অমিতাভ সরকার
আমি আপন করিয়া চাহিনি তোমায়
প্রণব রায়
গান তো করিস, গান লিখতে পারিস না?’
‘চেষ্টা করিনি কখনো।’
‘লিখে দেখাস না।’
এইচএমভির তৎকালীন ট্রেনার সহৃদয় মানুষটির কথায় সেদিনের প্রতিভাবান কিশোরটি দপ্তরে চারটি গান জমা দিয়ে গেছিল।
তারপর কয়েকমাস আর কোনো খোঁজ-খবর নেই। শেষে আশাহত হয়ে নিজেই খোঁজ নিতে অফিসে গেলে ভদ্রলোকটি হাসিমুখে জানিয়েছিলেন, এতদিন কোথায় ছিলে? তোমার গানের যে সুর হয়ে রেকর্ড বেরিয়ে গেছে।
কিশোরটি অবাক। এইভাবেই তার গীতিকার জীবনের পথ চলা শুরু।
শিক্ষকটি ছিলেন কাজী নজরুল স্বয়ং, আর কিশোরটির নাম প্রণব রায়। জনপ্রিয় গীতিকার হিসাবে এই মানুষটি বাংলা গানে প্রভৃত অবদান রেখে গেছেন।

নিজে ভালো গান গাইতেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিমের পাশাপাশি পিয়ানো অর্গান বাদ্যযন্ত্র বাদনেও পারদর্শী ছিলেন। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও তাঁর গানের প্রশংসা করেছিলেন। বিদ্রোহী কবি নজরুলের হাতে গড়া তাঁর স্নেহধন্য গীতিকার প্রণব রায়। জহুরির চোখ ছিল বিদ্রোহী কবির।
নজরুলের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল প্রণব রায়-কমল দাশগুপ্ত এই গীতিকার-সুরকার বন্ধু জুটি। নজরুল যেমন তাঁকে স্বরচিত গান শিখিয়েছেন, তেমনি সন্তোষ সেনগুপ্ত নজরুলসঙ্গীত শিখেছেন প্রণব রায়ের কাছ থেকেই।
প্রণব রায় নিজে গল্প কবিতা চিত্রনাট্য সংলাপ উপন্যাস সবই লিখেছেন। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’, সোমনাথ লাহিড়ীর ‘স্বাধীনতা’ এমনকি ‘রোমাঞ্চ’ পত্রিকাতেও লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বরচিত কবিতার সুখ্যাতি করেছেন। বসুমতী পত্রিকার সহ-সম্পাদকও ছিলেন কিছুকাল।
একই মানুষ, তার এত প্রতিভা। একটা জীবনে কেউ এত বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে আসতে পারে? তিনি পেরেছিলেন। কী পেয়েছেন বা কী পেলেন না- এই দ্বন্দ্বে আদৌ বিচলিত হননি। সৃষ্টি করে গেছেন।
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনোদিন সিরিয়াস কিছু ভাবেননি। কাজ তাঁর কাছে ঠিকই এসেছে- উনি কাজের জন্য লালায়িত হননি, আর ওঁকে কাজের সন্ধানে যেতে হয়নি।
কিন্তু গীতিকার হিসেবেই বিখ্যাত হয়ে গেলেন। প্রণব রায়ের নিজের কথায় তিনিই প্রথম বাংলা গানের জেলখাটা গীতিকার(ছাত্রাবস্থায় ‘কমরেড’ নামক কবিতা লিখে ব্রিটিশ সরকারের রাজদ্রোহের মুখে পড়েন এবং বিচারে তাঁকে হাজতবাস করতে হয়। মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও এতে তাঁর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে যায়।)।
জন্ম ১৯১১ সালের ৫ই ডিসেম্বর। প্রণব রায় ছিলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বংশধর। বাবা দেবকুমার রায়চৌধুরী, মা সুকৃতি দেবী। বাবা ছিলেন ব্রাহ্ম। সুকিয়া স্ট্রিটে ছিল তাঁদের বাড়ি। ব্রাহ্ম বয়েস স্কুলে তাঁর পড়াশোনা শুরু। পড়াশোনায় তো খুবই ভালো ছিলেন। কিন্তু মা গত হওয়ায় পিসেমশাই ঈশানচন্দ্র এবং পিসিমার কাছে মানুষ হতে হয়। উদারচিন্তার এই দম্পতি নিজের ছেলের মতোই তাঁকে মানুষ করে তোলেন। ম্যাট্রিকুলেশনে তিনটি লেটার নিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হন ইন্টারমিডিয়েট পড়তে। তখন সাহিত্যচর্চাও চলছে। এই সময়ে নজরুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ। তাঁরই দেখানো পথে গান লেখা শুরু। ব্যাস। কোন ঘটনা কীভাবে কার জীবনে কী মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তা যে বিধাতাই জানেন।
১৯৩৪ থেকে আমৃত্যু – অসামান্য সব গান উপহার দিয়েছেন। আড়াই হাজারেরও বেশি গানের রচয়িতা প্রণব রায় মানুষ হিসেবেও ছিলেন -বড় মনের। নিরহংকারী, নম্র, ভদ্র, সৎ এবং বেশ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের। আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা – স্বভাবে নিতান্তই সাদামাটা সহজ-সরল। ‘যখন রবো না আমি দিন হলে অবসান/ আমারে ভুলিয়া যেও মনে রেখো মোর গান’- এই ছিল তাঁর প্রত্যাশা। বলাবাহুল্য এই ইচ্ছা ঠিকই পূরণ হয়েছিল।
অনেক শিল্পীরই প্রথম রেকর্ড ওঁর গান দিয়েই। সারা জীবনে আড়াই হাজারের মতো গান লিখে গেছেন। ১৯৭৫ সালে মৃত্যুর সময় ১১টি সিনেমার কাজ বাকি ছিল, যার মধ্যে পরে মোটে তিনটি সিনেমাই মুক্তি পেয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়, প্রণব রায় সেটা জানতেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে খুব সহজেই গান লিখে ফেলতেন। গানের কথা, গানের ভাষাও ছিল সহজ, অনুভবী; আবেদন এমনই ছিল, যে দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছত। একে একে আধুনিক বেসিক গান, সিনেমার গান, সংলাপ রচনা, চলচ্চিত্র পরিচালনা সবই করেছেন।
‘সাঁঝের তারকা আমি’, ’ জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা’, ’ নাইবা ঘুমালে প্রিয়’,’ একহাতে মোর পূজার থালা’, ’ মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘এমনই ভরসা ছিল সেদিন’, কিংবা ‘চিঠি’, ‘সাতটি বছর আগে’, ‘সাতটি বছর পরে’-র মতো কাহিনীগীতি তো আছেই, এছাড়া ‘আমি বনফুল গো’,’ এই কি গো শেষ দান’,’ ভাঙনের তীরে ঘর বেঁধে কি বা ফল’,’ মধুমালতী ডাকে আয়’,’ নতুন সূর্য আলো দাও’, ’সে বিনে আর জানে না’,’ আজ দুজনে মন্দ হলে মন্দ কি’ ’এক যে আছে কন্যা’ -ইত্যাদি গানের কথা যেন কোনো নির্দিষ্ট ব্যাপ্তিতে বাঁধা পড়বার নয়।
যূথিকা রায়, কানন দেবী, মিস মানিকমালা, কমলা ঝরিয়া, বেলা মুখোপাধ্যায়, ভবানী দাস, কুন্দনলাল সায়গল, রবীন মজুমদার, তালাত মাহমুদ, শ্যামল মিত্র, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন -সবার কণ্ঠেই যেমন প্রণব রায়ের কথা সুর হয়ে বেজে উঠেছে- তেমনি শৈলেশ দত্তগুপ্ত, সুধীরলাল চক্রবর্তী, নচিকেতা ঘোষ, রাইচাঁদ বড়াল, অনিল বাগচি সবার সুরেই গান লিখেছেন৷ তবে বন্ধু কমল দাশগুপ্তর পরে রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটিতে বেশ কিছু কালজয়ী গানের জন্ম হয়।
প্রণব রায়ের গানের কথা সমাজের সর্বস্তরের বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন মানসিকতার মানুষের জন্য ভালো লাগার- কারণ তিনি সব ধরনের মানুষের অনুভূতি খুব ভালো ভাবেই টের পেতেন। গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার প্রণব রায়কে ওঁর যথার্থ উত্তরসূরী মনে করতেন।
এছাড়া গল্পকার প্রণব রায়ের রচনা নিয়ে ‘সাত নম্বর বাড়ি’(১৯৪৬), ’মন্দির’(১৯৪৭), ’ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’(১৯৭১) -ইত্যাদি চলচ্চিত্র যেমন তৈরি হয়েছিল, তেমনি ‘রাঙামাটি’,’ অনুরাধা’,’ বামুনের মেয়ে’-প্রভৃতি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এছাড়া নীতিন বোসের সহযোগী হিসেবে বোম্বেতে গিয়ে ‘বিচার’ ছবিতে কাজ করেছেন। ’বাত এক রাত কি’ প্রণব রায়েরই লেখা গল্প। এছাড়া কলকাতায় ‘শেষ উত্তর’,’ রাঙা বউ’, ’পণ্ডিতমশাই’, ’গরমিল’, ’পরিচয়’, ’রাসপূর্ণিমা’, ’ব্রাহ্মণ কন্যা’,’মেঘ কালো’, ’পরিণীতা’, ’ঢুলি’, ’মায়ার সংসার’, ’পৃথিবী আমারে চায়’, ’কমললতা’, ’ফরিয়াদ’, ’জলজঙ্গল’, ’শিল্পী’ ইত্যাদি বহু সিনেমায় গান লিখেছেন।
আজও প্রণব রায়ের লেখা গান যেমন এখনকার যুগের বিভিন্ন শিল্পীরা রিমেক করেন, তেমনি আশ্চর্যের বিষয় এটাও যে, প্রণব রায়ের কথাও ওঁর পরবর্তী যুগের গীতিকাররা হুবহু ব্যবহার করেছেন।
এহেন গীতিকার সেরকম উল্লেখযোগ্য কোনো পুরস্কার পাননি। তবে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন অনেকটাই। আত্মপ্রচার তাঁর ধাতে ছিল না। তাই কোন কৃতজ্ঞতাবোধের পরোয়াও তিনি করেননি। সুখেও যেমন আহ্লাদিত হতেন না, বেদনাতেও তেমনি ভেঙে পড়তেন না- সবসময়ই ছিলেন নিজের বিশ্বাসে ধীর, শান্ত আর কর্তব্যে নীরব অথচ আত্মপ্রত্যয়ী, অবিচল- হাস্যমুখী, স্থিতপ্রজ্ঞ- এইসকল বিরল বৈশিষ্ট্যাবলিই তাঁর কাছ থেকে সকলের শেখার থেকে যায়।
স্ত্রী রমা দেবী, পুত্র প্রদীপ্ত রায়কে নিয়ে ছিল ওঁর সুখের সংসার। চলে যাওয়ার দিনটিও ছিল বাইশে শ্রাবণ। ১৯৭৫ সাল। মাত্র ষাট বছরের জীবন। কিন্তু সৃষ্টি চিরন্তন কালের।
যতদিন মানুষ ঠিক থাকবে, যতদিন ভালোবাসা থাকবে, ততদিন প্রণব রায়ও অমর হয়ে থাকবেন তাঁর গানের মধ্যে- ‘ভুলো না এ গান প্রিয়’,’শুধু মালাটি দিও না গো’ কিংবা ‘মেঘের স্বপন দেখি মরুতে’ ইত্যাদি গানের মায়াবিনী সুধায়। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
