মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস
পর্ব – ৩২
পুরোনো গল্প সচেতন ভাবে লিখতে বসলে কলমে আসে না, তারা আসে ঘুমের ঘোরে, তারা আসে পরীক্ষা হলের নীরবতায় হেঁটে চলা পাহারাদারির আলসেমোতে। ঋতুতে ঋতুতে সে মৌতাত পাল্টে পাল্টে যায়।
আমাদের বাড়ির একতলায় আনাগোনা ছিল কত মানুষের। চিকিৎসার কারণে যারা আসতেন তাদের অনেকের সাথেই পারিবারিক বন্ধুর মতো সম্পর্ক হয়ে গেছিল বাবার। আগেকার দিনের এই ব্যাপারটা খুব ভালো লাগে এখনও ভাবলে। ডাক্তার উকিলরা পারিবারিক বন্ধুর মতো সুখে দুঃখে থাকতেন পাশে। আর ছিল কাজের ফাঁকে বড়দের হইহই আড্ডা। এখনও যেন কান পাতলে শুনতে পাই একতলার ডিসপেনসারি ঘরে বাবা হীরুকাকা গাঙ্গুলীজ্যাঠা অসীমকাকুদের রাজনীতি বা সাহিত্য নিয়ে জমে ওঠা বাদানুবাদ, সামনের রাস্তার প্যাঁক প্যাঁক রিক্সার হর্ন, সাইকেলের রিনঠিন, এক দুটো বাইকের ভোঁ, রনজিৎ জ্যাঠার দোকানে, বা দলিলখানায় বা সোনার দোকানে মালিক ও অপর পক্ষের বিতণ্ডার তাপ উত্তাপ, হঠাৎই কখনও চারচাকার নিজেকে চেনানো আওয়াজ। বোকা বোকা কোনো বিকেলে নির্দিষ্ট সময়ে কটা বাইক দেখতে পেলাম, সেটাও গুণে রাখতাম ছোটরা।
তারপর, আমরা কেমন বড় হয়ে গেলাম। বাবা মায়েদের চুলে পাক ধরলো, ঘরে ঘরে কেবল আর টেলিফোনের দৌরাত্ম্যে হারিয়ে গেল আড্ডা -গল্প। তবুও তা বেঁচে থাকল পুজোর দিনের খুশি হয়ে।
ইতিমধ্যেই ডাঙাপাড়ায় দুর্গাপুজো শুরু হয়েছে বর্মণ ডাক্তারবাবুর কালীবাড়ির পাশের গলিতে। খুব ভালো লাগতো শশীবালা স্কুলের মাঠের পুজোর আন্তরিকতাও। আসলে বিয়ের পর এই সব পুজোর কোনোটাতেই ভেসে যেতে পারিনি সেই আগের মতো, যেমন যেতাম গোপালবাড়ির পুজোতে। কোনো কোনো বছর থাকিনি কালনাতে কিন্তু সবার আনন্দের শরিক হয়ে কাটাতে চেষ্টা করেছি কিছুটা সময়।
বিয়ের পর চাকরিসূত্রে কালনায় থেকে যাওয়ায় প্রথমে কালীনগর পাড়া, তারপর ভাদুড়িপাড়া ও শেষে বড়কালীতলায় বাসাবাড়িতে থেকেছি। কালীনগর পাড়ার গৌতম সরকারকাকুর বাড়ি নতুন সংসার পেতে পেয়েছি কাকু কাকীমার অফুরন্ত সহযোগিতা ও ভালোবাসা। দু’বছরের মাথায় ভাদুড়িপাড়ার এসেছি স্বনামধন্য সৌমেন পালজেঠুর বাড়ি। সেখানেই প্রবাহনীলের প্রথম আলোর ভোর। সেখানেই সবার অফুরন্ত ভালোবাসায় ওর দুরন্ত টলোমলো পা শিক্ষার আঙিনায় ছুটতে শুরু করেছে। ওই বাড়ির জেঠু জেঠিমার স্নেহচ্ছায়ায়, প্রতিবেশি আর সবার আদরে কেটেছে দিন।। পাপাইদিদি রাজ, অদ্রিজা, সপ্তর্ষি, রোদ্দুরদের নিয়ে সেই গল্প হয়ত নীল বুনবে একদিন। কালনার শেষ বছরগুলো সুখে দুখে কেটেছে বড়কালীতলায়। কোভিড নামক জাতীয়- সামাজিক সঙ্কটের সময় এবং আমাদের পারিবারিক নানা ধাক্কার সেই সময়কালটা যখন অতিবাহিত করছি ওখানে তখন ভাবিনি কালনার দিন ফুরোতে চলেছে হঠাৎই। যে পাড়াতেই থাকি ডাঙাপাড়ার সাথে প্রাত্যহিক যোগ রেখে গেছি। ভাই বোন দুজনেরই বিয়ের পর মন থেকে আস্তে আস্তে অনুভূত হয়েছে, অনেক দাবি ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে হয়।

সাংসারিক নানা ওঠাপড়ায় এক এক সময় মনে প্রাণে চেয়েছি চাকরির একটা বদলি, যা আমাকে একটা নিজস্ব মাথা গোঁজার স্হানে পৌঁছে দেবে, ছেলেটা তার ছেলেবেলার কিছুটা অংশ অন্তত নিজের বাড়িতেও কাটাতে পারবে। অবশেষে, আমি কালনা থেকে অনেক অনেক দূরে এসেছি, স্বেচ্ছায়, কিছুটা ভাগ্যের চমৎকারিত্বে, অতি প্রিয় পাড়া আর হৃদয়ের টুকরো আমার হিন্দু বালিকা ছেড়ে। তবু শুধু মনে পড়ে কালনার সেই পুরনো জায়গাগুলোর কথা। একলা চুপচাপ শুয়ে থাকলে, বা অলস সময়ে ছায়াছবির মতন চোখের সামনে মাঝে মাঝে সে সব কুড়ি তিরিশ বছর আগেকার ছবি হঠাৎ ভেসে ওঠে। দ্রুত বদলে যাওয়া কালনা শহরের সাথে এখন আর আমি তাল মেলাতে পারি না।
আমি কি তবে পুরোনোয় বাঁচাতে চাই? পুরোনোয় আটকে থাকতে চাই? মনকে বোঝাই, কি যায় আসে এখন!
যা আমারই নয় তার জন্য এত কষ্ট পাওয়া কেন? যা আমার ছিল, তাই থাক আমার মনে তাজমহল হয়ে।
ঝলমলে দিনগুলো থাক। ভায়ের অন্নপ্রাশন-পৈতে-বিয়ে, আমার বিয়ের লোক সমাগম, কৃষ্ণার বিয়ের আনন্দ কোলাহল, আমার সন্তানের মামাবাড়িতে এক একটা ছোট ছোট পদক্ষেপ, চাওয়া পাওয়ার আনন্দের চিত্র থাক সোনালী ফ্রেমে। আমার দাদুর চোখের আলো আমার চোখের সামনে নিভে যাওয়া, আমার ভাইয়ের কোনো উত্তাল মনকষ্টজনিত চরম সিদ্ধান্ত – আমার চোখের আড়ালে ঘটে যাওয়া, বাবার রাগ, মায়ের আক্ষেপ, সবার হাসির ক্ষণ, সবার আকুল আর্তনাদ সব -সব থাক। একান্ত ব্যক্তিগত ভুল, একান্ত ব্যক্তিগত শপথ, একান্ত ব্যক্তিগত চাওয়া, কান্নার রাত, চাঁদের আকাশ এ সবের ঘর বারান্দাকে কেড়ে নেবে এক শিশু বহুতল! তা কি সম্ভব! তা আছে আমার রক্তে মজ্জায়।

পুরোনো পাড়া, পুরোনো শহর, আমার পুরোনো চুরি হয়ে যাওয়া প্রিয় সাইকেল, আমার হারিয়ে যাওয়া পটকা বিড়াল, ভুল করে বেচে দেওয়া পুরোনো বাঁধাই করা শুকতারা আনন্দমেলা, আমার পুরোনো ভালোবাসার মানুষরা, গড়ে উঠে ভেঙে যাওয়া কিছু কিছু সম্পর্ক, আমার সব কিছু থাকবে আমার মনে। জীর্ণ শ্যাওলা ধরা বাড়ি ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলোতে শ্যাওলা ধরবে না কখনও, কোনোদিন।
আমি সেই পুরোনোকে ছুঁয়ে নতুন করে ঘর সাজাই। প্যাকেটে প্যাকেটে, বস্তায় বয়ে আনা বাবার কিনে দেওয়া বই, সাধের পরতের পুরোনো সব সংখ্যা, ছাত্র ছাত্রীদের থেকে পাওয়া উপহার, ভাইয়ের লেখার খাতা, পুরস্কারের সার্টিফিকেট, ক্রিকেটারদের পরিসংখ্যান ছাপা খেলার মামুলি কার্ড, আরও কত কি! বাতিল আসবাবকে দুশো কি.মি. দূরে এনে রঙ চাপিয়ে, ছেঁড়া বই তাপ্তি দিয়ে তাল দেয় আমার সহমর্মী, আমার স্বামী। হারিয়ে ফেলা গাছ আবার পুঁতে দেয়। ডাঙাপাড়ার কামিনীর চারা ফুল ছড়ায় মেদিনীপুরের লালমাটিতে, নতুন দেবকাঞ্চন ফুলে ফুলে ভরে গিয়ে পুরোনোকে ছেড়ে আসার দুখ ভোলায়। আবার ভাইয়ের কেনা মিলিকে বাঁচাতে না পারার হতাশা ভুলি চাঁপার গন্ধে। আসলে কষ্ট পেতে পেতেই আমরা শক্ত হয়ে উঠি, ভেঙে পড়তে পড়তেই আমরা নতুন কিছুর তাগিদ পাই।
মনে মনে বলি, ভালো থেকো নতুন হয়ে ওঠা পাড়া, পাল্টাতে থাকা কালনা। কোথাও আমি আছি। আমি থাকবো। সেই থাকাকে মুছে দিতে পারবে না বর্মণ ডাক্তারখানা মোড়ে মিষ্টির দোকানের গা লেগে ওঠা একটা অর্বাচীন বহুতল।
ভালো থেকো কালনা। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
সমাপ্ত
