তাপস সরকার

লেখক পরিচিতি 

( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর  বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। ) 

অধ্যায় : তেরো

একটা হনুমান কয়েকদিন হল বেশ জ্বালাচ্ছে আমাকে। আমি বাড়িতে ঢুকলে সেও আমার সঙ্গে ভিতরে ঢুকে যায়। কিভাবে ঢোকে বুঝতে পারিনা। দেখি, সে আমার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে বসে আছে। আবার বাড়ির বাইরে গেলে তার আর দেখা পাই না। সে তখন যে বাড়িতে থাকে না এ-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সে অবশ্যই বাড়ির বাইরে চলে যায়। সে থাকলে বাড়ি ফেলে বাইরে যাওয়ার ভরসা পেতাম না। আমি বাইরে যাওয়ার কথা ভেবে পা বাড়ালেই দেখি সেও আমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। বাইরে বেরিয়ে গেলে আর কোন ঝামেলা থাকে না। সে নিজের জগতে উধাও হয়ে যায়। 

আজকাল বাড়িতে থাকতে আমার ভয় করে। বাড়িতে ঢুকলেই সেই আপদ হনুমানের উপদ্রব। আমি বাড়িতে যাব, এই ব্যাপারটা কিভাবে যেন সে টের পায়। রাতে, বিকেলে, সকালে বিভিন্ন সময়ে বাড়িতে ঢুকে দেখেছি সে ঠিক বুঝে যায় আর আমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ে। ঢুকে যদি লক্ষ্মীছেলের মত শান্তশিষ্ট থেকে যেত তো আপত্তি ছিল না, ব্যাটা আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। একটা গোটা হনুমানের সঙ্গে সময় কাটানো বেশ কঠিন ব্যাপার। অনেকেই হয়তো বুঝতে পারবে না সমস্যাটা, কারণ এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতা কারো হয় কিনা সন্দেহ। বাড়িতে ঢুকে আমি জুতো খুলে জুতোদানিতে রাখলাম, সে অকারণে জুতোগুলো সেখান থেকে ফেলে দেবে। ধমক দিয়ে দেখেছি ফল হয় না। জুতোগুলি যতবার গুছিয়ে রাখি ততবার সে ফেলে দেয়। বিরক্ত হয়ে একদিন আমি জুতো খুলে এমনি ফেলে রাখলাম। সেদিন সে জুতোগুলি নিয়ে দরজার বাইরে রেখে এল। এরকম করতে থাকে সে গোড়া থেকেই। এখন আর জুতো নিয়ে মাথা ঘামাই না। যা খুশি করুক ভেবে যেখানে-সেখানে খুলে রেখে যাই। স্বস্তির কথা একটাই যে জুতোগুলি হারায় না। আবার বাড়ি থেকে বার হওয়ার সময় কোন না কোন এক জায়গায় সেগুলি ঠিক পেয়ে যাই। একটু যা খোঁজাখুঁজি করতে হয়, এই পর্যন্ত। 

আমি হয়তো বসার ঘরে ঢুকলাম, সে গিয়ে সোফার ওপর গ্যাট হয়ে বসল। বসার আগে স্যুইচ টিপে টিভিটা চালিয়ে নেবে। তারপর রিমোট টিপে টিপে এ-চ্যানেল সে-চ্যানেল করতে থাকে। আমার হয়তো তখন টিভি দেখার ইচ্ছে নেই, কোন একটা বই খুলে বসব ভাবছি, কিন্তু হনুমানটার খুশিমত টিভি দেখতেই বাধ্য হই। আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছেগুলি অপদটা নিয়ন্ত্রণ করে। এটা খুব আশঙ্কার কথা হলেও সত্যি যে আমি কিভাবে সময় কাটাব বা নিজের বিনোদন করব তা একটা হনুমান ঠিক করে দিচ্ছে। কেবল কি বিনোদন ? অন্যান্য বিষয়েও দেখছি তার ভূমিকা ক্রমশই প্রবল হয়ে উঠছে। 

খাবার ঘরে ঢুকলে সে খাবার টেবিলের পাশে দেখেশুনে একটা চেয়ার নিয়ে বসে। তার আগে ফ্রিজ খুলে পছন্দসই খাবারগুলি বার করে নেয়। আমি কী খাব না-খাব সেটাও তার পছন্দ অনুযায়ীই ঠিক হয়, তার ইচ্ছের বাইরে অন্য খাবার নেওয়া হয়ে ওঠে না। তার পছন্দের খাবারগুলি নিয়ে সে গরম করে টেবিলে রাখে, আমাকে সেসব খাবারই খেতে হয়। হয়তো মাছ খাওয়ার সাধ জাগল, কিন্তু তার ইচ্ছে মেনে মাছের বদলে খেতে হবে লাউঘন্ট। রাগে হাড়পিত্তি জ্বলে গেলে কী হবে, কিছু করার উপায় নেই। জোর করে আমার পছন্দমত খাবার নিতে গিয়ে দেখেছি একটা না একটা অঘটন ঘটে আর যা চাইছি তা পাই না। গতকালই সে আমাকে বাধ্য করল বাঁধাকপি খাওয়াতে। অথচ আমার ফ্রিজে মুরগির ঝোল ছিল আর আমি তা খেতেও চাইছিলাম। খাবার ঘরে ঢোকার সময় মুরগির ঝোল খাব ভেবে বেশ উৎফুল ছিলাম, কিন্তু সে আমাকে কোন সুযোগ না দিয়ে ফ্রিজ থেকে বাঁধাকপির তরকারি নামিয়ে আনল। আমি বিদ্রোহী হব ভাবলাম, সে নিরুত্তাপভাবে ওই বাঁধাকপি গরম করে টেবিলে রাখল। ‘তুই খা বাঁধাকপি,’ বলে ফ্রিজ খুলে নিজের উদ্যোগে মাংসের ঝোল নামাতে গিয়ে দেখি, কাঁচা মাংস পড়ে আছে, রান্না করাই হয়নি। ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হল না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ফ্রিজে মুরগির ঝোল পাওয়া যাবে, ওবেলা খেয়েওছিলাম খানিকটা বলে মনে পড়ছিল। সেই মুরগি ঝোলসুদ্ধ কিভাবে কাঁচা হয়ে গেল ? বেশ বোকা ব নে গেলাম। বাধ্য হয়েই বাঁধাকপি খেতে হল। তখন কে আর মুরগির ঝোল রান্না করে ?

স্নান করতে বাথরুমে ঢুকলেও হনুমানটা আমার সঙ্গে সঙ্গে যায়। প্রথম প্রথম বেশ অস্বস্তি হতো। বাথরুম একেবারে নিজস্ব জায়গা। বাথরুম আর যমপুরিতে সঙ্গী নিয়ে যাওয়া রীতিবিরুদ্ধ। পুকুরে-টুকুরে একসঙ্গে দলবেঁধে সবাই স্নান করে, সাঁতার কাটে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বাথরুমে কেউ সঙ্গী নিয়ে ঢোকে না। পাড়ার কলতলাতেও দলবেঁধে স্নান করে মানুষ, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে। তাতে কারোও কিছু বলার থাকে না এবং দোষেরও কিছু নেই। এই কালচার বাথরুমের ক্ষেত্রে অচল। বাথরুম আধুনিক সভ্যতার এক উৎকৃষ্ট মডেল যেখানে মানুষ একা হয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এমনও শোনা গেছে যে বাথরুম হল সৃজনশীলতার এক অনন্য আখড়া। সংগীত, সাহিত্য, বিজ্ঞান অনেক কিছুরই সুতিকাগার। অন্যদিকে বাথরুম অনেকের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়ও অবশ্যই। এটি গোপন স্মোকিং জোন—- এখানে কেউ নিরুপদ্রবে নেশাদ্রব্য গ্রহণ করতে পারে, কেউ সাধ মিটিয়ে মূকাভিনয় বা নাট্যচর্চা করতে সক্ষম, অন্যকে না জানিয়ে যত খুশি কান্নাকাটি বা হাসাহাসি করলেও কোন বারণ নেই। প্রত্যেকেরই গোপন সাধ প্রকাশ বা বাস্তবায়িত করার এক আদর্শ স্থান বাথরুম। সেখানে কে সঙ্গী নিয়ে ঢুকতে চায় ? ওই হতচ্ছাড়া হনুমানটার দৌরাত্মে সে স্বাধীনতাটারও বাথরুমের জলেই জলাঞ্জলি ঘটল আমার। বাথরুমে উজবুকটা সঙ্গী হয়ে গেল। অস্বস্তি লাগল ঠিকই, পরে দেখলাম ব্যাপারটা কেমন অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। বাথরুমে হনুমানটাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। বাথরুমে ঢোকার পর সে কী করবে তার জন্য এখন রীতিমত অপেক্ষা করি। আগে তার ইচ্ছের দিকে না তাকিয়ে নিজের মর্জিমত কাজ করতে গিয়ে বারবার বিপর্যস্ত হতে হয়েছে। এখন তাই তার বিরুদ্ধে যেতে ভরসা পাই না। 

বাথরুমে ঢোকার পর সে এমনি ট্যাপ খুলে জল নিয়ে বালতি ভরতে লাগল, অথচ আমি ভেবে রেখেছিলাম যে গিজার চালিয়ে নেব। সে আমার ইচ্ছেমত গিজার না চালানোয় খুব খেপে গেলাম আর জোর করে গিজার চালিয়ে গরম জলে বালতি ভরে স্নান করতে গিয়ে ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখি, সময়টা শীতকাল না হয়ে গরমকাল হয়ে গেছে। এটা কী করে হতে পারে অনেক ভেবেও যুক্তি খুঁজে পাইনি তখনকার মত। অথচ স্পষ্ট খেয়াল আছে যে গতকালও শীতে-ঠাণ্ডায় জুবুথুবু হয়ে থেকেছি। উদাহরণ দিয়ে তালিকা বাড়ানোর দরকার নেই। মোটকথা হল, বাথরুমে ঢুকে হনুমানটার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলেই আমাকে নাজেহাল হতে হয়। বাধ্য হয়ে আমি নিজেকে তার ইচ্ছের অধীনেই রাখি। স্বাধীনভাবে কোনকিছু না করে অপেক্ষায় থাকি সে কী করতে চায় তা দেখার জন্য। সে যদি গায়ে-মাথায় তেল দেওয়ার ইচ্ছে করে তো দিই, তার ইচ্ছে না হলে তেল ছুঁই না। তার ইচ্ছে হলেই গায়ে সাবান মাখি, নাহলে গায়ে সাবান না মেখেই স্নান করি। সে চাইলে শাওয়ার খুলি, না চাইলে নয়। এমনকি, হনুমানটার মর্জি হলেই গায়ে জল ঢালি, আর সে যদি না চায় তো গায়ে জল না ঢেলেই স্নান সেরে নিই। হনুমানটা যেমনি চালায় তেমনি চলি। 

এভাবে একটা হনুমানের কাছে নিজেকে সমর্পন করে দেওয়াটা খুবই অবিবেচনার কাজ, কিন্তু কী করব, হনুমানটা যদি নিজের গরজে আমাকে ‘সিলেক্ট’ করে নেয় তো আমার কী করার আছে ? আমি নিজে তো জেনেবুঝে হনুমানটার কাছে আত্মসমর্পন করিনি। কোন হনুমান আমাকে বা অন্য কাউকে পছন্দ করতেই পারে, এটা তার ব্যক্তিস্বাধীনতা। হনুমান বলে তার এই মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করব এতটা পাষণ্ড আমি নই। আর একটা হনুমান মনে মনে কাউকে পছন্দ করে কিনা সেটা বুঝবই বা কী করে ? না আমি জানি তার ভাষা না হনুমানটা জানে আমার ভাষা। হনুমান আর মানুষের মধ্যে আদানপ্রদানের এই যে ভাষাগত সমস্যা তা তো এখনও পর্যন্ত সমাধান করে উঠতে পারেনি কেউ, ধর্ম ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কথা নাহয় বাদই দিলাম। অতএব যা হওয়ার হবে। হনুমান যদি আমাকে চালায় তাতে আপত্তি জানাবার উপায় কী?

শোবার ঘরে ঢুকেও দেখি একই বিপত্তি, হনুমানটা সেখানেও ঢুকে বসে আছে। দূর্-দূর্ করে তাড়াব কী, সে দেখি আমার বিছানায় হাত-পা তুলে উঠে শুয়ে রয়েছে জম্পেশ করে। আমি যখন ভাবি পাখা চালাব, সে এসি চালিয়ে নেয়, আমি এসি চালাব ভাবলে সে পাখা চালায়। একটা আদাড়ে-বাদাড়ে ঘোরা হনুমান আমার বিছানায় বসে থাকবে ব্যাপারটা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। বালিশ-চাদর সব নোংরা হয়ে যাবেই যাবে। কিন্তু তাকে বিছানা থেকে নামাব সেই ক্ষমতা আমার নেই। ওই হনুমান প্রত্যেকটা ঘরে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে, আমি অসহায় হয়ে দেখতে থাকি। সে সিঁড়িতে বসে কলা খায় আঙুর খায়, জানলায় দাঁড়িয়ে পথচলতি লোকেদের উদ্দেশ্যে দাঁত খিঁচোয়, কখনো বা আমার স্মার্টফোন নিয়ে সোফায় গা ঢেলে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম করে আর খ্যাক-খ্যাক করে হাসে। অবশ্য হনুমানরা হাসে কিনা সন্দেহ আছে, তবে স্মার্টফোন নিয়ে নেটদুনিয়ায় ঘুরতে ঘুরতে যখন দাঁত খিঁচোয় আর গলা দিয়ে বিদঘুটে আওয়াজ করতে থাকে তখন তা চরিত্রে রাস্তার লোক দেখে দাঁত খিঁচোনোর তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা বলে মনে হয়। ওটা হাসিই হবে।

হনুমানের কাছে এভাবে একেবারেই বিকিয়ে আছি আমি। যে কেউ এতে আমার সমালোচনা করতেই পারে, তাতে কান দিয়ে কিছুই লাভ হবে না আমার। হনুমানের কবলগ্রস্ত হয়ে থাকার এই বিড়ম্বনা যদি কপালে থাকে কে আমাকে উদ্ধার করবে ? তবে যাই হোক না কেন, ব্যাপারটার একটা ফয়সালা হওয়া দরকার। উপায়ান্তর হয়ে আমি গিয়ে রিক্তকে ধরলাম। সে সব শুনে জিজ্ঞেস করল,

‘হনুমানটার লেজ আছে ?’

‘নিশ্চয় আছে। হনুমান যখন তার লেজ থাকতেই হবে।’

‘না-ও থাকতে পারে। তুই সত্যি দেখেছিস ওর লেজ ?’

আমার কেমন ধাঁধা লেগে গেল। হনুমানটাকে নিয়ে এতই ব্যতিব্যস্ত আমি যে তার লেজ আছে কি নেই লক্ষই করিনি। আমতা আমতা করে বললাম,

‘খেয়াল করে দেখিনি অত ?’

‘তোর কোন লেজ গজিয়েছে ?’

বেশ ঘাবড়ে গেলাম। অজান্তেই পিছনে হাত দিয়ে লেজটেজের কোন চিহ্ন দেখতে পেলাম না। রেগেমেগে প্রশ্ন তুললাম,

‘হনুমানের লেজের সঙ্গে আমার লেজ থাকা না-থাকার কী সম্পর্ক ?’

‘সম্পর্ক আছে।’

রিক্তর গলায় রহস্য। সে তারপর জানতে চাইল।

‘হনুমানটার গায়ে বড় বড় লোম আছে ?’

আবার আমার ধাঁধা লেগে গেল। আপদটার গায়ে লোম আছে কিনা সেটাও আলাদাভাবে খেয়াল করে দেখিনি। রিক্ত আমাকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখে আর কিছু বলল না। দৌড়ে কোত্থেকে একটা আয়না নিয়ে এসে ধরল আমার সামনে। গাঢ় গলায় জানতে চাইল,

‘দ্যাখ্ নিজেকে। কী মনে হচ্ছে ?’

নিজের মুখটা আয়নায় দেখে হকচকিয়ে গেলাম। বেশ চেনা চেনা ঠেকল। নিজের মুখ বলে নয়। অন্য কারণে। রিক্ত জিজ্ঞেস করল,

‘হনুমানটাকে দেখতে পাচ্ছিস ?’

ততক্ষণে আমি রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে গেছি। আয়নাতে যে মুখটা দেখছি সেটা ওই হনুমানটার মুখ। আমার মুখ কোথায় গেল? ভীতচকিত গলায় বললাম,

‘আয়নাটাতো ধরেছি আমার মুখের ওপর। হনুমানটার মুখ দেখছি কেন?’

‘কারণ ওটাই তোর মুখ।’

রিক্ত আয়নাটা সরিয়ে নিল। বিস্ময়ে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

‘আমার মুখ মানে? হনুমানটার মুখ আমার মুখের মত হতে যাবে কেন?’

‘কারণ ওই হনুমানটা আসলে তুই নিজেই।’

রিক্তর কথা শুনে আমি কী বলব খুঁজে পেলাম না। ওই যে বলে না, বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়া, আমার অবস্থা হল তেমনই। রিক্ত বলতে লাগল,

‘নিজের বাড়িতে ঢুকলে তুই নিজেই একটা হনুমান হয়ে যাস। বুঝতে পারিস না সেটা নিজে। ভাবিস একটা হনুমান তোর সঙ্গে বাড়িতে ঢুকে গেল।’

‘উরি-ব্বাপ্ রে, কী সর্বনাশ রে ! কী করব আমি এখন?’

রীতিমত আর্তনাদ করে উঠলাম আমি। রিক্ত সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

‘তুই তো তবু ভাগ্যবান রে, একটা হনুমানের আন্ডারে আছিস। অনেকে এর চেয়ে অনেক বেশি ইতর প্রাণির আন্ডারে চলে যায়। টিকটিকি, কেন্নো, মাকড়সা আরও কত কী। তার চেয়ে হনুমান অনেক ভাল। মানুষের কাছাকাছি জীব।’

আমার সান্ত্বনা পেতে ইচ্ছে করল না। শোরগোল তুলে বললাম,

‘আপদটার হাত থেকে রেহাই পাব কী করে বলে দে।’

‘তুই অকারণে এত ঘাবড়ে যাচ্ছিস। বললাম তো, অন্যান্য ইতর প্রাণির তুলনায় হনুমান অনেক ভাল। তার ওপর, তুই কেবল বাড়িতে গেলেই হনুমানটার আন্ডারে যাস। বহু লোক আছে যারা অনেক বেশি ইতর প্রাণি হয়ে ঘরে-বাইরে কাটায়। তোর এই হনুমানাইটিস রোগটা যদি পথেঘাটে গেলেও হতো তাহলে তোর সমস্যা আরও বেড়ে যেত। রাস্তাঘাটে লোকের সামনে যদি দাঁত খিঁচোতিস বা লোকজনকে আঁচড়ে-কামড়ে দিতিস তাহলে ব্যাপারটা বেশি ঘোরালো হতো না ?’

অবশ্য চেহারা পাল্টে অন্য কিছু হয়ে যাওয়ার অভ্যেস বা অভিজ্ঞতা আছে আমার, ভাবলাম আমি। রিক্তকে বললামও সেকথা যে ব্যাপারটা নতুন কিছু নয় আমার কাছে। রিক্ত জানাল,

‘তোর সেই চেহারা পাল্টে অন্য কিছু হয়ে যাওয়া আর এই হনুমানাইটিস ব্যাপারটা কিন্তু এক নয়। প্রথমটার বেলায় তোর বাইরের চেহারাটা পুরোপুরি পাল্টে যায় আর এখানে তোর ভিতরটা পাল্টায়, বাইরের চেহারা অল্পস্বল্প পাল্টাতে পারে আবার না-ও পারে।’

তাহলে আমার কোন্ অবস্থাটাকে বেশি ভয় পাওয়া উচিত? রিক্তকে সেই প্রশ্নটা করলে সে জানাল,

‘দ্যাখ্, দু’টো অবস্থার ক্ষেত্রেই ভয় আছে আবার নেইও। ভয় যদি থাকে তাহলে প্রথমটার ক্ষেত্রে তা যেমন দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে আলাদা। আবার তুই যদি ভয় না পাস্ তাহলে কোন অবস্থাটাকেই ভয় পাওয়ার নয়।’

‘এ আবার কী কথা, মাথামুণ্ডু নেই?’

বিরক্ত হয়ে বললাম। রিক্ত শান্ত গলায় উত্তর দিল,

‘কথাটা এই কারণে বললাম যে মানুষের দুনিয়ায় এসব ঘটনা আকছার ঘটে যাচ্ছে। কেউ বোঝেও না দেখতেও পায় না, আর তাই মাথাও ঘামায় না।’

‘তার মানে তুই বলছিস এগুলি স্বাভাবিক ঘটনা?’

‘একশ’বার। বরং এগুলি না ঘটলেই মানুষের দুনিয়া অস্বাভাবিক হয়ে যাবে। তুই ভাবতে পারিস তেমন এক পৃথিবীর কথা যেখানে মানুষ একে অন্যকে হিংসে করবে না, খুন করবে না, ধরে পেটাবে না বা অত্যাচার করবে না ?’

রিক্তর গলায় বেশ জোর ছিল আর কথাগুলির যৌক্তিকতাও আমি অস্বীকার করতে পারলাম না। আবার শান্তিও পাচ্ছিলাম না। হনুমান হয়ে যাই কেন রে বাবা? ভাল ভাল কত কী হওয়ার আছে। সব ছেড়ে হনুমান হতে গেলাম কেন? ভিতরের সেই অসন্তোষ বাইরে প্রকাশ হল জিজ্ঞাসা হিসেবে। বললাম,

‘তবুও, তুই যা-ই বলিস, হনুমান হয়ে যাওয়াটাকে আমি ঠিক মেনে নিতে পারছি না। আবার হনুমান যে হয়ে যাই সেটা বুঝতেও পারি না।’

‘কারণ তোর ভিতরটা যেহেতু পুরোপুরি হনুমান হয়ে যায়। তোর আর তখন মানুষের চেহারার মস্তিষ্ক বা স্মৃতি কিছুই থাকে না।’

‘অন্যরকম চেহারা পাল্টানোর ক্ষেত্রে কিন্তু আমি আসলে কে সেই চেতনা থাকে।’

‘কারণ সেক্ষেত্রে তোর বাইরের চেহারায় পরিবর্তন হয়, ভিতরে যে-তুই সে-তুই অবিকল একই থেকে যাস।’

‘কোন্ পরিবর্তনটা বেশি দেখা যায় মানুষের দুনিয়ায়?’

‘দু’টোই। তবে দ্বিতীয় পরিবর্তনের ব্যাপারটা বেশি জটিল, আর চট করে বোঝাও যায় না। অথচ এর প্রভাবটা বোধহয় বেশি প্রবল।’

নিজেকে হনুমান ভাবতে আমার গা ঘিনঘিন করছিল আবার রাগও হচ্ছিল। রাগটা কার ওপর বুঝতে পারলাম না। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে রিক্ত নিশ্চয় টের পাচ্ছিল ভিতরে কী দ্বিধাদ্বন্দ চলছে। সে তাই সান্ত্বনা দেওয়ার গলায় বলতে লাগল, 

‘দ্যাখ্, আগেও বলেছি এখনও বলছি, তোর এই হনুমান হয়ে যাওয়ার রোগ, অর্থাৎ এই হনুমানাইটিস তুলনায় অনেক ভাল ব্যাপার। অন্য কোন ইতর প্রাণিও হয়ে যেতে পারতিস। তার চেয়েও ভাব, যদি কোন হিংস্র প্রাণি হয়ে যেতিস? সেটা আরও বেশি অপছন্দের হতো না কি?’

আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম। রিক্ত সূত্র ধরাল,

‘মনে কর্, হনুমান না হয়ে তুই একটা বাঘ হয়ে যেতে পারতিস। সেক্ষেত্রে তোর হতো বাঘাইটিস রোগ। তুই মানুষ আর জীবজন্তু ধরে ধরে ঘাড় মটকে হাড়-মাংস-রক্ত কাঁচা কাঁচা খেতিস। সেটা কি আনন্দের হতো?’

দৃশ্যটা ভাবতে গিয়ে আমি শিউরে উঠলাম। রিক্ত বলে চলল,

‘তাছাড়া তোর ভালুকাইটিস হতে পারতো, কিংবা শেয়ালাইটিস, আর নাহলে হায়েনাইসিস। তুই মানুষ বা অন্য প্রাণি ধরে ধরে শিকার করতিস, কাঁচা কাঁচা খেতিস। ব্যাপারটা সুখের বলে কি মনে হচ্ছে তোর?’

আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম আমি। রিক্ত বুঝিয়ে বলল,

‘তার চেয়ে তোর এই হনুমানাইটিস অনেক ভাল। হনুমান তুলনায় অনেক নিরীহ জীব। মাছ-মাংস খায় না, ফলটল খায়। ভয়টয় দেখায় বড়জোর, কারো ঘাড়টার মটকায় না, কাউকে তেমন মারেধরেও না।’

আমার মনে হল, হনুমানাইটিস হয়েছে বলে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবা উচিত। ব্যাঘ্রাইটিস বা শেয়ালাইসিস্ না হওয়ায় বড় জোর বেঁচে গেছি। হতে পারত ওইসব রোগ, না হওয়ার কোন কারণ ছিল না। রিক্তর বক্তব্যে জোর যুক্তি রয়েছে। আমি কান পেতে তার কথা শুনতে লাগলাম। সে বলছিল,

‘পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষেরই ব্যাঘ্রাইটিস, শেয়ালাইসিস জাতীয় রক্তখেকো রোগ হয়। সর্পাইসিস, হায়েনাইসিস, ভালুকাইটিস ধরণের রোগেই ভোগে বেশির ভাগ মানুষ। দেখছিস না খেয়োখেয়ি, খুনোখুনি, মারামারি চলছে কী হারে? তার চেয়ে হনুমানাইটিস রোগটা তোর হল বলে নিজেকে ধন্য মনে করা উচিত। তুই অন্তত অন্য কারও ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খাবি না।’

‘তাহলে তুই বলছিস, হনুমানাইটিস রোগটি যাতে আমার মধ্যে পাকাপাকিভাবে থেকে যায় তার জন্য যত্ন নেওয়া উচিত? কী করব, হনুমানের পুজোটুজো করা ঠিক হবে কি? নাকি সারাদিন হনুমানের ছবিটবি দেখে যাব?’

সরলভাবে জানতে চাইলাম। রিক্ত বলল,

‘করলে ক্ষতি নেই। তবে ছাগল, ভেড়া জাতীয় অহিংস প্রাণিদের কথাও ভাবতে পারিস। যত এসব প্রাণির কথা বেশি ভাববি ততই তোর বিপদের ভয় কমে যেতে থাকবে। একটা কথা মাথায় রাখিস, তুই কিন্তু এখনও আউট অব ডেনজার হতে পারিস নি। সেইজন্যে তোকে বেশি করে সাবধানে থাকতে হবে।’

‘কেন, কেন?’

আশঙ্কার গলায় প্রশ্ন করলাম। রিক্ত জানাল,

‘কারণ তুই কেবল বাড়িতে থাকলেই একটা হনুমানের আন্ডারে চলে যাস। বাড়ির বাইরে গেলে হনুমানটা থাকে না। ওই সময়টা তোর ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনায়াসে তোকে সেসময় কোন হিংস্র প্রাণি দখল করে নিতে পারে। ঘরে তোর হনুমানাইটিস, বাইরে গেলে ব্যাঘ্রাইটিস, এমন হওয়া বিচিত্র নয়।’

‘এমন হয় নাকি?’

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। রিক্ত বলল,

‘প্রচুর হয়। বহু লোক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ার বা পোকামাকড়ের আন্ডারে থাকে। বিভিন্ন সময় তাদের চরিত্রের বিভিন্নতা প্রকাশ পায়।’

‘এমন যদি হয় তাহলে তো সত্যি খুব মুশকিল।’

আমার দুশ্চিন্তা হতে লাগল। মুখে নিশ্চয় তার আভাষ ফুটে উঠেছিল। রিক্ত তাই দেখে অভয় দিয়ে জানাল,

‘তবে তোর চিন্তা নেই। কার কী রোগ হবে, কে কোন্ জন্তু বা পোকামাকড়ের আন্ডারে যাবে তা তার স্বভাব-চরিত্রের ওপর নির্ভর করে অনেকটাই। তোর যেমন প্রকৃতি তাতে তোকে কোন হিংস্র বা মাংসাশি প্রাণি আশ্রয় করে তেমন মজা পাবে না। তোকে হনুমান, ছাগল, ভেড়া, বড়জোর শিংওলা গরু আশ্রয় করতে চাইবে। কুকুররাও তোর মত চরিত্রের লোককে এড়িয়ে যাবে। তোর ভয় নেই।’

আশ্বস্ত হওয়ার মত কথাই বটে। ভাবলাম, বাড়ি ফিরেই হনুমানের আরাধনা শুরু করে দেব। তাতে বিপদের ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যাবে। কিন্তু বাড়ি ফিরলে আমি নিজেই যে হনুমান হয়ে যাই, হনুমানের ভজনা করব কী করে? হনুমানত্ব ছাড়া আমিত্বের কিছুই যে ছাই বাড়ি ফিরলে মাথায় থাকে না! তাহলে একমাত্র উপায়, বাইরে যতক্ষণ থাকব সর্বক্ষণ কেবল হনুমানের নাম জপ করে যাব। তাতে বিপদ অবশ্যই দূর হবে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *