তপোপ্রিয়
আড়ালে কেউ আড়াল
সেই দুঃসহ নির্মম দুর্দশার দিনগুলিতেও মাকে দেখেছি তার ইষ্টদেবতার ওপর অবিচল আশায় ভরসা করে আছে। যত কষ্ট বাড়ত, সমস্যা প্রবল হয়ে আসত মা তত বেশি ঐশীশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠত। কখনো মাকে কোন অবস্থাতেই বিশ্বাস হারাতে দেখতাম না। তাতে তাৎক্ষণিক কোন সমাধান নজরে না এলেও পরবর্তী কোন না কোন সময় দেখেছি আশ্চর্য কিছু প্রতিদান কিভাবে যেন মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
অনেক উদাহরণের মধ্যে একটি অন্তত বলা যেতে পারে।

আমরা তখন নাবালক আর পাহাড়-জঙ্গলের দেশ ত্রিপুরাতে আছি। জমি-জায়গা নিয়ে মায়ের নাজেহাল অবস্থা। চাষ-আবাদ সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। আর তাকে কিনা এখন বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে জমি-জমা আঁকড়ে ধরতে হল। সেটাও যে খুব অসাধ্য ছিল এমন নয়। মায়ের জন্য তার চেয়ে অনেক বড় সমস্যা সৃষ্টি করল প্রতিবেশী লোকজন। মারা যাওয়ার আগে বাবা জায়গা-জমি গুছিয়ে যাওয়ার সময় পায়নি। যারা সঙ্গী ছিল তারা এখন শত্রু হয়ে গেল। স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে গেলে স্বজন সঙ্গে রেখ, এটাই ছিল বাবার আদর্শ। ভারতবর্ষ তার কাছে বিদেশেরই শামিল। ওবঙ্গের জল-হাওয়ায় মানুষ সে, তার পিতা-প্রপিতামহরা যে মাটিকে ভিত্তি করে বেড়ে উঠেছিল। বাবা হঠাৎ চলে যাওয়ার পর তার সাধের স্বজনরাই শ্বাপদ হয়ে গেল। এই নিয়ে মা প্রায়ই সখেদে বলত শুনতাম,
‘এর চেয়ে অচেনা লোকজনরা অনেক ভাল ছিল। কী যে দুর্মতি হয়েছিল তার। সে তো মরে পার পেয়ে গেছে, আমাকে ভোগ করতে হচ্ছে যন্ত্রণা।’
জমি-জমা কারও নামে নেই। কার কতটা তাও জানা নেই। বাবার স্বজনরা সব কেড়েকুড়ে নেওয়ার চেষ্টায় ছিল। সেখানে দাঁড়িয়েই শুরু হয়েছিল মায়ের লড়াই।
এক ভাইঝির শ্বশুরবাড়ির লোকদের বাবা স্বজন আশ্বাসে সঙ্গে করে এনেছিল। সেই ভাইঝির ছ’জন দেওর, তারাই এখন প্রধান শত্রু হয়ে উঠল। এক দেওরের নাম ছিল বলাই। সে গাড়ি চালাত। দশাসই জোয়ান সে, হেঁটে গেলে মনে হত ভূমিকম্প হবে। তার চেহারা আজ বড়ই অস্পষ্ট। তবুও তার সামগ্রিক গোলাকার চেহারা চোখে ভাসে।
বড়ই অমার্জিত তার ভাবভঙ্গি আর অশালীন মুখের ভাষা। কারণে-অকারণে সে মাকে নানাভাবে অপমান করত। দিদি তখন সদ্য কিশোরী। একদিন ওদের ছাগল এসে আমাদের বাড়িজমির ফসল খাচ্ছিল। তখন বিকেল। দিদি একটা লাঠি হাতে ছাগলটাকে তাড়িয়ে দিয়েছে আর সেই অপরাধ তেড়ে মারতে এসেছিল বলাই। মা প্রতিবাদ করতে গেলে চেঁচিয়ে বলল,
‘এসব বাড়িজমি সব আমাদের। তোদের উচ্ছেদ করে ছাড়ব করে এখান থেকে।’
সেই চেষ্টাতেই ছিল তারা সবাই। গায়ের জোরে বছর বছর আমাদের অনেকটা করে জমি নিজেদের সীমানায় ঢুকিয়ে নিত। খুব রগচটা আর দেখতে অসুরের মত চেহারা বলে সমস্ত গর্হিত কাজের সামনে তাকেই রাখা হত যাতে মা ভয় পায় তার চেহারা দেখে। ভয় পাওয়ার পাত্রী ছিল না মা, কেবল অশ্রাব্য গালিগালাজ শুনলে সিঁটিয়ে যেত। গলাবাজি করতে জানত না মা, বেশ ভয় পেত ঝগড়াকে। যেখানেই ঝগড়া লাগার সম্ভাবনা সে স্থান সযত্নে এড়িয়ে চলত। যদি বা কোন কারণে কারও সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে যেতে বাধ্য হত তো নিজের বক্তব্য অনুচ্চ গলায় খানিকটা বলার চেষ্টা করেই রণেভঙ্গ দিত।
বলাইদের সঙ্গে গায়ের জোরে পারা তো সম্ভব ছিল না কোনমতেই গলার জোরেও মা এঁটে উঠত না। মায়ের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা আর অপমান জানাবার একটি জায়গা ছিল। মা বলত বিপদভঞ্জন শ্রীমধুসূদন, ও-ই মায়ের ইষ্টদেবতা। সকাল আর সন্ধে কেবল নয়, সারাদিনে যখনই মনে হত মা ওই ইষ্টদেবতার কাছে গিয়ে নিজের হেনস্তার কথা জানাত। সুবিচার প্রার্থনা করত কান্না বিগলিত আকুলতায়। সেই দৃশ্য এখনও আমার কাছে জীবন্ত। ঠাকুরের সামনে মা জোড়াসনে বসে আছে সরলসোজা, হাতগুলি জড়ো করে রাখা কোলে, দুচোখ বুজে কিছু মা জানাচ্ছে তার গোপালকে বিড়বিড় করে আর চোখের কোণ থেকে জলের ধারা নিঃশব্দে নেমে যাচ্ছে দু’গাল বেয়ে।
ওই সময়ের অন্তত সাত-আট বছর পরের কথা। সামনে আমার মাধ্যমিক পরীক্ষা। ছ’মাসও বাকি নেই। বছর দুয়েক আগে থেকে একটা অসম্ভব উঁচু স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম, মাধ্যমিকে এক নম্বর হতে হবে। তখন আমার মধ্যে প্রবল নাম-ডাকের মোহ। সবসময় কেবল স্বপ্ন রচনা করি। স্বপ্নগুলি কিভাবে বাস্তবায়িত হবে জানতাম না। অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল, হয়ে যাবে।
মাধ্যমিকে এক নম্বর হওয়ার স্বপ্নটা বেশ আরামদায়ক। কিন্তু স্বপ্ন সফল করার প্রক্রিয়াটাতে বিন্দুমাত্র আরাম নেই। তখন সেটা বুঝতাম না। চেষ্টা যেভাবে করছিলাম আজ বুঝি সেটা মোটেই যথেষ্ট ছিল না। উপরন্তু একটা অপ্রীতিকর উপসর্গ আমার সেই চেষ্টাতেও বাদ সাধল। কী কারণে বা কিভাবে জানিনা, পরীক্ষার কয়েক মাস আগে আমার হাত কেমন অসাড় হয়ে যেতে লাগল। সারাক্ষণ হাত কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে, সে আর আমার বশে নেই। হাত দিয়ে কিছু লিখব দূরের কথা, এমনি এমনি রাখলেও স্বস্তি পাই না। হাত না অকেজো হয়ে যায় এই দুশ্চিন্তায় খাওয়া-ঘুম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আমার সঙ্গে সঙ্গে মায়েরও খুবই মন খারাপ। হাতে মা এটা মাকে ওটা মাখে, মাসাজ করে, কিছুতেই কিছু হয় না। কত যে ওঝা-বদ্যি, ঝাড়ফুঁক হল, হাতের সার ফিরে আসে না। মা ঠাকুরের কাছে বসে কান্নাকাটি করে, আমার জন্য সব সময় তার মুখ কালো। স্থানীয় হাসপাতালে দেখিয়ে কোন ফল হলো না। রাজধানী আগরতলা শহরে বড় ডাক্তারের কাছে গিয়েও প্রতিকার পেলাম না। আমি তখন এতটাই হতাশ যে ভাবতে শুরু করেছি আত্মহত্যার সহজ উপায় কী হতে পারে।
একদিন বিকেলের কথা। মা বাড়ির ভিতর দিকে উঠোনে পাংশু মুখে কিছু একটা কাজে ব্যস্ত। আমার জন্য মায়ের সবসময় মনে হাহাকার। আর আমি ছিলাম ঘরে। শোকগ্রস্ত মুখে বসে বসে দেখছিলাম হাত কেমন অচল হয়ে যাচ্ছে। কিছুই আমার ভালো লাগেনা, পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ বিস্বাদ।
হঠাৎ শুনতে পেলাম কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখি বলাই একটা লাঠিতে ভর দিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই স্বাস্থ্যবান চেহারা আর নেই, পুরোপুরি বিধ্বস্ত শরীর। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
‘কিরে, কেমন আছিস ? হাতে জোর ফিরে পেয়েছিস ?’
আমি উত্তর দেওয়ার আগে মা চলে এল।
‘কিরে বলাই, ভালো আছিস ?’
‘আর আমার ভালো থাকা। আমি আর ভালো হবো না গো মাওইমা।’
বলাইরা সবাই অনেক বছর আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তার ইতিহাসটা বড়ই বিচিত্র। অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবেনা। ভাইরা সব বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর বলাই বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে কাছেই একটা বাড়ি কিনে থাকছিল। বছরখানেক আগে হঠাৎ সে কোমরে চোট পায়। ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়েছিল। সেই ডাল টানতে গিয়ে তার কোমরে লাগে। চোট আর সারে না কিছুতেই। অমন দশাসই জোয়ান তারপর এক বছরে এভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে।
পুরনো রাগজেদ এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মা বলাইকে স্নেহের গলায় ডাকে,
‘আয় বলাই, ঘরে এসো বস।’
‘না গো মাওইমা বসব না। বসতে পারিনা। যদিও বা বসি উঠতে খুব কষ্ট হয়।’
বলাই দাঁড়িয়েই থাকে লাঠিতে ভর দিয়ে। তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে মাকে বলে,
‘আমি শুনলাম ওর নাকি হাতে ব্যথা। লিখতে পারে না। আবার পরীক্ষাও কাছে। তাই এলাম। আমি তো আমার জন্য ডাক্তার-কবিরাজ কিছুই বাদ রাখিনি। কোনো ফল হলো না। তবে জিবি হাসপাতালের বড় সার্জেন একটা মলম দিয়েছিল। ওইটা মেখে কিছুটা উপকার পেয়েছি। মলমটা আমি ওর জন্য নিয়ে এসেছি মাওইমা। দুদিন মাখলেই দেখবেন সেরে যাবে। আমার তো বুড়ো হাড়, তাই পুরো সারছে না।’
বলতে বলতে বলাই তার কোমরে আটকানো লুঙ্গির খুঁট থেকে ওষুধটা মায়ের হাতে তুলে দিল আর বলল আমাকে,
‘চিন্তা করিস না, দেখবি ভালো হয়ে যাবি। আমি আশীর্বাদ করি।’
মা অভিভূত গলায় বলল,
‘তুইও ভালো হয়ে যা রে বলাই। তোর তো চেহারা খুব খারাপ হয়ে গেছে।’
বলাই অদ্ভুত নির্লিপ্ত স্বরে বলতে লাগল,
‘আমি আর ভালো হবো না গো মাওইমা। আমার শেষ ঘনিয়ে এসেছে। যা অন্যায় করেছি আপনাদের সঙ্গে তার ফল ভোগ করছি। তাই ওষুধটা দিতে এলাম, যদি ওর উপকার হয়। সারা জীবনের পাপ কিছুটা অন্তত তাতে হয়তো লাঘব হবে।’
অন্তত সাত বছর আগের বলাইয়ের সঙ্গে এই বলাইকে মিলিয়ে দেখছিলাম। ছাগল নিয়ে ঝগড়ায় বলাই সেদিন দিদিকে তেড়ে মারতে গিয়েছিল। সেই চেহারা এখন কোথায় ? এমন চারিত্রিক রূপান্তর জানতাম নাটকেই ঘটে।
সেই মলমটা সত্যিই আশ্চর্য উপকার দিয়েছিল। আমার হাতের কাঁপুনি আর অসাড় ভাবটা একেবারে সেরে গেল। ভালোমতোই পরীক্ষা দিয়েছিলাম। বলাই তারপর আর আসেনি। দেখিওনি তাকে আর কোনদিন। পরীক্ষার চাপে ব্যস্ত থাকায় তার খোঁজ করতে পারিনি। কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন খবর পেলাম, সে মারা গেছে।
হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আমার বলাইকে খুব মনে পড়ে। মানুষেরই রক্ত দেখার জন্য পাগল যে মানুষ সময়ে সেও কি টের পাবেনা তার একটা অন্য চেহারা আছে ? সেদিন কি তারও চোখে জল দেখা যাবে না মানুষের রক্ত ঝরিয়েছিল বলে ?
আজ মা-ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। চিরকাল মা বিশ্বাস করে এসেছে শুভশক্তির জয় অনিবার্য। জীবন থেকে অনেক কিছু আমার হারিয়ে গেছে। তবু মায়ের সেই বিশ্বাসকে আমি ফেলে দিতে পারি না। তেমনই বুঝতে পারি না মায়ের সেই বিশ্বাসের ক্ষমতা। সত্যিই তো, মা যা বিশ্বাস করত তা যেভাবেই হোক বাস্তবায়িত হয়েছে। এই লেখা যে লিখছি আমি তাও মায়ের ওই বিশ্বাসের জোর। তাহলে সত্যিই কিছু আছে পৃথিবীতে জ্ঞান দিয়েও মানুষ যা ব্যাখ্যা করতে পারে না। এই আশ্বাসটাই মা চলে যাওয়ার পরও আমাকে সজীব রাখে। আমারও বিশ্বাস করতে ভালো লাগে, মৃত্যু মানেই সব শেষ নয়। মৃত্যু আসলে মানুষের অজ্ঞতা। প্রতিভাস ম্যাগাজিন