রম্যরচনা
অধ্যায় : সাত
উপায়ান্তর হয়ে হাচিয়া ফাল তার বাড়িতে নিজের হাতে গর্ত খুঁড়ে শত্রুদের কাছ থেকে আত্মগোপন করে থাকবে বলেই সিদ্ধান্ত নিল। ঘরে-বাইরে রাত্রি-দিন কাঁহাতক এত এত শত্রুদের মোকাবিলা করা যায়? বাইরে রাস্তাঘাটে না বেরোলেও লোকেরা গায়ে পড়ে বাড়িতে এসে শত্রু হয়ে যেতে থাকে। শত্রুদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে কাক-পক্ষী টের পাবে না এমন একটা আত্মগোপন করার মতো জায়গার কথা ভেবে ভেবে চোরাকুঠুরি, বাংকার বানাবার কথা মাথায় এনেও খারিজ করে দিয়েছিল এই কারণে যে সেসব বানাতে আসবে যারা মিস্ত্রিমজুর হয়ে তারাও শেষে শত্রুতা করে সেসব রটিয়ে দিতে পারে। শত্রুদের কাছে তখন আর কিছুই গোপন থাকবে না। তার চেয়ে নিজের হাতে বাড়িতে একটা গর্ত খুঁড়ে তার ভিতরে ঢুকে লুকিয়ে থাকলে কেউ আর জানতে পারবে না কোথায় আছে।
গর্তটা ঘরের ভিতর খুঁড়তে পারলেই ভালো হতো, কিন্তু তাতে হাঙ্গামা অনেক। বলতে গেলে, অসম্ভব যেহেতু কংক্রিটে তৈরি পুরু মেঝে। ওই কংক্রিটের মেঝে খুঁড়ে গর্ত বানানো তার কর্ম নয়। সে কি গাঁইতি-শাবল বা কোদাল চালাতে জানে? সৌভাগ্যক্রমে তার বাড়ির সামনে এক চিলতে ফাঁকা জমি ছিল, পিছনেও ছিল। তবে ভেবেচিন্তে সামনের অংশটাকেই নির্বাচন করল তুলনায় বড় বলে। হিসেব-টিসেব করে দেখল, তার যা উচ্চতা আর আয়তন তাতে ফুট পাঁচেক উচ্চতা ও ফুট চারেক ব্যাসযুক্ত একটা গর্ত খুঁড়লেই দিব্যি তার মধ্যে শুয়ে-বসে আরাম-আয়েশ করে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। প্রথমে ভেবেছিল, গর্তটার ব্যাস তিন ফুট করলে খোঁড়াখুঁড়ির পরিশ্রমটা অনেক কমে যাবে। শেষে মনে হল, অত কম চওড়ার গর্তে থাকতে গেলে জেলখানার কয়েদিদের মতো কষ্ট করে থাকতে হবে। শত্রুদের ভয়ে একে তো বাড়িঘর ছেড়ে গর্ত বানিয়ে তাতে ঢুকে বসবাস করা, আবার অত কষ্ট করে থাকা পোষাবে কেন? অনেক যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ, জ্যামিতি-পরিমিতিশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত বৃত্ত, উপবৃত্ত, আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র ইত্যাদির ক্ষেত্রফল ও পরিসীমা জাতীয় বিষয় নিয়ে কয়েক দিন অক্লান্ত চর্চা করে শেষে বুঝতে পারল যে গর্তটার চার ফুট ব্যাস হওয়াই বিধেয়, তার চেয়ে এক ইঞ্চি কমও বেশিও নয়। গর্তটা যেমন সে জেলখানার কয়েদি থাকার কুঠুরি হয়ে যাক চায় না, তেমনি গর্তের মধ্যে সে তো আর দৌড়ে দৌড়ে লনটেনিস অথবা ব্যাডমিন্টন খেলতে যাবে না। তাই আর বেশি বড় গর্ত বানালে সেটা হয়ে যাবে বিলাসিতা। গর্তে বসবাস করে তার যেমন কয়েদি হওয়া পোষাবে না তেমনি বিলাসিতা করাও চলবে না।
সব ঠিকঠাক করে পরদিন সকালে কোদাল-টোদাল নিয়ে হাচিয়া ফাল বাড়ির সামনে থাকা জমিটায় গর্ত খোঁড়ার কাজে লেগে গেল। কংক্রিটের মেজে খুঁড়ে গর্ত বানানো অসম্ভব হলেও মাটি খুঁড়ে গর্ত বানানোর কাজটা বেশ সহজ বলেই মনে হল। বুদ্ধি করে একটা মইও এনেছিল সঙ্গে, কারণ গর্ত একটু গভীর হলে নিচ থেকে ঝুড়িতে মাটি ওপরে তুলতে বারবার নামা-ওঠা দরকার। তাছাড়া মইটা পরে গর্তে বসবাস করার সময়ও একই কাজে ব্যবহার করা যাবে। মনের আনন্দে গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে হাচিয়া ফাল ভাবছিল এবার তার শত্রুরা মহাজব্দ হবে। বাড়িতে এসে দেখবে বাড়ি ফাঁকা। শত্রুতাও করতে পারবে না। তারা যখন হাচিয়া ফাল কোথায় গেল ভেবে মাথার চুল ছিঁড়বে সে তখন মহানন্দে গর্তে বসে বসে তামাশা দেখবে আর মিটিমিটি হাসবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য তার সব আনন্দ মাটি হয়ে যেতে লাগল। দুর্ভাগ্যক্রমে তার বাড়িটা রাস্তা লাগোয়া আর ফাঁকা জমিটাও বাড়ির ঠিক সামনে। তাই রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছিল তারা সবাই তাকে সে কী করছে জিজ্ঞেস করে করে পাগল বানিয়ে দিল। কেউ বলে, ‘কী হে, গর্ত খুঁড়ছো কেন, গাছ লাগাবে বুঝি?’ কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘জলের জন্য কুয়ো বানাবে, তাই না?’ কেউ কেউ পরামর্শ দিল, ‘জলের জন্য কুয়ো না বানিয়ে টিউবঅয়েল বসালে পারতে।’ দু’-একজন ফাজলামি করে বলল, ‘মাছ চাষের জন্য পুকুর বানাবে বুঝি? অতটুকু জমিতে কি আর পুকুর হয়? চৌবাচ্চা হবে বড়জোর। কয়েকজন আবার উপদেশ দিয়ে জানালো, ‘পুকুর কাটো আর যাই কাটো, দুটো লোক রেখে কাজ করাতে পারলে না? নিজেই খেটে মরছো। অত কিপ্টেমি কেন হে বাপু?’ লোকের জ্বালায় তার কাজ পন্ড হওয়ার জোগাড়। যে যায় সে কেবল জিজ্ঞেস করে, ‘কী করছো, কী করছো?’ একসময় তো কয়েকজন তার বাড়ির সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়েও গেল মজা দেখতে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখলেও নাহয় কথা ছিল, অনবরত তাকে ‘কী করছো, কেন করছ’ জাতীয় প্রশ্ন তুলে তুলে উত্ত্যক্ত করে মারছিল। রেগেমেগে তার বলতে ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে, ‘আমার কবর খুঁড়ছি।’ চারপাশে এত এত শত্রু থাকলে কাঁহাতক শান্তিতে থাকা যায়?
যাই হোক, লোকজনের অত উৎপাত ঠান্ডা মাথায় সামলে দু’দিনের মধ্যে গর্তটা বানিয়ে বসবাসের যোগ্য করে তুলল সে। একটা গোলাকার মাপ মতো ঢাকনাও সে আগে থাকতেই অর্ডার দিয়ে তৈরি করে বাড়িতে এনে রেখে দিয়েছিল। তৃতীয় দিন শেষ রাত্তিরে ভোর হওয়ার খানিকটা আগে সে যথেষ্ট খাবার দাবার সঙ্গে নিয়ে গর্তে গিয়ে আশ্রয় নিল। গর্তে ঢুকে মই বেয়ে নিচে নামার আগে ঢাকনাটা চাপিয়ে দিল মুখে। ঠিক করল, সারাটা দিন গর্তে কাটিয়ে দিতে দিতে সে দেখবে তাকে বাড়িতে না পেয়ে তার সব শত্রুরা কেমন জব্দ হয়। তারা কেউ কল্পনাই করতে পারবে না যে ঘরবাড়ি ছেড়ে সে গর্তে ঢুকে গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে।
যেমন ভেবেছিল তাই হল। সকালের একটু পর থেকেই তার বাড়িতে লোকরা, অন্য কথায়, শত্রুরা এসে তাকে ডাকাডাকি করতে লাগল। না পেয়ে হতাশ হয়ে চলেও যাচ্ছিল দুপুরের মধ্যে। সে গর্তে বসে বসে টের পেল যে অনেক লোক বা শত্রুরা তার বাড়িতে জড়ো হয়ে তাকে রীতিমতো খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল। সবার গলাতেই এক জিজ্ঞাসা, ‘কোথায় গেল, কোথায় গেল?’ তাকে না পেলে যে তার শত্রুদের পেটের ভাতও হজম হয় না, সে জানে। তারপর সে শুনলো তারা বলাবলি করছে যে দুদিন আগে সে গর্ত খোঁড়াখুঁড়ি করছিল। গর্তে বসে সে সবার সব কথা ভালো বুঝতেও পারছিল না। হঠাৎ সে বুঝল যে সবাই এসে জড়ো হয়েছে গর্তটার কাছে এবং সে শুনল, গর্তের ঢাকনার গায়ে গুমগুম আওয়াজ। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, গর্তের ঢাকনাটা সরে গেল আর গর্তের মধ্যে উঁকি মারল একাধিক শত্রুর মুখ। সবাই মিলে চিৎকার করে বলল, ‘গর্তে ঢুকে বসে আছে, গর্তে ঢুকে বসে আছে।’
তাকে টানাহ্যাঁচড়া করে গর্ত থেকে তুলে আনলো সবাই। তারপর একসঙ্গে সবাই প্রশ্ন করতে লাগল কেন সে গর্তে ঢুকে বসে আছে। শুনে মনে হচ্ছিল যে মহা অন্যায় বা অপরাধ করে ফেলেছে। কেউ কেউ আবার উত্তেজিত গলায় বলতে লাগলো, ‘তুমি পাগল না মাতাল যে বাড়িঘর ফেলে গর্তে ঢুকে বসে আছো?’ কেউ কেউ বলল, ‘বাড়িঘর ছেড়ে গর্তে থাকার শখ কেন? তুমি সাপ না শেয়াল?’
হাচিয়া ফাল ধারণাই করতে পারেনি যে তার শত্রুরা এত চতুর ও পরাক্রমশালী। সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে গর্ত না খুঁড়ে তার উচিত ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনে কাজটা করে ফেলা। তাছাড়া বাড়ির পিছন দিকে যে চাতালটা রয়েছে সেখানেও তো গর্তটা খুঁড়তে পারতো? কেন যে মাথায় কুবুদ্ধি চেপেছিল বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গাটাকে বেছে নেওয়ার!
কিন্তু কান্ডটা দেখো, শত্রুদের জ্বালায় কি কারো কোন ক্ষতি না করেও স্বাধীনভাবে তার কোন কাজ করার উপায় নেই?প্রতিভাস ম্যাগাজিন
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)