সুতপন চট্টোপাধ্যায়
এমা
নাইরোবি শহরের ইউনাইটেড নেশান আয়োজিত এক সেমিনারে রোয়ান্ডা থেকে এসেছে এমা। সেখানেই আলাপ। আমি ভারতীয় শুনে অধীর আগ্রহে প্রশ্ন করল, আপনাদের দেশে গত দশ বছরে প্রচুর মিলিওনিয়ার তৈরি হয়েছে। তারা গরিব লোকেদের দারিদ্র মোচনের জন্য কী করে? কিছু কি করে?
এমন প্রশ্ন কেউ কোনও দিন করেনি আমাকে। বছর খানেক হল এই দেশে। এখানের মানুষরা সহৃদয় ও অকপট। মনেই হয় না আমি বহু দূর থেকে এসেছি এক অপরিচিত দেশে। এমা তো প্রথম আলাপেই এমন বিদ্ঘুটে প্রশ্ন করে বসল। এমন প্রশ্নের উত্তর নানা ভাবে দেওয়া যায়। আবার দক্ষতার সঙ্গে এড়িয়েও যাওয়া যায়। আমি ভারতীয় বলে এই সেমিনারে আসিনি। এসেছি কেনিয়ার একটি কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে। এখানে আমি চাকরির সূত্রে নন রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান। সেমিনারের বিষয় ছিল আফ্রিকার দারিদ্র দূরীকরণে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা।
আকস্মিক প্রশ্নের সামনে কিছুটা অসহায় লেগেছিল নিজেকে। ঠিক কী উত্তর তাও আমার জানা নেই। ব্যাপারটা নিয়ে কোনও দিন আমার মাথাব্যাথাও ছিল না। তাই এড়িয়ে গিয়ে বললাম, আমাদের দেশে অনেক বিলিওনিয়ারও তৈরি হয়েছে, আমরা তাদের কথা কততুকু জানি বা জানতে পারি?
হাসল এমা। তার মাথা নাড়ার মধ্যে এক বিশেষ ভঙ্গি আছে। যা সচরাচর এই বয়সে চোখে পড়ে না। ভেবেছিলাম এমা এসেছে এই সেমিনারের ডেলিগেট হয়ে।
(২)
সেমিনারে উগান্ডা, তানজানিয়া, ইথিওপিয়া, বুরুন্ডি, দক্ষিণ সুদান সমেত আফ্রিকার অনেক দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এসেছে। আমার বিষয় পাম অয়েল থেকে উৎপাদিত জিনিষের ব্যবহার ও আফ্রিকান সমাজের উপকারিতা। সময় মাত্র আধ ঘন্টা। আমি তো ল্যাপটপে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেসেনটেশন দেখে বলতে শুরু করেছি। আর ঠিক তখনি দেখেছিলাম এমা প্রথম সারিতে বসে মগ্ন হয়ে শুনছে। সে এই সেমিনারে সর্বকনিষ্ঠ। পূর্ব আফ্রিকার স্থলভূমি ঘেরা ছোট্ট দেশ রোয়ান্ডা। পাহাড়ের হার পরানো তার সর্বাঙ্গে। সারি সারি পাহাড়ের সঙ্গে এই সুন্দর দেশে আছে জঙ্গলের মায়াময় উপস্থিতি।
আমার সংস্থা পাম তেলকে শোধন করে নানান জিনিস তৈরি করে। রান্নার তেল, রান্নার চর্বি যা ডালডা নামে আমাদের দেশে বিখ্যাত, মারজারিন, কাপড় কাচার সাবান, এমন নানান জিনিষ তৈরি করে বিভিন্ন পদ্ধতিতে। কিন্তু প্রধান রান্নার তেল ও চর্বি। এই তেল আফ্রিকার দোকানে দোকানে নানান ব্র্যান্ডে বিক্রি হয়। কেনিয়াতেই চারটি কোম্পানি মালয়েশিয়া থেকে অপরিশুদ্ধ তেল আমদানি করে। তাকে শোধন করে প্রথমে তেল আর তারপর ডাউন স্ট্রিমে বাকি সব বাজারজাত সামগ্রী। এ এক বিরাট বাজার। এই তেলের দাম কম তাই আফ্রিকার মতো মহাদেশে দরিদ্র মানুষের নিত্যদিন ব্যবহার না করে উপায় নেই। এই কথাই আমাদের ব্যবসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। আর এই কর্মকান্ডে কেনিয়ার ও ভারতের অনেক মানুষের জীবিকা। খুব মন দিয়ে শুনছিল এমা। আমার পরেই তার নামটা ঘোষনা হল। রোয়ান্ডা, সেই সবুজ, চিরতরুন, প্রানবন্ত দেশের মেয়ে এমা এখানে বক্তৃতা দেবে। তাই সে প্রথম সারিতে। ভেবে অবাক না হয়ে পারিনি।
আলাপের সময় নিজের কার্ডটা এগিয়ে দিতে দেখেছিলাম এমা একটি কোম্পানির ডাইরেক্টর। অবাক হবারই কথা। এই অল্প বয়সে সে এই গুরু দায়িত্ব পালন করে? কে বলবে সে রসায়নে স্নাতকোত্তর করে একটি কোম্পানি চালায়। দেখলে মনে হবে এই সবে কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী।
খুব সন্তর্পণে সে ডায়াসে উঠলে চারিদিক থেকে প্রবল হাততালি। ধন্যবাদ জানিয়ে সে প্রথম যে স্লাইডটা সামনে রাখল সেটা দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। তার প্রথম বাক্যটি সে সাজিয়েছিল এই ভাবে, মানুষের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে সারা আফ্রিকাব্যাপী পাম অয়েলের ব্যবসা, মানুষের জন্য শুধু অকল্যাণকর নয়, ক্ষতিকর ও বিধ্বংসী। তার পর ধীরে ধীরে তার কথা বলে চলল।
আমি কদিন আগেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিতরণের জন্য ইউনাইটেড নেশানের পাঁচশ টন পাম তেলের অর্ডার পেয়েছিলাম। নাইরোবিতে আফ্রিকার ইউ এন এর প্রধান দপ্তর। তারা নানান উন্নয়ন মূলক কাজ করেন সারা বছর। আমার পাশে ইউ এন এর দফতরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক আমার দিকে তাকালেন। এমা পোডিআম থেকে বলছে তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ। কি ভাবে পাম তেল মানুষের শরীরে ক্ষতি করে।
পাম তেল পাম গাছের ফল থেকে পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জূড়ে চাষ হয় পাম গাছের। সম্প্রতি উগান্ডায় এই গাছের চাষ শুরু হয়েছে। সারা আফ্রিকা জূড়ে এই তেলের ব্যবহার বিপুল। এমা আবার বলল, সবাই জানেন আফ্রিকার মানুষ দরিদ্র, অপুষ্টিতে ভোগে, শিশুর মৃতুর হার অন্য সব দেশের থেকে বেশি। এখনকার জীবন দারিদ্র ও কষ্টের এপিঠ ওপিঠ। তাই শুধু রোয়ান্ডা নয়, আফ্রিকাকে বাঁচাতে গেলে এক মাত্র পথ এই তেলের সর্বগ্রাসী ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সরষের তেল, সূর্যমুখী তেল, সোয়াবিন তেল তৈরি করতে হবে। সম্পৃক্ত ফ্যাট যুক্ত এই তেল যেন চিরদিনের জন্য আফ্রিকার ঘরে ঘরে আর না ঢুকতে পারে। কেন? অল্প কথায় বলল সে।
কিগালি রোয়ান্ডার রাজধানী। সেখানেই তার কোম্পানি। সে রসায়নের ছাত্রী হলেও, মাশরুম কিভাবে গ্রীন হাউসে চাষ করে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিল এমা। এতে তার সমাজ কল্যাণের দিকটাও তুলে ধরল। তারপর সে স্টেজ থেকে যখন নেমে আসছে, তখন সারা হলে পিন পড়ার শব্দ নেই। এক বিমূর্ত স্তব্ধতার পর গোটা হল ফেটে পরল অভিনন্দনে। ঠিক সকালের মতো মাথা নাড়িয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল এমা।
(৩)
লাঞ্চের সময়ই আলোচনার প্রকৃত সময়। সামনাসামনি দেখা হল আবার। এমা বলল, ক্ষমা করবেন। আমি খুব বিরোধিতা করেছি আপনার প্রেসেন্টেশনের। কিন্তু জানেন, আমি বিশ্বাস করি, আমি যা বলেছি এই আধ ঘন্টায় সব কথা বলা যায় না। সময় পেলে আমি প্রমাণ দিতে পারি, যা বলেছি তা একেবারেই ঠিক। রসাতলে যাচ্ছে আমাদের আফ্রিকার সহজ সরল, শান্তিকামী মানূষের জীবন। আমি হাসতে হাসতে বললাম, না না, যেটা ঠিক মনে করেছেন তাই বলেছেন। আর বিরোধিতায় কী আসে যায়?
এমা বলল, হলে ভালো হতো। জানেন আমি বাবারও বিরোধিতা করেছি।
কী বিরোধিতা করেছেন? কেন?
আমার বাবা রোয়ান্ডার খুব বড় বিজনেসম্যান। বাবার বিশাল এম্পায়ার। কি নেই আমাদের। প্রায় সব। আমার পড়াশোনা শেষ করে ফিরলে বাবা আমাকে তার ব্যাবসায় যোগ দিতে আদেশ করেছিলেন। আমি জানি আমার বাবার বিজনেস এমন অনেক জিনিষের যা মানুষের শোষনের নামান্তর। আমি বুঝতে পারি। কিন্তু তার ব্যবসাকে বিরোধিতা করা সম্ভব ছিল না। তাই আমি নিজের ব্যবসা শুরু করেছি।
কী সেই ব্যবসা? মাশরুমের?
আমার দুটো গ্রীন হাউস আছে। একটায় চাষ হয় সবজি, আর একটায় ফুল। সবজি হয় আমার দেশের মানুষের জন্য আর ফুল সব নেদারল্যান্ডসের ফুলের বিশ্ববাজারে চলে যায়। আমি আমার গ্রীন হাউসের ফসল দেশের মানুষের মধ্যে কম দামে খাঁটি সব্জি বিক্রি করি। আর ফুল থেকে লাভ করি বিদেশী মুদ্রা, ইউরো। কী ঠিক করিনি? বলে সে অদ্ভূত হাসি হাসল। আমি তারিফ না করে পারলাম না। বললাম, তাহলে রসায়নের চর্চাটা থেমে গেছে?
এমা বলল, না। থামবে কেন? বিদ্যা তো প্রয়োগ করার। বিভিন্ন সারের ব্যবহার আমি অনেকের থেকে ভালো বুঝতে পারি ও করি। তাতে আমার দুটো ব্যবসায় কাজে লাগে, মাশরুমে ও ফুলে। তাই না?
রাইট।
এমা বলল, আপনি কি রোয়ান্ডায় কখনও ট্যুরে আসেন না?
আমি বললাম, না। তবে যাবো। আমি তো রপ্তানি দেখি। আপনাদের ওখানে আমাদের প্রডাক্ট যায়।
–এবার আসুন। আসার আগে আমাকে জানাবেন। আমি আমার গ্রীনহাউস দেখাব। ভালো লাগবে। কত বিচিত্র ধরণের শাকসবজি চাষ করি আমি। আর আমার ওখানে কত ছেলেমেয়ে কাজ করে দেখলে আপনার ভালো লাগবে।
যাব। নিশ্চয় যাব।
-ফোন ও ইমেল আছে কার্ডে। বলে সে চারদিকটা একবার দেখে নিল। তারপর নীচু গলায় বলল, সকালে আমার প্রশ্নের জন্য আপনি কিছু মনে করেননি তো?
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, না না, মনে করার কি আছে। জানতে চেয়েছেন, উত্তরটা দিতে পারলে খুব খুশি হতাম।
এমা বলল, সে ঠিক আছে। আসলে আমি ভারতের কথা কেন জিজ্ঞাসা করলাম জানেন?
আমি আগ্রহের গলায় প্রশ্ন করি, কেন?
–আমার মা ইন্ডিয়ান। অনেকবছর আগে নার্সের কাজে এ দেশে এসেছিলেন। বাবার সঙ্গে এখানেই আলাপ। তারপর আর দেশে ফেরেননি। কিগালিতেই থেকে গেছেন।
তাই নাকি, আমি বিস্ময়ে তাকাই। তারপর বলি ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং।
আমার দুই ভাই। তারা সবাই বাবার সঙ্গে। আমি শুধু আলাদা। কিন্তু থাকি এক বাড়িতে, খাই এক টেবিলে, বেড়াতে গেলে বাবা মাকে সঙ্গে নিয়ে যাই। দাদারা তখন বাবার ব্যবসা দেখে।
–আর আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার ব্যবসা কে দেখে? আমি জিজ্ঞাসা করি।
–আমার দেশের মানূষ। তাদের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস। কিছু মনে করবেন না, এই দিনদিন পাম অয়েল খেয়ে মোটা, ফ্যাট সর্বস্য মানুষগুলো নানান রোগে ভোগে। কিছুই করতে পারি না। ওই তেলে খাবার, ভাজা খুব সুস্বাদু হয়। বারণ করলেও শোনে না।
অগত্যা সহানুভূতির সঙ্গে মাথা নাড়ি।
এমা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করব?
–বলুন। বলে আমি তার মুখের দিকে তাকাই। এমা এবার একটু পাশে সরে গেল। তারপর বলল, মায়ের দেশ বলে ভারতের অনেক খবর রাখি। আপনাদের ওখানে অনেকে রিফাইনারি, তেলের ব্যবসায় মিলিয়নিয়র হয়েছে। তারা আমাদের দেশে একটা প্ল্যান্ট বসানোর, মানে আমার সঙ্গে যুগ্মভাবে কারখানা করতে পারে না? এখানে সুর্যমুখী, সোয়া, বাদামতেলের কারখানা করতে পারি আমরা। সস্তায় মানুষকে তেল দিতে পারি। জানেন এই পাম তেল সবচেয়ে ক্ষতি করে হার্টের। অথচ আমাদের মানুষদের হৃদয় কত শুদ্ধ। আপনি সারা পৃথিবীতে এমন মনের মানুষ কোথাও পাবেন না। নির্মল হৃদয়ের মানুষ সব।
শেষ কথাটা স্বীকার না করে উপায় নেই। কেনিয়ার মানুষ যেভাবে আমাকে আপন করেছে তা আমার কল্পনার অগোচরে ছিল।
এমা এবার বলল, একবার দেশে গেলে চেষ্ঠা করে দেখবেন? প্লিজ।
আমি এবার তার মতোই সম্মতির মাথা নাড়ালাম।
সেমিনার শেষে আবার এমা এল আমার কাছে। বলল, তখন আপনাকে ধন্যবাদ দিতে ভুলে গেছি। আবার দেখা হবে কিগালিতে। আপনার জন্য আমি অপেক্ষা করব। আসবেন কিন্তু।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
