পাঠক মিত্র
জন্মশতবর্ষে ঋত্বিক ঘটক
‘ঋত্বিক ঘটক’ নামটি শুনলে প্রথম যে শব্দগুচ্ছ মনে আসে তা হল ‘মেঘে ঢাকা তারা’ । এটি কেবল শব্দগুচ্ছ নয় । এই শব্দগুচ্ছ চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে । ঋত্বিক ঘটক যার স্রষ্টা । যাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ মেনে নির্মাণ হয়নি বলে তদানীন্তন বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন । কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেছে । ‘পিকচারাইজেশন’, ‘মিউজিক’, ‘শট অ্যাঙ্গেল’ বিষয়গুলিতে তিনি তাঁর মত করে ব্যাকরণ তৈরি করেছেন বলে দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রের মানুষজনের অনেকেই তা ব্যক্ত করেছেন। সেই ব্যাকরণের ভাষা তাঁর নিজস্ব ভাষা যা অত্যন্ত সচেতন ভাবে তিনি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর কথায় -‘আমি এমন এক ভাষার সন্ধানে ছিলাম যা আমার দেশের মানুষের দুঃখ আনন্দ আর পতনের অন্তরঙ্গ স্বরূপকে তুলে ধরতে পারে । একই সময় আমি চাইছিলাম যে এমন এক শিল্পরীতি আমার করায়ত্ত হোক, যা যথাসম্ভব জাতীয় হয়েও আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্বে উজ্জ্বল।…যাতে সিনেমা আমাদের দেশের প্রতিচ্ছবি, দেশের স্পন্দন ও পরিচিত উপকরণকেও সর্বজনগ্রাহী করে প্রকাশ করতে পারে ।’ তাঁর সৃষ্টি বিশেষভাবে সমাদৃত হলেও সর্বজনগ্রাহী হয়ে ওঠেনি । সর্বজনগ্রাহীর একটা বিরাট অংশ হচ্ছে ব্যবসায়িক সাফল্য । সেই সফলতার স্রোতে তাঁর সৃষ্টি বহে যায়নি । সফলতার পিছনে ছোটার জন্য কখনোই তিনি ছবি করতে চান নি । তিনি তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন । সংগ্রামী মানুষের কথা বলতে চেয়েছেন । আজীবন । কোনকিছুই তাঁকে সে পথ থেকে বিরত করতে পারেনি । তাই তিনি তাঁর জীবদ্দশায় ব্যবসায়িক অর্থে সফল ছিলেন না, নাম-যশ-খ্যাতির বিচারেও সমসাময়িক অনেকের তুলনায় উপেক্ষিত ছিলেন । কিন্তু প্রত্যাখ্যান-ব্যর্থতা-হতাশা এসব কোনও কিছুই খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার জায়গাটা গোলমাল করে দিতে পারেনি । এই জায়গায় তিনি শেষ পর্যন্ত কমিটেড এবং পজিটিভ ছিলেন । তাঁর কথায় তা পরিষ্কার বোঝা যায় । তিনি বলছেন ,’মানুষের জন্য ছবি করি । সব শিল্পেরই শেষ পর্যায়ে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয় । যারা তা করেন না, তারা শিল্পী বলে আমার কাছে কোনও আদর পাবেন না ।..আজ না পারি কাল, কাল না পারি পরশু…আমি প্রমাণ করে দেব আজও আমি সংগ্রামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখি । তাদের আমি ভুলে যাইনি । অভাব-অনটন-অপবাদ কিছুই আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না, তার জন্য যে মূল্য দিতে হয় আমি দিতে প্রস্তুত।’ সে-মূল্য তিনি দিয়েছেন তাঁর জীবন দিয়ে । প্রথম সৃষ্টি ও শেষ সৃষ্টি নিজে দেখে যেতে পারেননি । তিলে তিলে নিজেকে শেষ করেছেন, অথচ কোন আনুকুল্য পেতে মিথ্যের আশ্রয় নেননি । সত্যকে সোজা কথায় ব্যক্ত করেছেন এবং শিল্পের মাধ্যমে তা বলতে চেয়েছেন । যে শিল্পের মাধ্যমে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’র ‘নীতা’, ‘সুবর্ণরেখা’র সীতা’র লড়াই বাস্তবতার মাটিকে স্পর্শ করে । যদিও সুবর্ণরেখা নৈরাশ্যবাদের কথা বলেছে বলে তদানীন্তন চিত্রসমালোচকদের মত ব্যক্ত হয়েছে । এই নৈরাশ্যবাদ আর অবক্ষয়ের প্রচার সম্পর্কে ঋত্বিকের স্পষ্ট উত্তর ছিল-‐- ‘অবক্ষয়-এর শিল্পী হবার কোনও স্পৃহা তাঁর নেই। নৈরাশ্যবাদ প্রচারের অপচেষ্টাও করেননি । বলার চেষ্টা করেছেন, আজকের (১৯৪৮ থেকে ১৯৬২) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনীতিক ও সামাজিক সংকটের কথা । যে বিশাল সংকট আস্তে আস্তে একটা দানবের রূপ পরিগ্রহ করেছেন…সেটাকে ধরর চেষ্টা করেছি । এই সংকটের প্রথম বলি হচ্ছে আমাদের বোধশক্তি । সেই শক্তি ক্রমশ অসাড় হয়ে এসেছে আমাদের মধ্যে, আমি সেটাকেই ঘা দিতে চেয়েছিলাম ।’
দেশভাগের পর নীতা ও সীতা’র মত মেয়েরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও পরিবারকে বাঁচায় অথচ পরিবার ও সমাজ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে । ঋত্বিক ঘটকের হৃদয়ে দেশভাগের যন্ত্রণা । মানুষের যন্ত্রণায় সেই যন্ত্রণা উপশম হয় না । সেই যন্ত্রণার বিন্যাসে তাঁর শিল্প । সত্যজিত রায়ের কথায়, ‘পার্টিশানের করুণ পরিণতিই ছিল ঋত্বিকের সারা জীবনের অনুক্ষণের চিন্তা । তিনি নিজে পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছিলেন, যেখানে তাঁর শিকড় গভীরে প্রোথিত ছিল । এটা খুবই বিরল ঘটনা যে, কোনো পরিচালক এতটা অনন্যচিত্তে একই বিষয়ের উপর এভাবে কাজ করে গেছেন । এই ঘটনাই আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে এ নিয়ে তাঁর আবেগের গভীরতা কতটা নিখাদ ছিল ।’
দেশভাগের যন্ত্রণার গভীরতায় তিনি মিলনের সুর খুঁজে বেড়িয়েছেন। ‘কোমল গান্ধার’ চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর নিজের কথা– ‘ছবি করেছিলাম ‘কোমল গান্ধার’ ।..’কোমল গান্ধার’ এর মূল সুর হচ্ছে মিলনের । দুই বাংলা খন্ড হয়ে যাওয়ার যে অপরিসীম আমি পেয়েছিলাম তাকেই আমি প্রকাশ করার চেষ্টা করেছিলাম এই ‘কোমল গান্ধার’-এ । আমি রাজনীতিক নই । আমার কারবার হচ্ছে মানুষের মন নিয়ে । কাজেই দুই বাংলা কী করে এক হবে তার হদিশ দেওয়া আমার কর্ম নয় । আমি শুধু ভালবাসতে পারি ।’ তাঁর সেই ভালোবাসার কাহিনী ‘কোমল গান্ধার’ । ঋত্বিক বলেছিলেন, ‘কোমল গান্ধার । শকুন্তলা বাংলাদেশে পরিণত হয় আমার কাছে । রবি ঠাকুরের সেই আশ্চর্য সুন্দর প্রবন্ধটি — শকুন্তলা এবং মিরান্ডার অপূর্ব তুলনা যেখানে রয়েছে, সেটি আমাকে প্রভাবিত করে । আমি জানি–তার মূল হচ্ছে ভাঙা বাংলা । পূর্ববাংলার লোক বলে এ কথা মনে করি না । গোটা বাংলার ঐতিহ্যটা আয়ত্ত করার চেষ্টা করি বলেই এ কথা জানি যে, দুই বাংলার মিলন অবশ্যম্ভাবী । তার রাজনৈতিক তাৎপর্য আমার হিসেব করার কথা নয়; কিন্তু সাংস্কৃতিক মূল্য আমার কাছে অবধারিত ।’
বাংলার সাংস্কৃতিক মূল্যে রবি ঠাকুর ছাড়া তিনি এক পা ও চলতে পারেন নি । তাঁর সৃষ্টি নির্মাণে রবি ঠাকুর যেন ভিত । ‘কোমল গান্ধার’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘রবি ঠাকুর একটা কবিতা লিখে গেছলেন–‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার মনে মনে’ । বিষ্ণু দে মশাইকে রবীন্দ্রনাথ ব্যারাকপুরেতে একবার তাঁর চোখ দুটো দেখে বলেছিলেন যে তুমি তো কোমল গান্ধার হয়ে বসে আছ । বিষ্ণু দে তার বহু বছর পরে এক কবিতার বই ছেপেছিলেন যার নাম ‘কোমল গান্ধার’ । রবীন্দ্রনাথের সেই যে একটি বর্ণনা, এক বিষাদাচ্ছন্ন ষোড়শী জানলার দিকে তাকিয়ে বসে আছে–বিষ্ণুবাবু তাকে equate করলেন সমগ্র বাংলাদেশের সঙ্গে । কিন্তু আমার বাংলা ভাঙ্গা বাংলা । কাজেই আমাকে আর এক ধাপ এগিয়ে যেতে হয়েছে ।’ রবি ঠাকুরের গান ও তাঁর ছবি যেন পরিপূরক । এ সম্পর্ক এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, Rabindra Sangeet has an important functional role in most of your films. Could you explain your affinity to Rabindranath Tagore?
উত্তরে তিনি বলেছিলেন, I cannot speak without him. That man has culted all my feelings long before my birth. He has understood what I am and he has put in all the words. I read and I find that all has been said and I have nothing new to say…
You can be angry with him, you can criticise him, you may dislike him, but ultimately in the final analysis, you will find that he has the last word. তাঁর ভাবনার গভীরে রবীন্দ্রনাথ, এই উত্তর বলে দেয় । ভাববাদী রোমান্টিক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কীভাবে গ্রহণ করেছেন ? ক্ষোভের সংগে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন, There are some people who want to sell Rabindranath. And that is why you have this image of him impressed on your minds. You people have not read Rabindranath properly. You are yet to know of his anger. From the lowest rung of society to the highest he spared none.
হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ এবং দেশভাগের যন্ত্রণা র কোলাজ তাঁর সৃষ্টিতে । অথচ জীবদ্দশায় তিনি শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রাপ্যটুকু পান নি । জীবনের সফলতার সোপানে ওঠার জন্য যা যা করার তার জন্য তিনি নিজেকে নিবেদিত করেন নি । শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য পাবার জন্য তিনি তাঁর শিল্পকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন নি । এমনকি তার জন্য কোন আপোষ করার মানসিকতা নিয়ে তিনি চলেননি । নিজের সফলতার সোপানে গুছিয়ে হাঁটার জন্য তিনি আপোষ করার পথে হাটেন নি । সমাজের প্রয়োজনে, সংস্কৃতির প্রয়োজনে, শিল্পের প্রয়োজনে তাঁর মতে যেটা করার তার জন্য কোনভাবেই কোন স্তরে তিনি আপোষের পথকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করেন নি । তাঁর এই অদম্য মনোভাব নিয়ে আজীবন চলেছেন । তাঁর কথায়, ‘আমৃত্যু আমার জীবনে কম্প্রোমাইজ করা সম্ভব নয় । সম্ভব হলে তা অনেক আগেই করতাম এবং ভালো ছেলের মতো বেশ গুছিয়ে বসতাম । কিন্তু তা হয়ে উঠল না, সম্ভবত হবেও না । তাতে বাঁচতে হয় বাঁচব, না হলে বাঁচব না । তবে এইভাবে শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না ।’
শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে পারেন নি বলেই জীবন কেটেছে বেদনায় অন্ধকারে । সেই অন্ধকারে প্রাণ খুঁজে বেড়িয়েছেন । তিনি বলতে পেরেছেন,’বেদনা ও অন্ধকার সবার জীবনেই আসে । কিন্তু তাই নিয়ে যাঁরা হারিয়ে যান, তাঁদের মেরুদন্ড নেই বলেই আমি মনে করি । আমার জীবনেও এসব এসেছে । কিন্তু আজও পর্যন্ত আমি মাথা উঁচু করে আছি । সেগুলি সম্পর্কে ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প বলার কোন অবকাশ নেই বলেই আমি মনে করি । দুঃখ-দুর্দশা না হলে মানুষ কখনও শিল্পী হতে পারে না । আমি যা কিছু দুঃখ পেয়েছি, তার দ্বারা কিঞ্চিত মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি –অবশ্য যদি আমাকে মানুষ বলে আপনাদের মানুষকুল ভাবেন । দুঃখকে ভালবাসতেই হবে । তারই মধ্যে নিহিত রয়েছে পরম প্রাণ, যেটাকে খুঁজে বার করার মতো মনুষ্যত্ব থাকার অবশ্যই দরকার বলে আমি মনে করি ।’ তাঁর বেদনার কারণ সম্পর্কে এ যুগের চলচ্চিত্র সমালোচক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ঋত্বিক বিষয়ে আমাদের একটি নিহিত পাপবোধ আছেই। আমরা তাঁকে জীবদ্দশায় বড়জোর একজন সমাজ-বাস্তববাদী শিল্পী ভেবেছি, কিন্তু কখনই উদ্বাস্তু জীবনের বিশ্বস্ত ধারাভাষ্যকারের অতিরিক্ত কোন সম্মান তাঁকে দিতে পারিনি । রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেনি । বিপন্ন ঋত্বিক ক্রমশই একাকী, বিপন্নতম হয়ে উঠলেন । আমরা দর্শক হয়ে ছিলাম । আজ তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পরেও দেখি, সময়ের ডেটল এসে আমাদের হাতের শুকিয়ে থাকা রক্তের দাগ মুছে দিতে পারেনি ।’
ঋত্বিক ঘটকের সৃষ্টি নিয়ে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র তখন এগিয়ে আসেনি । আসলে তাঁর শিল্পীসত্তা ও জীবনবোধে যে প্রতিবাদ ছিল তা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের কাছে সহনীয় নয়। তাই এগিয়ে না আসাটাই তাঁকে খুন করার সামিল বলে মত ব্যক্ত হয়েছে । তাঁর মত প্রতিবাদী মানুষদের খুন হতে হয় অন্যভাবে । রঞ্জন আচার্য নামের এক সমালোচক বলছেন, ‘আমিও বিজন ভট্টাচার্যের মতো মনে করি ঋত্বিককেও খুন করা হয়েছিল। যেভাবে খুন করা হয়েছিল মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও । এসব ঘটেছে স্বাধীন ভারতবর্ষে । রাষ্ট্রের খুনের পদ্ধতি বাতাসের মতো । যা চোখে দেখা যায় না । অনুভব করতে হয় । সুচেতনায় সমৃদ্ধ একটা মানুষ, একজন প্রবল স্রষ্টা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে তীব্র হাহাকার করেছেন তা আমরা কেউই অনুভব করতে পারিনি । এ আসলে জাতির কলঙ্ক। ‘
তাঁর চেতনার কাছে তদানীন্তন বামপন্থী রাজনৈতিক দল তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি । অথচ বামপন্থী আদর্শকে পাথেয় করেছিলেন । যে আদর্শে শিল্প, শিল্পী র স্বাধীনতায় এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মার্ক্সবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ঋত্বিক সর্বতোভাবে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন । তাঁর নিজের কথায়–‘৪৩-৪৪-৪৫, সে-সময়কার কথা জানেন তাঁরা জানেন যে সে সময়টা ছিল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দ্রুত পটপরিবর্তনের সময় ।..আমি তখন মার্ক্সবাদী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছি, ঝুঁকে পড়েছি শুধু নয়, active কর্মী, card holder ছিলাম না অবশ্য, কিন্তু close sympathiser, fellow traveller আর কি ।’
তদানীন্তন বামপন্থী আদর্শে গড়ে ওঠা গণনাট্য আন্দোলনের পুরোধা হয়ে উঠেছিলেন । সেই আদর্শে সামাজিক প্রেক্ষাপটকে রূপ দিতে চেয়েছিলেন নিজের মত করে । বলেছিলেন ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ, দিনমজুর নাট্য আন্দোলন ও দলাদলির প্রায় বাস্তবানুগ চিত্রায়ণ ও তৎসমান্তরাল কৌতুকাবহ প্রেমাখ্যান, এ সমস্তই পরিকল্পিত ও সন্নিবেশিত হয়েছে মূল পরিকল্পনা অনুসারে–রূপকগুলিকে সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে । একটি বাস্তবধৃত বহুবিষয় সমন্বিত জটিল নকশা প্রস্তুত করাই ছিল অভিপ্রেত ।’ এই অভিপ্রায় থেকে তাঁর প্রতিবাদকে শিল্পের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন । বলেছিলেন, ‘আমার প্রটেস্টকে আপনার মধ্যে চারিয়ে দিতে পারি, তবেই আমার সার্থকতা ।’ তাঁকে সার্থক করে তোলার জন্য তাঁর দল পাশে ছিল না । পার্টির কালচারাল লাইন নিয়ে নেতাদের শিথিলতায় তিনি ‘অন দ্য কালচারাল ফ্রন্ট’ নামাঙ্কিত রচনায় নিজের যুক্তি ও বক্তব্য প্রকাশ করেছিলেন । তিনটি পর্বে তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দল ও তার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বিকশিত হতে পারত কিন্তু হয়নি (প্রথম পর্ব-কমিউনিস্ট শিল্পীরা ও পার্টি, দ্বিতীয়- কমিউনিস্ট শিল্পীরা এবং জনগণ, তৃতীয়- কমিউনিস্ট শিল্পীরা ও শিল্প))। যা তাঁর চেতনার এক সাংস্কৃতিক দলিল হিসেবে আজ পরিগণিত হয়। কিন্তু দল তাঁকে বহিষ্কার করেছিল । কিন্তু নিজের জীবনের আদর্শ থেকে বামপন্থাকে বিচ্যুত হতে দেননি । তাঁর জন্মশতবর্ষে তাই প্রশ্ন উঠেছে । তদানীন্তন সময়ে বামপন্থী দলটি যদি সঠিক বামপন্থার চর্চা করতো তাহলে ঋত্বিক ঘটককে এভাবে স্তব্ধ হতে হত না, স্তব্ধ করে দেওয়া হত না। প্রসূন ধর ও সংঘামিত্র চট্টোপাধ্যায় ঋত্বিক ঘটককে স্মরণ করেছেন এই অভিমত ব্যক্ত করে ।
‘জন্মশতবর্ষে ঋত্বিক ঘটক’ বিশেষ সংখ্যায় ‘সংবর্তক’ পত্রিকা ঋত্বিক ঘটক কে পাঠকের কাছে হাজির করছেন নানা আঙ্গিকে । ঋত্বিক ঘটক কে এই সময়ে চেনার প্রাসঙ্গিকতাকে হাজির করেছে এই পত্রিকা । যার সূত্র ধরে ঋত্বিক ঘটক কে চেনানোর এই প্রতিবেদনের আংশিক প্রয়াস মাত্র ।
‘ঋত্বিক ঘটক’ বিশেষ সংখ্যা ঋত্বিক ঘটক কে নতুন করে পরিচয় করে দিতে চেয়েছে । চলচ্চিত্র সমালোচক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সত্যিই আজ অবাক হয়ে ভাবি, কি বিচিত্রভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে তিনি আধুনিকতার সমীপবর্তী করেছিলেন । তিনি শুধু দেশ বিভাজনের প্রতিক্রিয়া নয়, চলচ্চিত্র মাধ্যমের সূত্রে তিনি নিজের ও সময়ের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন । আর সেই তদন্ত নিছক প্রতিবেদন না হয়ে দার্শনিক সন্দর্ভে রূপান্তরিত হয়ে যায় । এ বিষয়ে কথা চালাচালি না হলে একধরনের বামপন্থীরা তাঁকে শালগ্রামশিলার মতো সমাজ-বাস্তবতার রূপকার ভেবেই চলবে, অন্যদিকে যারা ঋত্বিকের প্রতিপক্ষ তারা ভেবে যেতে থাকবেন, তিনি হিন্দু পুরাণের নুড়িপাথর ব্যবহার করে হিন্দু রিফিউজির মর্মবেদনাই প্রকাশ করে গেছেন । আমরা যারা সময়ের ছাই পরিষ্কার করে তাঁকে দেখতে চাই, তাদের শেষ ব্যারিকেড বানানোর প্রস্তুতি নিতে হবে । কি ছিলেন ঋত্বিক ঘটক।’ ঋত্বিক ঘটক কি ছিলেন সে সম্পর্কে হিরণ মিত্রের কথায়, ‘চিত্রপরিচালকেরা চিত্র বা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন । তার একটা শুরু থাকে, একটা শেষ থাকে । অজান্তেই থাকে । চিত্রকরদের তেমনই থাকার কথা । ঋত্বিক ‘নাগরিক’ দিয়ে শুরু করে ‘যুক্তি তক্কো’তে থেমেছিলেন । নাগরিকের নায়ক যেন ঋত্বিক নিজেই। যুক্তি তক্কোতে ঋত্বিক স্বয়ং নায়ক। ‘পথের পাঁচালি’র অপু–রায় সাহেব নিজেই। ‘আগুন্তক’-এ মনোময় মিত্র, রায় সাহেব স্বয়ং । বয়স বাড়ে; ছবি পাল্টায়, ভাবনাও পরিণতি পায় । এ যেন এক অলিখিত জীবন কাহিনী; এর চলন বুঝতে হলে কাছ থেকে দেখতে হয় । ‘ভ্যান গগ’ শেষ ছবি এঁকেছিলেন হলুদ ক্ষেতে কালো এক ঝাঁক কাক উড়ে যাচ্ছে; তা কি মৃত্যুর অনুষঙ্গ? কুরোসাওয়া তা নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন । ‘ড্রিম’ নাম দিয়ে । কোনটা স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব, আমাদের সংশয় যায় না । আজও সেই সংশয় যায়নি ।’ সেই সংশয় নিয়ে আমরা তাঁকে খুঁজে চলেছি । আরো খুঁজতে হবে । বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অধ্যাপক মানস ঘোষ মনে করেন,’অন্যদিকে ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র মানচিত্রে তখন সত্যজিত রায়ের স্বর্ণযুগ। চারিদিকে চলচ্চিত্র সমালোচকদের মধ্যে এইরকম একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে বসছে যে বাস্তববাদ চলচ্চিত্রের শেষ কথা এবং যে চলচ্চিত্রকার বাস্তববাদী উপনীত হতে পেরেছেন তিনি বাস্তবের শ্রেষ্ঠ রূপকার । ফলে ঋত্বিক ঘটকের অতিনাটকীয়তার আঙ্গিক যেখানে অতিরেক, সমাপ্তি ইত্যাদির মাধ্যমে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার শক্তিকে না বুঝে অস্বীকার এবং সমালোচনা করা হচ্ছে । আসলে এটা এক ধরণের ‘মায়োপিক ভিশন’ বলা যেতে পারে ।’ তিনি আরো মনে করেন,’..বাস্তববাদে যেভাবে স্থান-কাল পাত্রর মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকে এবং একে অন্যের সঙ্গে এই ভারসাম্যের যুক্তিতে আবদ্ধ থাকে ঋত্বিকের ছবিতে তা হয় না । কারণ ঋত্বিক এই ভারসাম্যের আঙ্গিকে ছবি করতে চান না ; তাঁর অভীষ্ট এই ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করা । ফলে কখনো কখনো স্থান, নিসর্গ ইত্যাদি চরিত্রগুলির উপরে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে যা তাদের বিশেষ ধরনের অ্যাকশনের দিকে চালিত করে । এটা ঋত্বিকের ছবির, ঋত্বিকের স্টাইল বা শৈলীর একটা বৈশিষ্ট্য । এই বৈশিষ্ট্যকে বিচার করতে হবে ব্রেখটীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, বিচার করতে হবে তিনি যে এপিক সিনেমা তৈরি করতে চেয়েছিলেন তার প্রেক্ষাপট থেকে । সে দেখা কিছুটা হয়েছে তবে তার অনেকটাই বাকি আছে ।’
ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষে ‘সংবর্তক’ পত্রিকার এই বিশেষ সংখ্যা তাঁর শিল্প নির্মাণ, সৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে আজকের পাঠককে যেমন ভাবাবে, তেমন আজকের শিল্পীদের তাঁদের শিল্পসত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রেরণা দিতে পারে । এমনকি এই সংকলন চলচ্চিত্র গবেষকদের কাছে ঋত্বিক সম্পর্কে অনেকটাই পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারবে । প্রতিভাস ম্যাগাজিন
জন্মশতবর্ষে ঋত্বিক ঘটক বিশেষ সংখ্যা
সংবর্তক, জানুয়ারি, ২০২৫.