প্রীতন্বিতা
সীসা থেকে বিষ
সীসা নিঃসন্দেহে খুবই প্রয়োজনীয় খনিজ। কিন্তু আধুনিক সভ্যতায় নানাভাবে মানুষের শরীরে অতিরিক্ত সীসা অনবরত ঢুকে যাচ্ছে। ব্যাপারটা খুবই বিপজ্জনক। মাত্রাতিরিক্ত সীসা দেহে গেলে তা বিষের মত ভয়ংকর। সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে যে সীসা পুরুষদের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করে। যেসব শ্রমিক সীসানির্ভর কারখানায় কাজ করে তাদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে ব্যাপারটা দেখা গেছে। মহিলাদের ক্ষেত্রেও সীসা ঋতুজনিত সমস্যার কারণ। গর্ভবতী মায়েদের গর্ভপাত অতিরিক্ত সীসার প্রভাবে ঘটতে পারে। তাছাড়া গর্ভস্থ সন্তানের মস্তিষ্ক এবং দেহের অন্যান্য অংশেও সীসা অপূরণীয় ক্ষতি করে থাকে।
মানুষের শরীরে রয়েছে অনেকরকম খনিজের সঞ্চয়। এদের মধ্যে লোহা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ, তামা, কোবাল্ট, সেলেনিয়াম ইত্যাদি প্রয়োজনীয় পদার্থ। এছাড়া ক্রোমিয়াম, নিকেল, সিলিকন ইত্যাদিও দেহে রয়েছে যদিও তাদের প্রয়োজনটা স্পষ্ট নয়। এসব খনিজ নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত নিরাপদ। সেই সীমা অতিক্রম করে গেলেই নানা বিপদ ঘটায়। মানুষের শরীরে সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদিও আছে। এরা শরীরে বিশেষ করে ঢোকে পরিবেশদূষণ থেকে।
মানুষের শরীরে সীসার সর্বোচ্চ নিরাপদ সীমা ১২০ মিলিগ্রাম, যার প্রায় ৯৫% হাড়ের ভিতর সঞ্চিত থাকে। আদিম মানুষের শরীরে মাত্র ২ মিলিগ্রাম সীসা জমত। বর্তমানে সীসার ব্যাপক ব্যবহার শরীরে এর পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে। খাবার, জলপান, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ও ধূমপান থেকে শরীরের সীসা অনবরত ঢুকে যাচ্ছে।
সীসার মারাত্মক বিষাক্ত প্রভাবে মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভার ও দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভাবিত হয়। সীসার বিষ থেকে ক্ষুধামান্দ, বমি, অঙ্গ সঞ্চালনে অস্বাভাবিকতা, খিঁচুনি, কোষ্ঠবদ্ধতা, অ্যানিমিয়া, হতবুদ্ধিতা দেখা যেতে পারে, শেষ পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
সীসা হচ্ছে ভারী ধাতু। এর কোমলতা, কম দাম ও বিশেষ পারমাণবিক গুণাবলী শিল্প উৎপাদনে একে খুবই উপযোগী করে তুলেছে। এতে মরচে ধরে না এবং এজন্য জলের পাইপ বানাতে বেশি দরকারী, যদিও এখন পিভিসি পাইপ এসে গেছে। সালফিউরিক অ্যাসিড বানাতে সীসা অপরিহার্য। ব্যাটারি, বন্দুকের গুলি বানাতেও সীসার ব্যবহার রয়েছে। কাচ, রং ও বার্নিশ শিল্পে সীসা খুব দরকার। স্টিলের নানা কাঠামো, ব্রিজ ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও সীসা অপরিহার্য। প্লাস্টিক তৈরি ও মোটর গাড়ির জ্বালানি প্রস্তুতেও সীসার ব্যবহার হয়।
মোটর গাড়ি নিঃসৃত ধোঁয়া থেকে ব্যাপক হারে সীসার বিষ বাতাসে মেশে। গবেষণাগারে সীসাঘটিত লবনের ব্যবহারও দূষণ ঘটানোর জন্য দায়ী। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত থেকে আবহাওয়া সীসার বিষে বিষাক্ত হয়। তবে শিল্প উৎপাদনে সীসার ব্যবহারই পরিবেশদূষণ ঘটানোর জন্য বেশি দায়ী। বাচ্চাদের কাঠ বা প্লাস্টিকের খেলনা থেকেও বিষ ছড়ায় তাদের শরীরে। খেলনাগুলিতে থাকে সীসাঘটিত রং আর বাচ্চারা খেলতে খেলতে প্রায়ই মুখে দেয় সেসব। এভাবে তাদের শরীরে সীসা প্রবেশ করে।
গাড়ি-ঘোড়ার ধোঁয়া থেকে বাতাসে সীসাদূষণ খুব বেশি মাত্রায় হয়ে থাকে। সংবাদপত্র ও মুদ্রণশিল্পে সীসাঘটিত রং ব্যবহৃত হয়, তাও বিষ ছড়ানোর বড় কারণ। মোটরগাড়ি থেকে এত সীসার বিষ ছড়ায় যে হাইওয়ে ও যানবাহনব্যস্ত রাস্তার দু’ধারে মাটি ও বাতাস মাত্রাধিক সীসা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। হাইওয়ের পাশে জমি সীসার বিষে এতই আক্রান্ত হয় যে গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি তো বাধা পায়ই, উপরন্তু ধ্বংসও ঘটে। ব্যাটারি নির্মাণ ও অন্যান্য শিল্পে যেখানে সীসা খুব ব্যবহৃত হয় সেখানে শ্রমিকদের মধ্যে প্রবল হারে সীসা বিষের সংক্রমণ হয়ে থাকে। সীসাঘটিত পোকামাকড়ের বিষ যারা নিয়মিত ব্যবহার করে তারাও সীসা বিষের শিকার। ক্যানবন্দি মাংস ও মাংসজাত খাবার এবং ফলের জুসের মধ্যেও থাকে সিসার বিষ। প্রতিভাস ম্যাগাজিন