অমিতাভ সরকার

আমি বনফুল গো

চিরস্মরণীয়া কানন দেবী

কিছুদিন আগে নারী দিবস পেরিয়ে গেল। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এখনো লিঙ্গ বৈষম্যের মাত্রা কতটা আছে, নারীকে সত্যিকারের আপন করে নিতে আমরা আন্তরিকভাবে মন থেকে আদৌ কতটা প্রস্তুত, এই প্রশ্নগুলো বারবার ফিরে আসার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা আছে।

অন্যান্য জীবিকার মতো আজ যখন চলচ্চিত্রেও নারীরা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানভাবে কাজ করে চলেছে, এই রকম সময়ে দাঁড়িয়ে আসুন একটু ফ্ল্যাশব্যাক করি, পৌঁছে যাই, আজ থেকে একশ বছর আগে, যখন মেয়েদের চলচ্চিত্রে অভিনয় করাটাকে ঘৃণ্য চোখে দেখা হতো, শুধু তাই নয়, সিনেমায় গান গাওয়াটাও মহিলাদের কাছে ছিল গর্হিত অপরাধ। আজ এরকমই একটি মেয়ের গল্প শোনাবো, যিনি জীবনের সকল উপেক্ষা, অসম্মান, কষ্টকে প্রতিহত করে নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটা উদাহরণ। শুধু এটুকু বললেই হয় না, মহিলা অভিনেত্রীরা যাতে স্বাধীনভাবে নিজেদের সুবিধা-অসুবিধের কথা বলার সুযোগ পায়, পুরুষদের পাশে মহিলা শিল্পীরা যাতে কোনোভাবে নিগৃহীত, অসম্মানিত বা লাঞ্ছনার শিকার না হয়, কিংবা বয়সকালে অর্থনৈতিক কারণে  কষ্ট না পেতে হয়- সেইসব কথা ভেবেই গড়ে তুলেছিলেন ‘মহিলা শিল্পী মহল’। এর ফলাফলও হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। অনেক ভালো ভালো কাজও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের সমাজে মেয়েরাই যে মেয়েদের শত্রু- আর শত্রু হলো রাজনীতি, আর তা যদি শুধুই মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত হয়, সেটা হয়ে ওঠে আরো মারাত্মক। এইসব নানাবিধ কারণে ‘মহিলা শিল্পী মহল’- এর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপরেও সব শেষ হয়ে যায়নি। বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মেও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। বুঝতে পারছেন, কার কথা বলছি? 

এই দেবীর নাম কানন দেবী (২২ শে এপ্রিল ১৯১৬-১৭ জুলাই, ১৯৯২)। নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। কানন দাস, কাননবালা, সেখান থেকে কানন দেবী। সেই যুগের অন্যতম  নায়িকা, গায়িকা, পরবর্তীকালে প্রযোজক, পরিচালক। (ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম গায়িকা, বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম স্বীকৃত নায়িকা বলে মনে করা হয়।) তার দ্রুত লয়ে গান গাওয়ার ধরন সে যুগে বেশ বিখ্যাত ছিল। যথেষ্ট সুন্দরী, ব্যক্তিত্বপূর্ণ, বুদ্ধিমতী নায়িকা তখন অনেক পুরুষের হার্টথ্রব ছিলেন। সত্তরের অধিক চলচ্চিত্রে কানন দেবী সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ‘বিদ্যাপতি’, ‘শেষ উত্তর’, ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’,’মুক্তি’, ‘মেজদিদি’ প্রভৃতি সিনেমায় ওঁর স্মরণীয় হয়ে আছে। মহিলারাও কানন দেবীর  অনুকরণে শাড়ি-ব্লাউজ, কানের দুল পরা, তাঁর স্টাইলে হাঁটাচলা করতে পছন্দ করতো। ‘শ্রীমতি পিকচারস’ কানন দেবীর নিজেরই প্রোডাকশন। অভিনয়ের পাশাপাশি ওঁর নেপথ্য কণ্ঠের গানও ছিল অসাধারণ। গান শিখেছিলেন আল্লারাখা, কাজী নজরুল ইসলাম, রাইচাঁদ বড়াল, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, অনাদি দস্তিদার, পঙ্কজ কুমার মল্লিক প্রমুখের কাছে। রবীন্দ্রনাথও ওঁর গুণমুগ্ধ হয়েছিলেন(তবে সাক্ষাতে কবিগুরুকে গান শোনানোর সুযোগ পাননি)। পরবর্তীকালে বিভিন্ন কাজে এতটা জড়িয়ে পড়েন, যে গানের জন্য সময় ততটা দিতে পারেননি। তবে প্রচুর চলচ্চিত্রে কণ্ঠদান করে গেছেন, যাতে আপামর বাঙালি মুগ্ধ না হয়ে পারেনি। 

তাছাড়া অভিনয়ের পাশাপাশি ছবি প্রযোজনা, পরিচালনাও করেছিলেন- যার বেশিরভাগ কাহিনীই ছিল অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের লেখা। ‘বামুনের মেয়ে’,‘নববিধান’, ‘আঁধারে আলো’, ‘দর্পচূর্ণ’,’রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’,’অভয়া ও শ্রীকান্ত’ প্রভৃতি শরৎ-সৃষ্টির পাশাপাশি ‘শেষ অঙ্ক’-র মতো থ্রিলার সিনেমাও বানিয়েছিলেন।  

 কানন দেবীর কণ্ঠে ‘আমি বনফুল গো’(শেষ উত্তর), প্রণাম তোমায় ঘনশ্যাম(মেজদিদি), তুফান মেইল যায়, যদি ভালো না লাগে, কিংবা ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে’, ‘সেই ভালো সেই ভালো’, ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু’, 

‘আমার বেলা যে যায়’ প্রভৃতি রবীন্দ্রসংগীত খুব বিখ্যাত হয়।

রবীন্দ্রসংগীতকে জনপ্রিয় করায় কাননদেবীও যথেষ্ট ভূমিকা নিয়েছিলেন।  

সারাজীবনে নিরন্তর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেনও বেশ কিছু পুরস্কার।’পরিচয়’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে ১৯৪২য়ে বিএফজে, পরের বছর ১৯৪৩ সালে ‘শেষ উত্তর’ ছবির জন্য আবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে বিএফজে পান। তাছাড়া বিশ্বভারতী থেকে ডিলিট উপাধি, ১৯৬৮ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৭৬ সালে দাদাসাহেব ফালকে প্রভৃতি পুরস্কারে সম্মানিতও হয়েছিলেন। তাছাড়া ২০১১ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী ভারতীয় ডাক বিভাগ থেকে কানন দেবী স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। 

অভিনয় জীবনে খ্যাতির চূড়ায় উঠলেও বিতর্ক কষ্ট অসম্মান কখনো তাঁকে ছাড়েনি। তবে যে কোনো ব্যাপারে ভাগ্যের অজুহাত দেওয়া একদমই পছন্দ করতেন না। শুধু পরিশ্রম, কর্মযোগ, চেষ্টা, আর প্রতিভাবলে অভিনয় জগতের একজন অন্যতমা সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছিলেন, যা আজকের দিনেও যথেষ্ট বিস্ময়ের দাবি রাখে।   

‘সবারে আমি নমি’ তাঁর আত্মজীবনী। এর থেকেই তাঁর সম্বন্ধে যেটুকু বোঝার। জীবনের অনেক তথ্যই সঠিকভাবে জানা যায় না। তাছাড়া ঘনিষ্ঠ মহলের বিভিন্ন আলাপচারিতা, অনুলিখন, কানন দেবীকে নিয়ে নানান জনের বক্তব্য -এসব থেকেই এই কিন্নরকণ্ঠী কিংবদন্তী সম্বন্ধে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতেই এই মহিয়সী নারীর বিষয়ে বিভিন্ন কিছু জানা সম্ভব হয়েছে।       

কানন দেবীর জন্ম কোথায় কেউ জানে না। ( মনে করা হয়, হাওড়ায় ওঁর জন্ম হয়েছিল) মা-বাবার সঠিক নামও জানা যায় না। মা-বাবা পরস্পরকে বিবাহ করেছিলেন, না সহবাস করতেন, বা তাঁকে জন্মের পরে কারোর কাছে রেখেছিলেন, না জন্মের পর ফেলে দিয়েছিলেন, তাঁকে হাড়কাটা গলি থেকে পাওয়া গিয়েছিল এসব নানারকম মতামত পাওয়া যায়। জন্মসাল নিয়েও নানান জনের নানা মত। কেউ বলেন, ১৯১৬, কেউ ১৯২২ বা কেউ ১৯২৪। তবে কানন দেবীর জীবনীতে রতনচন্দ্র দাস, রাজবালা দেবীকে পিতা-মাতা বলে উল্লেখ করা আছে। রতনচন্দ্র ভালো চাকরি করতেন, গয়নার দোকানও ছিল, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান, জুয়াখেলায় সব টাকা শেষ হয়ে যায়। তারপর অল্প বয়সে  মারা গেলে আত্মীয়রা রতনচন্দ্রের সব সম্পত্তি নিয়ে নেয়। এর ফলে রাজবালা কিশোরী কাননসহ আরেক মেয়েকে নিয়ে দুমুঠো অন্নের জন্য পরিচারিকার কাজ করতে শুরু করেন। (কেউ কেউ বলেন, রক্ষিতা পরিবেশের ছত্রছায়ায় নাকি কানন দেবী বড়ো হয়েছিলেন। রাজবালা নাকি রতনচন্দ্রের নিজের স্ত্রী ছিলেন না)

আর্থিক অনটনের জন্য হাওড়ায় স্কুলে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা চালু রাখতে পারেন নি। মাইনে দিতে না পারায় স্কুল থেকে কিশোরী কাননের নাম কাটিয়ে দেওয়া হয়। (তবে বই পড়া, গান করা, এমনকি আয়নার সামনে পাওডার মেখে অভিনয় প্রাক্টিস করার অভ্যাসটা ওঁর মধ্যে তখন থেকেই তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তী জীবনেও এই অভ্যাসের অন্যথা হয়নি। নতুন কিছু পড়াশোনা করা, শিখবার ইচ্ছা চিরকালই কানন দেবীর ছিল।)

ভাগ্যান্বেষণে এক আত্মীয়ের বাড়ি আশ্রয় নিলে তারাও তাদের বাড়ির সব কাজের লোক ছাড়িয়ে দিয়ে মা-মেয়েকে তো বাড়ির সব কাজ করাতোই, উপরন্তু নানারকম গালিগালাজ করতো। শেষে একদিন সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেলে কানন রাজবালাসহ বোনকে নিয়ে অন্য জায়গায় (হাওড়ার ঘোলাডাঙা) চলে আসে। সেখানে পাড়াতুতো এক দাদার(‘ভোলাদা’) কাছে কীর্তন, বাউল, ভজন, ব্রাহ্মসংগীত শেখার হাতেখড়ি। এই ভোলাদাও একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর পাশের বাড়িরই এক বৌদি( মনে করা হয়, ইনি সেকালের বিখ্যাত গায়িকা আশ্চর্যময়ী দাসী) কাননবালাকে সস্নেহে আশ্রয় দিয়েছিলেন।   

পাড়াতুতো কাকাবাবু তুলসী ব্যানার্জির সুপারিশে দশ বছর বয়সে একটু সামান্য রোজগারের জন্যই অভিনয় করতে আসতে হয়। সেখানেও নানান ভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছে কিশোরী কাননকে। জ্যোতিষ ব্যানার্জির পরিচালনায় জ্যোতি থিয়েটার /মদন স্টুডিওতে ১৯২৬ সালে নির্বাক ছবি জয়দেব সিনেমায় প্রথম অভিনয়। ১৯২৭তে শঙ্করাচার্য সিনেমায় কাননবালা নামে আত্মপ্রকাশ। এখানে ঋষির প্রেম, জোরবরাত সিনেমা ছাড়াও বিষ্ণুমায়া, প্রহ্লাদ -ছবিতে পুরুষের চরিত্রেও অভিনয় করতে হয়েছিল। কালানুক্রম অনুযায়ী, ১৯২৬-১৯৩২ জ্যোতি থিয়েটার, ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সালে রাধা ফিল্ম, ১৯৩৭ -১৯৪১ নিউ থিয়েটার্স, ১৯৪২ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত এমপি প্রোডাকশন এবং ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত নিজের লেবেলকৃত শ্রীমতী পিকচার্সে কাজ করেন। শ্রীমতী পিকচার্সে উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায় থেকে পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র -কে না অভিনয় করেননি! সমকালের অন্যান্য খ্যাতনামা শিল্পীরাও ওঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। প্রিয় মানুষ কৃষ্ণচন্দ্র দে তো কানন দেবীকে ‘রাধে’ সম্বোধনে ডাকতেন। 

কিন্তু এই কানন দেবীকেই ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অনেক হেনস্থা হতে হয়েছিল। সহায়সম্বলহীন কিশোরী বলে যা হয়- অনেকেই সুযোগ নিত বা নিয়েছে। সবার নামও উনি বলেননি। ১৯৩১ সালে সবাক ছবি ‘জোরবরাত’ সিনেমায়(মিস কাননবালা নামে অভিনয় করেছিলেন) কিশোরী কাননবালাকে নায়ক বলপূর্বক চুম্বন করায় উনি প্রতিবাদ করলে ওঁর জোরের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়ে সিনেমা থেকে দৃশ্যটি বাদ দেয়া হয়। ‘বাসবদত্তা’ ছবিতে (সে সময়ের বিচারে) নগ্নতার প্রদর্শন ছিল। এমনকি খোলামেলা দৃশ্যেও তাঁকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অভিনয় করাতে বাধ্য করানো হতো, অর্থের লোভ দেখানো হতো। আবার এমনও হয়েছে, অভিনয়ের প্রাপ্য অর্থের অনেক অংশই তাঁকে দেয়া হতো না। সবাই জানতো তাঁকে প্রতারণা করলে তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করা কাননবালার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’, ‘মুক্তি’ চলচ্চিত্রে অসাধারণ কাজের ফলে নায়িকা এবং গায়িকা হিসেবে কাননবালা যথেষ্ট সমাদৃত হন। পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টি, তাদের প্রলোভনের সঙ্গে খুব ছোটবেলা থেকেই পরিচিত ছিলেন বলে একজন প্রযোজক বোম্বেতে গেলে লক্ষ লক্ষ টাকা দেবেন বললেও কানন দেবী বোম্বে যাননি। পরবর্তীকালে অবশ্য তারাই  কলকাতায় এসেছিলেন। বাংলা, হিন্দি দ্বিভাষিক ছবি ছাড়াও কিছু  হিন্দি ছবিতেও সুনামের সঙ্গে কাজ করেছিলেন কানন দেবী। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৪ ছিল কাননবালা থেকে কানন দেবী হয়ে ওঠার সময়। সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পান এই সময়টাতেই। অভিনয়, গান গাওয়ার পাশাপাশি প্রযোজনা, পরিচালনাতেও কানন দেবী কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। একটা সময় অভিনয় করে সিনেমার নায়কদের সমপরিমাণ উঁচু অঙ্কের টাকা সাম্মানিক পেয়েছেন। যোগাযোগ, পরাজয়, সাথী, মা, কণ্ঠহার, খুনি কৌন প্রভৃতি ওঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমা। 

ব্রাহ্ম সমাজের নেতা হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের পুত্র অশোক মৈত্রের সঙ্গে  কানন দেবীর প্রেম ও ১৯৪০ সালে বিবাহ হলেও সেসময়ের অন্যান্য অভিনেত্রীদের মতো চলচ্চিত্র অভিনয়ে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা করায় সম্পর্কে ভাঙন ধরে। কানন দেবী ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট, লড়াই করেছেন। সমঝোতা করা তাঁর ধাতে ছিল না। উভয়ের সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলেও অশোক মৈত্র কানন দেবীকে বিদগ্ধজনের সমাজে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন বলে চিরদিনই শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে গেছেন।  

শাশুড়ি মা কুসুমকুমারী দেবী, দেওর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, ও তার স্ত্রী রাণী মহলানবিশ, এমনকি অন্নপূর্ণা দাস, ধীরেন দাসের সঙ্গে কানন দেবীর নিবিড় সখ্যভাব চিরদিন বজায় ছিল। এমনও হয়েছে, কুসুমকুমারী দেবী অসুস্থ হলে নিজের শুটিং বাতিল করে কানন দেবী তাঁকে সেবা-সুশ্রূষা করেছেন, নিজের কাছে এনে রেখেছিলেন নিজের মায়ের আসনে বসিয়ে। এ যেন এক অন্য নজির, তাও সেই সময়ে। ১৯৪৯ সালে কানন দেবী রাজ্যপালের এডিসি হরিদাস ভট্টাচার্যকে বিবাহ করেন। সন্তান সিদ্ধার্থকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল ওদের সংসার। এখানেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। এই সম্পর্ক নিয়েও নানা কথা শোনা যায়। এরকমও বলা হতো যে এ বিয়েও টিকবে না। কিন্তু শেষদিন পর্যন্ত এই সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ ছিল। হরিদাস ভট্টাচার্যকে পরিচালক বানান কানন দেবীই। কানন দেবীর প্রযোজনা আর হরিদাসবাবুর পরিচালনায় প্রচুর ভালো ভালো ছবি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, ‘দেবত্র’ সিনেমায় উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, কানন দেবী একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। 

তবে ১৯৮৯ সালে হঠাৎ একদিন এ জিনিসপত্র নিয়ে হরিদাস ভট্টাচার্য উদাও হয়ে যান। ১৯৯২ সালে ১৭ই জুলাই কলকাতার বেলভিউ নার্সিংহোমে আটাত্তর বছর বয়সে কানন দেবী পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান। শেষ সময়ে পুত্র, পুত্রবধূ কাছের কিছু মানুষ ছাড়া শ্রদ্ধা জানাতে কলাকুশলীরা তেমন কেউই আসেনি। কাকতালীয়ভাবে এর ঠিক কুড়ি বছর পর সুচিত্রা সেনেরও এই বেলভিউ নার্সিংহোমেই দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অবসান হয়। 

কানন দেবী এমনই একজন, যাঁর জীবনই একটা সিনেমা। এতে যতই তলিয়ে যাওয়া ততই যেন গল্পের পর গল্প- একটার পর একটা বাঁধাকে প্রতিহত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জয়গাথা। 

যাদের দ্বারা এত কষ্ট আঘাত পেয়েছেন গোটা জীবনটায়,  কাউকেই তিনি অভিশম্পাত করেননি, সবাইকেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছেন। এটাই তো একজন আদর্শ শিল্পীর উদাহরণ। একজন শিল্পীও যে মানুষ। এখানেই কানন দেবীর মহত্ত্ব।

বিস্মৃতির আড়ালে গিয়েও আজও (ভারতীয় সিনেমার প্রথম সিঙ্গিং সুপারস্টার হিসাবেই হোক, কিংবা একটু সম্মানের সঙ্গে নিজের উপার্জনে অন্যায় প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে অবিরত মোকাবিলা করতে করতে সারাজীবন মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার জন্য ওঁর নিরন্তর অধ্যাবসায়ের কারণেই হোক) তাই কানন দেবী চিরস্মরণীয়া। কবিগুরুর কথাতেই তাই বলতে হয়,’যে কেহ মোরে দিয়েছ দুখ, সবারে আমি নমি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *