দীপান্বিতা
ডোরিস লেসিং
সাহিত্যে ২০০৭ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ডোরিস লেসিং। পারস্য বা ইরানজাত ব্রিটিশ লেখিকা। বিংশ শতাব্দীর সমাজ ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তন-এর আওতাভুক্ত মানুষ তাঁর অধিকাংশ রচনার উপজীব্য। তাঁর সাহিত্যকর্মে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে নারীবাদ, সামগ্রিকতার সন্ধানরত ব্যক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিপত্তি। পূর্বতন রোডিসিয়া বা এখনকার জিম্বাবোয়েতে তাঁর পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা। এজন্য ১৯৪৯ থেকে তিনি ইংল্যান্ডের বাসিন্দা হওয়া সত্বেও তাঁকে আফ্রিকান লেখক হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
বর্তমান ইরানের কারমানশাতে ডোরিস লেসিং তাঁর শিশুকাল কাটিয়েছিলেন। ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অফ পার্সিয়াতে তাঁর বাবা আলফ্রেড কুক টেলার ছিলেন একজন কেরানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর একটি পা খোওয়া যায় এবং স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ে। মায়ের ছিল নার্সদের ট্রেনিং। যুদ্ধের পর টেলর পরিবার কারমানশাতে চলে আসে, পরে যায় ইরানে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ রোডেশিয়ার লোমাগুন্ডি অঞ্চলের ব্যাঙ্কেট জেলায় পরিবারটি সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করে একটি কৃষি খামার কেনে। সেখানে ছোট ভাই হ্যারির সঙ্গে ডোরিস বড় হতে থাকেন। ছোটবেলাটা লেখিকার বেশ নিঃসঙ্গ অবস্থাতেই কাটে। কৃষি খামারের ধারেকাছে কোন প্রতিবেশী ছিল না। খামারগুলিতে রাস্তাঘাটের যোগাযোগও ছিল অপ্রতুল।
পূর্বতন স্যালিসবারি বা বর্তমান হারারেতে লেসিংকে ১৯২৬ সালে একটি কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করা হয়। সেখানে রোমান ক্যাথলিক শিক্ষকরা তাঁর পারিবারিক প্রোটেস্ট্যান্ট বিশ্বাসকে টলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ডোরিস প্রচন্ডভাবে গৃহকাতর হয়ে পড়েন। ১৪ বছর বয়সে হাই স্কুল ছাড়ার পর তিনি আয়া, টেলিফোন অপারেটর ও কেরানি হিসেবে কাজ করেছিলেন। ফ্র্যাঙ্ক উইশডম নামে এক সরকারি চাকুরেকে ১৯ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন। তাঁদের দুটি সন্তান জন্ম নেয়। কয়েক বছর পরই তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। কিছুকাল লেসিং রোডেশিয়াতে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর জীবনের এই সময়কাল প্রতিফলিত হয়েছে পাঁচ ভলিউম-এর চিলড্রেন অফ দা ভায়োলেন্স সিকুয়েন্সের আ রিপল ফ্রম দা স্টর্ম খন্ডে। লেসিং ১৯৪৩ সালে সক্রিয় জার্মান রাজনীতিবিদ গটফ্রিড লেসিংকে বিয়ে করেন যিনি ছিলেন রোডেশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির এক সদস্য। আ রিপল ফ্রম দা স্টর্ম খন্ডের অ্যান্টন হেস তাঁরই আদলে চিত্রিত। আবার দ্য গোল্ডেন নোটবুক-এর উইলি রোডেও মডেল তিনি। পরে গটফ্রিড লেসিং উগান্ডাতে জার্মান রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে ইদি আমিনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হলে গটফ্রিড ও তাঁর তৃতীয় স্ত্রীকে হত্যা করা হয়।
ডোরিস লেসিং-এর দ্বিতীয় বিয়েটি অসফল হলে ১৯৪৯ সালে তিনি কনিষ্ঠ পুত্র ও প্রথম উপন্যাসের পান্ডুলিপি নিয়ে ইংল্যান্ড চলে আসেন। ১৯৫০ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। নাম ছিল দা গ্রাস ইজ সিঙ্গিং। পটভূমি রোডেশিয়া। মেরি টার্নার নামে দরিদ্র ও শ্বেতকায়া খামারের মহিলা ও তার অক্ষম স্বামীর গল্প। মেরির সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার আফ্রিকান ভৃত্য মোজেসের সঙ্গে। শেষে ওই ভৃত্যের হাতেই মেরি খুন হয়।
১৯৫০ সাল থেকে ছেলে ও নিজের জীবিকা লিখে অর্জন করতে থাকেন লেসিং। মধ্যপঞ্চাশে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে তাঁর মোহভঙ্গ ঘটে ও তিনি দল ছেড়ে দেন। সুফিজম নিয়ে তাঁর মধ্যে আকর্ষণ গড়ে ওঠে। এ বিষয়ে শিক্ষা নিয়ে প্রায় এক লক্ষ ডলারের এক সুফি ট্রাস্ট করে তোলেন তিনি।
বহু সমালোচকই মনে করেন যে মার্থা কোয়েন্টকে নিয়ে আধা-আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসগুচ্ছ চিলড্রেন অফ ভায়োলেন্স হল ডোরিস-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। শেষ ভলিউম ফোর-গেটেড সিটি দিয়ে এই উপন্যাসরাজির সমাপ্তি যেখানে বিংশ শতাব্দীর শেষে এক বিধ্বস্ত পৃথিবীতে মার্থার মৃত্যু হয়। উপন্যাস ছাড়াও লেসিং কবিতা নাটক ও সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন। তাঁর ডায়েরি অফ আ গুড নেবার এবং দ্য ওল্ড কুড প্রকাশিত হয়েছে জেন সামার্স নামে যেখানে অখ্যাত লেখকদের সমস্যা বোঝানো হয়েছে। তাঁর বহু আলোচিত ও অনূদিত অন্য একটি লেখা হল দ্য গোল্ডেন নোটবুক। এই পরীক্ষামূলক উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর অভিনন্দন পেয়েছে নারী আন্দোলনের এক স্তম্ভ হিসেবে। এখানে আছে অ্যানা উল্ফ নামে এক মহিলা লেখকের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা। আত্মসচেতনতার ঢঙ্গে লেখা ব্রিফিং ফর আ ডিসেন্ট ইনটু হেল আর সামাজিক ভাঙ্গনের বর্ণনায় নির্মিত মেমোয়ার্স অফ আ সারভাইভার। শেষের উপন্যাসটি নিয়ে ছবি করেছেন পরিচালক ডেভিড গ্ল্যাডওয়েল। এক সন্ত্রাসবাদী বামপন্থীকে নিয়ে লেখা দা গুড টেরোরিস্ট উপন্যাসে দেখানো হয়েছে যে আদর্শবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে দূরত্ব খুবই কম। এক নাট্যদলের মহিলা ম্যানেজারের কথা আছে লাভ এগেইন উপন্যাসে। মেরি শেলীর বিখ্যাত রচনা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-এর এক নতুন রূপ দা ফিফ্থ চাইল্ড, যেখানে একটি পরিবার বিধ্বস্ত হয়ে গেল পঞ্চম সন্তানটি দানব হয়ে জন্মানোর পর। লেখিকার জিম্বাবোয়ে সফরের ওপর ভিত্তি করে আফ্রিকান লাফটার লেখা। হাজার বছর পর অ্যাডভেঞ্চার ও হিংসায় ভরা পৃথিবীতে দুই ভাইবোনের কাহিনী মারা অ্যান্ড ডান, যার সিকোয়েন্স হল দ্য স্টোরি অফ জেনারেল ডান অ্যান্ড মারাস ডটার। অন্যদিকে মিষ্টি পারিবারিক কাহিনী দা সুইটেস্ট ড্রিম, যেখানে ফ্রান্সেস লিনাক্স তার পূর্বতন স্বামী ও দুটি ছেলেকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে সামিল।
লেখিকার আত্মজীবনী আন্ডার মাই স্কিন-এর প্রথম ভলিউম বর্ণনা করে জিম্বাবোয়েতে তাঁর ছোটবেলার কথা। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ সালের কথা রয়েছে ওয়াকিং ইন দা শেড বইতে। তাঁর বাবা-মায়ের গল্প আছে আলফ্রেড অ্যান্ড এমিলি বইটির দ্বিতীয় অংশে, আর প্রথম অংশে কল্পনা করা হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ না ঘটলে তাঁদের জীবন কেমন হত। প্রতিভাস ম্যাগাজিন