মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস
পর্ব – ২৬
জ্বর হলে বাবার কথা মনে পড়ে, শরীর খারাপ লাগলেও তাই। একটা কারণ যদি হয় এটা যে বাবাই তো শরীর খারাপের ওষুধপত্র দিত, ক্ষতে হাত বোলাতো; তবে আমার মনে হয় অন্য কারণটা এই যে, বাবা আমাদের ভাইবোনকে বেশি বেশি আগলে রাখত। অন্তত একটা বয়স পর্যন্ত তো বটেই। তাই বাবাকে দীর্ঘক্ষণ না দেখলেও খুব অস্হির লাগতো।
একটা ঘটনার কথা এই প্রসঙ্গে মনে আসছে। একবার কালনা থেকে বাবা কোন কারণে একাই মেদিনীপুরে মামার বাড়িতে এসেছিল। নির্দিষ্ট দিনে ফেরার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর খালি মনে হচ্ছিল, বাবা তো এখন এলো না। ভাই তখন নিতান্তই ছোট। দুপুরে খাওয়ার পর সে ঘুমিয়ে গেছে। মা আমাকে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ থেকে গল্প পড়ে শোনাচ্ছিল। আমি খুব তাড়াতাড়িই নিজে নিজে বই পড়তে শিখে গেছিলাম কিন্তু কেউ যদি গল্প পড়ে শোনাত তাহলে তার মজা দ্বিগুণ হয়ে যেত। কিন্তু সেদিন রাজকন্যার দুঃখ কষ্টের কথায় আমার মোটেই মনযোগ ছিল না। শুধু ভাবছিলাম, বাবা কেন এখনো এলো না! তারপর হঠাৎ যেই শুনলাম দরজায় বেল বেজে উঠেছে তখন তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ছুটে এলাম নিচে। সেই টেলিফোনহীন মোবাইল ফোনহীন জীবনটাতে মানুষের মনের টান বোধহয় খুব স্পষ্ট ভাবে বোঝা যেত।
আসলে খুব ছোটবেলার চাওয়া পাওয়াগুলো অন্য রকম ছিল। বড় হবার সাথে সাথে বেশিরভাগ সম্পর্কগুলোর সমীকরণ বদলে যায়। সবকিছু আর আগের মতন ততটা গভীরতা নিয়ে, ততটা আকুতি নিয়ে হাজির হয় না হয়তো। খুব কম সম্পর্কই টানাপোড়েন ছাড়া একই থেকে যায়।
তবে আমার বাবার প্রতি সব ছোটদেরই একটা আকর্ষণ ছিল এর কারণ এই যে বাবা ছোটদের সাথে খুব সহজেই মিশে যেতে পারত। বাবা মুখে মুখে অনেক ছড়া, ধাঁধা বলতে পারতো এবং ছোটদের শোনাতো। বাবার কাছেই প্রথম শুনেছিলাম “if যদি is হয় but কিন্তু what কী?” বাবাই উত্তরটা বলে দিয়েছিল, “গাধার মতো প্রশ্ন করলে উত্তর দেব কী?” আবার “সীতার অপর নাম জানো কি?” এই প্রশ্নটার উত্তর একই ছিল। বাবা এরকম অনেক ধাঁধা আমাদের ভাই বোনকে জিজ্ঞেস করতো। যখন কোন কারণে সন্ধ্যেবেলায় লোডশেডিং হয়ে যেত, হ্যারিকেনের আলোয় আর পড়তে ইচ্ছা করত না, তখন বাবা মজার মজার নানা কথা বলতো আর নিজের ছোটবেলার গ্রামের গল্প করত।

বাবা বলতো, খুব তাড়াতাড়ি করে বলতো, ‘হোয়াট ইজ দা গুবরিকালচার ব্যাং ফাটা গরুর গাড়ির চাকা ডাবা ফুটো বালতি ফাটা ফ্রাকশন অফ দা কালো জিরে’। আমরা দুই ভাই বোন কিছুতেই বাবা কী বলছে বুঝতে পারতাম না এবং হেসে গড়াগড়ি খেতাম। অনেকদিন পরে আমি আর ভাই বাবার এই বাক্যটার মর্ম উদ্ধার করেছিলাম। যেমন পরে দুই ভাই বোনে দেখেছিলাম বাবার বলা অনেকগুলো ধাঁধাই দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্রের তৈরি। বাবার কিনে দেওয়া বই থেকেই খুঁজে পেয়েছিলাম ধাঁধাগুলো। আসলে তখন ছোটদের সময় দেবার মতন সময় অনেকের হাতেই থাকতো আর যে সমস্ত মানুষরা ছোটদের সময় দিত তাদের ছোটরা তো পছন্দ করবেই। এখনকার এই টেলিভিশন আর মোবাইল নিয়ন্ত্রিত জীবনে ছোটদেরকে আমরা ফেলে রাখছি একাকী ঘরের কোণে। নিজেদের চোখ মোবাইলে গুঁজে ওদের মাথা গুঁজতে দিচ্ছি টিভিতে।
আমাদের ছোটবেলায় কালনায় মাঝে মাঝে বইমেলা হতো। জেলা বইমেলার স্থান হিসেবে নির্বাচিত হয়ে হয়তো কালনাবাসীর কাছে এই দারুণ সুযোগ আসতো। যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে বাংলা বই প্রকাশনার জগতে খুব একটা চমকপ্রদ আলোড়ন ঘটেনি। ছোটদের মন আকর্ষণ করে এমন রঙিন বই তা কাহিনীরই হোক বা আঁকা শেখারই হোক, খুব একটা ভালো পাওয়া যেত না যদিও ‘অমর চিত্র কথা’ তাদের আঞ্চলিক ভাষার সম্ভারে বাংলাতেও অনেক বই উপহার দিচ্ছিল। কালনার বইমেলাগুলোতেই আমার প্রথম ‘রাদুগা’র মত প্রকাশনীগুলোর সাথে পরিচয় ঘটে। সোভিয়েত এবং চীনা বিভিন্ন প্রকাশনীর যে বইগুলি বাংলা অনুবাদে বইমেলায় এসে হাজির হত সেগুলো শিশুদের অবশ্যই আকর্ষণ করতো। ঝকঝকে গোটা গোটা অক্ষরে রঙিন ছবি সমেত কাহিনীগুলি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতন টানতো। এই ভাবেই ঝু বাজিয়ে ও আনাড়িদের সাথে আমার আর আমার ভাইয়ের পরিচয় হয়ে গেল। বইগুলোর কাগজের গুণমানও অত্যন্ত ভালো ছিল। কাহিনী, দেখে আঁকা শেখা বা রং-ভরার বই, এই ধরনের নানা বই বাবার কাছে আবদার করে সংগ্রহ করেছিলাম। ভাইকে তখন তো শিশুই বলা যেতে পারে। ও খুব খুশি হতো। পরে একটু বড় হয়েও পড়েছে।

এই সমস্ত বইগুলোর মধ্যে এখনো আমার খুব প্রিয় ‘দুই ইয়ারের যত কান্ড’। এই তো লকডাউনেও ছেলের সাথে আবার পড়লাম। সরব পাঠ। প্রথমবারের জন্য পড়ে আমার ছেলে যতটাই মুগ্ধ পঞ্চম বা ষষ্ঠবার পড়ার পর আমি ঠিক প্রথমবারের মতোই মুগ্ধ হলাম। আসলে সেই না দেখা একটা দেশে আমাদেরই বয়সী চরিত্রগুলো বুকের মধ্যে যে আনন্দের অনুভূতি ছেলেবেলায় জাগিয়ে তুলেছিল তা যেন আজও একই রকম আছে। সময় পাল্টে গেছে, দেশটাও পাল্টে গেছে। কিন্তু সেই সাবেকি সোভিয়েতের কিছু কিশোর কিশোরীর মজাদার ঘটনাগুলো এখনো যেন মনের মধ্যে আলো হয়ে আছে।
তার কতটা কাহিনীর গুণে আর কতটা সুন্দর সুন্দর অলংকরণের গুণে সে বিচার করার কোনো ইচ্ছেও হয় না কখনও। প্রতিভাস ম্যাগাজিন
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)