দীপান্বিতা
এডগার অ্যালান পো
রহস্য কাহিনীর লেখক হিসেবে তার খ্যাতি সর্বাধিক। মার্কিন মুলুকে ছোট গল্প যাঁরা প্রথম লিখতে শুরু করেছিলেন তিনি তাঁদের অন্যতম। গোয়েন্দা কাহিনী লেখার সূত্র আপাত ঘটেছিল তাঁর হাত থেকেই। আবার সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞান ধারাটিরও সূচনা তিনি ঘটিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। লেখাকে ভিত্তি করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা আমেরিকান লেখকদের মধ্যে প্রথম তিনিই করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে অগ্রণী হতে গিয়ে সারা জীবন তাঁকে অসম্ভব আর্থিক কষ্ট ও অসম্মান ভোগ করতে হয়েছিল।

মা এবং বাবা দুজনেই ছিলেন অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বোস্টন শহরে তার জন্ম। এক বছর বয়সের সময় বাবা ছেড়ে চলে যান এবং দু’বছর বয়সের সময় মা মারা যান যক্ষা রোগে। এক সফল স্কটিশ ব্যবসায়ী ও তার স্ত্রী তাঁকে মানুষ করার দায়িত্ব নেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি নামের সঙ্গে অ্যালান শব্দটি পেয়ে যান। পড়াশোনা করতে পো ভর্তি হন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এ সময় একটি মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পালক পিতার সঙ্গে তাঁর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। পরে ওই মেয়েটির সঙ্গেও সম্পর্ক ভেঙে যায়। যথেষ্ট ঋণগ্রস্থ হয়ে তিনি বোস্টন শহরে গিয়ে কেরানীগিরি থেকে সংবাদপত্রের লেখক হিসেবে কাজ করতে থাকেন।
ক্রমশ জীবিকা নির্বাহ কষ্টকর হয়ে যাওয়ায় তিনি বয়স গোপন করে সৈন্য দলে নাম লেখান। প্রকৃত বয়স ১৮ হলেও খাতায় লেখান ২২ এবং মাস মাইনে পান পাঁচ ডলার। ওই বছরই তার প্রথম একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়, কিন্তু সেটি চূড়ান্ত ব্যর্থ। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সৈন্যদল ছেড়ে দেন।
পালক পিতার সঙ্গে অশান্তি বাড়তে থাকে ও সমস্ত সম্পত্তি থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়। কিছুদিন নিউইয়র্কে কাটিয়ে তিনি বালটি মোড়ে চলে আসেন। সেখানে মাসি ও তাঁর দুই ছেলে মেয়ের সঙ্গে বসবাস করতে থাকেন। পো নিজেকে পেশাদার লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় মেতে ওঠেন। মার্কিন গুলোকে তখন লেখকদের বিশেষ মর্যাদা ছিল না। প্রকাশকরা দেশীয় লেখকদের তুলনায় ব্রিটিশ লেখকদের লেখা প্রকাশে বেশি আগ্রহ দেখাতো। লিখে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে তাকে অনবরত হেনস্থা ও অপমান ভোগ করতে হচ্ছিল।
কবিতা ছেড়ে তিনি গদ্য রচনায় মন দেন। একটি ছোট গল্প লিখে এ সময় তিনি পুরস্কার পান ও কিছুটা পরিচিত হন। সেই সুবাদে সহকারী সম্পাদকের কাজ পেলেন একটি সাহিত্য পত্রিকায় কিন্তু মদ্যপানের অভিযোগে অল্প দিনের মধ্যেই কাজ হারালেন। এসময় তিনি গোপনে বিয়ে করেন মাসতুতো বোন ভার্জিনিয়াকে। বরখাস্ত হওয়া পত্রিকাটিতে ভালোভাবে চলার কথা দিয়ে আবার তিনি কাজ ফিরে পান। বছর দুয়েক কাজ করার সুবাদে ওখানে কিছু কবিতা, গল্প ও সমালোচনা মূলক রচনা তিনি প্রকাশ করেছিলেন।
দ্য ন্যারেটিভ অফ আর্থার গর্ডন পিম বইটির প্রকাশ তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। অল্পদিনের মধ্যেই দুটি ভলিউম এ প্রকাশিত হয় আরেকটি উপন্যাস। খ্যাতি বাড়লেও রোজগার বিশেষ বাড়ে না। এই সময় স্ত্রী ভার্জিনিয়া যক্ষা রোগে আক্রান্ত হন। হন্যে হয়ে কাজের সন্ধান করে যান এখানে সেখানে। অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। প্রচন্ড চাপে যথেচ্ছ মদ্যপান করতে থাকেন। এ সময় বিখ্যাত কবিতা দা রাভেন প্রকাশিত হয় এবং তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু কবিতা লিখে পেয়েছিলেন মাত্র ৯ ডলার।
অল্পদিনের মধ্যেই ভার্জিনিয়ার মৃত্যু হয় এবং তাঁর জীবন আরো ছন্নছাড়া হয়ে ওঠে। পরপর দুটি জায়গায় তিনি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাত্রীদের কাছে প্রত্যাখ্যান পান।
তাঁর তখন ৪০ বছর বয়স। এ সময় একদিন বাল্টিমোরের রাস্তায় অসুস্থ ও অজ্ঞান অবস্থায় জনৈক ব্যক্তি তাকে পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে ভর্তি করেন এবং সেখানে চার দিনের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিভাবে এমন শোচনীয় অবস্থা ঘটেছিল সেটা জানা যায়নি। রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় তাঁর গায়ের পোশাক নিজের ছিল না। পরবর্তী সময়ে ডেথ সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে সমস্ত ডাক্তারি রিপোর্ট হারিয়ে গিয়েছিল। কিভাবে বা কী কারণে মৃত্যু হয়েছিল সেটা আজও রহস্যাবৃত।
মাত্র ৪০ বছর পরমায়ু হলেও সাহিত্য জগতে তিনি আশ্চর্য কীর্তি রেখে গেছেন। তাঁর অনেক রচনায় মৃত্যু ও সেই সম্পর্কিত রহস্যকে ঘিরে। সাহিত্যের সমস্ত শাখায় তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন। সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও এক বিশেষ মাত্রা তৈরি করে গেছেন। ডিটেকটিভ সাহিত্যের ভিত্তি প্রস্তর তিনি রচনা করেছিলেন একথা স্বীকার করেছেন শার্লক হোমসের স্রষ্টা কোনান ডয়েল। সায়েন্স ফিকশনের জগতেও তিনি অবিস্মরণীয়। তাঁর লেখায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জুলেভার্নে এবং এইচ জি ওয়েলস্। সমস্ত দিক দিয়েই তিনি ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
