রক্তিম ভট্টাচার্য

সেই কথাটা

দোয়েল আমাকে কথাটা বলেনি। কিছুতেই বলেনি। নির্ঝরকে দিয়ে অনেকবার খোঁচানোর চেষ্টা করেছি। আমি নিজেও ইনিয়েবিনিয়ে কথাটা পাড়ার চেষ্টা করেছি বহুবার। কিন্তু লাভের গুড়ে লবডঙ্কা। হয় এড়িয়ে গেছে, নয় নাটমেগ ক’রে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমি আঁচ পাইনি। একফোঁটাও আঁচ পাইনি। দোয়েল কথাটা কোনওভাবেই বলেনি।

এই কথাটা

সিঁড়ির মুখে এমনভাবে ধাক্কা লাগায় স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। ফুটো কপালে চাঁদের আলো যেটুকু ছিল, সব এবার জলাঞ্জলি। কোনোমতে ব্যাগটা তুলে আমতা আমতা “সরি” ছুঁড়ে সরিয়ে দৌড় লাগালাম একতলার দিকে। বুঝতেই পারলাম বিরক্ত, হতচকিত একজোড়া নীল-চোখ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আমার এই বেসামাল অবস্থা দেখে। ও আর ভেবে লাভ নেই। তাড়াহুড়োয় ব্যাপারটা যে বিশ বিশ ক’রে চল্লিশ বাঁও জলে ফেলে দিয়েছি, বুঝতেই পারছি। অয়নাভ আজ আর আমায় ছাড়বে না কিছুতেই।

কথা শুরু

– “ছিঃ। একটা মেয়েকে প্রোপোজ করতে এত লজ্জা? ভবিষ্যতে বিয়েটাও কি অন্য কাউকে দিয়ে করাবি নাকি?”

একটা অত্যন্ত বিরক্তিসূচক মুখ ক’রে আমাকে মাসতিনেক আগে কথাটা বলেছিল নির্ঝর। আমি খরগোশের মতো পিটপিট ক’রে বোঝার চেষ্টা করছিলাম সিচুয়েশনটা। রুয়াকে, মানে ফিলোজফির সেকেন্ড ইয়ারের ওই ক্যাটরিনা ফিগারের মেয়েটাকে আমার, মানে, রঞ্জিত মল্লিকের মতো দাদাসুলভ ঘরানার এই রঙ্গিত ভট্টাচার্যের পছন্দ, এটা সর্বজন না হলেও মোটামুটি তিনশোজনবিদিত তো বটেই। অন্তত আমাদের দু’জনের ডিপার্টমেন্টের সবাই তো জানেই।

রুয়াও যে জানে না তা নয়, কিন্তু ওই! চিরাচরিত নেগেশনের পাঁচালি। হ্যাঁ নেগেশন, নেগোশিয়েশন নয়। ডায়রেক্ট নেগেশন। কারণ অয়নাভকে দিয়ে কথাটা আমি একবার বলতে পাঠিয়েছিলাম ওর কাছে। অয়নাভ বাংলার পাঁচের মতো মুখ ক’রে প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল বাধ্য ছেলের মতো। কিন্তু কেসটা হয়েছিল উলটপুরাণ। রুয়া ভেবেছিল অয়নাভ নিজের কথাই বলতে গিয়েছিল। হনুমানকে মানুষের আগে চোখে পড়ে, পেছনের রামটাকে ঠিক ঠাহর করতে অসুবিধা হয়। রুয়া সারা কলেজের হৃদয় ভেঙে এক-কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল।

শুকিয়ে যাওয়া পাঁউরুটির মতো দূর থেকে দেখেছিলাম আঙুলে আঙুলে এক্কাদোক্কা খেলতে খেলতে ওরা যাচ্ছে নন্দন, কলেজ স্ট্রিট, ভিক্টোরিয়া, প্রিন্সেপ। দেখে দূর থেকে হাত শুকশুক করত, কিন্তু কী আর বলব! ফুটো কপালে চাঁদের হাসি বাঁধ ভাঙার স্বপ্ন দেখার বদলে হাতুড়ির দম-পেটানো আওয়াজ শুনতে হতো।

নির্ঝরের সে-দিনের ঝোড়ো ইন্সপিরেশনে চার্জড আপ হয়ে বুক ফুলিয়ে সিক্স প্যাক করে ফেলেছিলাম। নির্ঝর এক নম্বরের সেয়ানা ছেলে। পুরো অক্সিজেনের মতো অনুঘটক। সবাইকে জ্বালাবে, জ্বলাবে। নিজে জ্বলবে না কিছুতেই। প্রেম-ফেমের মতো মেকি ব্যাপার নাকি ওর পোষায় না। ওসব নাকি গ্যালারি থেকে দেখতেই ভালো, ক্রিজে যাওয়া মানেই হিট উইকেট। তো গরীবের লাভগুরুর এ-গ্রেড ইন্সপিরেশনের টনিক খেয়েই সিধে ঠিক করেছিলাম, রুয়াকে আজ কথাটা বলেই ছাড়ব। হোক অয়নাভর গার্লফ্রেন্ড। প্রেম হল ফুটবল, গোলকিপার থাকলেও গোল করতে হবে তোমায়।

কিন্তু তখনই আরেকটা ধাক্কা। সোশিওলজির এই মেয়েটাকে প্রথম দিন থেকে দেখেছি, অত্যন্ত শান্ত, চুপচাপ মেয়ে। আমাদের এক ক্লাস জুনিয়র, কিন্তু এতটাই পার্সোনালিটি, যে কথা বলতে গেলে দুবার চেটো চুলকোতে হবেই। আমার যাবার পথের সামনে হঠাৎই এসে গিয়েছিল মৌসুমী বায়ুর মতো। খানিকটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। পরক্ষণেই সামলে নিয়েছিলাম প্রতিবর্ত ক্রিয়ায়।

– তুমি রঙ্গিতদা তো? ইংলিশ অনার্সের?

– হ্যাঁ মানে, হ্যাঁ তো… থমকে তুতলে গিয়েছিলাম আমি।

– তোমার সঙ্গে একটা গোপন কথা ছিল। খুব পার্সোনাল। একটু আলাদা ক’রে মিট করতে পারবে?

এই বয়সের মেয়েরা নিজে থেকে পার্সোনালি মিট ক’রে কী বলতে চাইবে এটা বহু নামী এবং দামী লেখকের গপ্প-উপন্যাসে টেক্সট বুকের মতো ব্যাখ্যা করা আছে। কিন্তু লেখকের কল্পনা আর বাস্তব পুরো লন্ডন আর লন্ঠন। তাই ব্যাপারটা ধাতস্থ করতে একটু সময় নিয়েছিলাম।

এমন সময় পেছনে ধাক্কা। চকিতে হাফ টার্নে ঘুরলাম। অয়নাভ দাঁড়িয়ে।

  • “কী হে রঙ্গিতকুমার? কী কথা হচ্ছিল রাজকুমারীর সঙ্গে?”

গোলাপী টপ আর নেভি ব্লু জিনস-পরা মেয়ে কোন্ দেশের রাজকুমারীর পোশাক ছিল — ভাবনাটা শুরু করব জাস্ট, আবার তাল কাটল অয়নাভ।

  • “জানিস ভাই, আজ একেবারে চম্পক ব্যাপার। এতটা হবে আমি ভাবতে পারিনি।”

আমি চুপ ক’রে রইলাম। রুয়ার ব্যাপারে কিছু শুনতে আমার ভালো লাগে না। ভালো খারাপ মাঝারি কিচ্ছু না। শুধু জানি, ওটা একটা ইনফ্যাচুয়েশন। সবার হয় পৃথিবীতে এই বয়সে। বরং না-হলেই ট্রেনের কামরায় গায়ে গায়ে লাগানো সবুজ-হলুদ বিজ্ঞাপনগুলো সিরিয়াস লাগতে শুরু করে।

কিন্তু অয়নাভ এসব কথা চেপে রাখতে পারে না। আগেরদিন কে ক’টা চুমু খেয়েছিল, ইন-ডিটেইল ব্যাখ্যা করেছিল। আমাদের লাভগুরু নির্ঝরও বেশ বিরক্ত হয়েছিল। আজকেও শুরু করল, “আরে সবে পন্টাইদের বাড়ির পেছনের ওই পোড়ো বাগানটায় বসেছি, ও হঠাৎ লটকে পড়ল আমার কোলে। আমি তো পুরো থ। জানিস শালা, পড়ে গিয়ে উঠল না কিন্তু। একদৃষ্টে চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর তো আমি ঝুঁকে প’ড়ে…”

– “ব্যাস ব্যাস ঠিক আছে থাম”। হাত তুলে থামালো নির্ঝর, “বাকিটা বুঝে নিয়েছি আমরা, এসব সিনেমা বহু দেখে ফেলেছি”।

– “হুঁ হুঁ বুঝেছি চাঁদ, ফিলিং জেলাস”।

হুহ, আমার বয়ে গেছে জেলাস হতে। ভারী তো চুমু, ও আমিও খেতে পারি। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিলাম। অয়নাভ তারপর আমাকে যেন খানিকটা থ্রেট দিয়েই বলল, “তা এই যে রঙ্গিতকুমার। তোমার রঙ্গিলাপোনাটা একটু নিজের মধ্যে রেখো। রুয়ার দিকে যদি চোখ যায় না…”, আমি তীরের মতো ঘুরেছিলাম ওর দিকে। কিন্তু ওর লালাভ চোখদুটো দেখে কিছু বলতে পারিনি। নির্ঝরও কেমন ব্যোমকে গিয়েছিল এই কথায়। তারপর “এনিওয়ে, বাই নাও” বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গিয়েছিল। আমিও নির্ঝরকে বলেছিলাম, “আর না ভাই। বাঁদরের গলায় মুক্তোর হারটা ভালো দেখায় না। এসব আর নয়। বরং দেখি, দোয়েল কী বলে।”

হ্যাঁ, দোয়েল। ওই গোলাপী টপ আর নেভি ব্লু জিনস-পরা রাজকুমারীর নাম দোয়েল।

আবার সেই কথাটা

কিন্তু সে-দিন কেন, দোয়েল কথাটা আমায় আর কোনওদিনই বলেনি। কী জানি কেন, এমন আচরণ করেছে যেন এরকম কিছু বলার কথা ওর কোনোদিনই ছিল না। আমি মনে করানোর চেষ্টা করেছিলাম প্রথম-প্রথম খুচরোভাবে, কিন্তু দোয়েল তার ধার-কাছও মাড়ায়নি। আমিও এক-প্রকার ভুলতে শুরু করেছিলাম। হয়তো এটাই হয়, সবাই-ই হয়তো যা চায় বলতে পারে না, অথবা সাময়িক উত্তেজনাবশত বলতে চাইলেও আমেজ কেটে গেলে বলার ইচ্ছে চলে যায়‌। তখন আর কথাটা মনেই পড়ে না।

এই কথাটার আগের কথা

কিন্তু আজ অয়নাভ শিওর ক্যালাবে আমায়। কারণ, ধাক্কার সময় ময়ূখ ছিল কাছেই। ও নিশ্চয়ই দেখেছে যে, রুয়ার সঙ্গে আমার কোলিশনটা নেহাত দৈব-দুর্বিপাক নয়। প্রচ্ছন্ন চক্রান্ত করেই এটা ঘটানো হয়েছে। আর অপ্রস্তুতভাব, সরি – ওগুলোর অভিনয়টা যে খুব একটা পোক্ত হয়নি সে তো আমি নিজেই বুঝেছি। শালা, নির্ঝরটা একটা গা.. গাধা। নিজের মনেই সামলে নিলাম। কারণ এরকম ফ্রয়েডিয়ান স্লিপ অস্থানে, অকালে, অচরিত্রে হয়ে গেলে কেলো টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি।

আসলে কেসটা হয়েছিল কী, সে-দিন আর নয় আর নয় ক’রে নানা দার্শনিক তত্ত্ব মনে জড়ো করলেও মন আর কবে বুড়ো-হাবড়া ফিলোজফারদের কথা শুনেছে? উপরন্তু, ফিলোজফিটা যখন ওদের ক্লাসেই প’ড়ে আছে? নাহ, রুয়াকে আমি ভুলিনি। একদমই ভুলিনি। বরং আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছি। অবশ্যই কল্পনায়। বাস্তবে হলে অয়নাভ এতক্ষণে আমায় পেঁদিয়ে পাশবালিশ করে দিতো। রুয়াও নিশ্চয়ই ছেড়ে দিত না খালি হাতে। কিন্তু উড়তে তো বাধা নেই। তো সেই ওড়ার আনন্দেই দিব্যি উড়ছিলাম। দোয়েলের সেই না-বলা কথার বুড়বুড়িটা বিদায় ক’রে দিয়েছিলাম পুরোপুরি। নতুন ক’রে মনোবল জোগাচ্ছিলাম, আর চিরন্তন নিয়মে পৃষ্ঠপোষক হয়ে এসেছিল নির্ঝর। আমিও বেশ ভালোমতোই তৈরি হচ্ছিলাম। কিন্তু অয়নাভটা এত আঠার মতো সেঁটে থাকে!

কিন্তু ফাঁক পেতে দেরী হল না। বুধবার সাড়ে চারটেয় রুয়াদের ক্লাস শেষ হয়। অয়নাভ-র তখন একটা প্রোজেক্ট সই করানোর ছিল। রুয়া নিশ্চয়ই এ ব্লকের কাছে ওর জন্য ওয়েট করবে। এই ভেবেই প্ল্যানটা সাজিয়েছিল নির্ঝর। আমি, যেন খুব তাড়া, এমনভাবে সিঁড়ি দিয়ে উঠি। রুয়াও নামবে সেই সময়। একটা হালকা পায়ের ধাক্কায় রুয়াকে ডিসব্যালেন্স করে দিতে হবে; যেন সামনের দিকে পড়ে যায়। আর আমি ঠিক সেই সময়ই ওকে ধরব দু-হাতে। যেভাবে খুশি। বেশ কিছুক্ষণ। মানে, সোজা কথায় বাজারচলতি রদ্দি লাভ স্টোরির সিকোয়েন্স। এইটটিজ-এর থিম এখনও কাজ করবে কিনা একটু সন্দেহ মনে ছিল। তবুও, ওল্ড ইজ গোল্ড। এগিয়ে গিয়েছিলাম।

কিন্তু কেসটা ঘুরে এতটাই ঘেঁটে গিয়েছিল যে, আমার র‍্যামোসসুলভ ল্যাং খেয়ে চশমাটা পুরো ছিটকে পড়েছিল সামনে, আর রুয়া রেলিংটা কোনওমতে ধরে ফেলেছিল। আমি আর দাঁড়ানোর কোনো চেষ্টাই করিনি। পুরো প্ল্যানটাকে ঝুলিয়ে ঝুলবারান্দা ক’রে কেটে পড়েছিলাম অকুস্থল থেকে। যেন ওর নীল-চোখের ফলো-থ্রুর ফোকাসের বাইরে যাওয়াই পৃথিবীতে আমার এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য।

বায়োলজি বিল্ডিংটা পেরিয়ে এসে থামতেই যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটাই হলো। মূর্তিমান বসে রয়েছে করিডোরে। হাতে প্রোজেক্টের খাতা। গেরিলাবাহিনীর মতো পা টিপে টিপে এগোলাম। কিন্তু… এ কী! অয়নাভ সম্পূর্ণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমায় দেখে শুকনো স্বরে বলল, “আয় রঙ্গিত বোস। একটা কথা আছে”।

একটু ভেবড়ে গেলাম। নাহ, যে ভয়টা পেয়েছিলাম সেটা নয়। অন্য কোনো ভয়ের কথা নিশ্চয়ই। পাশে বসে বললাম, “হ্যাঁ বল।“ একটা হলকা বয়ে যাচ্ছিল যেন ওর শিরায়। জ্বর এসেছে নাকি? কপালটা একবার দেখলাম। ও হঠাৎ আমার হাতটা ধরে কেমন একটা ন’ড়ে উঠল। তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। এইসব সিচুয়েশন আমার লাইফে একদমই ডেবিউ। নির্ঝরটা যে শালা কোথায় গেল! আমি আউট অফ সিলেবাস কোশ্চেনে উত্তর দেওয়ার মতোই ওকে ধরলাম। সিনেমায় দেখেছি, মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে হয় এমন সময়। রিল থেকে রিয়েল টুকতে শুরু করলাম। প্রায় মিনিটচারেক পর নিজেকে একটু সামলে আমার দিকে ঝাপসা চোখে তাকাল অয়নাভ। তারপর বলল…

আর কথা নেই

মিলেনিয়াম পার্কের একটা কদমগাছের নীচে বেঞ্চে বসে আছি আমি। ক্লান্ত লাগছে বড্ড। কানের পাশে একটা বাদামী রঙের প্রজাপতি ঘুরছে অনেকক্ষণ থেকে। নির্ঝরও চেয়ে আছে ওপারের দিকে। মাঝের জলটা কতটা গভীর সেটাই মাপছিল হয়তো ওর চোখ। আমি ওর চোখের গভীরতা মাপতে পারছিলাম না। একটা গুঁড়ো হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীরবতা ভেঙে বললাম, “একবার বলতে পারতিস তো আমায়”।

একবার মুখ বুলিয়ে হাওয়াটা মেখে নিল বোধ হয় নির্ঝর। তারপর বলল, “আমিও জানতাম না রে। জানলে তোকেই সবার আগে বলতাম। কিন্তু… এমনসময়ে জানলাম, অয়নাভ জেনে গেল। তারপর তোকে আলাদা করে বলার মুখ ছিল না আর”। আমি খানিকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম প্রজাপতিটার দিকে। ওর ছটফটানিতে একটু সান্ত্বনা মেশানোর চেষ্টা করলাম।

আসলে পুরো ব্যাপারটাই আমাদের তিনজনকে এতটা নাড়া দিয়ে গেছে, যে আমরা পুরো আপনভোলা নাগরদোলা হয়ে গেছি। সেদিন রুয়ার সঙ্গে দেখা করতে সকালেই পন্টাইদের বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত বাগানটায় গিয়েছিল অয়নাভ। তার আগের ক’দিনের সামান্য শরীরী ছোঁয়ায় ও একটু বেশিই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে-দিন পৌঁছে যা দেখেছিল, সেটা অনুধাবন ক’রে তুলে মাথায় ঢোকাতে ক্রেন লাগতো বোধ হয়। বোগেনভিলিয়ার ঝাড়ের পাশে ছড়িয়ে আছে দুটো শরীর। অত্যন্ত সক্রিয় দুটো শরীর। যেন একটা আরেকটাকে আত্মস্থ করছে শুষতে শুষতে। একটা মুখ ওদেরই ক্লাসের মেহুলের, সেটা আগেই দেখেছিল, দ্বিতীয় শরীরটা ওর তলপেট থেকে মুখ তুলতেই নিথর হয়ে যায় অয়নাভ। উন্মত্তের মতো সর্পিল গতিতে মেহুলকে বেয়ে উঠছে, আবার পিছলে নেমে আসছে। রুয়া!

অয়নাভ আর দাঁড়ায়নি। পা-দুটো না চলতে চাইলেও শরীরটা দিয়ে ঝাঁকিয়ে টেনে টেনে ঝোড়ো কাকের মতো ফিরে যেতে গিয়ে বাগানের গেটের কাছে আটকে গিয়েছিল। দোয়েল! সেই গোলাপী টপ আর নেভি ব্লু জিনস-পরা রাজকুমারী। দোয়েলের চোখে কী যেন একটা ছিল।

ও অয়নাভকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এসেছিল বাইরে। তারপর উপসংহার টেনেছিল, “রুয়াদিকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। রাসবিহারীতে আমাদের আবাসনেই থাকতো। ওখানে আমার সঙ্গে অনেকবার ট্রাই করেছিল। খুব ছড়িয়ে পড়েছিল কেস। তারপর থেকেই ওরা উঠে যায় নর্থের দিকে। মেহুলদিও আমাদের আবাসনেই থাকতো। প্রথমে স্বীকার না-করলেও পরে জানা যায়, মেহুলদির সঙ্গেই রুয়াদি…। তারপর মেহুলদি-দেরও উঠে যেতে হয়। আমি প্রথমেই তোমার ওই বন্ধু রঙ্গিতদাকে দিয়ে বলিয়ে সাবধান করব ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, সেও প্রেমে পড়েছে রুয়াদির। তাই আর বলতে পারিনি। কিন্তু, নির্ঝরদা যে মেহুলদিকে ভালোবাসতো আমি সত্যি জানতাম না বিশ্বাস করো, না হলে নির্ঝরদাকেও কেসটা বলতাম না। তোমাকে হয়তো বলত, কিন্তু তার আগেই! বাট প্লিজ, তুমি ভুল বুঝো না আমায়”।

বলে চলে গিয়েছিল দোয়েল। যেভাবে এসেছিল হঠাৎ, সেভাবেই। দমকা হাওয়ায়। মৌসুমী বায়ু এরকমই হয়, ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায়। অপেক্ষা করে না। অয়নাভ অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল ওর চলে যাওয়ার দিকে। তারপর নিয়ম-মতো বাস্তবে ফিরে চলে গিয়েছিল ক্লাসে। রুয়ারাও চলে এসেছিল ক্লাসে শরীরী সাইক্লোন শান্ত করেই। তারপরের ঘটনা আমাদের সকলের জানা।

শেষ কথাটার পরে

আমি কোনও কথা বললাম না। দূরে নৌকোগুলোর দিকে চেয়ে রইলাম একদৃষ্টে। নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের পথচলা আঁকছিল নিবিষ্ট মনে। অয়নাভর ধুম জ্বর। হয়তো বিছানায় শুয়ে শুয়ে সাহারীয় ক্যাকটাসের কাঁটা গুনছে। আর দোয়েল! দোয়েল বোধ হয় তারপর হারিয়ে গিয়েছিল। কারণ, ওকে এরপর আর কখনও খুঁজে পাইনি। মানে, সেই দোয়েলপাখির উত্তেজনায় আর খুঁজে পাইনি। সেদিন দোয়েল কি শুধু এটাই বলবে বলে ডেকেছিল আমায়?  শুধুই কি একটা সমাজ-নির্ধারিত নিষিদ্ধ প্রেমের ভেতরের কথা বলার জন্য কুয়াশার মতো তাকাত আমার দিকে? নাকি আরো কোনও…

আমার জানা হয়নি আর। আর একটা খটকাও মন‌ থেকে সরেনি। অয়নাভ কেন? মানে, রুয়া কি অয়নাভকে তুরুপের ইস্কাপন ঠাওরেছিল? যাতে ওর এই মেহুলের সঙ্গে কেসটা পুরো অধরাই থেকে যায়? নাকি, আরো অন্যরকম কিছু? অয়নাভ বা নির্ঝর এ-ব্যাপারে আর না উৎসাহ দেখালেও আমার জানার চেষ্টা থামেনি। দোয়েল হয়তো জানত। কিন্তু দোয়েল আমাকে কথাটা বলেনি। কিছুতেই বলেনি। কারণ, দোয়েল আর কখনোই আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি। আমার সঙ্গেও বলেনি, নির্ঝরের সঙ্গেও বলেনি, অয়নাভর সঙ্গেও বলেনি। কেন বলেনি? সেটাও বলেনি। শুধু ঘূর্ণিঝড়ে তোলপাড় হয়ে যাওয়া তিনটে জাহাজের মাস্তুলকে একাকী বন্দরে দাঁড় করিয়ে রেখে হারিয়ে গিয়েছিল।  হয়তো, কোনও দক্ষ নাবিকের খোঁজে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *