নীলাদ্রি পাল

‘হিপ্পোলো হুকুম্মা’, ‘হিপ্পোলো হুকুম্মা’। ক্রমাগত কানে বাজছে এই সুর আলিপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরির নর্থ গেটে কর্মরত এক প্রহরীর। অমাবস্যার রাত, তার ওপর রাত গভীর। দু’চোখ বন্ধ হওয়ার কোনো উপায় নেই। কারণ ডিউটি। রাতের শিফটে পাহারা দেওয়ার ডিউটি। চোখ ঘুমে জড়িয়ে না আসার ওষুধ হিসেবে খৈনি ডলছিল সে। হঠাৎ অমন সুরে একটানা শব্দে ন্যাশনাল লাইব্রেরির ভিতর দিকে তাকাতেই তার আক্কেল গুড়ুম। 

পালকি বাহকেরা লাইব্রেরির বিল্ডিংয়ের দিক থেকে নর্থ গেটের দিকে একটানা ‘হিপ্পোলো হুকুম্মা’, ‘হিপ্পোলো হুকুম্মা’ আওয়াজ তুলে বয়ে আনছে একটা পালকি। পালকিটা হঠাৎ বাঁক নেওয়ার সময় প্রহরী দেখতে পেলো পালকির ভিতরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এক সাহেবকে। ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই পালকিটা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল। 

কি ভাবছেন, আবার কলকাতার ভূতুড়ে উপদ্রবের বিষয় শুরু করলাম। নাহ, সে গুড়ে বালি। এবারের বিষয়বস্তু হল পরকীয়া কেন্দ্রিক। কলকাতায় বসবাসকারী ব্রিটিশদের পরকীয়ার গল্প বলতে গিয়ে একটু ভূতুড়ে বিষয়ের অবতারণা করলাম। কেন এই রক্তারক্তি কাহিনী? এই রক্তারক্তি কাহিনীর পিছনে রয়েছে একটি ত্রিকোণ প্রেমের গল্প। কিন্তু এই পরকিয়া প্রেমে রয়েছে একটা ফুলের পিছনে তিনটে মালি। যদিও ফুলটির সঙ্গে আরো অনেক মালির সন্ধান পাওয়া যায়। 

আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগের কথা। ধনকুবের বাবা ও ভাইয়ের সাথে চন্দননগরে এসে বসবাস শুরু করলেন এক ফরাসি সুন্দরী। বয়স ষোল। দীর্ঘাঙ্গী, পরীর মত অপরূপা। তুষার শুভ্র গায়ের রং, সোনালী চুল, ঘন কালো ভ্রুর নিচে বড় বড় দুটো নীলাভ চোখ। নাম ক্যাথরিন। ক্যাথরিন পরমা সুন্দরী, এক কথায় অপরূপা। 

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন চলছে। কলকাতায় বহু ইউরোপীয়র বাস। এই সময় কলকাতায় ইউরোপীয়ান মেয়ের আকাল। ইউরোপীয় পুরুষেরা মৌমাছির মত ছেঁকে ধরলেন ক্যাথরিনকে। এই স্বপ্ন সুন্দরীর মন জয় করার জন্য। মেয়েকে নিয়ে ইউরোপীয়দের এমন লালায়িত হতে দেখে বিরক্ত হয়ে ক্যাথরিনের বাবা ক্যাথরিনকে নিয়ে কিছুদিনের জন্য চলে আসেন কলকাতায়। 

যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। কলকাতায় এসেও অবস্থার পরিবর্তন কিছুই হল না। এখানে তখন রয়েছেন বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস। ওয়ারেন হেস্টিংসের লোলুপ দৃষ্টি পড়ল ক্যাথরিনের ওপর। কিন্তু নিজের পদমর্যাদার কথা স্মরণ করে চক্ষুলজ্জার ভয়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারলেন না হেস্টিংস। এদিকে হেস্টিংসের বিরোধী দলের নেতা কাউন্সিলর ফিলিপ ফ্রান্সিস দিওয়ানা হয়ে পড়লেন ক্যাথরিনের ওপর। এই ব্যাপারে ফ্রান্সিস টেক্কা দিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসকে। 

সুপুরুষ ফ্রান্সিস ক্যাথরিনের নেক নজরে আসার জন্য চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখলেন না। এদিকে মেয়েকে বহু পুরুষের সাথে আসক্ত হতে দেখে ক্যাথরিনের  বাবা প্রমাদ গুনলেন। এর মধ্যে নরম প্রকৃতির নিপাট ভদ্র মানুষ মিস্টার গ্র্যান্ডের সাথে আলাপ হল ক্যাথরিনের। ক্যাথরিনে মুগ্ধ হয়ে অকস্মাৎ মিস্টার গ্র্যান্ড বিয়ে করার প্রস্তাব দিলে সেই প্রস্তাবে এক কথায় রাজি হয়ে যায় ক্যাথরিন। মেয়ের বাবাও গ্র্যান্ডকে পছন্দ করে নিশ্চিন্ত মনে মেয়ের এই বিয়ের ব্যাপারে মত প্রকাশ করেন। 

চন্দননগরের চার্চে গ্র্যান্ডের সাথে বিয়ে হল ক্যাথরিনের। দিনটা ছিল ১৭৭৭ সালের ১০ জুলাই। বিয়ের পরে নবদম্পতি এসে উঠলেন আলিপুর লেনের রেড গার্ডেন হাউসে। পরমা সুন্দরী বউ পেয়ে গ্র্যান্ড আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন। বিয়ের পরেও ক্যাথরিনের আকর্ষণী ক্ষমতা একই থাকল। ওয়ারেন হেস্টিংস চুপিসারে ক্যাথরিনের সান্নিধ্য লাভ করার চেষ্টা করতে থাকলেন। 

ক্যাথরিনকে সন্তুষ্ট করার জন্য হেস্টিংস ও ফ্রান্সিসের মধ্যে চোরা প্রতিযোগিতা শুরু হল। ওয়ারেন হেস্টিংস একদিন তাঁর বসতবাড়ি (বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরি)-তে ক্যাথরিন ও মিস্টার গ্র্যান্ডকে নিমন্ত্রণ করলেন। নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন নবদম্পতি। পরেরদিন ক্যাথরিনের সাথে হেস্টিংসকে চুঁচুড়া আর সুখচরে নৌবিহার করতে দেখা গেল। 

ফ্রান্সিস ক্যাথরিনের মনোরঞ্জনের জন্য বল ড্যান্স পার্টির আয়োজন করলেন এক সন্ধ্যায়। খানাপিনার পরে ক্যাথরিনের সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হলেন। ফ্রান্সিসের সক্ষমতায় মজলেন ক্যাথরিন। শুরু হয়ে গেল ফ্রান্সিসের সাথে ক্যাথরিনের প্রেমলীলা। মিস্টার গ্র্যান্ডের অজ্ঞাতসারে চলতে লাগল দু’জনের উদ্দাম পরকীয়া। গ্র্যান্ড শহরে না থাকলে তাঁর আলিপুরের বাড়িতেই চলতে থাকে ক্যাথরিনের সাথে ফ্রান্সিসের অবাধ সম্পর্ক। আবার কখনো নির্জনতার খোঁজে কোনো বাগানবাড়িতে যান সময় কাটানোর জন্য। 

পরকীয়ার এই গল্প শহরে চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। কানে এই কথা গেল মিস্টার গ্র্যান্ডের। পত্নী প্রেমে অন্ধ মিস্টার গ্র্যান্ডের এইকথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হল না। কিন্তু তাঁর এই বিশ্বাসও বেশিদিন স্থায়ী হল না। ১৭৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বরের রাত। মিস্টার বারওয়েলের খিদিরপুরের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। গ্র্যান্ডের বাড়িতে না থাকার সুবাদে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়লেন না ফ্রান্সিস। অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু জর্জের সাথে গ্র্যান্ডের আলিপুরের বাড়ির পাঁচিল টপকে হাজির হন ফ্রান্সিস। মই জোগাড় করে জানলা দিয়ে ক্যাথরিনের দোতলার ঘরে উঠতে গিয়ে দারোয়ানের হাতে ফ্রান্সিস ধরা পড়ে যান। এই পরকীয়ার কথা জানা থাকার সুবাদে মোটা বখসিস পাওয়ার লোভে ফ্রান্সিসকে বেঁধে রেখে দারোয়ান ছুটল খিদিরপুরে মনিবকে খবর দেওয়ার জন্য। 

খবর পেয়ে মিস্টার গ্র্যান্ড উন্মাদের মত ছুটে এলেন নিজের বাড়িতে। পথে মিস্টার ইমপ্রের সাথে দেখা হলে তাঁকেও নিয়ে এলেন। বাড়িতে ফিরে এসে গ্র্যান্ড দেখলেন বন্ধু জর্জের সাহায্যে দড়ি খুলে পালিয়ে গেছেন ফ্রান্সিস। খবর পেয়ে ইতিমধ্যে গ্র্যান্ডের বাড়িতে চলে এসেছেন হেস্টিংসের মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর পামার এবং কয়েকজন সশস্ত্র বন্ধুবান্ধব। 

ভীষণ মনোকষ্টে ভুগলেন গ্র্যান্ড। কষ্টের পরিমাণ আরো বেড়ে গেল তাঁর যখন ক্যাথরিন নিজে এই পরকীয়ার ব্যাপার স্বীকার করলেন। ভিতরে ভেঙে পড়লেও সুন্দরী পত্নী প্রেমে বিভোর গ্র্যান্ড ক্যাথরিনকে কিছু বললেন না। এদিকে স্ত্রীর সাথেও আর কোনো সম্পর্ক রাখলেন না। ক্যাথরিনকে তাঁর বাপের বাড়ি চন্দননগরে পাঠিয়ে দিলেন সামান্য কিছু মাসোহারার ব্যবস্থা করে। ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে মামলা করে সেই মামলা জিতলেন। 

ফ্রান্সিসের সাথে ক্যাথরিনের সম্পর্কও আর বেশিদিন টিকল না। কিছুদিন পরে ক্যাথরিন ফিরে যান তাঁর নিজের দেশ ফ্রান্সে। সেখানে গিয়ে সেখানকার এক অধিবাসীকে বিয়ে করে নতুন সংসার পাতেন ক্যাথরিন। এদিকে মিস্টার গ্র্যান্ডও এক ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করে নেন। 

“আমার কথাটি ফুরালো / নটে গাছটি মুড়ালো”। হতেই পারতো এখানে এই উপসংহার। কিন্তু নাহ, শেষ হইয়াও হইল না শেষ। পরকীয়ার গল্প। ক্লাইম্যাক্সে একটু মারপিট থাকবে না, হয় কি তা? 

গ্র্যান্ডের বাড়ির এই কেচ্ছা কেলেঙ্কারির ঘটনা কলকাতার তৎকালীন ইওরোপিয়ান সমাজে তুমুল চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। সাংবাদিক জেমস হিকি তাঁর একটি প্রতিবেদনে লেখেন, “কলকাতার অভিজাত ইংরেজদের মাথা একেবারে হেঁট করে দিয়েছিল এই কেলেঙ্কারি”। এদিকে তাঁর মুখের গ্রাস ক্যাথরিনকে কেড়ে নেওয়ার জন্য ফ্রান্সিসের ওপর বেজায় চটেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। তার ওপরে এই কেলেঙ্কারি হেস্টিংসের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। 

মুখের গ্রাস কাড়ার অপরাধে এবং ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে মিস্টার গ্র্যান্ডের মামলা দায়ের করার সুবাদে হেস্টিংস তাঁকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তৎপর হন। তাঁর সাথে লড়াই করার জন্য ফ্রান্সিসকে বার্তা পাঠান হেস্টিংস। এই লড়াই কোনো সাধারণ হাতাহাতি লড়াই নয়, এই লড়াইয়ে হবে পিস্তলের ডুয়েল। 

সেই সময় শৌর্য প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম ছিল পিস্তলের ডুয়েল। প্রেম পিরিতিতে ফ্রান্সিস সেরা হলেও লড়াই যুদ্ধের ব্যাপারে ছিলেন একেবারে কাঁচা। জীবনে কোনোদিন পিস্তলের ধারেকাছে থাকতেন না। চেষ্টা করলেন এই ডুয়েল এড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু সফল হলেন না। 

ভোর তখন পাঁচটা বেজে ত্রিশ মিনিট। দিনটা ১৭ আগস্ট, ১৭৮০। ভোরের আলো ফুটছে বেলভেডিয়ার রোডের বাগানে, যা বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরি নামে পরিচিত। ডুয়েল লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী উভয় পক্ষ হাজির। ডুয়েলের নিয়ম উভয়পক্ষের সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কিনা দেখার জন্য হেস্টিংসের পক্ষে ছিলেন কর্নেল পিয়ার্স এবং ফ্রান্সিসের পক্ষে কর্নেল ওয়াটসন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ফ্রান্সিসের বন্দুক খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণে হেস্টিংস নিজের একটা বন্দুক দেন ফ্রান্সিসকে। 

যথা সময়ে যুদ্ধ শুরু হল। ফ্রান্সিসের ছোঁড়া গুলি লক্ষ্যভেদ করতে বিফল হল। কিন্তু হেস্টিংসের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ফ্রান্সিস। ঘাড়ে গুলি লেগেছে তাঁর। জামাকাপড় রক্তে ভেজা। প্রমাদ গুনলেন হেস্টিংস। আসলে মারতে চাননি তিনি ফ্রান্সিসকে। শুধু একটু শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। ফ্রান্সিসকে চিকিৎসা করানোর জন্য নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হল। কিন্তু চেষ্টা বিফলে গেল। বর্ষাকাল, গঙ্গায় বান এসেছে সেই সময়। নিয়ে যাওয়া যাবে না তখন। এদিকে প্রাথমিক শুশ্রুষায় ধীরে ধীরে ফ্রান্সিসের জ্ঞান ফিরল। হেস্টিংসের প্রবল অনুরোধকে উপেক্ষা করে তাঁর বেলভেডিয়ার রোডের বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিতে একেবারে রাজি নন ফ্রান্সিস। হেস্টিংসের কোনো সাহায্যই তিনি নিতে চান না। শেষ পর্যন্ত টলি সাহেবের বাড়িতে ফ্রান্সিসের চিকিৎসা হয়। মাসখানেকের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর তিনি নিজের দেশে ফিরে যান। সেখানে অনেক বছর বাদে স্বাভাবিক মৃত্যু হয় তাঁর। 

এবার প্রশ্ন হল বহুকোণ প্রেমের এই পরকীয়ার গল্পের শুরুতেই ভূতের গল্পের অবতারণা কেন? ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ভূতুড়ে পালকির ঘটনার পিছনে পরকীয়ার এই কাহিনীর কি কোনো যোগসূত্র আছে? পারলৌকিক এইসব ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি বিশেষ না করাই ভাল। সেই ব্যাপার আজও অজানাই থাক। 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *