বিদিশা বসু
কিন্নর – কৈলাসের পথে
দ্বিতীয় পর্ব
তৃতীয় দিন–সাংলা থেকে ছিটকুলের পথে…
সাংলা ভ্যালি থেকে মাত্র ২৩ কিমি মত দূরত্বে কিন্নর জেলার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা… ছিটকুল। বছরের একটা বড় সময় বরফাবৃত থাকে এই ইন্দো- তীব্বতীয় সীমানার শেষ গ্রাম। সাংলা থেকে বেড়িয়ে ছিটকুলের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথেই পড়ে হিমাচলের আরেকটি সুন্দর ছোট গ্রাম রাকসাম। যত পথ এগিয়েছি ছিটকুলের দিকে,ততই পথের নৈসর্গিক দৃশ্য বদলাতে শুরু করে। পাহাড়ি বাঁকে পাথুরে ভাব স্পষ্ট, পাহাড়ের সবুজ সজীবতা কমে এক অন্য সৌন্দর্য দেখা দিচ্ছিলো। আর প্রতিটা বাঁকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কৈলাসের বরফ মোড়া চূড়া কাছে চলে আসছিলো।

ছিটকুলে ঠান্ডা হাওয়া এই বার্তা বহন করছিল যে, এখানে বিকেলের পরে আবহাওয়া প্রবল শীতল হবে। অধিকাংশ ভ্রমণার্থী সাংলা থেকে একবেলার জন্য ঘুরে আবার সাংলাতেই রাত্রিবাস করেন। এই প্রবল শৈত্যে রাতে থাকাটা বেশ কঠিন, আমি নিজেও ভীষণ শীতকাতুরে,তাই খুব চিন্তায় ছিলাম এখানে সারারাত কাটাবো কি করে!! বাসপা নদীর তীরেই আমাদের সেদিনের থাকার জায়গা “Sama resort – chitkul heights” ছিল। দুপুরবেলা হোটেলে চেক ইন করে তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে বেড়িয়ে পড়লাম ইন্দো -চীনা বর্ডারে। যা হোটেল থেকে ৩কিমি মত দূরত্বে ছিল। সেখানেই চোখে পড়লো নানা রকম টেন্টে থাকার ব্যবস্হা এবং ট্রেকার সহ নানা বাইকারদের যাতায়াত। ইন্দো তিব্বতিয়ান বর্ডার পোলিশ (ITBP) পরিচালিত এই অঞ্চলে গেট দিয়ে বাইরের দর্শকদের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুলিশের সাথে কথোপকথন থেকে এটা বুঝলাম যে,অনেক আগে এখান থেকে ভিতরে যেতে দেওয়া হত ভারত – চীন বর্ডার দেখাতে। কিন্তু পরবর্তীতে টুরিস্টদের মোবাইল ক্যামেরা এবং সোস্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের ফলে এখানকার গোপনীয়তা বজায় রাখা মুসকিল হচ্ছিল। তাই আমাদের ঐ বর্ডারের দিকে ITBP এর সেনা ছাউনির ছবি তুলতেও নিষেধ করলেন।একমাত্র উপর মহল থেকে জেলা শাষকের অনুমতিপত্র থাকলে তাদের ওঁনারা বর্ডারের দিকে যেতে দেন, তাও যথাযথ নিরাপদ ব্যবস্হায়। অগত্যা,ঐটুকু সীমানা দেখে ভারতের শেষ প্রান্তের রূপ দর্শন করে ফিরে এলাম আমাদের হোটেল সংলগ্ন বাসপা নদীর তীরে।

বাসপা নদীর পাড়ে সেদিন প্রায় ১.৫ ঘন্টার উপর কাটিয়ে আমরা হোটেলে প্রায় সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে এসেছিলাম। পাহাড়ি খরস্রোতা নদী সহ দূরে কৈলাস পর্বতের শোভা আর নদীতীর জুড়ে পাইন বনের বাহার… ছিটকুলের রূপকে অপরূপা করেছিলো। সময় বয়ে যাচ্ছিলো যত সূর্য ডোবার পালাও তত এগোচ্ছিলো,সেই সাথে ঠান্ডার বহর বাড়ছিল শীতল হাওয়ার সাথে। তাই আমরা বিকেল ৫-৫.৩০ টায় আমাদের হোটেলের ঘরে চলে আসি। কিন্তু ঘরটি অবস্হানগতভাবে সম্পূর্ণ পাহাড়ের সামনে। তাই ব্যালকনি বাদেও ঘরের কাঁচের জানলা থেকে কম্বল মুড়ি দিয়ে দেখলাম সূর্যের আলোর রকমারি কারুকার্য। সূর্য ডুবতে ডুবতে একফালি রক্তিম আলো পাহাড়ের চূড়াতে রেখে যখন এক মুহূর্তে ডুবে গেল,তখন চোখের সামনে সম্পূর্ণ পাহাড়টি সাদা কালো ছবির মত হয়ে গেলো।
সন্ধ্যা নামার পরে চারদিকে এক নৈশব্দ ঘিরে ধরলো ঐ ছোট্ট গ্রাম জুড়ে। ঠান্ডায় জমতে জমতে রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে ছিলাম। ভারী কম্বলের মধ্যেও শীতপোষাকে নিজেদের মুড়ে সকালে ঘুম ভাঙলো যখন চারদিকে শীতের আস্তরণ। সামনের রাস্তায় নর্দমার জল জমে আগাছাগুলো বরফ হয়ে ছিল। বোঝা যাচ্ছে রাতে তাপমাত্রা শূন্যর নীচে ছিল।
ছিটকুলে একদিন থাকার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। ঠান্ডার অনুভূতি ও সূর্যাস্তে পাহাড়ের অপরূপ শোভা দেখতে এবং সকালের ঝকঝকে রোদে নদীর পাড়ের শীতল অনুভূতি নিতে হলে এখানে একরাত্রি থাকাটা জরুরি। তবে হ্যাঁ, হোটেল সহ থাকা খাওয়ার ব্যবস্হা নিয়ে কিছুটা হলেও নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে যে, খুব আরামদায়ক নয় এবং সবরকম উপকরণ এখানে পাওয়া যাবে না।
পরের দিন সকালে তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
চতুর্থ দিন —ছিটকুল থেকে কিন্নর সুন্দরী কল্পার পথে….
কিন্নর জেলার সদর শহর রিকং পিও র একটি ছোট অংশ এই কল্পা,যেখানের প্রায় সব জায়গা থেকে কিন্নর কৈলাস পর্বতের বরফাবৃত শৃঙ্গ দেখা যায়। ছিটকুল থেকে সকাল ৯ টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট করেই বেড়িয়ে পড়েছিলাম কল্পার উদ্দেশ্যে। সাংলা রোড ধরে প্রায় ৬২ কিমি দূরে কল্পার পাহাড়ি রাস্তায় পৌঁছাতে ৩ ঘন্টা মত সময় লাগবে। ছিটকুলের ঠান্ডা থেকে প্রায় পালিয়ে আসার জন্য তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়া,তাই হাতে সময় থাকায় সাংলা শহরের সম্মুখে কামরু ফোর্ট ঘুরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। ফোর্টে যাওয়ার রাস্তার মুখে শুনলাম প্রায় ২ কিমি খাড়াই রাস্তা অনেকে ট্রেক করে পায়ে হেঁটে যান। কিন্তু আমার অসুবিধা থাকার কারণে ড্রাইভার দাদা গাড়ি উপরে নিয়ে গেছিলেন।এবার গাড়ি চলাচলের রাস্তা পেরিয়ে ফোর্টে যাওয়ার হাঁটাপথ আপেল বাগানের মধ্যে,সিঁড়ি বেয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পরে ফোর্টের দরজার সামনে এলাম। তবে রাস্তায় যাওয়ার সময়ই বুঝলাম এ পথে এখন তেমন কোন টুরিস্ট আসে না, অযত্নের ছোঁয়া সর্বত্র। একজন লেডি পুলিশ আমাদের খালি পায়ে ভিতরে আসতে বললেন,এখানের মন্দিরের নিয়ম অনুযায়ী সবাইকেই মাথায় টুপি এবং কোমরবন্ধ মত একটা ফিতে বেঁধে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। মন্দিরের বাইরে এই হিমাচলী টুপি এবং রঙিন ফিতে রাখা ছিল। ঐ মহিলা আমাদের সঙ্গে ভিতরে ঢুকে সব দেখালেন। তবে কামরু ফোর্টের ভিতরে যাওয়া নিষিদ্ধ। ফোর্টের কাঠের পাটাতন সহ পুরো কাঠামো প্রায় ভগ্নপ্রায়। ওখানে উপবিষ্ট কামাখ্যা দেবীর মন্দির দর্শন করে আমরা ফিরে এলাম।

এরপর কল্পার পথে যত এগোতে লাগলাম,সামনে কৈলাস পর্বত যেন এগিয়ে আসতে লাগলো। সদর শহর পিও বেশ বড় এবং এখানে সব রকমের অফিস দোকান দরকারি জিনিসের ব্যবস্হাপনা নজরে এলো। আমাদের এই দুইদিনের থাকার ব্যবস্হা ছিল হিমাচল প্রদেশ টুরিজম ডিপার্টমেন্টের ” কিন্নর কৈলাস হোটেল “এ।কল্পায় থাকার সবচেয়ে ভালো দুটো হোটেলের মধ্যে এটিই সেরা, আমার মতে। এখানে প্রতিটা ঘরের জানলা থেকেই সামনে কৈলাস পর্বতের সুবিশাল বিস্তৃতি নজরে আসে। আমাদের রুমটা আরও মেন বিল্ডিংয়ের সামনের দিকে হওয়ায় অসম্ভব ভালো একটা অনুভূতি হচ্ছিল। এই ট্রিপে এই দুটো দিন শান্তিতে বিশ্রাম নিয়ে বসে বসে কিন্নরের সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলাম।
দুপুরে লাঞ্চ করতে গিয়ে আরও ভালো অভিজ্ঞতা হয়… খাবার টেবিলের সামনেই মনে হচ্ছে পাহাড়ের চূড়া। এমন সুন্দর জায়গায় বসে খাওয়ার সৌভাগ্যও মনে রাখার মত। হোটেলের পাশের রাস্তা জুড়ে আপেল বাগান৷ সেখানে দলে দলে নারী পুরুষ ভেদে শ্রমিকেরা রাতদিন বাগানের কাজে যাচ্ছে পিঠে ঝোলা নিয়ে৷ সারারাত ধরে ওখানে আপেল তোলা এবং প্যাকেটিং এর কাজ হয়। নীচে গাড়িতে তোলা হয়। কাজ করতে আসা স্হানীয় মানুষের দল রাতে টর্চ জ্বালিয়ে গল্প করতে করতে পাহাড়ি রাস্তা ধরে ঐ ঠান্ডায় উপরে বাগানে যাচ্ছে… সে দৃশ্যও অন্য এক কাজের জগতের পরিচয় করালো।
কল্পাতে বিখ্যাত হলো সুইসাইড পয়েন্ট। পাহাড়ের কিনারে এমন একটা জায়গা যেখান থেকে নীচে তাকালে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়!! কিন্তু সেই পাহাড়ের চারপাশের রূপ ভয়ঙ্কর সুন্দর। মুহূর্তের ভুলে কোন কোণে এলে যখন তখন বিপদ হতে পারে জেনেও এই অপার সুন্দরের আহ্বানে ঐ জায়গা আকর্ষণ করবেই। তবে প্রশাষন থেকে রেলিং দিয়ে রাস্তার পাশে বিপদের সংকেত দিয়ে রেখেছে। এছাড়া আছে… রোগি গ্রাম। কৈলাস পাহাড়ের সবচেয়ে ভালো দর্শন এই গ্রামের প্রতিটা কোণায়। আপেল বাগান কেন্দ্রিক এই গ্রাম হেঁটে, পাশে বরফ মোড়া শৃঙ্গকে সাথে নিয়ে গাছ থেকে আপেল পেড়ে খাওয়ার মধ্যে এক স্বর্গীয় সুখ ছিল। এছাড়া প্রাচীন প্রায় ৫০০০ বছরের নারায়ণ – নাগিন মন্দির, হু বু লান কার মনেস্ট্রি সহ কল্পার মন্দির সব একজায়গায়।
এ বাদেও পাইন ফরেস্টে বিকেলের দিকে ঘুরে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আনন্দ উপভোগ করা যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত ছোট একটা দুর্ঘটনার কারণে আমরা এই দুইদিনে কিছু জায়গায় কম সময় নিয়ে ঘুরে হোটেলে সময় কাটিয়েছি বেশি। কিন্তু এই হোটেল এবং আমাদের থাকার ঘরটিই যথেষ্ট ছিল কল্পার সৌন্দর্যকে উপভোগ করার জন্য। সকালে সূর্যের আলোতে ঝলমলিয়ে ওঠা পাহাড়ের রূপ হোক কিংবা বিকেলে কালো মেঘের আড়ালে পাহাড়ের চূড়াতে বরফ পড়ার দৃশ্য… ঘরে বসে বসে দেখেছি। দুইদিন দারুণ কাটিয়ে পাশের আপেল বাগানে ঘুরে, মুখরোচক খাবার খেয়ে কৈলাস থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। প্রতিভাস ম্যাগাজিন