পাঠক মিত্র
বিতর্কিত দেশনায়ক
‘দেশনায়ক’ কথাটি কোন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয় না । যদিও কবিগুরু একজনকেই দেশনায়ক হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন । তিনি হলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু । সুভাষচন্দ্র বসু’র নেতাজী হিসেবে পরিচয় গড়ে ওঠার আগেই কবি তাঁকে দেশনায়ক হিসেবে বরণ করেছেন । তাঁর দেশনায়ক হয়ে ওঠার পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না । স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবন যদিও কখনও মসৃন হতে পারে না, সুভাষচন্দ্রের পথ তার থেকে আলাদা হবে তা কি হয় । তবে দেশের জন্য তাঁর সংগ্রামী জীবন সম্পূর্ণ অন্য এক অজানা পথের যাত্রায় তিনি নেতাজী হয়ে উঠেছিলেন । সে যাত্রা কি তাঁর আবেগের যাত্রা ছিল ? কিংবা তাঁর রাজনৈতিক জীবনটাই কি আবেগের ? তিনি বাঙালি ছিলেন বলে তাঁকে নিয়ে বাঙালি বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে ? বাঙালির কাছে তিনি এক আবেগ যে আবেগে বাঙলার রাজনীতি আজও ভাসে । তাই মানুষ সুভাষচন্দ্রের জীবনী নাকি সেরকমভাবে হয়নি বলে গবেষক সৌম বসু তাঁর ‘বিতর্কিত দেশনায়ক’ বইটিতে সেকথাই বলতে চেয়েছেন । ‘সুভাষচন্দ্র’ নামের আবেগে নাকি এই গবেষকের পূর্ববর্তী সুভাষ জীবনীকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করে বাঙালি পাঠকের কাছে সচেতনভাবে সুভাষচন্দ্রের জীবনী ‘সুখপাঠ্য করে’ পরিবেশন করেছেন বলে গবেষক বসু দাবি করেছেন । এ কথা ঠিক কিছু বই সুভাষচন্দ্রের জীবনীর নামে একটা ‘মিথ’ হিসেবে কাহিনী বিন্যাস হয়েছে । যা বাঙালির আবেগকে ধরে সত্যিই ‘সুখপাঠ্য’ করে তোলা হয়েছে । কিন্তু সকলে তা করেছেন বলে এমন দাবি করাটা কি সম্পূর্ণ রূপ হতে পারে ! অবশ্য সুখপাঠ্য সুভাষ-জীবনী সম্পর্কে লেখক এই বইয়ের কথামুখ ‘কৈফিয়ত’ এ উল্লেখ করেছেন, ‘..অন্য একধারার নেতাজি-বিষয়ক গ্রন্থ জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে । এই শাখার দাবি–বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি, তিনি ভারতে ফিরে এসে সাধুর ছদ্মবেশে বসবাস করছিলেন, ইত্যাদি । বিভিন্ন তদন্ত কমিটি থেকে রসদ জোগাড় করে বেশ কিছু গবেষণাশ্রয়ী কিন্তু মুখরোচক গ্রন্থ রাতারাতি খ্যাতিলাভ করে । এই সব তত্ত্ব নেতাজীর রোমান্টিক ইমেজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায় বাজারে প্রতিষ্ঠা লাভ করে । সত্তর বছর পরেও ‘নেতাজি মৃত্যু রহস্য’ বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন ।’ বইটির কথামুখের এই অংশে ভাষার বিন্যাসে উঠে এসেছে ‘নেতাজির ইমেজ রোমান্টিক’ আর ‘বিমান-দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি’ ঘটনাটি জনপ্রিয় মুখরোচক । দুর্ঘটনায় ‘নেতাজির মৃত্যু হয়নি’ সত্যিই কি মুখরোচক গল্প ? আর নেতাজির রোমান্টিক ইমেজের সাথে যা সঙ্গতিপূর্ণ ঠিক কোন জায়গায় তা কিন্তু এই বই-এ লেখক বসুর গবেষণা নথিভুক্ত হয়নি । অথচ তিনি নেতাজির সংগ্রামের শেষ অধ্যায়কে রোমান্টিকতার বিষয় বলে, আর এক মুখরোচকভাবে নেতাজিকে খাটো করলেন না তো ?
১৯২১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত এই সময়কালীন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুভাষচন্দ্রের ভূমিকা তুলে ধরেছেন গবেষক বসু । দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্র এবং রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্র এই দুটি সত্তা যে সর্বদা পরস্পর বিরোধী ক্রিয়াশীল তা তিনি দাবি করেছেন । তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্রের বর্ণচ্ছটা শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্রের বিবিধ কার্যকলাপকে গ্রাস করেছে । তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্রের আখ্যান যথেষ্ট বিতর্কমূলক। তাঁর গোটা রাজনৈতিক জীবনই বিতর্কমূলক । এই বিতর্কমূলক রাজনৈতিক জীবনের আখ্যান দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্রের আখ্যানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়া, তা অতীতে সুভাষ-জীবনী থেকে সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বা খাটো করে দেখাবার চেষ্টা করা হয়েছে বলে লেখক বসু দাবি করেছেন তাঁর এই বইয়ে ।
বইটির প্রথম অধ্যায় ‘প্রস্তুতিপর্ব’-এ সুভাষচন্দ্রের জীবনের প্রাথমিক পর্ব থেকে দেশপ্রেমের উত্তরণে রাজনীতির পথে প্রবেশ পর্বকে তুলে ধরেছেন যেখানে সুভাষের আবেগপ্রবণতাকে বিশেষীকরণ করা হয়েছে । দেশপ্রেম আছে অথচ আবেগ নেই যদি হয় তাহলে তার পূর্ণতা কি ? আবেগ না থাকলে কিন্তু দেশপ্রেম প্রস্ফুটিত হয় না । সুভাষচন্দ্রের এই আবেগপ্রবন মনে ওটেন-বিতর্ক সম্ভবত গভীর রেখাপাত করেছে বলে লেখক মন্তব্য করেছেন । ইংরেজের বর্ণবিদ্বেষ সুভাষচন্দ্রের মনকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে । এ কি কেবল আবেগ থেকে ? ওটেন-বিতর্ক থেকে সুভাষচন্দ্রের আপোষহীন মনোভাব গড়ে উঠেছিল বলে লেখক বলেছেন । এ ও বলেছেন যে সবক্ষেত্রে আপোষহীনতা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয় সে কথা তাঁর মনে হয়নি । তার মানে আপোষকামী হলে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় ? একজন গবেষক নেতাজির আপোষহীনতা বুদ্ধিমত্তাহীন হিসাবে উপস্থাপিত করার ইঙ্গিত কি অসচেতনভাবে করেছেন ? বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে জাতীয় জাগরণ থেকে চরমপন্থী রাজনীতির আত্মপ্রকাশে ‘বোমার যুগ’-এর সূচনাপর্বে ছোট্ট সুভাষের বেড়ে ওঠা । সেই যুগেই ক্ষুদিরাম আত্মরক্ষার্থে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়নি । যে ক্ষুদিরামকে ছোট্ট সুভাষ স্মরণ করেছে স্কুলে হেডমাস্টার মশাই বেণীমাধব দাসের প্রচ্ছন্ন ছায়ায় । এ ঘটনা উল্লেখ করেননি লেখক গবেষক তাঁর এই বইয়ের ‘প্রস্তুতিপর্ব’-এ। কিন্তু বেনীমাধব দাসের সংস্পর্শে সুভাষের দেশপ্রেম মন্ত্রে দীক্ষা হয়েছিল তা কিন্তু তিনি উল্লেখ করেছেন । এই দীক্ষায় দেশপ্রেমের আবেগ আরো দ্রুত তাড়িত হয়েছে । ‘আইসিএস’ চাকরি ছেড়ে দিয়ে অনিশ্চিত জীবনে পা ফেলা শুধু কি সেই আবেগ থেকেই? এ আবেগ হঠকারিতার আবেগ কি ? সুভাষ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, অথচ পরস্পর বিরোধী সত্তার অধিকারীও ছিলেন বলে লেখক বলেছেন । লেখক বলেছেন, ওটেন-পর্ব থেকে সুভাষচন্দ্রের ব্যক্তিত্বের মধ্যে পরস্পর-বিরোধী সত্তা দানা বাঁধতে থাকে । লেখকের মতে সুভাষ ব্যক্তিত্বের এই পরস্পর-বিরোধী সত্তা একদিকে তিনি মেধাবী ও ভালো ছেলের, আর একদিকে শিক্ষককে প্রহারে অংশগ্রহণকারী ডানপিটে ছেলে । মেধাবী ও ভালো ছেলে হলে ডানপিটে হতে পারে না । এই সাধারণ মত থেকেই এই দুটি সত্তা তাঁর ব্যক্তিত্বে পরস্পরবিরোধী সত্তা হিসেবে মান্যতা লেখক দিয়েছেন । তবে ঠিক ওটেন-পর্ব সুভাষচন্দ্রের কেবল বাঙালির আবেগ ছিল না, সেই আবেগ ছিল তাঁর দেশবাাসীর প্রতি আবেগ । সেই আবেগ থেকে তিনি নেতৃত্বের উত্তরণের পথে পা রাখা শুরু করেছিলেন । ওটেন-কান্ডে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সুভাষকে বহিষ্কার করা হয়েছিল । এ পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, ‘অধ্যক্ষ আমাকে বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন, কিন্তু আমার জীবনের ভবিষ্যত তিনিই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন । যে আত্মবিশ্বাস ও উদ্যমের পরিচয় সেদিন আমার মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম সেই ছিল আমার পাথেয় । আমি নেতৃত্বের স্বাদ সেদিন পেয়েছি এবং পেয়েছি আদর্শের জন্য দুঃখবরণের গভীর আনন্দ।’ এ কথা কখনও আবেগের হতে পারে কি ? যদিও এ কথা লিপিবদ্ধ হয় নি বইটির ‘প্রস্তুতিপর্ব’ অধ্যায়ে ।
শৈশবে র প্রশ্ন থেকে কিশোর সুভাষের সামাজিক পর্যবেক্ষণ স্বাধীনতা আন্দোলনের আবহাওয়ায় তাঁকে জীবনের ব্যক্তি সুখ ও পারিবারিক বন্ধনের দোটানা থেকে মুক্ত করেছিল । মুক্ত হয়েছিলেন বলেই তিনি দেশের কাজে দেশমুক্তির কাজে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিতে পেরেছেন ।
‘আইসিএস’ ত্যাগ করে ১৯২১ সালে দেশবন্ধুর শিষ্যত্বে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছেন । তাঁর কর্মযোগ্যতা তাঁকে রাজনৈতিক কর্মী থেকে ক্রমশ নেতৃত্ব পদে পৌঁছে দিতে পেরেছে । কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব ভাবনা ও কর্মকান্ড তদানীন্তন রাজনৈতিক নেতৃত্বের আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারেনি । আস্থাভাজন করে তুলতে পারেনি । কংগ্রেস ও কলকাতা কর্পোরেশনে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার জন্য তিনি রাজনীতির সততা রক্ষা করেননি , বরং রাজনীতিকে কে কলঙ্কিত করেছেন । এবং এই শিক্ষা তিনি তাঁর গুরু চিত্তরঞ্জন দাশের শিক্ষার ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বলে লেখক মন্তব্য করেছেন । যা তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন । প্রমাণ হিসেবে লেখক তদানীন্তন সময়ে লেখনীর ভিত্তি থেকে উত্থাপিত অভিযোগ দাখিল করেছেন । প্রথম অভিযোগ, দলাদলি, স্বজনপোষণ, দুর্নীতি, বিরোধীপক্ষের কন্ঠরোধ দেশবন্ধুর যুগেই শুরু হয়েছে এই বাংলায় । তাঁর দুই শিষ্য যতীন্দ্রমোহন ও সুভাষচন্দ্র সেই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সুভাষচন্দ্র দেশত্যাগের আগে পর্যন্ত তা বজায় ছিল বলে বলেছেন । বলছেন, দেশপ্রেমিক হিসেবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, আবার দলে নিজে ক্ষমতা বজায় রাখতে নানা পন্থা অবলম্বন–একই সঙ্গে এই দুই ক্রিয়াকান্ড প্রবাহমান । এ শিক্ষা দেশবন্ধুর। এর ফলে ক্ষতি হয় বাংলার । ‘শুধু বাংলার ক্ষতি হয়েছে’ এই শব্দবন্ধে বাংলার ক্ষতি কোনদিক থেকে হয়েছে তা বলা হয়নি ।
যে দুই ব্যক্তিত্ব ত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন । তাঁরা বাংলার ক্ষতি করলেন বলে অভিযোগ করলেন গবেষক । তার জন্য অভিযোগের তালিকা দাখিল করেছেন । দলাদলি, স্বজনপোষণ, কন্ঠরোধ যাঁরা করেছেন বলে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, সুভাষের বিরুদ্ধে কি তা হয়নি ? সুভাষের বিরুদ্ধে গান্ধীজীর নেতৃত্ব কি সেই কাজ করেনি । তার জন্য সুভাষই কি দায়ী ? সুভাষের আপোষহীনতা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আগেও দেয়নি বলে যে মত ব্যক্ত করেছিলেন, তা প্রতি পদে তাঁকে ভুগতে হয়েছে । যদিও এর জন্য সুভাষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপরিপক্ক ও দূরদর্শিতাহীন পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে । এই অভিযোগের সারবত্তা ধরে সুভাষের পথ যদি হত তাহলে তিনি কি নেতাজি হতে পারতেন ? নাকি নেতাজি শব্দটি বাঙালির কেবল আবেগ ঢেউ?
আর কলকাতা কর্পোরেশন বিষয়ক দুর্নীতি প্রসঙ্গের অভিযোগ হিসেবে যা উঠে এসেছে তা তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থ কে মলিন করার একটা অপচেষ্টা ছিল । যা পরবর্তী একটি ক্ষেত্রে বৃহত্তর জনস্বার্থের বিষয় হয়েছে যেমন ‘মহাজাতি সদন’ নির্মাণ। আর দলীয় স্বার্থের বিষয়ে দেশবন্ধু ও নেতাজির আগ্রাসন কে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা কি কেবল তাঁদের ক্ষমতাভোগ লিপ্সা থেকে ? তদানীন্তন সময়ে এই প্রশ্নটি ব্রাত্য রেখে দিলে, অর্থটাই পাল্টে যায় । যদিও তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে কোন প্রশ্নই অনুচিত ।
দ্বিতীয় যে বীজ দেশধন্ধু নিজ হাতে বাঙলা কংগ্রেসে বপন করেছেন বলে উল্লেখিত হয়েছে এই বইয়ে, তা হল বিপ্লবাদী বীজ । বাঙলার বিপ্লবীদের কংগ্রেসে স্থান করে দেওয়াটা অদূর ভবিষ্যতে অত্যন্ত ক্ষতিকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে বলেই দাবি । তা অবশ্য দুপক্ষের জন্যই ক্ষতিকারক । লেখক এ ও বলেছেন যে বিপ্লবীরা ছিলেন নিখাদ দেশপ্রেমিক; দলীয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের যুক্ত করায় বিপ্লবীদের মধ্যে একধরণের নৈতিক দুর্নীতি বৃদ্ধি পেতে থাকে । তাঁরাও দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শক্তিক্ষয় করেন । এ কথা ঠিক দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতা শুধু বিপ্লবীদের প্রভাবিত করেনি, সেই প্রভাব কংগ্রেসীসহ সকলকেই আচ্ছন্ন করেছিল । তবে তার ফলে কিভাবে বিপ্লববাদ ক্ষতিকর ও তাতে নৈতিক দুর্নীতি বৃদ্ধি ঘটেছে বলে যে মত প্রকাশ করেছেন তা অহিংসার দাবিকে সমর্থন ছাড়া আর কিছু নয় । ‘নৈতিক দুর্নীতি’ প্রসঙ্গ পরিষ্কার করা হয়নি । তবে ১৯২১ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত যাঁরা ব্রিটিশের সহমর্মিতায় কাজ করেছে তাঁরা উচ্চ নৈতিকতার পরিচয় দিয়েছে কিনা তা ও পরিষ্কার করা হয়নি ।
স্বাধীনতার দাবি ও তার জন্য লড়াই সুভাষ যেভাবে করতে চেয়েছে তদানীন্তন কংগ্রেসী, বামপন্থী কেউই তা বুঝতে চায়নি । সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে তাঁদের মূল্যায়ন সুভাষচন্দ্রের পক্ষে হবে তা হতে পারে না।
সিটি কলেজে হিন্দু ছাত্রদের সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে সুভাষচন্দ্রের ভূমিকা তাঁর স্বাধীনতার লড়াইয়ের কর্মপদ্ধতির সাথে একেবারেই বেমানান ঠিকই। তবে তার রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ কেবল সুভাষকে ঘিরেই। যার জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতি বিরূপ হয়েছিলেন । কিন্তু সেই বিরূপতা বেশিদিন থাকেনি । পরপরই কবি সুভাষকে ‘দেশনায়ক’ হিসেবে সম্ভাষণ জানিয়ে তাঁর ‘তাসের দেশ’ নাটকটি উৎসর্গ করেন সুভাষকে । ত্রিপুরী কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে গান্ধীবাহিনী যখন অসহযোগ করে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে, তখনও কি সুভাষই দায়ী ? তদানীন্তন বামপন্থীরা অসহযোগিতা করেছে তাঁর সাথে তার জন্য কি সুভাষই দায়ী। লেখক দেখিয়েছেন, সুভাষের রাজনৈতিক পদক্ষেপে একাধিক ভুল সিদ্ধান্তের দরুন দেশপ্রেমিক সুভাষের বিস্ফোরক আত্মপ্রকাশ ঘটে । এই জায়গা থেকে তিনি অবশ্য একটি প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনীতির ভ্রান্তপথে হাতড়ে না বেড়ালে আমরা নেতাজিকে পেতাম ? সত্যিই কি তাঁর রাজনীতির পথ ভ্রান্ত ? বইটির দশটি অধ্যায়ে গবেষক লেখক তা বলার চেষ্টা করেছেন । ১৯২১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত সুভাষের রাজনীতির পথ ভ্রান্ত হলে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ পর্বে এককভাবে বেরিয়ে পড়াটাও নিশ্চয় কেবল আবেগ ছিল না । তাঁকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে সমস্ত প্রশাসনের পোপনীয়তা বা মিথ্যাচার হয়নি বলে কি লেখকের পরবর্তী গবেষণা ? প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
বিতর্কিত দেশনায়ক
সৌম্য বসু
বুকপোস্ট পাবলিকেশন
কলকাতা-৯
