সুদীপ ঘোষাল
লেখক প্রমথ চৌধুরী
জন্ম যশোর জেলায় ১৮৬৮ সালে। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রমথ চৌধুরী কলকাতার প্রখ্যাত স্কুল ও কলেজে শিক্ষিত ছিলেন। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন প্রগতিশীল লেখক এবং সাহিত্য আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
প্রমথ চৌধুরীর শিক্ষাজীবন ছিল অসাধারণ কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি কলকাতা হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এফ এ পাস করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে দর্শন শাস্ত্রে বিএ অনার্স এবং ১৮৯০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীতে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। পরে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলাত যান। বিলাত থেকে বার-অ্যাট-ল’ সম্পন্ন করে দেশে ফিরে এসে আইন পেশায় যোগদান করেন এবং পরবর্তী সময়ে আইনপেশা ছেড়ে কিছুকাল ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। তারপর সম্পূর্ণ ভাবে সাহিত্য রচনায় নিমগ্ন হন। ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘জগত্তারিণী পদক’ লাভ করেন।

প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে খ্যাতি অর্জন করেন তাঁর উপন্যাস, ছোট গল্প, নাটক এবং সমালোচনামূলক প্রবন্ধের জন্য। তাঁর লেখায় আধুনিকতার ছাপ এবং বাস্তবতার প্রতিফলন স্পষ্ট। তিনি সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি, বিশেষ করে মানব মন ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরতেন। প্রধান সাহিত্যকর্ম বাউল, প্রেমের চূড়ান্ত সীমা। ছোট গল্প ও উপন্যাসে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক সমস্যার গভীর বিশ্লেষণ দেখা যায়। তাঁর লেখায় বাংলা ভাষার প্রাঞ্জলতা ও জীবনমুখী চিন্তাভাবনা চোখে পড়ে
প্রমথ চৌধুরী ছিলেন সাহসী চিন্তাবিদ ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তি। তিনি সমাজের প্রথাগত বন্ধনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেন এবং নতুন ধারার সাহিত্য প্রচেষ্টায় সবসময় আগ্রহী ছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী প্রভাব রেখেছে। প্রমথ চৌধুরীর লেখায় আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও নাট্যলেখায় একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হয়। পরবর্তী প্রজন্মের লেখকরা তাঁর চিন্তা ও ধাঁচ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।
প্রমথনাথ চৌধুরী, বা প্রমথ চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেছিলেন একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে । ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য ও শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি শিক্ষাজীবনে তীক্ষ্ণ মনোযোগী ছিলেন এবং বই-পড়ার মাধ্যমে সমাজ, সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাঁর শিক্ষাজীবন এবং সাহিত্যপ্রবৃত্তি পরবর্তীতে তাঁর লেখনিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রমথ চৌধুরী ব্যারিস্টারি পাশ করে বিলেত থেকে কলকাতায় ফিরে এসে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে কিছুকাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পাশাপাশি তিনি ঠাকুর এস্টেটের ব্যবস্থাপক হিসেবে নিযুক্ত হন।
তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি জামাতা। রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কলকাতার খ্যাতিমান আইনজীবী ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরী সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর অগ্রজ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আরেক বড় ভাই হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা প্রতিভা দেবীর সাথে আশুতোষ চৌধুরীর বিবাহ হয়।
প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য তিনি বেশী বিখ্যাত। তাঁর প্রথম প্রবন্ধ জয়দেব প্রকাশিত হয় সাধনা পত্রিকায় ১৮৯৩ সালে।
তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম ছিল বীরবল। তাঁর সম্পাদিত সবুজ পত্র বাংলা সাহিত্যে চলতি ভাষারীতি প্রবর্তনে আগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তাঁর প্রবর্তিত গদ্যরীতিতে “সবুজ পত্র” নামে বিখ্যাত সাহিত্যপত্র বেশ প্রসিদ্ধ। তাঁরই নেতৃত্বে বাংলা সাহিত্যে নতুন গদ্যধারা সূচিত হয়। তিনি বাংলা সাহিত্যে ইতালিয় রূপবন্ধের সনেট লিখেছেন। এছাড়াও তিনি বিশ্বভারতী পত্রিকার সম্পাদনা করেন। প্রমথ চৌধুরী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন নবপ্রবর্তক। তিনি ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রমথ চৌধুরী বাংলা ছোটগল্পে মানব মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম চিত্রায়ণ করেছেন। তাঁর ছোটগল্পগুলোতে দরিদ্র ও ধনী, সামাজিক বিভাজন, মানসিক দ্বন্দ্বের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। তিনি সমাজচেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে উপন্যাস রচনা করেছেন। সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে সমাজের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন। সাংবাদিকতা তাঁর সমাজচেতনা ও বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আরও মজবুত করেছে।
প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে আধুনিক ছোটগল্প ও সমাজচেতনামূলক রচনার একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত। তাঁর লেখা গল্প ও উপন্যাস শিক্ষার্থীদের জন্য সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
