঠা, হয়তো তারই প্রভাব পড়েছে দেবপমার সংযত আচরণের মধ্যেও।
(দুই)
আমাদের দেশে বেশিরভাগ পৌরাণিক কাব্য বা মহাকাব্য পড়লে মনে হয় বীর এবং পরাক্রমশালী পুরুষমানুষের যুদ্ধ কাব্যে নারী চরিত্রের সৃষ্টি যেন শুধুই দুঃখ পাওয়ার জন্য। নায়কের বীরগাথা বুননের জন্য কাব্যে মেয়েদের ঠাঁই জুটেছে বড়ই করুন ভাবে। আবার কখনো কখনো নারীর ছায়াকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর ইতিহাসে গ্রথিত আছে ভয়ংকর যুদ্ধ গাঁথা।
সৃজনের পিসিমা শঙ্খমালা দেবী একদিন প্রায় দিবাস্বপ্ন দেখেওঠার মত তড়িঘড়ি ঠিক করলেন মা মরা ছেলেটার একটা গতি করতে হবে। দাদা বাড়িতে একা থাকতে থাকতে গত কয়েক বছর ধরে ডিমেনশিয়া জাঁকিয়ে বসেছে । বহু বছর আগে সপরিবারে বেনারস ঘুরতে গিয়ে বৌদি আর ফিরে আসেননি। ছোটবেলা থেকে মাকে হারানোয় ছেলেটার উপরেও মানসিক প্রভাব পড়েছে বিস্তর। তার চাইতেও বিশেষ লক্ষ্য পিতৃপুরুষের বংশ টিকিয়ে রাখার দায়ভার মাথায় নিয়ে নিজের শ্বশুরবাড়ি গ্রামের একটি মেয়ের সঙ্গে ছমাসের মধ্যেই একমাত্র কুলপ্রদীপের বিয়ে সেরে ফেললেন শঙ্খমালা দেবী। এত বছর ধরে বিয়ে নিয়ে সৃজনের দ্বিমত থাকলেও পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে ওকে রাজি করাতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। এই মহাকার্য সেরে ইহজন্মের পূণ্য পাত্রের উপচে পড়া ভান্ডার নিয়ে আত্মগরিমায় পিসিমা বাকি জীবন টুকু নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারেন জেনে নিস্তার পেলেন।
(তিন)
বসন্তকাল অতিবাহিত হয়ে গেলেও নব দম্পতির জীবনে বসন্তের রং এখনো প্রগাঢ়। দুপুর গড়াতে না গড়াতে ভারী হয়ে আসা হাওয়ায় জাঁকিয়ে ওঠা বিষন্নতাগুলো এখন হালকা হয়ে এসেছে জীবনে।
সৃজন স্বভাবে শান্ত শিষ্ট এবং সদা হাস্যমুখ হলেও ওর চোখে কৌতুক ভরপুর। কি যেন একটা রহস্য নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সবসময়। ওর চাওনির ভঙ্গিমা দেখে এক এক সময় দেবপমার মনে হয় যেকোনো জ্যান্ত মানুষের শরীর চিরে তার হাড়গোড়, ভেতরের ক্ষত বা গোপনতা পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারে। চাকরি ব্যতীত বাইরে যাওয়া বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা ব্যতিরেকে বাড়িতে বসে বই পড়ে সময় কাটিয়ে দেয় ঘন্টার পর ঘন্টা। বিভিন্ন ধরনের বই। পাভলফ, ফ্রায়েড থেকে শুরু করে অ্যানাটমি, যৌন তথ্য ইত্যাদি।
সৃজন আজ অব্দি কতগুলো চাকরি করেছে তার হিসেব করা কঠিন। এই বাজারেও বারবার চাকরি বদল। যদিও ওর ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কোনরকম সন্দেহ নেই। দেড় দু’বছর অন্তর অন্তর অন্য কোম্পানি অন্য পোস্ট। নিজেকে ডেভেলপ করে চলেছে। বহু বছর পর নিজের শহরে পোস্টিং নিয়ে আছে এইবার, হয়তো নতুন করে শুরু করবে বলেই। দেবপমা ওর সম্পর্কে টুকিটাকি জানতে শুরু করে ভেবেছিল জীবনটাকে নিয়ে হয়তো মানুষটার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা, একঘেয়েমিতে আটকে থাকার বদলে অনেকটা বৃহৎ পরিসরে জীবনকে অন্বেষণ করে বাঁচতে চায়।
ফুলশয্যার রাতেই দেবপমাকে জানিয়েছিলো একটা উপন্যাস লিখতে ব্যস্ত সৃজন। পাণ্ডুলিপি তৈরি করে চলেছে। তবে সেটা সময় সাপেক্ষ। জীবনটাকে নিংড়ে নিয়ে এই বইটাকে শেষ করাই ওর মূল লক্ষ্য।
(চার)
সমীরণ বাবুর চরিত্রটা দেবপমার কাছে বড়ই অদ্ভুত ঠেকে। যদিও উনি জীবনে সঙ্গে শারীরিক এবং মানসিক দুভাবেই লড়াই করে চলেছেন। প্রায়ই সমস্ত কিছুই ভুলে ভুলে যান। তবে ওনার এই অবস্থা কোন অপরিচিত মানুষ হয়তো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারবে না। সারাদিন স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে উঠে নিজের প্রাতঃকর্ম সেরে সকাল থেকেই টিভির সামনে নিউজ চালিয়ে বসে থাকেন। দৈনন্দিনের বাকি কাজকর্ম যেরকম স্নান, খাওয়া, বিশ্রামের মাঝেও ঘুরেফিরেই টিভি চালিয়ে খবরের সামনে এসে বসে থাকাটা তার নেশার মতো। শুধু সন্ধ্যা থেকে ব্যামোটা একটু বিকৃতির আকার ধারণ করে, মাঝে মাঝেই বিড়বিড় করে অনেক অজানা নাম বলে যেতে থাকেন, যাদের কথা কোনদিন শোনেনি দেবপমা।
বৈশাখ মাসের চ্যাপচাপে গরম। মধ্যরাত। তিনটা বাজে। হঠাৎ তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙ্গে যায়। গলা ভেজানোর জন্য রান্না ঘরের দিকে যেতে গিয়ে চোখে পড়ে ড্রয়িং রুমে সোফার উপর বসে বাবা কাকে যেন বকছেন।
- “খুব বার বেড়েছে না তোর? খালি বদমাইশি বুদ্ধি যত। মেয়েদের অতিরিক্ত বুদ্ধি-ই মৃত্যুর কারণ। পালা। এখান থেকে পালা। পালা।”
দেবপমা ঘরের লাইট জ্বালিয়ে সামনে যেতেই সমীরণ বাবুর ভোল বদলে যায়।
- “ঘুমাওনি মা?”
- “আপনার কোন অসুবিধা হচ্ছে বাবা? কাকে বকছিলেন ওইভাবে একা একা?”
- “ও কিছু না। ওই দীপাটাকে বকছিলাম।”
এই বলে আবার স্বাভাবিকভাবে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েন সমীরণ বাবু।
শ্বশুরমশাইয়ের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বরাবর করুণা হলেও সেই দিনের পর একটা কৌতূহল ও সন্দেহ জন্মায় দেবপমার মনে। বাড়ির কাজের লোক মিঠুদিকে কাছে কয়েকদিন আগেই দীপা নামটির পরিচিতি পেয়েছিলো সে। মিঠুদিদের কাজের এসোসিয়েশনের মঞ্জুদির মেয়ে ছিল দীপা। মঞ্জুদি পুরোহিতের কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা করার মত বাসা বাড়িতে কাজ করত। মাঝে মাঝে সময়ের হেরফের হলে দীপা মাকে সাহায্য করতে যেতো। মেয়েটি ছিল জলফড়িং এর মত। জলের মতো স্বচ্ছ মন, তবে মুখে চ্যাটাং চ্যাটাং বুলি। এই বাড়িতেও দুবেলার কাজ ধরেছিল মঞ্জুদি। মাঝে মাঝে দীপাও আসতো। সেই জন্যই হয়তো ওর নামটা মনে আছে সমীরণ বাবুর। তবে মিঠুদি দীপার কথা বলতে বলতেই কোমর থেকে আচলটা টেনে বের করে চোখ মুছতে শুরু করে। তারপর জানায় এই তল্লাটের সবথেকে ভয়াবহ মৃত্যুর কাহিনী। এখান থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে কালোডোবার জলে ভেসে উঠেছিল দীপার ফুলে ফ্যাকাশে হয়ে ওঠা লাশ। জলে ভেসে ওঠা ওই দেহ দেখে ভয়ার্ত আর্তনাদে ভেঙে পড়েছিলো চার পাশ। যেনো কোনো এক নরকের কীট ওর চোখ দুটো নিয়ে জলের তলে পালিয়েছিল।
এই অদ্ভুত মৃত্যু কাহিনী ও সমীরণ বাবুর রাতের সেই ঘটনা একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছিলো দেবপমার মনে। সন্ধ্যায় সৃজন বাড়ি ফেরার পর বাবার মানসিক এবং শারীরিক চিকিৎসার ওপর আরো জোর দেওয়ার জন্য একজন ভালো সাইকোলজিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করার আর্জি জানিয়ে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সমস্ত ঘটনার বিবরণ জানায়।
- “আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে উনি কেমন মানুষ ছিলেন?”
- “প্রচন্ড রাগী মানুষ বলতে যা বোঝায় সেই রকমই একজন।”
- “চঞ্চল মেয়েদের বুঝি পছন্দ করতেন না।”
- “তোমার ভয় নেই।” (সৃজন মুচকি হেসে বললো)
- “কেন?”
- “বউটা আমার নেহাত-ই শান্তশিষ্ট বোকা বোকা ধরণের।”
- “মেয়েদের বুঝি চঞ্চল চতুর হতে নেই?”
একটা কৌতুকের হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো সৃজনের। ঘারটা নামিয়ে ধীরে ধীরে বলল
- “সুন্দরী আমার! মায়াবিনী রাক্ষসীদের যে পতন হয়ে এসেছে এ দেশে বারবার। তাই ভয় করে।”
(পাঁচ)
জৈষ্ঠ মাসের শেষ। অফিসের কোয়ার্টার এন্ডিং। ফ্যামিলি ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। শহর থেকে দূরে ফরেস্ট ঘেঁষা বড় একটি রিসোর্টে। সৃজন এগুলোতে পার্টিতে আগে একাই যেত। তবে এখন সঙ্গিনী হয়েছে। নতুন বউকে নিয়ে প্রথম অফিস পার্টিতে যোগদান। একটা রঙিন সন্ধ্যা। দেবপমা এর আগে এইরকম উৎসবে শামিল হয়নি কখনো। রাত্রি প্রথম প্রহর। রঙিন জলে নারী পুরুষ অনেকেই নিজেদের রাঙিয়ে তুলেছে। তবে দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতেই নবদম্পতির জীবনের এই গোলাপী আস্তরণ কেটে অজানা গভীর তামাশা ঘনিয়ে রোপিত হয়েছিলো এক তিমির সন্ধিক্ষণের বীজ।
অফিসে ডেপুটি ম্যানেজার একজন মহিলা, নাম তোর্ষা। কাউন্টারে কাছে গিয়ে অর্ডার করলো
- “হুইস্কি অন দা রক্স প্লীজ।”
রিসর্টের বাইরের সুইমিংপুলের পাশে ফাঁকা জায়গায় চলছিলো বারবিকিউর নাইট। হাতে গ্লাস নিয়ে আগুনকে ঘিরে বসে থাকা আসরে শামিল হলো তোর্ষা।
- “দেবপমা রাইট? সরি, তোমাদের রিসেপশনের দিন একটা আর্জেন্ট কাজে আটকে গিয়েছিলাম, তাই আর যাওয়া হয়নি। নতুন জীবনের এক্সপেরিয়েন্স কেমন?”
- “ভালোই।” (দেবপমা মৃদু হেসে)
- “সৃজনের থেকে শুনলাম তুমি এম.এ কমপ্লিট করেই বিয়ে করে নিয়েছো। এখনকার দিনে হাউস ওয়াইফ হয়ে আর কেউ সময় নষ্ট করে না। তুমিও আমাদের মতো চাকরির চেষ্টা করো।”
- “হ্যাঁ, আমারও সেইরকমই ইচ্ছে। ভাবছি ওর সাথে আলোচনা করে চেষ্টা শুরু করবো।”
কথাটা বলেই সৃজনের দিকে চোখ পরে দেবপমার। কখন দূরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে দেবপমার দিকে তাকিয়ে ছিল। চমকে ওঠে দেবপমা। হঠাৎ করেই গায়ে একটা শিহরন বোধ হয়। কিজানি কেনো? হয়তো হিমালয় এখান থেকে খুব একটা দূর নয় বলে।
- “এইতো সৃজন। আরে এবার ওয়াইফকে একটু গ্রুমিং করে কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে ওয়েলকাম করো।”
কোনরকম উত্তরের অপেক্ষা না করেই তোর্ষা আবার বলে চললো।
- “দেখো দেবপমা আমিও পাঁচ বছর আগে আমার জার্নি শুরু করেছিলাম। এখন আমি ওয়েল এস্টাব্লিস্ট। ওইসব রান্নাবান্না করে জীবন কাটানোর থেকে নিজের পরিচয় বানানো, নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোমাকেও সাজেস্ট করবো। জাস্ট স্টার্ট ইয়োর জার্নি টুওয়ার্ডস দ্যা মুন।”
কথাটা শেষ করে তোর্সা সম্মতি সূচক উত্তরের প্রত্যাশায় সৃজন এর দিকে তাকায়। সৃজন মুচকি হেসে তোর্সার দিকে এগিয়ে আসে।
- “চিয়ার্স!”
(ছয়)
কালবৈশাখীর রাত। ঘড়িতে সাড়ে নটা বেজে পার। সৃজন তখনো বাড়ি ফেরেনি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত ঝড়বৃষ্টির কারণে নেটওয়ার্কের সমস্যা। তার মধ্যে দিনকয়েক হল সৃজনের স্বভাবের মধ্যে একটা বদল এসেছে। নতুন চাকরির জন্য ইতিমধ্যে অনলাইন কয়েকটি ইন্টারভিউ দিয়ে ফেলেছে। আবার জায়গা বদল। দেবপমার সেদিনের পর বুঝতে অসুবিধা হয়নি সৃজন ওর চাকরি করার ভাবনাটাকে ভালোভাবে নেয়নি। সেই নিয়ে যদিও পরে আর কোনরকম কথা বাড়ায়নি সে। তবে ওর কাছথেকে এই রকম আচরণ বড়ই অপ্রত্যাশিত। একজন শিক্ষিত ব্যক্তির এত সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া, খুবই অদ্ভুত ঠেকেছে দেবপমার। ড্রয়িং রুমে বসে এগুলোই ভাবতে ভাবতে ভাবনার অতল গহ্বরে খেই হারিয়ে ফেলে একসময়।
এমন সময় দরজায় সজোরে করাঘাত পড়ায় চমকে উঠে দেবপমা। অনবরত দরজায় ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে কেউ। দেবপমা চিৎকার করে ওঠে
- “কে? কে?”
- “দরজা খোলো।”
সৃজনের আওয়াজ। গলার স্বর ভারী হয়ে আছে। যেন প্রচন্ড ক্ষেপে এখনই দরজাটা ভেঙে ফেলবে। দরজা খুলতেই একরকম ধাক্কা দিয়েই ভিজে শরীরে হনহন করে সিঁড়ির দিকে চলে যাচ্ছিল সৃজন। মাঝে দেবপমা একবার ডেকে উঠতেই রক্তচক্ষু নিয়ে ওর দিকে ফিরে তাকায়। হাতে একটা কালো প্লাস্টিক মতো কিছু। একছুটে ছাদের দিকে চলে যায়। চিলেকোঠার ঘরে সজোরে দরজা বন্ধ করার আওয়াজ কানে আসে। বুকের ভেতরটা চিঁড়িক দিয়ে উঠলো দেবপমার। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। রাত্রি দ্বিপ্রহর কাটার পরও সৃজন ঘরে না ফেরায় অভুক্ত অবস্থায়তেই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে শুয়ে পড়লো সেই রাতে।
মধ্য রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা দীর্ঘ উষ্ণ শ্বাসে ঘুম ভেঙে যায় দেবপমার। চমকে ওঠে দেখে ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে একদৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সৃজন। তারপর দুই জোড়া চোখ, স্থির দৃষ্টির ক্ষণিক সংঘাত চালিয়ে পৃথিবীর আদিম প্রবৃত্তির আবডালে ডুবে যায়। উঠে আসা সমস্ত প্রশ্ন ঢেকে দেয় মলমলের চাদর।
(সাত)
রবিবারের সকাল। বৃষ্টি কমে গেলও আকাশ এখনো ধূসর। প্রতিদিনের মতো লোকাল নিউজ চ্যানেল চালিয়ে চায়ের কাপ হাতে বসে আছেন সমীরণ বাবু। দেবপমা রান্না ঘরে সকালে জল খাওয়ার বানানো নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন সমীরণ বাবু।
- “আবার! আবার! বাবু কোথায় আছিস? দেখে যা। আবার মরেছে।”
রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে দেবপমা। নিউজ দেখে আঁতকে ওঠে। সৃজন ছাদে পায়চারি করছিল। আওয়াজ শুনে নিচে নেমে আসে। দেবপমা আতঙ্ক ভর্তি চোখে সৃজনের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে আবার ধীরে ধীরে রান্না ঘরের দিকে ফিরে যায়।
আজ সারাদিন কারো সঙ্গে কোনোরকম কথা না বলে কাটিয়েছে দেবপমা। দুপুরের খাবার পর সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে। দেবপমা ক্লান্তি নিয়েও বিশ্রাম নিতে পারেনি একটুও। ছাদে খোলা হাওয়ায় খানিকক্ষণ পায়চারি করে চিলেকোঠার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। বিয়ের পর থেকেই এই ঘরটাকে সবসময় তালা বন্ধই দেখে এসেছে। একবার সৃজনকে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল,
- “ওখানে পুরনো কিছু জিনিস রাখা আছে, ধুলোবালির ঘর, ঢুকবে না।”
বাড়ি জুড়ে এতগুলো ঘর থাকতে নিষিদ্ধ ঘরটা তাকে ভাবায়নি। তবে কাল যে সৃজন এই ঘরটাতে কোনো একটা অপ্রীতিকর মতলবেই এসেছিল সেই ব্যাপারে একটা সন্দেহ ঘোরপাক খাচ্ছিলো মনে। আজ সকালের নিউজটা দেখার পর সারাদিন বিষন্ন মন নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও লক্ষ্য ছিল এই বন্ধ তালার চাবিটা। তাই সিজনের স্নানে যাওয়ার পর কৌশল করে মানিব্যাগ থেকে চাবিটা সরিয়ে রেখেছিল। ছাদে আসার সময় ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে এসেছে বাড়ির প্রত্যেককে।
তাড়াতাড়ি দরজা খুলে রহস্য উন্মোচন করার উদ্যোগ থাকলেও কেমন একটা অদ্ভুত ভয়ে খানিকক্ষণ সময় নিলো দেবপমা। হয়তো এই দরজার চৌকাঠ পার করে ছেলেবেলা থেকে বহুল প্রত্যাশিত এই সংসার জীবনটাকে হারিয়ে ফেলতে পারে সে। অথবা সবই তাঁর ভ্রম! তবে শয়তানকে মনের ভেতর পুষে রাখবেনা দেবপমা। সাহস যুগিয়ে তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করল।
(আট)
অদ্ভুতভাবে নিটোল-পরিষ্কার গোছানো একটা ঘর। ফেনাইলের গন্ধ নাকে এলো। ঘরের দক্ষিণ দিকে সারি সারি বই ভর্তি দুটো বইয়ের তাক, মাঝে খাতা পত্র সাজানো একটা বইয়ের টেবিল, তার পাশেই একটা ছোট মত বিছানা, ঘরের পূর্বদিকে কালচেলাল রঙের পর্দায় ঢাকা একটা আলমারি এবং একখানা পুরনো দিনের ড্রেসিং টেবিল।
মনের অজানা দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো দেবপমা। মনে মনে ঠাকুর কে ধন্যবাদ জানিয়ে, ফিরে আসবে ঠিক করেছে সেই সময় চোখ পরল টেবিলের উপর রাখা একটা শাড়ির মত কিছু। কাছে গিয়ে দেখল ওটা শাড়ি নয়, পুরনো সুতির শাড়ি থেকে ছেঁড়া টুকরো কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা একটা ডায়রি। মনে পড়ল শাড়িটা সৃজনের মায়ের। হল রুমের লাগানো ছবিতে এই শাড়িটাই পরা। ডায়রির পাতা উল্টে বুঝতে পারলো এটা সেই উপন্যাসের পান্ডুলিপি। তবে ডায়রির প্রথম পাতায় আঁকা একটা হিজিবিজি ছবি, দেখে মনে হচ্ছে একটা রাক্ষসীর প্রতিচ্ছবি। শুরুতে লেখা “উৎসর্গ- মাকে”। দেবপমার ওদের প্রথম রাতের কথা মনে পড়ে যায়। একদিন একটা সম্পূর্ণ বই লিখে উঠবে বলে জানিয়েছিল সৃজন।
একটা করুন বেদনায় স্বামীর জন্য যখন বুকটা ভরে উঠেছে, ঠিক সেই সময় সূচিপত্রে চোখ পড়তেই স্তম্ভিত হয়ে যায় দেবপমা। তখনও সে জানতো না কতটা আর্তনাদে ভরপুর শয়তানের পাঁচালী হাতে তুলে নিয়েছে। পৃষ্ঠা উল্টে এগিয়ে যায়। এবং পড়তে শুরু করে একটা ফুলের মত শিশুর ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত ক্যাকটাসে পরিণত হওয়ার গল্প।
“তখন সাত বছর বয়স। রূপালী ম্যাম, স্কুলেরই এক দিদিমণি আমায় টিউশন পড়াতেন। শিক্ষিতা, মডার্ন মহিলা। স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স নিয়ে অন্য শহর থেকে আমাদের শহরে এসে প্রাইভেট ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। ওনার বয়স তখন ৪৫ ঊর্ধ্বে। আমার খুব পছন্দের একজন দিদিমণি ছিলেন স্কুলে। সেই মতো মা বাড়িতে টিউশনের ব্যবস্থা উনার কাছেই করে দেওয়ায় আমি বেজায় খুশি। বাড়ির তেতলার চিলেকোঠার ঘরটা আমার বড্ড প্রিয় জায়গা, ওই ঘরেই পড়াতেন খুব যত্ন নিয়ে। তবে দিন যেতে যেতে তার আমার প্রতি আদরটা একটা অন্য রূপ ধারণ করে। একদিন বাড়ি ফাঁকা পেয়ে সেই রাক্ষসীর যৌণ তাড়নায় এই চিলেকোঠার ঘরেই দেখেছিলাম ওর বীভৎসরূপ। আমার সমস্ত ছেলেবেলাটাকে তছনছ করে দিয়েছে সেই অন্ধকার। মাকে বুঝিয়ে বলতে পারিনি। আর বাবাকে ভয়ে। যদিও মা কারণ না বুঝেই আমার পড়ার অনিহার দিকে তাকিয়ে তাকে পরের মাস থেকে আসতে বারণ করে দিয়েছিলো। তবে স্কুলে সেই অদ্ভুত চোখ দুটো আমায় মুচকি হেসে তাড়িয়ে বেড়াতো। একটা অদ্ভুত বিরক্তি নিয়ে রয়ে গেলাম কৈশোর জুড়ে। যেন নিজে বিষ পান করে অন্য ব্যক্তির মৃত্যুর অপেক্ষা করা।”
দেবপমার শ্বাসবায়ু উষ্ণ হয়ে আসে। ওর গলার ভেতর এই মাত্র কেউ যেনো সিমেন্ট ঢেলে দিয়ে গেলো। সৃজনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নোনা জলে চোখ ভিজে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে তার পর শুরু হয় একের পর এক পৃষ্ঠা জুড়ে বিভৎস সেই আখ্যানের পাঠ।
দেবপমা পাথরের মত শক্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়ে। খানিকক্ষণ পর বাইরের একটা দমকা হাওয়ার আলমারির পর্দায় আলোড়ন পরে। একটা ঝাঁঝালো-পঁচা গন্ধের মিশ্রণ নাকে এসে লাগে। কাঁচের আলমারি। এক ঝলক দেখে আঁতকে উঠলো দেবপমা। পায়ের পাতা ভারী হয়ে আসে ক্রমশ। হাঁড় হিম করা ঠান্ডা অনুভব করে পর মুহূর্তেই সারা শরীর ঘেমে উঠলো। ঘাড় ঘুরিয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে এলো দেবপমার, জায়গা থেকে ছিটকে গিয়ে খাটের হাতলটা শক্তকরে ধরে ভয়ার্ত ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। দরজার কাছে হেলান দিয়ে সরীসৃপের মত শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁড়িয়ে ছিলো সৃজন। এই প্রথমবার সৃজনকে দেখে ভয়ে গলা শুকিয়ে এসেছে ওর। নিজেকে সামলানোর বহু চেষ্টা করেও আর আটকাতে না পেরে চিৎকার করে উঠলো
- “তোমায় সাহায্য করার মতো জায়গা তুমি রাখোনি। শয়তানের জালে পড়ে তুমি নিজেও আস্ত একটা শয়তানে পরিণত হয়েছো। তুমি পাপী। নরকেও ঠাঁই হবে না তোমার।”
সৃজন অপলক মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিলো দেবপমার। যেনো একটা বিষাক্ত সরীসৃপের চেরা জিভ দিয়ে ওর গায়ের উপর লালারসের প্রলেপ লাগিয়ে দেওয়া হলো। তারপর ধীর গতিতে দেবপমার দিকে এগিয়ে এসে মৃদু স্বরে বলল।
- “তুমিও আমার কথা শুনলে না। লক্ষ্মীমন্ত মেয়েদের এত গলা করতে নেই।”
দেবপমা তখন প্রায় উন্মাদিনী। নিজেকে সামলাতে না পেরে ঘরের মধ্যে ছোটাছুটি করে চলেছে অন্ধের মত। মুহূর্তের মধ্যে জীবনের এই ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে দেবপমা তখন অন্ধ। বিড়বিড় করে একটার পর একটা ঘটনা জুড়ে যাচ্ছে নিরন্তর
- “সকালের সেই ভয়াবহ নিউজ। তোমার অফিসের কলিগ তোর্ষা। নৃশংসভাবে ওকে কাল রাতে খুন। তবে তুমিই? আর এই ডায়েরী? সূচিপত্রের নাম গুলো? দীপার নাম? আর এই, এই আলমারি?”
- “এইটুকুই?”
দেবপমার মন সন্দেহে-ভয়ে বিধ্বস্ত থাকলেও সৃজনের এইরূপ উত্তরের প্রত্যাশা বুঝি ও করেনি। এতটা অবিচলিত? এতটা স্থির? কি করে? শয়তান। একটা আস্ত শয়তান সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
দেবপমা আর্তনাদের চিৎকার দিয়ে কেঁদে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সমস্ত মৃত্যুর শোক যেন ওর বুকটাকে চিরে রক্তাক্ত করে ফেলেছে।
- “ভগবান তুমি আমায় কোন পাপিষ্ঠের সাথে জড়ালে।”
সৃজন এগিয়ে গিয়ে পর্দাটা টেনে কাঁচের পাল্লায় গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল
- “এগুলো আমার ট্রফি। আমার এচিভমেন্ট। সমাজে যাদের দায়িত্ব কেউ নেয়নি, যাদের কথা কেউ শোনেনি, জানতে চায়নি, তাদের হয়ে আমি এই ট্রফি গুলো কুড়িয়ে বেড়াচ্ছি।” (কাঁচের পাল্লার গায়ে সৃজনের রক্ত বর্ণ হয়ে আসা চোখের প্রতিবিম্ব ভেসে উঠলো)
বাইরে সজোরে হাওয়া বইছে। কালবৈশাখীর আভাস। দেবপমা চোখের সমস্ত জল শেষ করে এলোমেলো চুলে ঘরের মেঝের থেকে মাথাটা তুলে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসলো। ঘরের মধ্যে অবস্থিত লাল পর্দায় ঘেরা সেই নরকের দরজার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে আরেকবার তাকালো। আলমারি ভর্তি কাঁচের বয়ম। তার ভেতরে সারি সারি মানবদেহ থেকে সঞ্চিত অর্গান, হলদে রঙের তরলের মধ্যে ভাসছে।
সৃজন ধীরে ধীরে দরজাটা ভেতর থেকে টেনে বন্ধ করে দেয়। বাইরে তখন সূর্য ডুবছে। শেষ আলোটুকু লালচে হয়ে ঘরটাকে রক্তমাখা করে তুলছে। আর নিচে, রান্নাঘরের টেবিলে রাখা আছে দেবপমার প্রিয় নীল ফুলদানি—খালি।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
