অমিতাভ সরকার
বিস্মৃতির আড়ালে এক সাধক
সুধীরলাল চক্রবর্তী
১৯৫২ সাল। একজন তরুণ শিল্পী তাঁর সংগীতগুরুকে স্মরণ করে সদ্যপ্রয়াত তাঁরই সুরে সে বছরের পুজোর গান রেকর্ড করেছিলেন, যার একটি গান শিল্পীকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। গানটি ছিল পবিত্র মিত্রের কথায় ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’(রেকর্ডের অপর পিঠের গানটি ছিল, ‘আশা বাঁধে ঘর’)। এর সতেরো বছর পরে আরও একবার এই শিল্পী তাঁর পরমপূজ্য গুরুর সুরকৃত আরো দুখানি গান রেকর্ড করেন। গানদুটোর একটি ছিল গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কলমে ‘তোমার জীবনে চাই না কাঁটা হতে’ এবং পবিত্র মিত্রের কথায় ‘তুমি শুধু বলে যাও’)। পাঠক-পাঠিকারা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে শিল্পীর নাম শ্যামল মিত্র।
কিন্তু শ্যামল মিত্রের এই সংগীত শিক্ষক-গুরুটির নাম কি? যাঃ, পারলেন না তো! উনি আর কেউ নন, অবিস্মরণীয় সংগীত প্রতিভা সুধীরলাল চক্রবর্তী। পরবর্তীকালে শ্যামল মিত্র সুরস্রষ্টা হিসেবে খ্যাতি লাভ করলে তাঁর সুরে যে গুরু সুধীরলালের ধারা প্রবহমান, তা পরবর্তীকালে তিনি অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করেছেন, চিরদিনই সুধীরলালকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে গেছেন। শুধু শ্যামল মিত্র নন, সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে তাঁর পরম শিষ্যা উৎপলা সেনের কণ্ঠে ‘কেন জাগে শুকতারা আজো’,’এলো কি শাওন এলো কি আমার মনে’ গান দুটো সেই বছর অর্থাৎ ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসের রেকর্ডকৃত হয়।
এইচএমভির ক্যাটালগে প্রচ্ছদে সদ্যপ্রয়াত সুধীরলাল চক্রবর্তী, আর উৎপলা সেনের ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল, আর তাতে লেখা হয়েছিল -’স্বর্গীয় শিল্পী ও সুরকার সুধীরলালের সুরের রঙে রঞ্জিত, শিল্পী উৎপলা সেনের কণ্ঠ- আলিম্পনে চিত্রিত বিরহী মনের দরদ গাথা।’ এই দুজনের কথা তো গেল। গায়ত্রী বসু গুরু সুধীরলালের সুরে ‘কেন এলে মধুর রাতে গো, জীবনসায়রে নিরাশার ঢেউ’ রেকর্ড করেন ১৯৫৩ সালের মার্চে। এছাড়া নীতা বর্ধনের(সেন) রেকর্ড করা ‘ওগো নয়নে আবির দিও নাকো শ্যামরায়’, অনন্তদেব মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘যেদিন রবো না আমি’, ‘এ তো ভালোলাগা’, শচীন গুপ্তের ‘তখনো আকাশে ছিল গো আঁকা’,’কেন খেলাছলে শুধু স্বর্গ গড়িতে চাওয়া’, অপরেশ লাহিড়ীর কণ্ঠে ‘ভালোবাসা যদি অপরাধ হয়’- পরবর্তীকালের খ্যাতনামা এইসব শিষ্য-শিষ্যাদের সব গানেরই সুরকর্তা স্বয়ং সুধীরলাল। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় আধুনিক গান শিখেছেন তাঁর কাছেই। উল্লেখ্য, মূলত বেসিক গানেই সুধীরলাল নিজের স্বীকৃতি রেখে গেছেন।
এবার একটু সুধীরলালের পূর্ব জীবনের কথা শোনা যাক।

জন্ম বাংলাদেশের কোটালীপাড়ার বালিয়াভাঙা গ্রামে। জন্মের সাল ১৯২০। বাবা গঙ্গাধর চক্রবর্তী ফরিদপুর অফিসে কালেক্টরেট হিসেবে কাজ করলেও ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে গানের আবহাওয়া ছিল। ছোট্ট সুধীরলাল গ্রামের স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ঠিকই, তবে পড়াশোনায় তাঁর একেবারেই মন ছিল না। ফলে লেখাপড়াও বেশি দূর এগোয়নি। ছোটোর থেকেই গানের ব্যাপারে ওঁর ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ।
বাল্যকাল থেকেই সুধীরলাল যেমন শ্রুতিধর ছিলেন, তেমনি অল্প বয়সেই তাঁর খুব তাড়াতাড়ি গান তুলে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল, যা সবাইকে অবাক করে দিত। এহেন সুধীরলালের ৯-১০ বছর বয়স থেকে গুরু গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর কাছে সংগীতের বিভিন্ন শাখায় তালিম নেওয়া শুরু হয়। সেই সময়ই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে এসে গুরু গিরিজাশঙ্করের বাড়িতে থাকতেন। (সুধীরলালের বাংলাদেশে থাকাকালীন জীবন সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। উনিও কিছু লিখে রেখে যাননি। সমকালীন কেউই এ ব্যাপারে কিছু আলোকপাত করেননি। এমনকি কীভাবে গিরিজাশঙ্করের সঙ্গে সুধীরলালের যোগাযোগ হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত আছে।
কেউ বলেন, কোনো আসরে বালক সুধীরলালের গান শুনে গুরু গিরিজাশঙ্করের খুব ভালো লাগে। উনি বালক সুধীরলালের সাংগীতিক দক্ষতার বিষয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নেন। সব পরীক্ষাতেই সুধীরলাল উত্তীর্ণ হন সাফল্যের সঙ্গেই।) সেখানেই সুধীরলালের সঙ্গে নিখিলচন্দ্র সেনের আলাপ ও হৃদ্যতার শুরু, যা আমৃত্যু অক্ষুণ্ণ ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সুধীরলাল উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিভিন্ন কঠিন তালিম এবং তার নানা কৃৎকৌশল ভালোভাবে আয়ত্ত করে ফেলেন। গুরুর কৃপায়, নিজের পারদর্শিতায় অল্প বয়সেই বেতার, জলসা, ঘরোয়া অনুষ্ঠান -এমনকি বিভিন্ন মিউজিক কনফারেন্সে কৃতিত্বের সঙ্গে গান গাইতে থাকেন। এলাহাবাদ মিউজিক কনফারেন্স, অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে সুধীরলালের গান শুনে গুরুদেব গিরিজাশঙ্কর এই প্রিয় ছাত্রটির প্রতি খুব খুশি হন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে হিন্দুস্তান কোম্পানি থেকে সুধীরলালের প্রথম রেকর্ড বেরোয়। গানদুটো ছিল দেবেশ বাগচির কথায় ‘রজনী গো যেও না চলে’,’ভালোবেসেছিনু আলেয়ারে’।
১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে পরের রেকর্ড নরেশ্বর ভট্টাচার্যের কথায় অনুপম ঘটকের সুরে ‘সন্ধ্যামালতী বনে’, আর ‘শুকনো পাতা ঝরে যায়’। একে একে ‘গান গেয়ে মোর দিন কেটে যায়’,’তুমি ছিলে তাই’,’বনভূমি শ্যামায়িত আকাশ মেঘমেদূর’,’ছাইল অম্বর ঘন মেঘে’,’প্রথম দিনের প্রথম সে পরিচয়’,’খেলাঘর মোর ভেসে গেছে হায় নয়নের যমুনায়’,’এ জীবনে মোর যত কিছু ব্যথা’,’মধুর আমার মায়ের হাসি’- গানগুলো সুধীরলালকে বিখ্যাত করে তোলে।
প্রথমদিকে হিন্দুস্তান রেকর্ডের গায়ক এবং সুরকার হিসেবে প্রায় নিয়মিতই কাজ করেছেন। পরে হিন্দুস্তান রেকর্ডের পাশাপাশি এইচএমভি কলম্বিয়া ভারত মেগাফোন পাওনিয়ার ইত্যাদি জায়গা থেকেও রেকর্ড বার করেছেন। সুধীরলালকৃত সব গানই সেযুগে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। রেকর্ড, জলসা, চলচ্চিত্র, প্রশিক্ষণ সব জায়গাতেই -সুধীরলাল হয়ে উঠেছিলেন সুরের একচ্ছত্র সম্রাট। গুরু গিরিজাশঙ্কর নিজেও যেমন বদল খাঁ, মইজুদ্দিন খাঁ, ইনায়েত হোসেন খাঁ, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর মতো জগৎবিখ্যাত সংগীতজ্ঞের শিষ্য ছিলেন, তেমনি তাঁর নিজের শিষ্যদের তালিকাও ছিল দীর্ঘ। ভবিষ্যতে অনেকেই সংগীত জগতে যশস্বী হয়েছিলেন। যেমন- চিন্ময় লাহিড়ী, নিখিলচন্দ্র সেন, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, তারাপদ চক্রবর্তী, সুখেন্দু গোস্বামী, রেনুকা মোদক, ইভা গুহ, প্রভৃতি। তবে সুধীরলালের মিষ্টি গলা, সহজাত প্রতিভা, ব্যবহার, তাছাড়া দীর্ঘকাল নিজের বাড়িতে রেখে গান শেখানোর ফলে পুত্রসম এই ছাত্রটিকে গিরিজাশঙ্কর খুব স্নেহ করতেন। নিজেও চেয়েছিলেন অনন্য প্রতিভার অধিকারী তাঁর এই ছাত্রটি ভবিষ্যতে শাস্ত্রীয় সংগীতের শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে। শাস্ত্রীয় সংগীতে ব্যুৎপত্তির ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার সংগীত সাধকরা বাংলাদেশকে একটু উপেক্ষার চোখে দেখতেন। তার কারণও ছিল। বাংলাদেশ কীর্তন এবং আধুনিক গানের চর্চায় যতটা এগিয়ে ছিল, মার্গ সংগীত নিয়ে ততটা সাধনা, ধৈর্য দেখাতে পারেনি। গিরিজাশঙ্কর চেয়েছিলেন, সুধীরলাল সেটা করে দেখাক। কিন্তু জীবিকার তাগিদ, নামযশের আকাঙ্ক্ষা, সংগীত জগতের রঙিন হাতছানি – অন্য সবার মতো সুধীরলাল উঠতে পারেননি। আধুনিক গানের চর্চা, গান শেখানো, রেকর্ডিং, সুর করা, জলসায় গান গাওয়া, গীত গজল পরিবেশনায় সুবিধার জন্য সুধীরলাল পরবর্তীকালে গুরুগৃহ ত্যাগ করেন। এতে গিরিজাশঙ্কর মনে মনে খুব আঘাত পান। সুধীরলালও আজীবন গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ঋণস্বীকার করে গেছেন, একসময় তিনিও সব বুঝতে পারেন, তবে তখন আর ওঁর পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। গুরু-শিষ্য দুজনেই বিচ্ছেদের অন্তর্দাহে জর্জরিত হন। গুরু গিরিজাশঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়েন, ১৯৪৮ সালে তাঁর দেহান্তের মাত্র চার বছর বাদে প্রিয়তম শিষ্য সুধীরলালও সুরলোকে যাত্রা করেন।
তবে আজকের দিনে ভাবলে অবাক হতে হয়, এত অল্প বয়সে অত অল্প দিন গান গেয়ে সুধীরলাল সেই সময়ের একজন কালজয়ী সংগীতজ্ঞ হিসেবে প্রভূত নাম করেছিলেন, সারা বাংলায় ওঁর খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়েছিল। নিজের সুরে তো সুধীরলাল গেয়েইছেন, তাছাড়া অনুপম ঘটক, দুর্গা সেন প্রভৃতি সুরকারদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে গায়কসত্ত্বা থেকেও সুধীরলাল সুরকার, সংগীত প্রশিক্ষক হিসেবে অনেক বেশি খ্যাতি অর্জন করেন। উৎপলা সেন, শ্যামল মিত্র থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, অখিলবন্ধু ঘোষ, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল বসু (পান্না কাওয়াল)-র পাশাপাশি মাধবী ঘোষ, কুমারী সবিতা সিং, কুমার প্রদ্যুৎনারায়ন, পূরবী দেবী – সবাই সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে গান রেকর্ড করে খ্যাতি লাভ করেছেন।
১৯৩৫-৩৬ সাল থেকে সুধীরলাল কলকাতা বেতারের কাজ শুরু করেন। সুধীরলাল নিজেও উচ্চাঙ্গের ঠুংরি খেয়াল গাইতেন। বেতারে রাগপ্রধান, আধুনিক গানও গেয়েছেন। তবে সুধীরলালের ঠুংরি খেয়ালের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি, যা সংগীতানুরাগী শ্রোতাদের কাছে দুর্ভাগ্য। তেমনি সুধীরলাল যে নিজে দারুণ ভালো তবলা বাজাতেন, সেদিকটাও অজ্ঞাত হয়ে গেছে (বিমান মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা গিয়েছে)।
১৯৩৯ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সূচনা হলে সেখানেও সুধীরলাল শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেছেন। এখানেই ওঁর সঙ্গে পবিত্র মিত্রের আলাপ। জহুরীর যেমন জহর চিনতে ভুল হয় না, তেমনি দুজনের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রণব রায়, অজয় ভট্টাচার্য, নরেশ্বর ভট্টাচার্য, সুবোধ পুরকায়স্থ, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার -ইত্যাদি তখনকার সময়ের অন্যান্য অনেক গীতিকারদের সঙ্গে কাজ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুধীরলালকৃত গানের কথা লিখেছেন পবিত্র মিত্র। প্রথম দিকে নির্দেশক-প্রযোজক, ঘোষক, অভিনেতা হিসেবে কাজ করলেও পরম সুহৃদ সুধীরলালের পরামর্শে গীতিকার হিসেবে নিজের অনন্য পরিচয় তৈরি করে নেন।
১৯৪২ সালে সুধীরলাল ঢাকা বেতার কেন্দ্রে ধরাবাঁধা মাইনের সংগীত প্রযোজকের কাজে যোগ দেন, এবং তিন বছর এই কাজে রত ছিলেন। কলকাতা বেতার, গ্রামোফোনের রেকর্ডের কাজ, গান শেখানো ইত্যাদি চাপের ফলে চাকরি ছেড়ে ১৯৪৫ সালে আবার কলকাতায় চলে আসেন। তবে কোনো জায়গার সঙ্গে ওঁর হার্দিক সম্পর্ক চলে যায়নি। কলকাতা ঢাকা সব জায়গাতেই গায়ক, সংগীত পরিবেশক, এবং সুরকারের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
পরবর্তী কালে বাংলা সবাক ছবির আত্মপ্রকাশ এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সুধীরলাল রেকর্ডিংয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। সুধীরলাল জীবনের শেষ দিকে মাত্র দুটো চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন। চলচ্চিত্র দুটো ছিল ‘গরবিনী’(১৯৫০) ‘সুনন্দার বিয়ে’(১৯৫১), (মতান্তরে প্রথম ছবি হিসাবে ১৯৪৭ সালে জাগরণ ছবিটির নামও পাওয়া যায়।) ‘গরবিনী’-তে সুধীরলালের সুরে গায়ত্রী বসুর গাওয়া ‘যদি নতুন করে দেখো’,’যদি না আসে ফাগুন’ উল্লেখযোগ্য। তবে ‘গরবিনী’-র পারফর্মেন্স দেখে গেলেও ‘সুনন্দার বিয়ে’ সুধীরলালের মৃত্যুর পাঁচ মাস পরে মুক্তি পাওয়ায় এই চলচ্চিত্রের সাফল্য তিনি দেখে যেতে পারেননি। ‘সুনন্দার বিয়ে’ চলচ্চিত্রে সুপ্রীতি ঘোষ, শ্যামল মিত্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়ত্রী বসু গান গেয়েছিলেন। উক্ত চলচ্চিত্রে ‘উছল তটিনী আমি তুমি সুদূরের চাঁদ’ গানটি গেয়ে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করেন।
বাংলা আধুনিক গানে রাগ সংগীতের ব্যবহারের সঙ্গে টেনর বা সুরের সূক্ষ্ম কারুকাজ তৈরির ক্ষমতায় সুধীরলাল ছিলেন অনন্য।
তাঁর সুর করা গানের বৈশিষ্ট্য ছিল, বাংলা গানে চারতুকের মধ্যে দুটি অন্তরার ব্যবহার(শেরের ব্যবহার), হিন্দুস্তানি রাগ সংগীত ভেঙে বাংলায় সুর রচনা। বাংলা গানে কাওয়ালি ঢংয়ের প্রয়োগও সুধীরলালের একটি অনন্য কৃতিত্ব। শ্রদ্ধেয় সংগীতশিল্পী ডঃ অনুপ ঘোষালের মতে, ‘হিমাংশু দত্তের পরে সুধীরলাল চক্রবর্তী বাংলা গানের সার্থক উত্তরসূরী।’ এমনকি বিখ্যাতশিল্পী অখিলবন্ধু ঘোষ আধুনিক বাংলা গানের বাবা জ্যাঠা কাকা বলতে তিনজনের নাম উল্লেখ করেছেন- শচীনদেব বর্মন, জগন্ময় মিত্র, আর শেষ জন সুধীরলাল চক্রবর্তী। এছাড়া দুর্গা সেন, পঙ্কজ মল্লিক, প্রণব রায় প্রমুখ সুধীরলালকে বিশেষভাবে স্নেহ করতেন। ওঁর গুণগ্রাহীর সংখ্যাও ছিল কম না। কিন্তু এই বিস্ময়কর শিল্পী তথা সংগীত শিক্ষক বড় অকালে চলে গেছেন।
বর্তমান প্রজন্ম এই মানুষটির সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানে না বললেই চলে। মান্না দে(১লা মে ১৯১৯- ২৪ই অক্টোবর ২০১৩), হেমন্ত মুখোপাধ্যায়(১৬ই জুন ১৯২০- ২৬ শে সেপ্টেম্বর ১৯৮৯)-র সঙ্গে ২০২০ সালে এই যুগোত্তীর্ণ সুরস্রষ্টারও জন্মশতবর্ষ অতিবাহিত হলো বেশ নীরবেই। সংস্কৃতিপ্রিয় বাঙালির কাছে এই সুরস্রষ্টা বিস্মৃতই রয়ে গেলেন।
তবে এটাও ঠিক, যে, যাঁকে নিয়ে এই আলোচনা, সেই সুধীরলাল চক্রবর্তী নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে খুব একটা কিছু বলে বা লিখে যাননি। ওঁর শিষ্য-শিষ্যারাও তে যতটুকু জানা গিয়েছে, সেটুকুই যা সম্বল। তাঁর সংগীত জগতের বন্ধু-কলিগরাও তাঁকে নিয়ে তেমন কিছু লিখে যাননি। তবে মানুষটি পরোপকারী, শান্ত স্বভাবের, বিনয়ী ছিলেন। এরকমও শোনা গেছে, যে, কেউ কোনদিন তাকে রাগতে বা উত্তেজিত হতে দেখেনি। কলকাতায় জীবনটা খুব অভাবে কাটলেও তা নিয়ে কারোর কাছে কোনো অভিযোগ করতেন না। রোজ দিন সুধীরলালের ঠিক মতো খাওয়াও জুটত না। তবে উনি মদ্যপানে অভ্যস্ত উঠেছিলেন, পরবর্তীকালে যা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে। শোনা যায় এই অভ্যাসের শুরু গুরু গিরিজাশঙ্করের গৃহে থাকার সময় সতীর্থ নিখিলচন্দ্রের মাধ্যমে। তবে তখন ব্যাপারটা লুকিয়ে চুরিয়ে পরিমিত রূপে ছিল। পরে গুরুগৃহ ত্যাগের পর সেটা মাত্রাছাড়া হয়ে যায়। সেই সময়টায় সুধীরলালের সংগীতের বাজারে ইঁদুরদৌড়, যশোলাভের মেঠোস্রোতে গা ভাসানো, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এসবের ফলে জীবনযাত্রাও বুদ্ধিমাফিক এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল না। সংগীত শিল্পীরা মদ তখনো খেতেন এখনও খান। আলোচনায় কোনো বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু দুর্ভাগ্য, যে, অন্য অনেক প্রতিভাবান সুরস্রষ্টাদের মতোই সুর আর সুরা দুটোই সুধীরলালকে খেয়ে নিয়েছিল। জীবনে পার্থিব অনেক কিছু অপ্রাপ্তি, দারিদ্র্য, এই স্বার্থযুক্ত জগতে নানাবিধ কুটিল জটিল মানুষের নানা সুযোগ-সুবিধা চরিতার্থ করার বাসনা নিয়ে আসা তিনি ধরতে পারতেন না। এরকম অনেকেই তাকে সুরার বোতল ভেট হিসেবে দিত। ব্যস, উনি গলে যেতেন। তাছাড়া, পছন্দের মানুষের প্রত্যাখ্যান, দুর্ব্যবহার, মানসিক কষ্ট, অতৃপ্তি- এসবের ফলে সুরাপান আরও বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, অবশ্যম্ভাবী ফল লিভার সিরোসিস।
নিঃসঙ্গ জীবনের শেষের দিকে সুধীরলাল ১৯৫১ সালের অক্টোবরে পরম নিকটের বন্ধু নিখিলচন্দ্র সেনের পরামর্শে বিবাহ করেছিলেন মীরা দেবীকে। মীরা দেবীর বাড়ি ছিল ঢাকা জেলায়। অনাড়ম্বর ভাবে নিখিলচন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানেই এই বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। খুব অল্প দিন হলেও সুধীরলাল মীরাদেবীর দাম্পত্য জীবন সুখশান্তিরই ছিল। কিন্তু মাত্র তিনমাসের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্রমশ অবস্থার অবনতি হতে থাকে, সব সাংগীতিক কাজকর্ম একে একে বন্ধ হয়ে যায়, কখনো চেতনায় কখনো অবচেতনে থাকতেন। দুদিন আগে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই ১৯৫২ সালের ২০শে এপ্রিল সকাল চারটেয় মাত্র ৩২ বছর বয়সে সুধীরলাল মারা যান। কেওড়াতলা শ্মশানে নিখিলচন্দ্র সেন, চিন্ময় লাহিড়ী প্রমুখ কয়েকজন মাত্রের উপস্থিতিতে ওঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে মৃত্যুর পরেও সুধীরলাল চক্রবর্তীর প্রাণের দোসর সঙ্গীতজ্ঞ নিখিলচন্দ্র সেন ‘সুধীরলাল স্মৃতিবাসর’ নির্মাণ করেছিলেন। বলতে গেলে সীমিত সাধ্যের মধ্যে এই সংস্থা সুধীরলালের কর্মকাণ্ড তথা সংগীত চিন্তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা, ওঁর অপ্রকাশিত গানের প্রচার, প্রকাশিত সুরকৃত এবং স্বকণ্ঠে গীত গানগুলো জনসমক্ষে বিপুলভাবে প্রচার করা, জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালন – এইসব অন্তরের শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে গেছে। সংগঠক হিসাবে নিখিলচন্দ্র সেন বন্ধুকে ভোলেননি একটি বারের জন্যেও। সঙ্গীতজ্ঞের পাশাপাশি নিখিলচন্দ্র সেনের এটি আরেকটি দিক। প্রথম যখন সুধীরলাল কলকাতায় এসেছিলেন, সংগীতগুরু গিরিজাশঙ্কর গ্রাম থেকে আসা প্রতিভাবান কিশোরের ভালো থাকার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন নিখিলচন্দ্রের হাতে। সঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি আজীবন সেই দায়িত্ব নিখিলচন্দ্র পালন করেছিলেনই, মৃত্যুর পরেও তার এই বন্ধুর স্মৃতিসম্মান দেখানোয় এতটুকুও অন্যথা হয়নি। কিন্তু ১৯৮২ সালে নিখিলচন্দ্র ইহলোক ত্যাগ করলে আর্থিক এবং সাংগঠনিক কারণে সংগঠনটি বন্ধ করে দিতে হয়৷
সেইসঙ্গে সুধীরলালের স্মৃতিচর্চাও অনেকাংশেই ব্যাহত হয়।
বর্তমানে যতদূর জানা গেছে, ২০২০ সালে সুধীরলালের একমাত্র জীবিত ছাত্র ছিলেন দেবব্রত দাশ। তাঁর থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য সুধীরলাল চর্চার অনন্য সম্পদ।
মাত্র দু-দশক গানের জগতে থেকে এত ব্যপ্তি, এত জনপ্রিয়তা সুধীরলাল ভিন্ন কোনো যুগে কেউ পাননি। ‘আঁখি তারে ভোলে যদি মন কেন ভোলে না’,’ভালবেসেছিনু আলেয়ারে’,’ও তোর জীবনবীণা’- এসব কালজয়ী গানগুলো আজও সেই সুধীরলাল চক্রবর্তীকেই মনে পড়ায়। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাওয়া এই শিল্পীকে আরও বেশি করে আলোচনা ও চর্চায় পুনরালোকিত করা। পাঠক-পাঠিকা সংগীতরসিক সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।
আমার প্রবন্ধ থেকে কেউ তথ্য নিলে অনুরোধ করবো তারা যেন স্বীকৃতিটুকু উল্লেখ করেন। প্রতিভাস ম্যাগাজিন
কৃতজ্ঞতা: ১. আবুল আহসান চৌধুরী, প্রাক শতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি সুধীরলাল চক্রবর্তী রজনী গো যেও না চলে, কালি ও কলম
২. আনন্দবাজার পত্রিকায় সুধীরলাল চক্রবর্তীকে নিয়ে স্বপন সোমের লেখা
৩. আন্তর্জাল