মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস
পর্ব – ২৯
হারিয়ে ফেলা, নষ্ট হওয়া, পুরনো জিনিসের জন্য যেমন দুঃখ হয় তেমনি মনটা শান্তিতে ভরে যায় যখন ভাবি যেগুলোকে রাখতে পেরেছি তারাই বা কম কি!
ইমিটেশন পড়ার চল একদমই ছিল না আমাদের ছোটবেলায়। কিন্তু মহিষমর্দিনী মেলা উপলক্ষে বকুলতলায় যখন দেখতাম টেবিলের উপর ঢেলে বিক্রি হচ্ছে লাল নীল কানের টপ, টপ করে কিনে নিতাম কয়েকটা। নিজের জন্য এক দুটো রেখে প্রিয় বন্ধুদেরও দেওয়া যেত।
মাত্র কয়েক মাস বয়সেই ছোট্ট সোনার রিং দিয়ে বাবা আমার কান বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। পরে সেই দুল আকারে বড় হয়েছিল কিন্তু তা খোলা পরার কোন ব্যাপার ছিল না। কানে আছে তো আছে। যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন গড়ানো হল একজোড়া বাউটি বা পাঞ্জাবির রিং। তারপর মাঝে মাঝে কখনো ওই দুটোকে খুলে ইমিটেশন পড়তাম। বারবার খোলা পরা মানেই ঝামেলা মনে হতো। তাই বিয়েবাড়ি অনুষ্ঠান বাড়ি, যাই হোক না কেন কানে ওই একই দুল।
তখন মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি। বর্ধমান যাতায়াত শুরু করব। বাবা একদিন ডেকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল রূপলাগিতে। সিদ্ধেশ্বরী মোড়ের কাছে রূপলাগির কর্ণধার সমীর ঘোষ ছিলেন বাবা ক্লাস ফ্রেন্ড। কতদিন আগে কালনার মত মফস্বলে মেয়েদের সাজানোর জন্য বিউটি পার্লার চালু করার মত সিদ্ধান্ত একজন পুরুষ মানুষ নিয়েছিলেন, ভাবতেও অবাক লাগে বৈকি। সাথে তো প্রসাধনী রূপচর্চার হরেক স্টক দোকানে ছিলই। কলেজে পড়ার সময় থেকে ছোটখাটো সাজের জিনিস কাকুর কাছে কিনতাম। কখনো বা চুল কাটাতেও চলে যেতাম। আরো ছোট বয়সে পুজো এলে বাবা নিজেই পছন্দ করে কিনে দিত টিপ হেয়ার ব্যান্ড নেলপালিশ। লিপস্টিক বাবার বিচারে ব্রাত্য ছিল। তবে সেদিনের দোকানে যাওয়াটা ছিল একেবারে অন্যরকম। বাবা দোকানে গিয়ে বাছাবাছি করে একজোড়া গোল্ড প্লেটেড টপ কিনে দিল। ট্রেনে বাসে সোনার দুল পরে নিত্য যাতায়াত নিরাপদ নয় বলে বাবার আশঙ্কা হয়েছিল।
সেই পঁচিশ ছাব্বিশ বছর আগেকার দুল দুটো আমার কাছে আজও আছে। রং খানিক চটেছে বৈকি। তবে আনন্দের কথা আমার এই দুল জোড়ার প্রতি আশ্চর্য প্রীতি দেখে স্যাকরা ডেকে আমার কর্তা ঠিক ওই রকমই একজোড়া সোনার দুল গড়িয়ে দিয়েছে।

কিছুদিন আগেই খবর পেলাম সমীর কাকা ইহ জগতের মায়া কাটিয়েছেন। শুনে বড্ড মন খারাপ হয়ে গেল কাকার ছেলে, সৌনিক, আমার থেকে অনেক ছোট। বস্তুত আমি ওকে পড়িয়েছি কোনো কালে। আগের প্রজন্ম একে একে মায়া কাটাচ্ছেন পৃথিবীর। ভালো থাকুক নতুন প্রজন্ম, এইটুকুই কামনা।
পুরোনো পাড়া, পুরোনো শহর তাই আর আগের মতো নেই। সেই কবে থেকে সিদ্ধেশ্বরী মোড়ে উঁচু রোয়াকের ওপর দুলাল জেঠার চপ নেই, কালাদাদুর ডালপুরি নেই, ভোঁদা দাদুর হাতের সন্দেশ নেই। প্যানাকাকার আইসক্রিম কলও ছিল না। কিন্তু প্যানাকাকা তো ছিলেন এই সেদিনও। আজ তিনিও নেই। মায়া জেঠিমাও নেই। মায়া জেঠিমা আমার হাত ধরে নিয়ে গেছিলেন বাকুলিয়া এন এন গালর্সে। সদ্য এম এ দেওয়া, বেকার, টিউশনি প্রত্যাশী এক মেয়েকে। পার্ট টাইম পড়ানোর কাজে ভরসা করেছিলেন। বি. এড. পড়া শুরু করার আগে বছর খানেকের কিছু বেশি সময় কাটিয়ে ছিলাম বাকুলিয়া স্কুলে। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মীনা চক্রবর্তী, অন্যান্য শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মী, ছাত্রীদের সাথে এক অপূর্ব ভালোবাসার সম্পর্ক স্হাপন হয়েছিল।

যুগটা সোস্যাল মিডিয়ার ছিল না, তাই স্কুল ছাড়ার পর যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গেল। কিন্তু মানুষগুলো মনের ভিতর থেকে গেলেন সবুজ হয়ে। আজও মীনা দিদিমণির নেতৃত্বে হই হই করে চলা খোলামেলা স্টাফ রুমটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মায়া জেঠিমার কড়া শাসনে শৃঙখলাবদ্ধ ছাত্রীদের কথা। মনে পড়ে ক্লাসরুমের জানালার বাইরে সবুজ ধানের মাথা নাড়া, বাস স্টপেজের পাশের সুবিশাল কদমের রেণু ঝরানোর কথা। মনে পড়ে চলে আসার দিন ছোটদের ঘিরে ধরে আবেগে ভাসানোর মুহূর্ত। সর্বোপরি মনে পড়ে সেই প্রথম বাড়ির বাইরে যাওয়া, অল্প কিছু হলেও অর্থ এবং অভিজ্ঞতার আশায়।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
