তাপস সরকার

লেখক পরিচিতি 

( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর  বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। ) 

অধ্যায়: ষোল

সেদিন খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে আরেকটা সৃষ্টিছাড়া অসুখ বাঁধিয়ে বসলাম। এমন আজব অসুখ হতে পারে জানলে সাবধান হতে চেষ্টা করতাম। সে সুযোগ পেলাম কোথায়? পুঁথিপত্রে এ জাতীয় অসুখের বিবরণ পড়িনি কখনও। কী দুর্দশা ঘটলো তাতে জানাচ্ছি তা একটু পরেই। আমার চেনাজানা চারপাশের জগৎটা এমনিতেই ক্রমশ অন্যরকম চেহারা নিতে শুরু করেছিল, সেটা তো হাজারবার বলে যাচ্ছি। মনে হচ্ছিল, একে আমি আগে দেখিনি আর কখনো। এখানে যে মানুষরা থাকছে তাদের ওপরটাই দেখে এসেছি এতকাল। ভিতরটা দেখার তো সুযোগ হয়নি কোনদিন বা দেখলেও এভাবে দেখব বলে ভাবিনি। সম্পূর্ণ অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই দেখা, এমন দেখার শিক্ষাও আগে ছিল না আমার। নিজেকেও আমি এভাবে দেখতে জানতাম না। এখন দেখছি আর অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমার মধ্যে এত বৈপরীত্যের সমাহার দেখে ভাবছি এ তো একদিনে তৈরি হয়নি, তিলে তিলে তৈরি হয়েছিল অনেকদিন ধরে টের পাইনি। এই যে এত অসুখ-বিসুখ, পরিস্থিতি অনুযায়ী এই যে আমার এত পরিবর্তন, এ তো কেবল একা আমারই নয়। প্রত্যেকটি মানুষকে দেখতে গিয়ে বুঝতে পারছি, সবাই এমনই নানা অসুখের শিকার। মানুষের চেহারায় যে মানুষগুলি ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজের দেহে তারা কেউ ভিতরে মানুষ নয়, বিবিধ অসুখে আক্রান্ত বিবিধ রূপধারী অস্তিত্ব। নিজেরাও তারা জানে না যে তাদের মনুষ্যত্ব বিপর্যস্ত। সব অপ্রকৃতিস্থ অস্বাভাবিক জীব হয়ে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। ঠিক মানুষ কোথায়?

আমি বিরক্ত হয়ে রিক্তকে বললাম,

‘দূর্-দূর্, আর মানুষ দেখে ঘুরে বেড়াবো না। সব তো দেখছি বিকৃত মানুষ। আমি নিজে পর্যন্ত। এসব বিকৃতি দেখে কী লাভ?’

রিক্ত নিজেও বোধহয় হতাশ হয়ে গিয়েছিল। উদাসীন গলায় বলল,

‘লাভ কিছুই নেই। তবে ওই যে ঠিক মানুষ খোঁজা। সে আছে কিনা দেখতে গেলে মানুষ দেখে যেতেই হবে।’

‘আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা পুরোপুরি কল্পনা, ঠিক মানুষের কথা বলছি। তুই যতই যুক্তি দেখাস না কেন ঠিক মানুষ বলে কিছু আছে বা তাকে কোনদিন খুঁজে পাবো কিনা সন্দেহ রয়েছে। থাকলে এতদিনে তার কোন ইঙ্গিত পেতাম না ?’

আমার গলা ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছিল। রিক্ত জোর করে বলতে পারল না কিছুই। বরং তার কথা কেমন অসহায়ের মতো শোনালো,

‘খুব যে অযৌক্তিক তোর কথা তা নয়। তবু একটা বিশ্বাস, অন্তিম আশা বলতে পারিস, একদিন ঠিক মানুষকে খুঁজে পাব। জানিস তো, ক্ষ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফেরে পরশপাথর, অনেকটা সেই রকম।’ 

‘অবাস্তব-অসম্ভবের সন্ধানে ঘুরে সময় নষ্ট করব কেন?’

‘সময় নষ্ট না করলেই বা কী করবি? অসুখ-বিসুখে ধুঁকতে ধুঁকতে বেঁচে থাকা এই জীবনের মোহটা কোথায়? তবুও তো ঠিক মানুষকে খুঁজে পাবো, এই ভাবনা তোর সামনে এগিয়ে চলার একটা আকর্ষণ। এটা দূর্-দূর্ বলে তাড়িয়ে দিলে দেখবি বেঁচে থাকা কতটা বিবর্ণ হয়ে যাবে। ঠিক মানুষ পাই আর না পাই খুঁজতে আপত্তি কোথায়?’

ভেবে দেখলাম, রিক্তর কথাগুলি একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। ঠিক মানুষ আছে কোথাও ভাবলে যতটা উৎসাহ আসে, সে নেই ভাবলে কেমন এক অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে। তাহলে ঠিক মানুষ আছে ভেবে নেওয়াই বিধেয়।

এইসব আলোচনা হল সকালে। দুপুরের পর কোন এক সময় আবিষ্কার করলাম, আমার চারপাশটা পাল্টে যেতে শুরু করেছে। এই পাল্টে যাওয়া রীতিমতো অভাবনীয় এই কারণে যে এতদিন জানতাম মানুষগুলোই পাল্টায়, একটা বিশেষ স্থান যে তার চেহারা পাল্টাতে পারে সেই ধারণা ছিল না। যে পরিচিত পরিবেশের মধ্যে আমি ছিলাম এতদিন তার ভূগোল আর সাজসজ্জা কোন্ জাদুমন্ত্রে সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যেতে লাগলো। ব্যাপারটা বোঝাবার উপযুক্ত ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। ধরা যাক, আমার বাসস্থান কলকাতা শহরে। হঠাৎ সেই শহরটা চেহারা পাল্টে হয়ে গেল বেজিং, সঙ্গে সঙ্গে লোকজন থেকে শুরু করে বাড়িঘর-দোকানপাট-রাস্তাঘাট ইত্যাদি সবই হয়ে গেল সেই বেজিং শহরের মত, অর্থাৎ কলকাতা শহরটা সবসুদ্ধ পাল্টেই বেজিং শহর হয়ে গেল এবং আমিও ওই বেজিং শহরের কোন একজন বাসিন্দাতে পরিণত হয়ে বিশুদ্ধ চীনা ভাষায় কথা বলা ও ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম। এই অদ্ভুত পরিবর্তন কেন ঘটল বা কিভাবে হল বুঝতে পারলাম না, কেবল মনে ছিল যে তার আগে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। বেজিং শহরের কথাটা উল্লেখ করলাম উদাহরণ দিতে, আসলে আমার বাসস্থানটা চেহারা পাল্টে হয়ে গেল সম্পূর্ণ অন্য এক দেশ। ওই দেশটার কথাই আমি খবরের কাগজে পড়ছিলাম এটুকু মনে আছে।

কয়েক দিন ধরেই তাবৎ বিশ্বের কূটনীতি আর রাজনীতি টালমাটাল দ্বীপরাষ্ট্র ঘুজিয়াক নিয়ে, তার অধীশ্বর একনায়ক খিটিং-এর কার্যকলাপে। পৃথিবীর অধিকাংশ শক্তিধর দেশগুলির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুজিয়াক নাকি সভ্যতার বিপদ হয়ে উঠতে চলেছে, কারণ খিটিং আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে পারমাণবিক শক্তি অর্জনে বদ্ধপরিকর এবং লোকচক্ষুর আড়ালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে চলেছেন। তাঁর দেশের কোন খবর বাইরে আসে না যেহেতু বহির্বিশ্বের সাংবাদিক ঢুকতে পারেনা সে দেশে। তবে যতটুকু জানা গেছে, খিটিং পরমাণুশক্তির নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে পেয়েই গেছেন।  কিন্তু সেটা আসল ব্যাপার নয় যে কারণে ঘুজিয়াক এখন সংবাদ শিরোনামে। জানা গেছে যে খিটিং তাঁর দেশের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে তাঁর কথা না শোনার জন্য বা নেহাত তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এই সন্দেহে নানা বীভৎস উপায়ে খুন করেছেন। কাউকে মেরেছেন ফায়ারিং স্কোয়াড-এর সামনে দাঁড় করিয়ে, কাউকে হিংস্র বুনো কুকুর দিয়ে খাইয়ে, কাউকে উড়ন্ত এরোপ্লেন থেকে ফেলে, কাউকে জ্যান্ত কবর দিয়ে বা ঘরে বন্ধ করে আগুনে পুড়িয়ে। এমন অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে হামেশাই শোনা গেছে। এর আগে শোনা গিয়েছিল যে সমকালীন বিশ্বের কিছু বিজ্ঞানী, বিশেষত পরমাণু বিশেষজ্ঞ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন তাঁরই কলকাঠি নাড়ায়। খিটিং বিপুল অর্থের লোভ দেখিয়ে যে গোপনে অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীকে তাঁর দেশে নিয়ে যান তাতে কোন সন্দেহই নেই। এঁদের কয়েকজন পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছেন আবার কয়েকজনের মৃতদেহ বেশ কিছুদিন পরপর তাঁর দেশের বাইরে নানা অদ্ভুত জায়গায় আবিষ্কার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলির সন্দেহ বা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কারও কিছু করার উপায় নেই যেহেতু ঘুজিয়াক দেশে বাইরের কোন ব্যক্তির প্রবেশাধিকার নেই। পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলি তাঁকে বর্জন করেছে, ঘুজিয়াকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও বাণিজ্য বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্বেও খিটিংকে কিছুমাত্র নরম করা যায়নি। পৃথিবীর সেরা শক্তিধর দেশটি তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার, তাঁকে হুমকি দেয় মাঝেমধ্যেই, তাঁর দেশের উদ্দেশ্যে রণসজ্জা করে, খিটিং সেই রক্তচক্ষুকে এতটুকুও পাত্তা দেন না।

আমরা সবাই বাইরের পৃথিবীর লোক খবরের কাগজে বা সংবাদমাধ্যমে ঘুজিয়াক দেশের খবর পাই, সেই দেশের মানুষের কী অবস্থা তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করি। এমন এক স্বৈরাচারী শাসকের দেশে মানুষ থাকে কী করে? কী দুরবস্থা তাদের! খিটিং কখনো সাংবাদিক সম্মেলন করেন না, তাঁর সম্পর্কে যা খবর পাওয়া যায় সবই রটনা। আমরা বাইরের পৃথিবীতে বসে ভাবি, হোক রটনা, কিছু তো অবশ্যই ঘটনা। আমাদের চোখে খিটিং একজন নরপিশাচ, নৃশংস একনায়ক। মানুষকে মানুষ বলে মনে করেন না, তাঁর রোষানলে পড়লে কেউ রেহাই পায় না। ঘুজিয়াক আমাদের কাছে এক নিষিদ্ধ দেশ এবং খিটিং হল নির্মম নিষ্ঠুর এক ব্যক্তি যাঁর মধ্যে লেশমাত্র মানবিকতা নেই। আমি নিজে ঘুজিয়াক ও তার শাসক খিটিং, এই দুটো বিষয়কেই ঘোরতর অপছন্দ করি। আমার নিজের দেশ সম্পর্কে হাজারো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘুজিয়াকের কথা মনে হলেই নিজের দেশটাকে স্বর্গ বলে ভাবি। আমার ধারণায়, পৃথিবীর যারা খারাপ লোক তাদেরকে বেশ ভালো মনে হয় যখন খিটিং এসে চোখের সামনে উদয় হয়। এরকম একটা লোকের সংস্পর্শে ভাগ্যিস কোনোদিন যেতে হয়নি!

দুপুরের পর আমার চারপাশ পাল্টে যেতে শুরু করছে দেখে আমি বেশ অসহায় বোধ করতে লাগলাম। জ্ঞানত কোন গর্হিত কাজ করিনি, এমন কেন হচ্ছে ? দোষের মধ্যে খবরের কাগজ পড়ছিলাম আর সেখানে ছিল খুজিয়াক ও শাসক খিটিং-এর খবর। সেটা পড়া কি অন্যায় হল? তা কেন হবে? খবরের কাগজ এবং সেখানকার সমস্ত খবর তো পড়ার জন্যই। কোন সংবিধানে সেসব পড়া নিষিদ্ধ লিখেছে কি? তাছাড়া ওই খবর পড়া বাদ দিলে আমার তো তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। কে না পড়ে খবর, কার এমন বিপত্তি হয়? আমার দেশকাল যদি এভাবে পাল্টে যেতে থাকে আমি কোথায় যাই! কিছুই তো আমার আয়ত্তে নেই। দেখছি চারপাশ পাল্টে যাচ্ছে, থামাতে পারছি না। থামাবো কিভাবে বা থামাবার জন্য কী করা উচিত তার কোন ধারণাও নেই। আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করলাম। এ আবার কী নতুন রোগ? রোগটা কার তাও বুঝতে পারছিলাম না। যদি এটা আমারই আরেকটা অসুখ হয় তো আমার মধ্যে তার কি প্রভাব পড়ল? দেখছি কেবল চারপাশ পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টাতে পাল্টাতে দেখলাম আমার চেনা দেশটা ঘুজিয়াক হয়ে গেল। সেটা যে সত্যিই ঘুজিয়াক তা বুঝলাম কী করে জানিনা, তবে আমি স্থিরনিশ্চিত ছিলাম যে আমার দেশটা ঘুজিয়াকই হয়ে গেছে। এ এক মাত্রাহীন সংকট। এখানে আমি কি সেই আমি আছি, নাকি হয়ে গেছি অন্য কেউ? এই প্রশ্ন যখনই মাথায় এল বুঝতে পারলাম আমার মধ্যেও কী যেন একটা ঘটতে শুরু করেছে। কী ঘটছিল জানিনা, কিছু একটা এবং সেটা অবশ্যই পরিবর্তনের কোন প্রক্রিয়া। যদিও আমি আমার মধ্যে কোন পরিবর্তন ঘটুক একেবারেই চাইছিলাম না তবুও তা ঘটতে লাগল। শেষপর্যন্ত আবিষ্কার করলাম যে আমি নিজে পাল্টে খিটিং হয়ে গেছি।

আমার এই খিটিং হয়ে যাওয়া আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। কিন্তু আমার ইচ্ছে বা অনিচ্ছের কী দাম? আড়াল থেকে কেউ তার ইচ্ছেমতো সব করে যাচ্ছিল, আমাকে খিটিং বানিয়ে দিচ্ছিল। আমার মধ্যে ক্রমাগত শুনতে পাচ্ছিলাম, ‘আমি খিটিং হয়ে যাচ্ছি’-‘আমি খিটিং হয়ে যাচ্ছি’ এমন বার্তা। আমার সমস্ত অবয়ব পাল্টে যেতে লাগল, পাল্টে গেল। সঙ্গে পাল্টে গেল আমার মনোভাব। এখন আমার মধ্যে শুনতে পেলাম, ‘আমি খিটিং’-‘আমি খিটিং’ এমনই অবিরাম অনুরণন। আমি এখন পুরোপুরি খিটিং, আমার সমস্ত দেহমন খিটিং, আমি ষোলআনা খিটিং। যে অনিচ্ছে যে বিরক্তি ছিল এতক্ষণ, পুরোপুরি খিটিং হয়ে যাওয়ার পর দেখলাম তা নেই আর, বরং দেখলাম, নিজেকে খিটিং ভেবে আমার গর্ব হচ্ছে, ‘আমি খিটিং’ এই ভাবনা এখন আমার অবলম্বন। আমি আর আমাকে খিটিং ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে একদমই পছন্দ করছি না, ভাবতে পারছিও না। মনে হচ্ছিল, চিরজন্ম আমি খিটিং হয়ে ছিলাম, আছি এবং থাকব।

আমার দেশটা এভাবে পাল্টে ঘুজিয়াক হয়ে গেল আর আমি নিজে হয়ে গেলাম সে দেশের সর্বাধিনায়ক খিটিং। তারপর কী হল? যা হল তা দেখে খিটিং হিসেবে আমার একেবারেই অস্বাভাবিক কিছু মনে হল না। আমি নিজেকে প্রাসাদোপম এক বাসস্থানে অনুগামী পরিবৃত অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। আমাকে ঘিরে রেখেছে দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষাবলয়। সুশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষীরা স্তরে স্তরে আমার চারপাশে সুসজ্জিত থেকে আমার সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে রেখেছে। রয়েছে আমার উপদেষ্টা আর পরামর্শদাতারা। তারা সবাই আমি কী বলি তা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। একটি গোটা দেশ পরিচালনার ইচ্ছে আর ক্ষমতা আমি আমার মধ্যে মজুত দেখতে পেলাম। দেশের নৌবহর, বিমানবাহিনী, অস্ত্রসম্ভার, সামরিকসজ্জা ইত্যাদি সমস্ত বিষয় দেখলাম আমার আয়ত্তাধীন এবং আমি এদের সমস্ত তথ্য জানি। কী করে জানি সেটাই জানি না, তবে জানি এটা খুবই বাস্তব। এ ছাড়াও বিশেষ কয়েকটি কৌশলগত এবং প্রকৌশলগত গোপন খবর একমাত্র আমারই নখদর্পণে আর আমার এটাও জানা যে ওই গোপন বিষয়গুলির অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত আছে আমার কোন্ কোন্ বিশ্বস্ত অনুচরেরা, এবং আমার এটাও জানা যে তাদের কার বিশ্বস্ততার মাত্রা কতটা। আবার এসব বিশ্বস্ত অনুচরদের ওপর যে রয়েছে কড়া নজরদারি সে তথ্য কেবল আমারই জানা, আর একমাত্র আমিই জানি যে এই গুপ্ত নজরদারদের পাহারায় আছে আরেকদল গুপ্ত বাহিনী, তাদের পাহারায় অন্য দল এবং এভাবেই স্তরে স্তরে বিভক্ত হয়ে আছে আমার সাম্রাজ্যের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা যাদের প্রত্যেকটি প্রান্ত একত্রিত করে একটি গিঁট পাকিয়ে রাখা আছে কেবলই আমার হাতে, যে গিঁট খুলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে একমাত্র আমার। স্তরে স্তরে বিভক্ত নজরদারি এতই সবল যে সেখানে কোন ভ্রান্তির সম্ভাবনা একেবারেই নেই আর সেই কারণেই কেউ আজ পর্যন্ত বেচাল কিছু করতে পারেনি। এই যেমন আমি দেখতে পেলাম আমার অন্যতম বিশ্বস্ত একজন যোগাযোগ স্থাপন করেছে বিদেশী জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে। আমি তাকে এগোতে দিলাম। দেখলাম সে গোপন এক তথ্য পাচার করে দেওয়ার চুক্তি করতে চলেছে। আমি তাকে সুযোগ দিলাম নিজেকে সংশোধন করার, কারণ সে আমার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত অনুগামী। বিশ্বস্ততা চট করে পাওয়া যায় না, তৈরি করতে সময় লাগে। আমি চাইনা বিশ্বস্ত অনুচররা না থাকুক যেহেতু আমি জানি তাদের গড়ে তোলার প্রক্রিয়া কতটা কঠিন। কিন্তু কেউ যদি সুযোগ পেয়েও বিশ্বস্ত না হয়ে বিশ্বাসঘাতক হতে চায় আমি কী করব? যা করার করল আমার সুশিক্ষিত গুপ্ত নজরদাররা। তারা ধরে আনল তাকে। সে আমার বড়ই প্রিয়পাত্র, আমার সামরিক বাহিনীর এক জেনারেল এবং পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের একটি চাবি রেখেছিলাম তারই হাতে, তাকে আমার মত সবাই চেনে রোচেপ নামে। এবার সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে, প্রাণভিক্ষা চাইল আমার কাছে। আমি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ‘তোমাকে তো একটা সুযোগ দিয়েছিলাম রোচেপ। বুঝলে না কেন তোমাকে আমি কোন মূল্যেই হারাতে চাইছিলাম না। তুমি বিশ্বাসঘাতক হলে, আমি তবুও সুযোগ দিলাম। তুমি তাও অগ্রাহ্য করলে। দুটো অপরাধ ক্ষমা করলে তৃতীয় বার তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না। সেটা স্পষ্ট যেহেতু তুমি শুধরে গেলে না। তোমাকে পছন্দ করি, কিন্তু নিজের চেয়ে বেশি নয়। তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ আমি কতটা অসহায়? অতএব…..’  অতএব আমার গুপ্তবাহিনী নির্দেশ পালন করল। রোচেপের সারা দেহে এক্সপ্লোসিভ বেঁধে তাকে উড়িয়ে দেওয়া হল আর আমি খবরটা প্রকাশ করে দিলাম এই উদ্দেশ্যে যাতে আমার অন্যান্য বিশ্বস্ত অনুগামীরা এভাবে আমাকে অসহায় করে না দেয়।

এভাবেই ঘুজিয়াকে খিটিং হয়ে থাকাটা আমার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। আমি এখন পরিপূর্ণ খিটিং, অন্য আর কাউকে পছন্দ হয় না। এই খিটিং সংস্করণ ছেড়ে অন্য কেউ হওয়ার চিন্তা স্বপ্নেও আনতে পারি না। বিশ্বের সেরা শক্তিশালী দেশের সঙ্গে আমার আদায়-কাঁচকলায়, সে দেশের প্রেসিডেন্ট বিশাল নৌবহর পাঠাল তার ক্ষমতা দেখাতে যাতে আমার ভীতিসঞ্চার ঘটে। কিন্তু কী উপাদানে আমি গড়া সে বোধহয় জানত না। আমি প্রকাশ্যেই আমার ভাড়া করা বিজ্ঞানীদের দিয়ে এমন সব ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালিয়ে গেলাম যা কয়েক হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত আনতে পারে। সেই নির্ভুল লক্ষ্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হল মহা শক্তিধর দেশটির রাজধানীর নাম। ওটুকুই যথেষ্ট ছিল। বিশ্বজুড়ে তোলপাড় তুলে দিল সেই শক্তিশালী দেশ। আমি একেবারে নিশ্চুপ থেকে গেলাম। কত যে হুমকি, কত যে বাগাড়ম্বর চলতেই লাগল একের পর এক! আমার তরফ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে সব থেমে গেল কয়েকদিন পর। তারপর দেখলাম সেই বিপুল নৌবহর তার রনং দেহি মূর্তি বর্জন করল, আর একটু হলেও তার অভিমুখ পাল্টে গেল। আমি আমার বিলাসবহুল প্রাসাদের আরামে বসে সুখাদ্য খেতে খেতে মৃদু মৃদু হাসছিলাম, অবশ্যই অন্তরে অন্তরে, বাইরে ছিল অটুট কাঠিন্য।

আমার খিটিং সংস্করণের এসবই ছিল উল্লেখযোগ্য কার্যকলাপ এবং এসবই করত আগের খিটিং। কিন্তু এটাই আমার মাথায় ঢুকছিল না আগের খিটিং, অর্থাৎ যে আসল সে গেল কোথায়। দুটো খিটিং একসঙ্গে থাকতে পারেনা, ছিলও না। আমি যে নিখাদ খিটিং তা সন্দেহাতীত। তাহলে আসল খিটিং-এর কী হল ? অবশ্য আমি খিটিং হয়ে ছিলাম যতদিন এ প্রশ্ন ততদিন মাথায় আসেনি। তখন নিজেকে ভাবতাম চিরকালীন খিটিং, আগে-পরে কেউ ছিল কিনা ভাবতামই না। এসব ভাবনা খিটিং-উত্তর বর্তমান আমির, যখন আমি সেই নির্ভেজাল মাছ-ভাতের আমি হয়ে গেছি। এই জটিল প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে খুঁজে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছি। রিক্তকে আর কাঁহাতক বিরক্ত করা যায়?

খিটিং হয়ে ছিলাম, বেশ ছিলাম। কিন্তু থাকতে পারলাম কই? আমার বেয়ারা অসুখ কোন অবস্থাতেই আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। পরে শুনেছি, যাদের এমন অসুখ হয় তারা কেউ শান্তিতে থাকতে পারে না। আর এই অসুখ জগতে কার না হয়? রিক্তর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে যতটুকু জ্ঞান লাভ করেছি তার কল্যাণে জানতে পেরেছি যে এই অসুখ হয় না এমন লোক খুঁজে পাওয়াই বিরল। যাদের হয় না তারাই আসলে ঠিক মানুষ। সেই ঠিক মানুষের সন্ধান তো এখনো অব্দি পেলাম না। কোন জন্মে খুঁজে পাব কিনা তাও জানিনা। রিক্ত যদিও বিশ্বাস হারায়নি, আমি কিন্তু কোন আশা দেখতে পাচ্ছি না। ঠিক মানুষ ব্যাপারটা আমার এখন কল্পনা বলে মনে হয়। সে থাকলে কোথায় থাকে সেটাই তো ধোঁয়াশা। আর যদি থাকেও বা, সে দেখতে কেমন? তার কি চারটে হাত ছ’টা পা, নাকি মাথায় দুটো শিং? নাকি তার পঁচিশটা মাথা? নাকি তার দেহ ঘিরে জ্যোতিঃপুঞ্জ ঘোরাফেরা করে? নাকি সে কথা বলে জগতের সব স্বাভাবিক ব্যাপার-স্যাপার অন্যরকম করে দিতে পারে? সে কেমন জানি না, পায়ে হেঁটে বেড়ায় না হাওয়ায় ভেসে থাকে, অবয়ব আছে নাকি ছায়াসদৃশ, সেসব কিছুরই ঠিকঠিকানা নেই তো সে বিরাজমান বা বর্তমান ভাবব কোন্ আক্কেলে? রিক্ত যা বলে বলুক, আমি আশা ছেড়েই দিয়েছি।

ঠিক মানুষের প্রসঙ্গ আপাতত গোল্লায় যাক, বলছিলাম কোন্ বিষয় আমাকে খিটিং হয়ে থাকার নিশ্চিন্ত বিলাসিতায় শেষ পর্যন্ত বাদ সাধল। সেটা যে এক বিচিত্র অসুখ তা তো পরিষ্কার, কিন্তু খিটিংরূপ পাল্টে সে আমার কী দশা ঘটালো? খিটিংরূপী থেকে তার সমতুল্য কান্ডকীর্তি করতে করতে হঠাৎ কোন এক লগ্নে আবিষ্কার করলাম, আমি আবার অন্য বস্তু হতে চলেছি। খিটিংসদৃশ্য ধর্ম পালন করা থেকে বিচ্যুত হতে দেখে প্রমাদ গুণলাম। বুঝলাম, আবার আমার চারপাশ পাল্টে যাচ্ছে। দেখতে দেখতেই ঘুজিয়াক দেশটা পাল্টে হয়ে গেল পৃথিবীর সেই সেরা শক্তিশালী দেশ আর নিজেকে আমি আবিষ্কার করলাম সেই শক্তিধর দেশের কর্ণধার হিসেবে। আমার বাসস্থান এখন সেই দেশের সুবিখ্যাত ধবলাঙ্গ রাষ্ট্রপতিভবনে। আমাকে ঘিরে রাখল অভিজ্ঞ ও পারদর্শী উপদেষ্টা আর কূটনীতিকবৃন্দ। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয় আমার চতুষ্পার্শ্বে। আমি সেখানে অধিষ্ঠান হলাম যে রাষ্ট্রপতি বর্তমান তার অবয়বে। নিজেকে দেখে নিজেই চমকে গেলেও অনতিবিলম্বে বুঝলাম, এই নতুন ভুমিকাতেও আমি সহজ ও সাবলীল। আমার বিন্দুমাত্র অস্বস্তি নেই।

এই নতুন রূপে অবতীর্ণ হয়ে আমি দেখলাম আমার অন্যতম প্রধান চিন্তা ঘুজিয়াক। খিটিং-এর বাপান্ত করে চলেছি দিনরাত। এতকাল খিটিং হয়ে থেকে যে লোকটাকে আমি পর্যুদস্ত করার কথা ভাবতাম এখন কোন্ যাদুমন্ত্রে সেই লোকটা হয়ে সেই খিটিং-এর সর্বনাশ ঘটাতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু খিটিং যা বস্তু তার টিকি স্পর্শ করার উপায় না পেয়ে অনবরত কপালে ভাঁজ ফেলতে ফেলতে নিজের ঢোক নিজেই গিলতে বাধ্য হচ্ছিলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে। আমার বিশ্বসেরা কূটনীতিক, প্রযুক্তিবিদ আর পরামর্শদাতারা ওই এক খিটিং-এর চালে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছিল। কোনমতেই ব্যাটাকে কায়দা করতে পারছিলাম না। জগতের আর সবাই আমার রক্তচক্ষু দেখে থরহরি কম্পমান, অথচ খিটিংরুপী এক বস্তুর কাছে আমার সমস্ত আধুনিকতম আস্ফালন ফেল মেরে যাচ্ছিল। এই ব্যর্থতার যন্ত্রণা কি প্রাণে সহ্য হয়? কিন্তু নিরুপায়। খিটিং আমাকে ভয় পাবে দূরের কথা, পাত্তা পর্যন্ত দিল না। আমি নিজের মান বাঁচাতে তখন এমন ভাব দেখাতে লাগলাম যেন খিটিংকে নিজগুণে ক্ষমা করে দিয়েছি, সে ইচ্ছে হলেই আমার নাগাল পেতে পারে। আমার এতসব প্রচ্ছন্ন চালও উজবুকটা বানচাল করে দিল নিরুত্তর থেকে। মজার কথা হল এই যে খিটিংকে আমার মত ভালো কেউ চেনে না যেহেতু আমি স্বয়ং একদা খিটিং হয়ে ছিলাম। কিন্তু এখন দেখলাম, সেই চিরচেনা খিটিং আমার কাছেই আপাদমস্তক অচেনা। তার মেজাজমর্জির থই আমার ধারণায় নেই। এটা কী করে হতে পারে মাথায় ঢুকছিল না। তখন বাধ্য হয়ে বিশ্বনজর অন্যদিকে ঘোরাবার কথা ভাবতে হল। আমার গগনচুম্বী প্রতিভাসম্পন্ন প্রচারবিদরা মোক্ষম কায়দায় জগৎবাসীকে বোঝাল যে খিটিং এক তুচ্ছ ব্যক্তি, তাকে নিয়ে কোন বাক্যব্যয় করা নিরর্থক। জগতে আরও প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সমস্যা রয়েছে। জগৎবাসীর সেসব দিকে মনোনিবেশ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সৌভাগ্যক্রমে জগতবাসী আমি যেভাবে ভাবি সেভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল বলে বিশেষ কোনো সমস্যাই হল না। উল্টে সবাই মিলে আমি যা বলতে চেষ্টা করছিলাম সেটাই আমাকে বোঝাতে নেমে গেল কোমর বেঁধে।

খিটিং হই বা অন্যকিছু, সেসব তো অন্য ব্যাপার। আমি তো আসলে আমি, সে একমাত্র আমিই জানি আমি কে। নানা বিচিত্র দেহ নিয়ে পরিভ্রমণ করছি যে আমি সে আসলে কে সেই রহস্য জগতের কেউ কি টের পেয়েছে? মুশকিল হল, ব্যাপারটা যদিও আমি জানতাম বা বুঝতাম তা দশজনকে ডেকে বলতে গেলে ধরেবেঁধে নির্ঘাত আমাকে পাগলাগারদে বা চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেবে সবাই। প্রমাণস্বরূপ কোন নির্ভরযোগ্য বিষয় তো আমার হাতে নেই। এই রহস্যময় অসুখের এটাই তো বড় জ্বালা। যার হয় সে বোঝে কী হচ্ছে, কিন্তু সাহস করে সে তা জানাতে পারেনা কোন ডাক্তারকে। সে জানে তার এই আজব রূপান্তর জগতের কোন মানুষ বিশ্বাস করবে না। যার হয় অসুখটা, যদিও সবারই হয়, তারা নিজেও ভাবতে ভয় পায় তার কী কী রূপান্তর ঘটছে। সে হতেই থাকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট থেকে উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রনায়ক, আর নিজের এইসব হওয়াগুলি নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখে। এভাবেই নিজের সঙ্গে নিজের লুকোচুরি খেলতে খেলতে সব মানুষের জীবন কেটে যায়। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের একই গোপন কথা, নিজের কাছে প্রত্যেকের তা সত্যি, তবুও সারাজীবন কেউ তা সাহস করে প্রকাশ করতে পারেনা। প্রত্যেকেই ভাবে, সে কিছুতেই স্বীকার করবে না কথাগুলি, অন্য কেউ বলে দেবে কোনক্রমে। যুগে যুগে সবাই এই ধারাতেই ভেবে আসছে বলে সেই গোপনকথা চিরকাল গোপনই থেকে যায়, তার প্রকাশ ঘটেনি আজ পর্যন্ত। রিক্ত আমাকে বলেছিল,

‘ওই জন্যই ঠিক মানুষ পাওয়া দরকার। একমাত্র যারা ঠিক মানুষ তাদের এমন রূপান্তর ঘটে না কখনো। তারা ছাড়া জগতের আর সব মানুষ চরিত্রভ্রষ্ট। তারা কে কখন কোন্ চরিত্রে অবস্থান করবে বোঝে কার সাধ্যি। কিন্তু ঠিক মানুষের চরিত্র চিরকাল একরকম। তারা কখনো একসঙ্গে ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড হয়না। তারা এই বহুরূপী মানুষগুলির জগতে একমাত্র আশার আলো। তাদের তুমি নিশ্চিন্তে মানুষ ভেবে এগিয়ে যেতে পারো।’

তা তো পারি, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব আছে কিনা সেটাই তো সন্দেহের। রিক্ত বলছে বটে, আমার বিশ্বাস হয় না। আমি মুখে কিছু বলি না, মনের সন্দেহ মনেই চাপা থাকে। এই হতাশার জগতে অবশ্য যদি ভাবি ঠিক মানুষ রয়েছে কোথাও বুকে অনেকটাই সাহস পাওয়া যায়। তবে বিশ্বাসটা কত একতরফা বজায় রাখা সম্ভব? ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে একদল মানুষ সারাজীবন কাটিয়ে দেয়। তাদের দেখে হিংসে হয় আমার। এমন একনিষ্ঠ বিশ্বাস তো আমার মধ্যে নেই। যার আছে সে সত্যিই ভাগ্যবান। আমি হলাম না ঘরকা না ঘাটকা ধরনের জীব। খানিকটা বিশ্বাস আছে, অনেকটাই অবিশ্বাস। কোনকিছু বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে পারি না। আবার প্রশ্নটাকে যে স্থায়ীভাবে রেখে দেব নিজের মধ্যে তাও নয়। এমন যাদের মানসিক অবস্থা তারা তো অসুখে কাবু হবেই।

অসুখ আর অশান্তি এই শব্দ দুটি পরস্পরসংলগ্ন। নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট নয় বলেই অন্যের মধ্যে চলে যেতে চায় সবাই, অশান্তি তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে সর্বক্ষণ। এই অশান্তি সে ভোগ করে নিজের মধ্যে যেমন, অন্যের মধ্যে গিয়েও তা থেকে রেহাই পায় না। এই অশান্তি রূপান্তর ঘটায় অহরহ এবং এটাই অসুখ। কোন্ টা যে কার কারণ বা ফলশ্রুতি স্পষ্ট করে বোঝা দায়। হতে পারে, অসুখ বলেই অশান্তি, আবার অশান্তি থেকেই অসুখ এমনও হওয়া সম্ভব। যাই হোক না কেন, প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে অসুখ আর অশান্তির সহাবস্থান রয়েছে। রিক্ত জানালো,

‘ঠিক মানুষ যে তার কোন অসুখও নেই অশান্তিও নেই। সবচেয়ে বড় কথা, যদি তাকে তুই খুঁজে পাস, তার সান্নিধ্যে যেতে পারিস তো তোর জীবন থেকেও অসুখ আর অশান্তি দূর হয়ে যাবে চিরদিনের জন্য।’

খুবই আনন্দের কথা, কিন্তু আমি আশা খুঁজে পাই না। ঠিক মানুষ ব্যাপারটা নিছক কল্পনা বই তো কিছু নয়। রিক্তকে মুখে কিছু বলি না, মনের অবিশ্বাস মনেই চাপা থাকে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *