সুতপন চট্টোপাধ্যায়
প্রশান্ত
প্রশান্তকে ভ্যাবলা বলে ডাকলে সে আর রাগ করে না। একসময় তার প্রেম ভালবাসা, রাগ অভিমান, চিৎকার চেঁচামেচি ছিল জীবনে। কি যে হল? একদিন অফিস থেকে ফিরে আর সে অফিস গেল না। কথা বলল না কিছুদিন। গুম হয়ে বসে রইল বাড়িতে। বাড়ির লোকেরাও ঠিক বুঝতে পারল না। কেন সে এমন করছে? পরে জানা যায়, তার চাকরি চলে গেছে চব্বিশ ঘন্টার নোটিশে। সেই শক্ সে সহ্য করতে না পেরে নিজের কাছে নিজেই আত্মগোপন করেছে। অলকা যে তার প্রেমিকা তা প্রশান্ত গোপন করে নি। রবিবারের বিকেলে অলকাকে পিছনে বসিয়ে বাইক স্টার্ট করলে তাদের প্রেমের কথার গুঞ্জন উঠত। প্রশান্তের মোটর বাইকের শব্দে বিষন্ন বিকেল প্রফুল্ল হত, মেঘলা আকাশ নীল আকাশে বদলে যেত, পটুয়াটোলা লেনের গলি ল্যাভেন্ডার পাউডারের গন্ধে ভরে উঠত।
অলকাদের বাড়ি ছিল লেনের একেবারে শেষ প্রান্তে। সেই শেষ বাড়ি থেকে অলকা প্রশান্তর পিছনে বসে ময়দানের দিকে যখন বেড়ত তখন পটুয়াটোলা লেনটা কেমন কাঁপত। আর সেই কম্পনে কেঁপে উঠত লুকোন মানুষের চোখ। প্রশান্ত জানত। অলকাও জানত। তারা এঞ্জয় করত। এঞ্জয় করার তো তাদের বয়স ও সময় তখন।
এইটুকুতেই তাদের প্রেমের কথা বললে কম বলা হবে। শিয়ালদা অঞ্চলে সিনেমা হলের টিকেট কাটত। ময়দানে ঘোড়ার গাড়ি চড়ত। শোনা যায় বোটানিক্যাল গার্ডেনেও বেড়াতে গেছে কয়েকবার। প্রশ্ন হল, এসব জানা গেল কি ভাবে? প্রশান্ত তো বলে নি, তাহলে? অলকার ছোট ভাই ছিল লিক করার মাস্টার। সেই প্রশান্তর বন্ধুদের বলত লজেন্সের বিনিময়ে। প্রশান্তর বন্ধুরা তাকে নানান ব্রান্ডের লজেন্স ঘুষ দিয়ে খবর জোগাড় করত। আর সেই সূত্রে সে অনেক কথা বানিয়েও বলত। কিন্তু অলকা যে খুব মনে মনে ফুরফুরে ছিল সে তার পোষাক ও চোখ আঁকা দেখলেই বোঝা যেত। প্রশান্তর বন্ধুরা ভাবত কি এমন আছে প্রশান্তর মধ্যে, যে অলকা হুমড়ি খেয়ে পরেছে তার উপর? সেটাই প্রেমের রহস্য, চিরকালের।
২
চাকরি চলে যাবার পর অলকাও তাকে ছেড়ে বিয়ে করে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিল। বিয়েতে নেমতন্ন করেছিল অলকা। বিয়েতে গিয়ে দেখে অলকার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তারই ক্লাসের এক বন্ধুর। সে দুবাই এ চাকরি করে। সেই থেকেই সে কেমন এলোমেল হয়ে গেল। তার হাঁটা চলার গতি হল স্লথ, কথা সীমিত, দৃষ্টি ঘোরাল। সে বাস্তবে না থেকে অনেকটাই অবাস্তবের দোরগোড়ায় করা নাড়তে লাগল। ফলে কি হল, তার কথাবার্তা কিছুটা অসংলগ্ন হয়ে গেল। পোষাক এর দিকে অমনোযোগী হল, দেখা যেত কদাচিৎ। তারপর সবাই তাকে ভ্যাবলা বলে ডাকতে আরম্ভ করল। শুনে সে মৃদু হাসত। প্রতিবাদ করত না। মাথা নিচু করে চলে যেত। ভ্যাবলা বেশী দিন আর পটুয়াটোলা লেনে থাকল না। তাকে কোথায় যেন পাঠিয়ে দেওয়া হল। লোকে বলে সে প্রথমে যেতে চায় নি, তারপর বাধ্য হয়েই গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। এমন কি অলকার ভাইটাও জানত না। আমাদের পাড়া থেকে প্রশান্ত কেমন চিরদিনের জন্য গায়েব হয়ে গেল।
কাজটা ভালো হল না। প্রশান্তর অনুপস্থিতিতে পাড়াটা কেমন যৌবনবর্জিত প্রাণহীন পরিত্যক্ত গলিতে রুপান্তরিত হল। গলির প্রতিটি বাড়ির কেউ না কেউ উল্লেখযোগ্য কিছু করলে পাড়ার অনুষ্ঠানে তাদের পুরস্কার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। প্রশান্ত অনেকবার নানান কৃতিত্ত্বের জন্য পুরস্কার নিয়েছে। আর তার নাম উল্লেখ করে না কেউ। এই গলির কৃতিমানদের তালিকায় প্রশান্তর নামটা উহ্য হল। একদিন মোড়ের মুড়ি, তেলে ভাজার দোকানের বৃদ্ধ ঘটকদা বলল, তোরা কেউ ভ্যাবলার খবর জানিস?
আমরা যারা দাঁড়িয়ে ছিলাম বললাম, না তো। কোথায় প্রশান্ত দা?
ঘটকদা বলল, শুনেছি সে নাকি দিল্লীতে থাকে, আবার কেউ কেউ বলছে চেন্নাইতে আছে প্রশান্ত। ভ্যাবলা আর ভ্যাবলা নেই। সব ঠিক হয়ে গেছে।
শুনে আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। খুশি হবার অনেক কারণ ছিল। প্রশান্তদা কোনদিন কারও খারাপ কিছু করে নি। অলকাদির সঙ্গে প্রেম করেছে। সেটা তো ভাল কাজ, তাহলে সেই জন্য সে এমন শাস্তি পারে কেন? একটা চাকরি গেছে, অন্য একটা পেতে পারত। তা বলে অলকাদি এমন ডিচ করবে? এই অন্যায় আমরা মনে মনে মেনে নিতে পারি নি। ঘটকদার কাছে শুনে মনটা ভাল হয়ে গেল। মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম, খুব যেন ভাল কিছু হোক প্রশান্তদার। আর একদিন সে আমাদের এই পটুয়াটোলা লেনে ফিরে এসে সবার সামনে দাঁড়াক। সেটা হয়েছে কিনা জানি না।
আমি চাকরি নিয়ে সুদুর দক্ষিণের শহর কোয়েম্বাটুরে চলে এসেছি। কলকাতার সঙ্গে পাট অনেকদিন চুকে গেছে। দক্ষিণে এলে দেশটা কেমন অন্য রকম মনে হয়। উত্তেজনাহীন, শান্ত, নিয়ম মাফিক, সজ্জনচালিত একটি দেশের ভূখন্ডের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। এমনকি ভারতের সঙ্গেও যেন তেমন মিল নেই। ঐতিহাসিক কারণে ভারতের সঙ্গে যুক্ত। না হলে আলাদা অন্য একটা দেশ অনায়াসে জীবন্ত হতে পারত। এখানে প্রচেষ্টার নাম জীবনলক্ষ, শ্রমের নাম জীবনযাত্রা, আর সংস্কৃতির নাম জীবনযাপন। এখানেই জীবনটা কাটিয়ে দেব এমন ইচ্ছে।
৩
তিরুপুর নামের একটি শহরতলী আছে তামিলনাডু রাজ্যে। তিরুপুর তৈরি-জামা, প্যান্ট, তোয়ালে এবং নানান কটনের জামা কাপড়ের জন্য বিখ্যাত। এই তিরুপুরে প্রায় তিনশো পোশাক রপ্তানির কোম্পানির ছোটো ছোট কারখানা। গোটা তিরুপুর নিয়ে একটা বিশাল ব্যবসায়ী বসতী ছিল। একদিকে লম্বা চওড়া রাস্তা। তার পাশে অনেক বড় বড় বাংলো। উল্টো দিকে এই সব কারখানায় সুদুর জার্মানী থেকে কাপড় কাটার মেশিন আমদানি করে হাজারে হাজারে পোশাক তৈরি করত। আর তৈরি পোশাক চলে যেত সোজা চেন্নাই বন্দরে। সেখান থেকে জাহাজবন্দি হয়ে বিদেশের বাজারে। সেখানে চারটি কোম্পানি ছিল সুতির রুমাল তৈরির কারখানা। বাকি সব পোশাকের।
আমি একদিন এই তিরুপুরে অফিসের কাজে গিয়েছিলাম। সেখানেই কান্নানের সঙ্গে দেখা। তরুন, আত্মনির্ভর, সাহসী বলেই মনে হল। সে তার বাবার সঙ্গে কাজ করেছে আট বছর। তারপর নিজে রপ্তানি করবে। তাই নতুন কোম্পানি করেছে। দাদন নিয়েছে আমাদের কোম্পানি থেকে। সেই কারনেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ। আর তার নতুন ছোট্ট কারখানা আমার দেখে আসা লিস্টে ছিল প্রধান।
এক দুপুরে তিরুপুরে এসে কান্নানের কারখানা পরিদর্শনের পর বিকেলে হোটেলে ফিরে গেলাম। তার বাবা অনেক খাতির করে তার নিজের কারখানাও দেখাল। রাতে একটি রেস্তোঁরায় আমন্ত্রণ করল কান্নান। টেবিলে সামনা সামনি বসে দেখি দুজনের জন্য সে তিন চার রকমের খাদ্য অর্ডার করছে। আমি জানতাম দুজনে খেতে পারব না। তিরুপুরের অনেক গল্প হল। কথা প্রসঙ্গে জানাল এই তিরুপুরের সব কারখানাকে একটা ছাদের নীচে আনার পরিকল্পনা হচ্ছে। কান্নান আমাকে জিজ্ঞেস করল, ব্যাপারটা আপনার কি মনে হয়?
আমি বললাম, খুব ভালো প্রস্তাব। একটি বিশাল শিল্প অঞ্চল তৈরি করতে পারলে সেখানে একে অপরকে হেল্প করতে পারবে। ব্যাঙ্ক থাকবে, আমাদের মত ফাইনান্সিয়াল কোম্পানি থাকবে, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস থাকবে। স্বয়ং সম্পুর্ণ হবে এই রপ্তানি জোন। তাই না?
কান্নান নলল, আমারও তাই মনে হয়। রপ্তানি যে ভাবে এগোচ্ছে তাতে একা একা কাজ করার দিন শেষ। এখন সঙ্গবদ্ধ হতে হবে।
আমি বললাম, তাহলে আমাদেরও সুবিধা হয়।
সম্মতি জানাল কান্নান। তারপর বলল, এল অ্যান্ড টি কোম্পানিকে বরাত দেওয়া হয়েছে। নক্সা তৈরি হয়েছে। ছমাস পরে হয়ত দেখবেন খুচরো অফিস আর নেই। এক ছাদের নিচেই আমাদের বিভিন্ন কোম্পানির অফিস ঘর।
তাই হল। কিছুদিনের মধ্যে এক ডজন ক্রেন ও রেডিমিক্স মেশিন এসে সম্পুর্ণ বদলে দিল তিরুপুরের মানচিত্র। যে সব কোম্পানি বিভিন্ন কাজের সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল তাদের একজন আমাদের কাছে দাদন নিয়েছিল অল্প সময়ের মুলধনের প্রয়োজনে। আমি মাঝে মাঝে আসি তিরুপুরে। এই মহাযজ্ঞ যে না দেখেছে, কল্পনাই করতে পারবে না এত তাড়াতাড়ি একটি শিল্প তালুক তৈরি করা যায়। চব্বিশ ঘন্টা তৈরি হচ্ছে কংক্রিট। শিল্প তালুকের চারপাশে মৌমাছির মত শ্রমিক ভ্যানভ্যান করতে লাগল। বাংলা, বিহার, ঝাড়খন্ড থেকে শ্রমিকদের লাগিয়ে দেওয়া হল মাল বইতে, বালি তুলতে, স্টোন চিপস মেশাতে। শান্ত তিরুপুর কিছুদিনের মধ্যে কোলাহলমুখর, ধূলি ধুসরিত, এক যান্ত্রিক তালুকে পরিবর্তিত হল চোখের সামনে।
এরই মধ্যে আবার একদিন কান্নানের সঙ্গে এই রেস্তোঁরায় বসলাম। কান্নান সেই একই স্টাইলে ভিন্ন পদের অর্ডার দিল। আমি এবার বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন না করেই আর পারলাম না। বললাম, আচ্ছা তুমি কি করছ বলতো? আগের দিন দেখেছি অর্ডার দিয়েছ, খাও নি, ফেলে গেছো। আজো সেই একী ভাবে?
কান্নান আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি ভাবেন? আমি খাবার জন্য অর্ডার দিই?
মানে?
–দেখানোর জন্য। এখানে কতটা খাই তার চেয়ে কতটা পাতে ফেলে যাই সেটা ইম্পর্টান্ট। দেখছেন না? চারপাশটা তাকিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন। এই সামান্য টাকার অপচয় গায়ে লাগে না বুঝলেন? রপ্তানি থেকে ভালোই রোজগার হয়। আমার একটাও ইনসটলমেন্ট এক দিনও দেরি হয়েছে মনে হয়?
আমি বললাম, না। তা নয়। ঠিক সময়েই টাকা ঢুকেছে। তাবলে?
কান্নান, ঘাড় নাড়ল। বলল, বাবাদের সঙ্গে আমাদের এখানেই তফাৎ। জেনারেশন গ্যাপ। বাবারা অপচয় করতেই পারবে না আমাদের মত।
আমি অবাক হয়ে কান্নানের দিকে তাকাই। সে আমার থেকে অনেকটা ছোটো। আমি বললাম, ব্যাপারটা ডিবেট করার জন্য আজ তুলে রাখলাম। অন্য একদিন এই নিয়ে বসা যাবে।
এর মধ্যেই কান্নান একজনকে দেখেই হাত তুলে ডাকল। একমাথা লতানো চূল। মুখে সাদা কালো দাড়ি। চোখে মোটা চশমা। ডান হাতের উপর লোহার বালা। এক হাতে নানান রঙের আংটি। ভদ্রলোক কাছে আসতেই কান্নান বলল, আসুন আলাপ করিয়ে দিই। ইনি মিস্টার নস্কর।
পদবিটা তো দক্ষিণের নয়? কেন যেন মনে হল। এমন হতে পারে এখানে বসবাস করে ছিলে তাদের পুর্ব পুরুষ। তাদের ব্যবসার মুল সুত্র ধরে সেই ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, বসুন। আমাদের সঙ্গে জয়েন করুন।
মিস্টার নস্কর আমার উল্টো দিকে কান্নানের পাশে বসল। তারপর পকেট থেকে একটা কার্ড এগিয়ে দিল আমার দিকে। সেটা পকেটে রাখার আগে কার্ডের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত আমি। কার্ডটিতে লেখা “অলকা টাওয়েল”। এক্সপোর্টার প্রশান্ত নস্কর।
আমি অবাক চোখে প্রশান্তদার দিকে তাকিয়ে আছি।
কান্নান আমায় বলল, ওনার দিকে কি দেখছেন? উনি আমাদের তিরুপুরের সবচেয়ে বড় টাওয়েল এক্সপোর্টার। ওনার ব্রান্ড “অলকা” আজ বিশ্ববিখ্যাত।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
