তাপস সরকার
লেখক পরিচিতি
( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। )
অধ্যায়: আঠেরো
এতসব জটিলতার প্রবাহ বিদ্যমান চতুর্দিকে, একটিমাত্র জীবনে এ সকল সামলানো কি মুখের কথা? আমার আর কিছুই ভালো লাগে না। কিবা করি, কোথায় যাই? সর্বসময় মনে হতে থাকে, কী যেন একটা উৎকণ্ঠা হয়ে গলায় আটকে আছে, তাকে না পারি গিলে ফেলতে না পারি উগরে দিতে। কখন যে কী হয়ে যাব, কিভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটাব তার না জানি আগাম সংকেত না জানি বিশদ ব্যাখ্যা। আমার রং পাল্টে যায় ঘন ঘন, আমি অসহায় হয়ে সহ্য করি। আটকাতে পারি না এমন বেয়াক্কেলে চারিত্রিক স্খলন। কী যে বলি আর কী যে খাই বোঝার কি সাধ্যি আছে? জঠরে অনলের দহন, তার উত্তাপে অতীত ভস্মীভূত, কখন যে তারই তাড়নায় বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ গিলে বসে থাকব কে জানে। কোথায় আমার অবস্থান, শৈশবে না যৌবনে না বার্ধক্যে, তার হিসেব মিলবে কার কাছে? কোন স্থায়ী ঠিকানায় থাকতে পারছি না। আস্থা খুঁজে পাব কোথায়? আমি কোন্ ব্যক্তি, পুরুষ না মহিলা, রাজা কিংবা প্রজা, তারওতো কোন নিশ্চয়তা নেই। মানুষ না অন্য প্রাণি নাকি কীটপতঙ্গ, তাও কি সঠিক জানি? সর্বাঙ্গ জুড়ে এমনই শতাধিক অসুখ আমাকে দিবারাত্র কাবু করে রেখেছে। তার ওপর, নিত্যদিন যাদের দেখা পাচ্ছি তারাও যে কেউ সুস্থ এমন মনে হচ্ছে না। রিক্ত যাদের বলে ঠিক মানুষ তারা কে বা কোথায় থাকে হদিশ মেলেনি আজও। আমাকে দেখি পরিবেষ্টন করে আছে ব্যাপক শূন্যতা। আমি খাবি খেতে খেতে ঘর ছেড়ে বাড়ির ছাদে উঠে এলাম। পরিষ্কার দিন, কোথাও কোনো মালিন্য নেই। ওদিকে নকুলেশ্বর দেখি তার বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে মনের সুখে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। কোথাও তেমন হওয়ার দাপট নেই, অথচ ঘুড়িটা লাট খাচ্ছিল ক্রমাগত। উড়ছে না আকাশে, উল্টেপাল্টে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড পাকাচ্ছে। ঘুড়িটার হল কী, ভাবছিলাম। এমন দামাল কেন? তখন মাথায় উদয় হল, ঘুড়ির মনের অশান্তির প্রকাশ এই ওলট-পালট পাগলামি। অকারণে এমন অশান্ত হবে কেন? কোথাও ঝড় নেই, ঝঞ্ঝা নেই, ভূমিকম্প নেই, ঘুড়ি এত লাট-বেলাট খাবে কেন?
ওদিকে অন্য বাড়ির ছাদে কুঞ্জবিহারীকে দেখতে পেলাম। ওটা অবশ্য তারই নিজস্ব বাড়ির ছাদ। নিজের ছাদে নিজে ঘুরে বেড়াবে তাতে কার কী আপত্তি করার আছে? ব্যাপারটা হল, তার ছাদে বিশাল এক প্যান্ডেল তৈরি করছিল ডেকোরেটরের লোকজন আর কুঞ্জবিহারী এক হাত কোমরে রেখে ও অন্য হাত ক্রমাগত নেড়ে অনর্গল কথা বলে তদারকি করছিল। তাতেও আপত্তির কিছু নেই। কেউ নিজের ছাদে অস্থায়ী প্যান্ডেল বানালে কে কী বলবে? কর্পোরেশনের লোকজনও এসে জিজ্ঞেস করবে না প্যান্ডেল বানাবার জন্য সে প্ল্যান স্যাংশন করিয়েছে কিনা। বড়জোর দমকলের লোকজন এসে কিছু প্রশ্ন তুলতে পারে, যদিও তার সম্ভাবনা খুবই কম। ঘটনা হল এই যে কুঞ্জবিহারী তার বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল বানাচ্ছে ছেলের বিয়ে দেবে বলে। তাতেও আপত্তিকর কিছু খুঁজে না পেয়ে আমি অন্যদিকে তাকিয়ে দেখলাম কমলকিশোর তার বাড়ির ছাদে স্বপরিবারে ব্যায়ামচর্চা করছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত। এদের মধ্যে দুটি মনুষ্যতের প্রাণিও আছে। সদস্যদের বিবরণ হচ্ছে এরকম—- কমলকিশোর, তার বাবা, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে এবং একটি কুকুর ও একটি বেড়াল। সপরিবার বলতে এই সাতটি প্রাণিকেই বোঝাচ্ছে। ব্যায়াম করছিল সবাই খোলা ছাদে, কুকুর এবং বেড়ালটিও। কুকুর আর বেড়াল কিভাবে ব্যায়াম করে বলে বোঝাতে পারব না, স্বচক্ষে না দেখলে আমিও বুঝতে পারতাম না। ব্যাপারটা দেখে আশ্চর্যান্বিত হব নাকি ভয় পাব ঠিক করে উঠতে না উঠতেই চোখ গেল কালীকিংকরের বাড়ির ছাদে। সেখানে খোল-করতাল বাজিয়ে এক দঙ্গল ভক্তকুল নিয়ে কালীকিংকর কীর্তনের আসর বসিয়েছে। নামাবলী গায়ে লোকগুলি নেচেকুঁদে জগঝম্প কান্ড পাকিয়ে দিয়েছে। প্রাণের উল্লাস তাদের এমনই উচ্চসীমায় চলে গেছে যে কোন দিকে আর ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ যখন কিছু বলছে না আমি আর কেন বিরক্ত হব? হোক গে যা খুশি হল্লাচিল্লা, কী যায় আসে আমার? ভেবে অন্যদিকে চোখ ফেলে নজরে এল গজেন্দ্রগতির বাড়ির ছাদ। সেখানে আরেক বিতর্কিত দৃশ্য। গজেন্দ্রগতি কোত্থেকে এক পাল বাঁদর জুটিয়ে এনে বাড়ির ছাদে কিষ্কিন্ধা কান্ড বাঁধিয়ে বসেছে। কেউ যে নিজের বাড়ির ছাদে পালে পালে বাঁদর সাদরে ডেকে এনে স্বেচ্ছায় উৎপাত সৃষ্টি করে আনন্দ পেতে পারে গজেন্দ্রগতিকে না দেখলে বিশ্বাস করতেই পারতাম না। আমার কী করা উচিত ভাবতে ভাবতে এদিক-ওদিক তাকাতে গিয়ে চোখে পড়ল গোপীরঞ্জনের বাড়ির ছাদ। সেখানে সে বাড়ির অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে শুরু করেছে। গোপীরঞ্জনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিল, কারণ একইসঙ্গে সে গোলকীপার এবং স্ট্রাইকারের জায়গায় খেলতে গিয়ে গোলে শট নিচ্ছে আর গোল বাঁচাচ্ছে। এভাবে আদ্যোপান্ত গোলমাল পাকিয়ে আবার রেফারি হয়ে নিজেকেই নিজে লাল কার্ড দেখাচ্ছে। নিজের বাড়ির ছাদ বলে সদলবলে সে ফুটবল খেলবে এটা কতটা কাম্য? প্রশ্নটার কোন সদুত্তর ছিল না আমার কাছে। আমি নিরুপায় হয়ে অন্য এক ছাদের দিকে তাকালাম। ওটা কনিষ্ককান্তির বাড়ি। ছাদে তাকে হাজির দেখা গেল। সে কি একা? তার সঙ্গে একটা হাতিও দেখতে পেলাম। হাতি মানে হাতি, একটা প্রমাণ আকৃতির আসল হাতি। ছাদময় সেই হাতির সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছে কনিষ্ককান্তি। ব্যাপারটা অদ্ভুত না স্বাভাবিক ভেবে কোন কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। অত বড় একটা হাতি অত উঁচু বাড়ির ছাদে কী করে গিয়ে হাজির হল? ছাদে ওঠার সিঁড়ি মানুষের জন্য, সেই সিঁড়ি ধরে কি একটা জলজ্যান্ত হাতি লোকের বাড়ির ছাদে উঠে যেতে পারে? মাপামাপি করে না দেখলেও ব্যাপারটা অসম্ভব বলেই মনে হল। হাতির গায়ে পাথাও নেই কোন যে উড়ে ছাদে চলে যাবে। ছাদে উঠল কী করে হাতিটা? কনিষ্ককান্তিকে ডেকে জিজ্ঞেস করারও উপায় ছিল না। তখন বাধ্য হয়ে অন্যদিকে চোখ ফেললাম আর দেখলাম কন্দর্পকিশোর তার বাড়ির ছাদে মনের আনন্দে ধানচাষ করে বেড়াচ্ছে। বাড়ির ছাদ কি ধানচাষ করার জন্য? ধানচাষে কীটনাশক দিতে হয়, জলসেচেরও প্রয়োজন আছে। ছাদের ওপর সেসব আয়োজন করা খুব একটা সহজ কি? এসব হিতকথা কন্দর্পকিশোরকে কে বোঝায়?
প্রত্যেকেরই বাড়ির ছাদে এমনই সব খাপছাড়া কর্মকাণ্ড। এতসব বেসামাল কার্যকলাপের কোনোটার সঙ্গেই কোনোটার যোগাযোগ নেই। যেদিকে চোখ যাচ্ছিল সেদিকেই একাধিক বাড়ির ছাদ আর প্রত্যেকটি ছাদেই বাড়ির মালিক কোন না কোন বিচিত্র কাজে মগ্ন। ছাদ মানুষের বিচরণক্ষেত্র এবং প্রত্যেকেই তার বাড়ির ছাদে একশবার তার প্রাণ যা চায় করতে পারে। ঘরের ভিতরে যে যা করছে তা অন্য কেউ জানতে পারে না, কিন্তু বাড়ির সর্বোচ্চ তলার খোলা ছাদে যে যা করে তা খোলামেলা হয়ে যায়। কেউ তাকিয়ে দেখল কি দেখল না তা ভিন্ন ব্যাপার, ইচ্ছে করলেই যে কেউ অন্যের ছাদে কী ঘটছে দেখলে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। আমি যেমন দেখছি সমস্ত ছাদ তেমনি অন্যরাও দেখতে পারে আমার বেলায়। ছাদ ব্যক্তিগত সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও সবার কাছে উন্মুক্ত দেখার জন্য।
ছাদে এলে মানুষের চরিত্র পাল্টে যায়, তবুও তার আসল রূপ অগোচরে থাকে না। কেউ যদি তার ছাদ থেকে অন্য বাড়ির ছাদগুলি দেখে তো দেখতে পাবে বাড়ির মালিকদের কার্যকলাপ, যদিও তারা সেসময় ঘরের ভিতর অথবা বাড়ির বাইরে থাকতেই পারে। অবশ্য যদি তার ইচ্ছে থাকে। অধিকাংশ ব্যক্তির সেই ইচ্ছেটাই থাকে না আর তারা জানেও না ছাদ কী রহস্যের আধার। ছাদে এলে উন্মুক্ত আকাশ আর খোলা বাতাস। তাতে মানুষের মন আর চোখ দুটোই খুলে যায়। বিশেষত, শহুরে উপাদান যে স্থানগুলিতে রয়েছে সেখানে বাড়িতে বাড়িতে আর পথেঘাটে জটিল মানসিকতার শিকার সবাই। তারা সবাই আমারই মতো ঘন ঘন রং পাল্টায়, যখন তখন যেকোন রূপ ধারণ করে, যেখানে সেখানে উপস্থিত থাকে যেকোন সময়, যা খুশি তাই বলে যা প্রাণ চায়, সকল বস্তু গিলে খেতে খেতে নিজেদের ভবিষ্যৎটাকেও খেয়ে ফেলে একসময়। এ সমস্ত জীবরা সবাই মানুষ কিন্তু অন্তরে সবাই আমারই মত বিচিত্র ওইসব অসুখে আক্রান্ত, বাইরে দেখতে সর্বতোভাবে মনুষ্যাকার এইসব প্রাণির দল কেউ ভিনগ্রহী নয়, সবাই এই পৃথিবীর বাসিন্দা এবং এদের নিয়েই গঠিত ও সুসজ্জিত হয়েছে মানবসমাজ। হলেও ভিতরে আমরা কেউই ঠিক মানুষ নই। এই দেখতে মানুষ-মানুষ ব্যক্তিবর্গ কোন্ মানুষ হিসেবে গণ্য হয় বা জীবনধারণ করে চতুষ্পার্শ্বে বিরাজ করে তা জানা যায় যদি কেউ ছাদে আসে। সেখান থেকে অন্য সমস্ত বাড়ির ছাদ দেখা যায়, ধারণা করা যায় গৃহভ্যন্তরস্থ লোকগুলির আচার-ব্যবহার। দেখা যায় নিচে রাস্তায়-ঘাটে কাতারে কাতারে জনসমাজ। এমনকি, ছাদে এলে কেউ অতি সহজে নিজেকেও দেখতে পায়। নিজে কী বস্তু চিনতে পারে। অবশ্য যদি তার নিজের স্বরূপ দেখার আগ্রহ আদৌ অন্তরে জাগ্রত হয়। আমি নিজে যেমন ছাদে এলে সর্বদা বুঝি দিব্যদৃষ্টি অর্জন করেছি। জগতসংসারের অন্যান্য চেহারা দেখতে পাই যেসমস্ত নিঃসন্দেহে সকলের আসল প্রকাশ। আমি প্রায়ই আসি নিশুতি রাতে আর তখন নিজের চেহারাটাকেও আবিষ্কার করতে সমর্থ হই। ছাদ আমার ক্ষেত্রে মানুষ ও তার সাধের সভ্যতাকে দেখার-বোঝার-চেনার এক আদর্শ স্থান। যার জীবনে ছাদ নেই তার অনেক কিছুই নেই। ছাদ কি কেবল ব্যক্তিবিশেষের বাড়ির ওপরেই থাকে? ছাদ থাকে প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব অস্তিত্বেও। এই গোপন তথ্য ভালো জানে আউল-বাউল-ফকিরেরা। তাদের দেহতত্ত্বের গানগুলিতে তার ছাপ স্পষ্ট। ছাদ রয়েছে কেবল বাড়িতে নয়, প্রত্যেকটি ব্যক্তির জীবনে। ব্যক্তি তার জীবনের ছাদে আরোহণ করলে নিজেকে এবং নিজস্ব সমস্ত আচরণ ও কার্যকলাপ দেখতে পায়। ছাদে উঠে মনোযোগ আরোপ করে নিরীক্ষণ করলে ব্যক্তি ও তার পরিবারকে চেনা সম্ভব। ছাদ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য ও অখণ্ড পরিসর যেখানে রয়েছে অবকাশযাপন ও নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস মোচনের পর্যাপ্ত উপকরণ এবং সেই সমস্ত সুযোগ যে অবহেলা করবে তার জীবন-আকাশে কৃষ্ণমেঘের সমাগম অনিবার্য। ছাদে উঠলে সমস্যা সমাধান হয় না, তার উপায় অন্যত্র, কিন্তু ছাদে গেলে সমস্যাসমূহের প্রকৃতি অনুমান ও অনুধাবন করা যায়। ছাদকে খোলা ফেলে রাখলে বা সেখানে নিয়মিত গিয়ে পরিদর্শন ও পরিভ্রমণ না করলে ধুলোময়লা জমবে এবং কালে কালে তা কদাকার হবে বিচিত্র কী? তার চেয়েও বড় কথা, এভাবে ছাদ যদি পরিচর্যাহীন হয়ে অবহেলায় পড়ে থাকে তো তা একদিন চলে যায় অন্যের দখলে। যদি এরূপ ঘটে তো ব্যক্তি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং বাকি জীবনে তার সংকটমুক্তি ঘটবে কিনা তা অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় ছাদে নজরদারি নিয়মিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। ছাদের অধিকার আয়ত্তে না থাকলে মানুষকে আক্রমণ করে বিচিত্র বিকট সমস্ত অসুখ-বিসুখ যাদের বিবরণ ইতিমধ্যেই বিবিধ উপায়ে বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে পুনরায় স্মর্তব্য যে ছাদে আরোহণ করলে সমস্যাসমূহের নিরসন ঘটে না, তাদের চরিত্র সম্পর্কে ধারণার বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়। সেই অনুযায়ী আচরণ নির্ধারণ করে সমস্যা সকলের কবল থেকে নিষ্কৃতি লাভের উপায় ভাবতে হয় যা অন্য প্রসঙ্গ। ছাদে উঠে গিয়ে কেউ যদি ভাবে সমস্যা সব অন্তর্ধান করবে তো তা হবে চরম মুর্খামি এবং আমাকে উল্লেখ করে পরবর্তী সময়ে কেউ বলতেই পারে যে আমার নির্ণীত পন্থা অনুসরণ করেও সে সংকটমুক্ত হতে পারেনি। এক্ষেত্রে সে আমার নির্দেশিত সমাচারের ও তথ্যের অপব্যাখ্যা করবে। ছাদে উঠলেই যদি অসুখের কবলগ্রস্ত না হওয়া যেত তো আমার জীবনে কেন আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী সমস্যা? আমার তো ছাদে ওঠার নিয়মিত অভ্যেস ছিল এবং কদাপি এই অবশ্য পালনীয় কর্তব্যে অবহেলা না করা সত্ত্বেও আমি বহুবিধ অসুখের আক্রমণে পতিত অবস্থায় দুঃসহ জীবন অতিবাহিত করে চলেছি। কী কারণে এমন ঘটল? অতএব ছাদে গেলেই সংকটমোচন ঘটে না, ক্রমাগত বিপদ-আপদের আভাস পাওয়া যায় মাত্র। তাই বা কিসে কম?
বাড়ির মাথায় যেমন ছাদের অবস্থান তেমনই জীবনের সুবিস্তৃত প্রান্তরের ওপরে পরিব্যাপ্ত আছে বিপুলাকার ছাদ। সেই ছাদে আরোহণের সিঁড়ি রয়েছে জীবনেরই কোন অংশে। তাকে আবিষ্কার করে নিলে আমার মতই দুর্দশা ঘটে সবার, সেই সিঁড়ি অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকলেই ভবিষ্যৎ সংকটঘন হতে বাধ্য যেমন ঘটেছে আমার ক্ষেত্রে। আমি আমার বাড়ির ছাদ চিনতাম, সিঁড়ি কোথায় জানতাম, নিয়মিত ছাদে যাতায়াতের অভ্যেসও ছিল, তবুও নানাবিধ অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে জীবন দুর্বিষহ। পরিত্রাণের উপায় নজরে নেই। নিরবধি সকাতরে সন্ধান চালিয়ে চলেছি যদি কোনবা পন্থা খুঁজে পাই যাতে নিজেকে উদ্ধার করতে পারি এই দুর্বিপাক থেকে। জীবনের ছাদের মাথায় থাকে নিষ্কলঙ্ক মুক্ত আকাশ, সেখানে দূষণের মাত্রা অনুপস্থিত। আপামর জনসাধারণ তবু যেতে চায় না তাদের ছাদে। কলুষাক্রান্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করে ছাদের তলদেশে, গৃহাভ্যন্তরে বা রাস্তায়। স্বভাবতই পরিবেশ দূষণের কবলাক্রান্ত হয় অতি সহজে অনায়াসে এবং তারা অসুখ-বিসুখের শিকার হতে শুরু করে। আমরা সবাই এভাবে বিকারগ্রস্ত মানুষ হয়ে দিন কাটাই, বুঝতে পারি না অভ্যন্তরের বিকৃতি। ক্রমে ক্রমে পরিস্থিতি আরও জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। পরিশেষে কোন একদিন সে হয়তো বুঝতেও পারে কী ছিলাম আর কী হলাম। এভাবেই আমার হয়েছিল হনুমানাইটিস অসুখ যা তত বিপদের নয়, নিজের এবং অন্যের ক্ষেত্রে যেহেতু হনুমান অন্যকে বড়জোর আঁচড়ে-কামড়ে দেয়। কিন্তু পরে একদিন আমার হল শেষে আরও ভয়ানক রোগ যাতে আমি এতটাই বিবেকহীন হিংস্র জীব হয়ে গেলাম যে গোটা একটা মানুষকেই গিলে খেয়ে ফেলেছিলাম। তাতে সেই লোকটার ও তার পরিবারই যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা নয় আমি একই সঙ্গে নিজেরও ভবিষ্যতের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলাম যেহেতু সেই লোকটার হয়তো ক্ষমতা ছিল আমার অসুখ সারাবার এবং আমাকে সুস্থ মানুষ বানাবার। সেই কাহিনী পরে জানাতে যাচ্ছি যথাস্থানে। অসুখের কবলে পড়ে এভাবেই মানুষ নিজের ও সভ্যতার বিপদ ডেকে আনে। খুনী, অত্যাচারী, চরিত্রহীনদের আবির্ভাব ঘটে।
এখানেই প্রয়োজন ঠিক মানুষের ঠিকানা। তাকে পেলে তবেই যাবতীয় সংকট নিরসন হতে পারে। রিক্ত সেই আশার কথাই শোনায় আমাকে সর্বক্ষণ। আমাকে নিয়ে তার সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। একা নিজেও খোঁজে। আমি নিজেও বুঝতে পেরেছি কিভাবে তার সন্ধান চালাতে হয়, কিন্তু জানিনা সেই ঠিক মানুষ কে বা সত্যিই সে আছে কিনা। ইদানিং সেই সন্দেহের বশে ভুগে ভাবছি বোধহয় ব্যাপারটা এক অনুমানমাত্র, ঠিক মানুষ জগতে কেউ হতে পারে না। মানুষের চরিত্রে দোষগুণ থাকবেই এবং মানুষ ষড়রিপুর বশে বেচাল হয়ে কুকর্ম করতে বাধ্য। স্বভাবের কুৎসিত অন্ধকার দমন করতে পারে কোন্ মানুষ? জীবদ্দশায় কোন্ মানুষ নিজেকে অসদাচরণ থেকে বিমুক্ত করতে সক্ষম? তাহলে ঠিক মানুষ আর সোনার পাথর বাটি কি সমতুল্য নয়? আমি অতএব আশা ছেড়েই দিয়েছি ঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়ার। তেমন কেউ ছিল কোনদিন তার দৃষ্টান্তও মিলবে কিনা সন্দেহ।
ঠিক মানুষের প্রসঙ্গ ফেলে আপাতত ছাদের আলোচনায় ফেরা যাক। আমার আপন বিচরণক্ষেত্র ছাদে গেলে জীবনের বহুবিধ সমস্যাগুলির বৈশিষ্ট্য নজরে আসে, তাদের প্রকৃতিগত আভাষও দৃষ্টিগোচর হয় অনতিবিলম্বে। আমি, এমনকি ওই মুক্তাঞ্চলে যদি পরিভ্রমণ করি এবং কায়মনে অনুসন্ধান করি তো কোন কোন জটিল দুরারোগ্য সংকটের সরল কিছু সমাধানের প্রক্রিয়ার সূত্র পেয়ে যাই। এইসব অধরাসূত্রের সন্ধান সহসা অন্য সময় সহস্র প্রচেষ্টাতেও নজরে আসে না। ছাদ পরিক্রমাকালে আরও কতকিছু নাগালে আসে তার তালিকা সুদীর্ঘ। জীবনের ছাদ কিন্তু বাড়ির ছাদের মতই সমতল, সেখানে এলে দেখা যায় নিজেকে এবং অন্যান্য সকল ব্যক্তিদের। তারা কে কেমন চরিত্রের তা অনুধাবন করা যায়। এই ছাদেই তো এসে আমি নানা বাড়ির বাসিন্দাদের তাদের নিজের নিজের ছাদে দেখতে পেয়েছি। তারা প্রত্যেকেই তাদের ছাদে স্ব মহিমায় আপন স্বভাব অনুসারে কার্যকলাপে নিমগ্ন ছিল। আমি যতই অবাক হই না কেন, যতই চিৎকার-চেঁচামেচি করি না কেন কেউ তাতে ভ্রুক্ষেপ বা কর্ণপাত করার কোন অভিপ্রায় দেখানো প্রয়োজন মনে করে না। এইসব আপনাপন অঞ্চলের সীমাবদ্ধ ব্যক্তিবর্গ এমন আত্মপ্রসাদে গর্বিত যে তারা মহাবিশ্বের আকাশ অতিক্রমের ক্ষমতাপ্রাপ্ত এবং অধরা ও অনতিক্রম্য মহাকাশের সমুদয় রহস্য ও সমাচার তাদের করতালগত, অথচ প্রকৃত সত্য হল এই যে তারা নিজেরা কী তারও সঠিক অনুমান তাদের গোচরীভূত নয়। সেই যে বলে, আপনাকে আপনি চিনিনে, সেই রকম ব্যাপার। তারা প্রত্যেকেই নিজের বাড়ির ছাদটা কোথায়, সেখানে যাওয়ার সিঁড়ি আছে কি নেই বা কেমন অবস্থায় আছে তার বিবরণ ঠিকঠাক বলতে পারেনা, আন্দাজে অন্ধের মত কোনলগ্নে কোনক্রমে দৈবের বশে নিজের নিজের ছাদে উপস্থিত হয়ে স্বীয় আচরণ প্রকট করে এবং জানেও না যে তারা বাড়ির ছাদে আছে নাকি পুকুরের তলায় ডুবে ডুবে খাবি খাচ্ছে। স্বভাবদোষে অথবা বিধি বাম বলে আমিও দুর্ভাগ্যক্রমে এসকল ব্যক্তিসমষ্টির গোত্রভুক্ত হয়ে একই গোশালায় বসবাস করছি। আমাদের এমন নিদারুণ প্রাণঘাতক বদভ্যাস সংশোধন করে জীবনদান করবে এ হেন ঠিক মানুষও তো কল্পনাধামের বাসিন্দা হয়ে গেল। সে আছে বা তাকে পাব নাহয় ছেড়েই দিলাম, যদি অন্তত জানতাম কেমন তার চেহারা বা পরিচয় অথবা কোনকালে সে ছিল ধরাধামে তাহলেও বুকে অনেকটা বল পেতাম আর জীবনের প্রতি পদক্ষেপে দুষ্টগ্রহদের আক্রমণ থেকে নিজেকে লড়াই করে বাঁচাবার যথোপযুক্ত ক্ষমতা অনেকটা মজুত আছে দেখতে পেতাম। বেচারা রিক্ত আমাকে সান্ত্বনা দেয় সত্যি কিন্তু সে নিজেও জানি আমার মতোই অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে বা তার অবস্থা আমার চাইতেও বেশি করুণ আর সঙ্গীন।
আমার এবম্বিধ গগনচুম্বী সমুদয় সংকটের কণামাত্র সমাধানের উত্তর পাই যখন ছাদে আসি। তখন মানসলোকে অবলোকন করি জাগতিক সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য বিষয়সমূহ এবং জানতে পারি অপরাপর ব্যক্তিবর্গের কার্যকলাপের বিশদ বিবরণ। আমার আকাশ এবং প্রতিবেশীদের চালচলন দেখে নিজের কী উচিত-অনুচিত তার ধারণা পাই। ঘরে আমার মুখ একরকম, ছাদে এলে দেখি তার অন্যরকম প্রকাশ। রাস্তায় চলতে গিয়ে যে মানুষগুলিকে অহরহ দেখছি, ছাদে এলে দেখি তাদের চেহারা পাল্টে গেছে। মানুষ যে কত বিচিত্র তার আভাষ পাই যখন ছাদে এসে তাকাই তাদের দিকে, সে তারা তখন রাস্তায় থাকুক বা তাদের গৃহাভ্যন্তরে অথবা আপনাপন ছাদে। ব্যক্তিগত ছাদে থাকলেও ব্যক্তিবিশেষের চরিত্র অনাবৃত হয়ে যায়, বরং অন্য সকল স্থানের তুলনায় অনেক বর্ধিত হারে। ছাদে এলে এইসব ব্যক্তিগণের চেহারা বা চরিত্র পাল্টে গেলেও তারা আসলে কে চিনতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয় না। প্রায়শই ছাদে এসে আমি তাদের দেখি যেমন দেখছি এখন এই সময়ে। এইমাত্র উল্লেখ করেছি যে ছাদে উপস্থিত হলে ব্যক্তিবিশেষের প্রকাশ অন্যস্থানের তুলনায় ভিন্নরূপ হয়ে যায়। এই তথ্যে কিঞ্চিতমাত্র বাহুল্য বা সন্দেহ নেই। বিষয়টি যদি কারোও প্রতীয়মান করা সম্ভব না হয় তো দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে। মনে করি, চন্দ্রবিকাশ ঘরে বা রাস্তায় যদি সে চন্দ্রবিকাশ থাকে তো ছাদে এলে সে দন্তবিকাশ হয়ে যাবে না, আদি ও অকৃত্রিম চন্দ্রবিকাশই থেকে যাবে। কিন্তু পরিবর্তন স্পষ্টতর হয়ে উঠবে অন্যত্র, তার চরিত্রগত চেহারায়। যদি ঘরে সে বেজি এবং রাস্তায় তাকে আমার ছাদ থেকে শেয়াল হিসেবে দেখি তো তার ছাদে এলে সে কুমির হয়ে যাবে এবং এই কুমির হিসেবে তার রূপান্তর ঘটাটাই চন্দ্রবিকাশের আসল রূপ। বদ্ধবিনয় হয়তো রাস্তায় পিঁপড়ে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ঘরে সে আপন স্ত্রীর সম্মুখে মেনি বেড়াল, অথচ বাড়ির ছাদে এলে দেখা যাবে মুলোসদৃশ্য দাঁত ও ভাঁটার মত চোখওয়ালা এক বিকটদর্শন জীব সে এবং তার আয়ত্তে যে আসে তাকে সে অতীব সংগোপনে তিলে তিলে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে আর খাদ্যবস্তুটি যাতে বিনা বাধায় নির্বিবাদে গলাধঃকরণ সম্ভব হয় সেই কারণে চর্বন প্রক্রিয়াকালে ঘন ঘন জল পান করে। এই যে বদ্ধবিনয়ের আসল পরিচয় তা তার নাম শুনে বা অন্যত্র তাকে দেখে লেশমাত্র অনুমান করা সম্ভব হবে না।
ছাদে এসে আমি বর্তমানে নিকটবর্তী বাড়িগুলির ছাদে উপস্থিত সেই সেই বাড়ির মালিক ও অপরাপর সদস্যসমূহের বিচিত্র আচার-আচরণ লক্ষ করছিলাম। তারা দেখতে কে কেমন তার বর্ণনায় আগ্রহী না হয়ে কে কী করছিল তারই বর্ণনা দিয়েছি এবং দিতে দিতে আমি নিজেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ভেবেছি, এত প্রকার চারিত্রিক প্রকাশ কোন্ নিয়মে একত্রিত করা সম্ভব। আসলে এটাই মানবচরিত্র ও তার সমাজের প্রকরণ। যেকোন সাধারণ যুক্তি প্রয়োগ দুঃসাধ্য ঘটনা। কেউ যদি ভাবে যে কোনো বিধিবদ্ধ শৃঙ্খলাসূত্র সন্ধান করলে পাওয়া যাবে তো সেই ভাবনা বাতুলতার নামান্তরমাত্র। ব্যক্তিবিশেষ ও তৎসংশ্লিষ্ট চরিত্র সমুদয়ের এই রূপ বহুবর্ণ প্রকাশ যদি কেউ তলিয়ে না দেখতে চায় তো তার সম্মুখে সকলই অতি স্বাভাবিক, কিন্তু যে ব্যক্তি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে আগ্রহী তার কাছে মনে হবে যা চোখের সামনে ধরা পড়ছে তাতে রয়েছে অপার বিস্ময়ের উপাদান। আমার নিজের কি আগে এমন চোখ ছিল?রিক্তর সঙ্গে থেকে থেকে তার কল্যাণে এই বিশেষত্ব আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছি। তবুও আমি রিক্তর মত বিশ্বাস করতে পারছি না যে ঠিক মানুষ সত্যিই কেউ ছিল এই ধরাধামে বা আছে। বিশ্বাস করতে পারলে জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেতাম, জীবনের আনন্দ করায়ত্ত হত। ঠিক মানুষের অস্তিত্ব স্বীকার করতে পারছি না বলেই জীবন জুড়ে এমন হতাশা, এমন বিষাদ, এতসব অসুখ-বিসুখ। প্রতিভাস ম্যাগাজিন| Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
