প্রীতন্বিতা
সৌরজগতের সৃষ্টিতত্ত্ব কি ভুল
সৌরজগৎ সৃষ্টির প্রচলিত ধারণা কি সত্যি নয়?
সৌরজগৎ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল সে সম্পর্কে আমাদের প্রায় সবারই কিছু না কিছু ধারণা আছে। সৌর পরিবারের পরিচয়টাও আমরা কমবেশি জানি। সূর্য পরিবারের কেন্দ্রীয় চরিত্র, তাকে ঘিরে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণরত গ্রহগুলি। আবার গ্রহদের অনেকেরই আছে এক বা একাধিক উপগ্রহ। এই হল সৌরজগতের মূল সদস্যবৃন্দ।এছাড়া এখানে আছে উল্কাপিণ্ড বা উল্কাপিণ্ডের পরিবারে মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসে ধূমকেতুরা।
এতদিন এই পরিবারের দূরবর্তী গ্রহ হিসেবে বিবেচিত হত প্লুটো। ইদানিং প্লুটো তার গ্রহত্বের মর্যাদাচ্যুত হওয়ার পর নেপচুনকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত বলে ভাবা হয়। কিন্তু এই পরিবারের সীমানা এখানেই শেষ নয়। সৌরজগতের শেষ সীমানা ক্যুইপার বেল্ট বলে এক বৃত্তাকার ক্ষেত্র যার উপস্থিতি ১৯৯২ সালে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ক্যুইপার বেল্ট কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, বা কী এর উপাদান?

নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত ক্যুইপার বেল্ট আসলে শিলাখণ্ড জাতীয় বস্তু সমন্বয়, যা মনে করা হয় যে সৌরজগৎ সৃষ্টির প্রক্রিয়াজাত অবশেষ এবং এখান থেকেই বহু ধূমকেতু জন্ম নেয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী কয়েক শ কোটি বছর আগে সূর্যের পাশ দিয়ে একটি বড় ধরনের তারকা চলে যাওয়ার সময় এই ক্যুইপার বেল্ট তৈরি হয়েছিল যা আসলে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নানা বস্তু সমন্বয়ের এক প্রসারিত ডিস্কের আকৃতি পায়। এই বড় তারকাটির মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত প্রচন্ড ছিল যে বস্তুগুলিকে বৃত্তাকার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করে দিতে পেরেছিল। কিন্তু তবুও ওই আকর্ষণ তাদের সূর্যের বন্দীদশা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করে দিতে পারেনি। ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই-এর বিশেষজ্ঞ ডেভিড জেউইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যুইপার বেল্টে অন্তত ৭০ হাজার শিলাখন্ড রয়েছে যাদের ব্যাস ১০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি এবং এদের অধিকাংশই ৩০ থেকে ৫০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট বা এ ইউ দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত। প্রসঙ্গক্রমে, এক এ ইউ হল সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দূরত্ব যা মোটামুটি ১৫কোটি কিলোমিটার বা ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল। ৫০ এ ইউ-এর বাইরে ক্যুইপার বেল্ট প্রায় শেষ এবং খুব কম বস্তুই সেখানে বর্তমান। যারা আছে তাদের কক্ষপথ পরিক্রমায় রয়েছে বড়ই খামখেয়ালীপনা, একেবারেই তাতে নেই বৃত্তাকার চেহারা। এসব খামখেয়ালী পরিক্রমণ পথ আসলে নেপচুন গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিজনিত বিক্ষেপের ফল।
সাম্প্রতিক এক রহস্যজনক আবিষ্কার কিন্তু এসব ধারণার মূল ধরে নাড়া দিয়েছে। সন্দেহ দেখা দিয়েছে, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া তারকার টানে ক্যুইপার বেল্ট সৃষ্টি হওয়ার তত্ত্বটিতেও। কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা গভীর মহাকাশে সৌরজগতের প্রায় বাইরে এক শিলাগঠিত বস্তুপিণ্ড খুঁজে পেয়েছেন যা সৌরজগৎ সৃষ্টির মূল তত্ত্বকে যথেষ্ট ধাক্কা দিয়েছে। এই বস্তুপিণ্ডটির ডাকনাম দেওয়া হয়েছে বাফি .প্রথমে এর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন কানাডাস্থিত ইউনিভারসিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিজ্ঞানী লিন অ্যালেন নামে এক ভদ্রমহিলা। প্যারিসের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিয়নের দেওয়া বাফির সরকারি নাম আসলে ২০০৪ এক্স আর ১৯০।
বাফি কিভাবে সৌরজগৎ সৃষ্টির প্রচলিত তত্ত্বে নাড়া দিয়েছে?
নেপচুন থেকে সূর্যের যা দূরত্ব বাফি সূর্য থেকে তার দ্বিগুণ দূরে রয়েছে এবং আয়তনে প্লুটোর প্রায় অর্ধেক। ঠিক ঠিক হিসেব অনুযায়ী বাফির এমাথা থেকে ওমাথা ৫০০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার আর সূর্যকে একবার ঘুরে আসতে এর লেগে যায় প্রায় ৪৪০ বছর। কিন্তু এগুলি কোনটাই তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাফি মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে শোরগোল ফেলে দিয়েছে তার অবস্থানগত এবং কক্ষপথের বিশেষ হেলানো ভঙ্গিমার কারণে। সৌরজগতের সৃষ্টি ও তার প্রাথমিক অবস্থার ইতিহাস সম্পর্কেই বাফি সন্দেহ এনে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা ভাবতে বসেছেন নতুন করে, ক্যুইপার বেল্ট কিভাবে তৈরি হয়েছিল? এটা কি তবে সৌরজগৎ সৃষ্টির অবশেষ নয়? সত্যি কি তাহলে কোন তারা পাশ দিয়ে চলে যায়নি সৌর পরিবারের?
বাফি বর্তমানে সূর্য থেকে ৫৮ এ ইউ দূরে। হিসেব করে দেখা গেছে যে এর কক্ষপথ সূর্য থেকে ৫২ এবং ৬২ এ ইউ-এর মধ্যে, এর বেশি হয় না কখনো। ক্যুইপার বেল্ট থাকা কোন বস্তুর ক্ষেত্রে এমন কক্ষপথ থাকাটা কিন্তু বেশ আশ্চর্যের। ক্যুইপার বেল্টের শেষ সীমায়ে রয়েছে সেডনা নামে এক বস্তুপিণ্ড যা সূর্য থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ এ ইউ দূরে এবং খুব কাছে এলে তার দূরত্ব দাঁড়ায় ৭৬ এ ইউ।
সেডনার মত অন্য সব ক্যুইপার বেল্টস্থিত বস্তুখন্ডের কক্ষপথও কিন্তু অনেকটাই এমন। তুলনায় দেখা যাচ্ছে, বাফির কক্ষপথ অনেকটাই যেন বৃত্তাকার, কক্ষপথের দূরতম বিন্দুটিও তত বেশি দূরে অবস্থিত নয়। অন্যদিকে বাফির কক্ষপথের নিকটতম বিন্দুটিও ৫০ এ ইউ-এর কম হয় না। সব মিলিয়ে কক্ষপথের চেহারাটা প্রায় বৃত্তাকার। শুধু তাই নয়, বাফির কক্ষপথ সমগ্র সৌরমন্ডলের দিকে ৪৭ ডিগ্রী কোণে আনত। বাফির এভাবে ঝুঁকে থাকাটাও একেবারেই অস্বাভাবিক, বিশেষ করে তার মত বস্তুর ক্ষেত্রে। বাফির এই হতবুদ্ধিকর কক্ষপথ ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না এতদিন ধরে প্রচলিত সৌরজগতের বাইরের অংশ তৈরি হওয়ার তত্ত্বের সাহায্যে। হয় এই তত্ত্ব পাল্টাতে হবে আর নয়তো বাফির এই বিভ্রান্তিকর কক্ষপথের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রচলিত তথ্য থেকে আবিষ্কার করা দরকার। একটা সম্ভাবনার কথা ভেবে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অবশ্য কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা বলছেন যে সৌরজগতের শৈশবে অস্থির নেপচুন সূর্যের খুবই কাছে ছিল। পরবর্তীকালে নেপচুন বাইরের দিকে চলে যায় এবং এই প্রক্রিয়ায় ক্যুইপার বেল্টের প্রসারিত বিক্ষিপ্ত ডিস্ক-এর অন্তর্গত কিছু অন্তত বস্তুপিণ্ডের কক্ষপথকে অনেকটা আনত বৃত্তাকার বানিয়ে দেয়, যার একটি উদাহরণ বাফি। তবে এসবই কল্পনা, কোনটাই প্রমাণিত সত্যি নয়। ক্যুইপার বেল্টের বস্তুগুলি সূর্যকে পরিক্রমা করতে এত বেশি সময় নেয় যে তাদের কক্ষপথ ও আচার-আচরণ পুরোপুরি বিশ্লেষণ করতে কয়েক বছর লেগে যায়। তাতেও যা জানা যায় সত্যি বলে তাও কি চূড়ান্ত?
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
