স্বপ্ননীল

ঝাঁকড়া চুলের মেঘটা একদিন তার ব্যাগের ভেতর ভরে নিয়ে যাচ্ছিল বৃষ্টি।
একটা রোগা ঢ্যাঙা ফর্সা নদী মেঘটাকে দেখে এক ঝটকায় ব্যাগটা টেনে ছিঁড়ে ফুটিফাটা করে দিল। বলল- এই ছোকরা তোর খুব দেমাগ না? বলে ফুটিফাটা ব্যাগটা ছুঁড়ে মারল তার গায়ে।


মেঘটা নতুন এসেছে শহরে। খুব ভয় পেল সে, নদীটাকে।

ছেঁড়া ব্যাগটা নিয়েই পা চালাল আরও জোরে।

দৌড়ে পালাচ্ছিল মেঘ। নদীটাও ধাওয়া করে ছুটছিল পিছন পিছন। ছেঁড়া ফাটা ব্যাগ থেকে তার বৃষ্টি গলে গলে পড়ছিল পথে।

নদীটা ভিজে যাচ্ছিল আরো। আরো জোরে জোরে ছুটছিল নদী। মেঘটা ক্রমশ ধীর। দম ফুরিয়ে আসছিল। নদীটা ভিজে তখন আরো শক্তিশালী। সে গতি বাড়ালো। একসময় সে মেঘটার সামনে সামনে চলে এলো। সামনে পেয়ে একেবারে রেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকের উপর। মেঘটা এবার আরো কাঁপছিল ভয়ে। শুকিয়ে কুঁকড়ে কাঠ। নদীটার ইচ্ছে করছিল মেঘের বুকটাকে ছিঁড়ে একদম ফালাফালা করে ফেলতে।

কিন্তু তার যেন হঠাৎ দয়া হল। সে মেঘটার দিকে করুণভাবে তাকাল। মনে হল সে খুব ভালো এবং নিরীহ। সে মেঘটার প্রতি যেন একটু দয়ালু হল। বলল- তুমি যদি আমার একটা কাজ করে দাও তবে তোমাকে আমি ছেড়ে দেবো।

কি কাজ?

নদী বলল- এই যে চারদিকে এতো ধূ ধূ মাঠ, তোমার মেঘ দিয়ে এদের তুমি ভাসিয়ে দেবে। আমি সেই ভেসে যাওয়া বুকে সাঁতরাবো। আরও শক্তিশালী হবো।

শুনে মেঘ বলল- তবে তো অনেক লোক ভেসে যাবে।

মেঘ তুমি খুব ভীতু তাই না? তুমি আগুনকে দেখে খুব ভয় পাও?

শুনে মেঘ বলল- তা কেন?

ভয় পাওনা?

না।

শুনে অমনি নদী মেঘটাকে তার বুকে আঁকড়ে ধরল। আরো উত্তাল উন্মাদ হয়ে উঠল নদী। পাড়ে এসে একটা একটা ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়তে থাকল। বলল- তোমার এই বুকটাতে থাকতে চাই মেঘ। এইখানে একটা আশ্রয় চাই। খুব নিবিড় হয়ে থাকতে চাই।

শুনে মেঘটা কেমন নরম হয়ে উঠল। যেমন করে ঘনীভূত হয়ে ঠাণ্ডা হয়, সে তার নরম বুকটাকে নদীর জন্য প্রসারিত করে দিল।

সে এখন ঘন ঘন মেঘের গর্জন আর প্রবল বৃষ্টি। অন্যদিকে ফুলে ফেঁপে ভরাট হয়ে উঠছে ঋতুমতী নদী। ভিজে সপসপে শাড়ীতে তাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে এখন। এখন আর সে খটখটে ফুটিফাটা মাঠ নয়। নরম একখানি নদী।

ঝাঁকড়া চুলের মেঘটা রোগা ঢ্যাঙা ফর্সা নদীটাকে বুকে জড়িয়ে তার খোঁপায় ফুল গুঁজে কপোলে একটা চুমু দিল। নদী বলল- তোমায় এখন খুব সুন্দর দেখাচ্ছে মেঘ। তুমি আর এখন সেই উসকো খুসকো ঝাঁকড়া চুলের মেঘ নয়, রাজপুত্রের মতো, খুব সুন্দর। শুনে মেঘ বলল, আর তুমিও ঠিক যেন বৃষ্টিফুলমেয়ে।

নদী বলল- চলো, আজ আমরা মাঠের ফসল হয়ে কোন কৃষকের ঘরে যাই। সবুজে সবুজে ভরিয়ে দিই ঘর। আনন্দে ওরা তোমায় মেঘ বলে ডাকবে, ওদের প্রিয় মেঘ। আর আমাকে—তোমার বৃষ্টিফুলনদী।    

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *