সুতপন চট্টোপাধ্যায়
পারিজা
শ্যামলিমা হোমস্টের যে ঘরটায় আমরা এসে উঠলাম সেখান থেকে দূরে স্পষ্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় বলেই এই হোমস্টে বুক করা। এখন চারিদিক মেঘে ঢাকা, ঘন মেঘ নেমে এসেছে হাতের অদূরে। হঠাৎ এক টুকরো মেঘ এসে আমদের দরজায় দাঁড়াল। অরুণা বিছানা ছেড়ে এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আমি ডাকলাম না। দেখি সে মেঘ মেখে দাঁড়িয়ে আছে রেলিঙের ধারে। তার সারা শরীরে ঝুরো বরফের মত মেঘ। দূর থেকে চেনাই যায় না।
পিছন থেকে একটা মেয়ের কন্ঠস্বর, চিনতে পারছেন না তো? তাই হয়। একটু পরে দেখবেন, আকাশ পরিস্কার বা ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। এই শ্যামলিমাকে তখন আর চেনাই যাবে না। যেমন ম্যাডামকে। এখানে এলেই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়।
আমি অবাক হয়ে দেখি, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে হলুদ স্কার্ট আর নীল জিনস্ পড়া এক পাহাড়ি মেয়ে । একমুখ উজ্জ্বল হাসি। এই একটু আগে যেন স্নান সেরে বেড়িয়ে এসেছে সে এই হোমস্টের উঠোনে।
—আপনি ?
–আমি পারিজা। এখানের কুক। আপনারা একটু আগে এসেছেন। চা পাঠাই? আবার সেই হাসি।
আমি বললাম, কফি হবে না?
পারিজা বলল, সিয়োর, ব্ল্যাক না দুধ চিনি?
আমি বললাম, ব্ল্যাক।
ঝাউ গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল পারিজা উঠোনের একধারে।
উঠোন, ফুলের উঠোন। উঠোনের চারিদিকে ঘাসে ঘাসে হলুদ ফুলের উপর মেরুণ প্রজাপতি, সবুজ গুল্মলতায় গায়ে গায়ে এক এক গুচ্ছ রঙ বেরঙের ফুলের ঝাড়। পাহাড়ের ঢালে রেলিঙের আগে লম্বা চেয়ার। তিন দিকে উঁচূ পাইনের জঙ্গল, সেদিকে তাকিয়ে থাকলেই সময় কেটে যায়। তার পিছনে সার দিয়ে পবর্তমালা। এ যেন হিমালয়ের কোলে শান্ত সুনিবিড় অবসর আবাসন।
সতত বদলে যাওয়া হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেই মাথার মধ্যে এক শান্তির বাতাবরণ টের পাই আমি।
অরুণা ঘরের কাছে আসতেই পারিজা কফি নিয়ে এল। পাহারের ওপাড়ে ক্ষীণ আলোর আভা। পারিজা কফি নামাতে নামাতে বলল, আজ কাজের মেয়েটা আসেনি তাই আমিই সব করছি। ভাগ্য ভালো, আজ কেবল আপনারাই গেস্ট। খুব নিরিবিলি। কিছু লাগলে বলবেন। অরুণা প্রশ্ন করল, তোমার নাম?
–পারিজাত, সবাই পারিজা বলে ডাকে।
–বাহ, কি সুন্দর নাম? নামের মানে জানো?
–হুউউউ, আসমানের ফুল। বলে সে একপাক নেচে নিল এই ঠান্ডা হাওায়ায়। তার দোপাট্টা উড়ে গেল কানের দু পাশে। পারিজাকে দেখতে লাগল এক সতেজ সূর্যমুখী ফুলের মতো।
পারিজা বলল, আপনার নাম কি ম্যাডাম?
–অরুণা।
— এর মানে কি?
–ভোরের আলো ।
–আপনি ঠিক তাই ম্যাডাম। বলে একগাল হেসে চলে গেল পারিজা।
অরুণা বলল, মেয়েটি বুদ্ধিমতী। কাস্টোমারকে কি করে হ্যান্ডেল করতে হয় দেখলে?
২)
অরেঞ্জ টাউন নামে বিখ্যাত সিটং। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে এই শহরটা কমলা রঙে সেজে ওঠে । গাছে গাছে কমলালেবুর সমারোহ, তাই সেই সময় অনেক পর্যটক । আমি সেই সময়টা যেতে চাই নি। অরুণাও তাই। আমরা এসেছি জুলাইএর শেষে, বর্ষার শেষ ও শরতের আলোছায়ার খেলা দেখার লোভে। আমার এক এক দিন ছকা আছে সাইট ভিজিট । অরুণা এতো ধকল নিয়ে চায় না। সে একটু নিরিবিলিতেই সময় কাটাতে চায় । লোকজনের চলা ফেরা এড়িয়ে যেতে পারলেই খুশি।
রাতে খাবার ঘরেই টেবিল পাতা হয়েছে। বাইরে উঠোনে ঝির ঝিরি বৃষ্টি । দেখি একটি সুদর্শন ছেলে সবজি কাটছে । পারিজা আমাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। আমার স্বামী। পরেশ। ছেলেটা হাত জোর করে বলল, নমস্তে। আমি পরেশকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি করেন?
পরেশ নিচু গলায় বলল, এখন কন্সট্রাকশান ওয়ার্কার। লেবুর সময় প্যাকেজিং-এর কাজ।
অরুণা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পারিজা বলল, এই যে হোমস্টে হচ্ছে চারিদিকে। ওখানে সিভিল ওয়ার্ক করে। আর ফলের সময় তো দিদি নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। সারা দিন সারা রাত প্যাকিং হয়। খুব খাটে । রাত দিন। ওই সময়েই আমদের কিছু টাকা জমে।
এবার অরুণা আমার দিকে তাকিয়ে বলে, দেখো কি কর্মঠ। তুমি তো কুটোটি নাড় না?
আমি অরুণাকে চোখের ইশারায় বারণ করি। কী দরকার এই সব কথা বলা? তার চেয়ে শোন। ওদের গল্প?
অরুণা চুপ করে যায়।
আমি পরেশকে প্রশ্ন করি, লাভ ম্যারেজ, তাই তো?
পরেশ শুনেই হেসে ফেলে বলল, আপনাদের লাভ ম্যারেজের থেকে একটু আলাদা।
অরুণার আগ্রহ বেড়ে গেল। সে বলে বসল, কী রকম?
–আমাদের নেপালী সমাজে বিয়েটা হয় অন্য ভাবে। নেপালী ছেলেরা মেয়ে পছন্দ করে বাড়িতে নিয়ে আসে। একবার বাড়িতে নিয়ে এলে সেই মেয়েকে আর বাড়িতে ফেরত নেয় না। তখন ছেলের বাড়ি থেকে মেয়ের বাড়িতে খবর যায় । তাদের অনুরোধ করা হয় এবার যা যা রিচুয়াল আছে সেই সব পালন করার। মেয়ের বাড়ি ও ছেলের বাড়ি মিলে সেই সব রিচুয়াল করে বিয়ে হয়।
আমি আর থাকতে পারলাম না। বললাম, তা আপনি পারিজাকে পেলেন কোথায় ?
পারিজা বলল, আর বলবেন না। দার্জিলিং বেড়াতে গেছি তিন বন্ধু মিলে। সেখানেই আলাপ। তিন দিন ছিলাম। তিন দিন ম্যালের চার দিকে ঘুরলাম। তারপর আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল।
অরুণা বলল, তোমার বাবা মা আপত্তি করে নি?
পরেশ বলল, না। করে না। ছেলেমেয়ে বড় হলে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত তাদের। আর আপত্তি করবে কেন? মেয়ের বিয়ে তো হয়ে গেল। হাসল পরেশ।
রাতে শুতে যাবার আগে অরুণা বলল, কি সহজ সিস্টেম দেখো। আমাদের সমাজেই যত ঝামেলা। বর্ণ, পরিবার, রোজগার, স্টেটাস, এই সব অকারণ জগাখিচুড়ি।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, নিজের কথা মনে পড়ছে বুঝি?
অরুণা বলল, তা নয়। দেখেছো এরা কত স্মার্ট কথা বলে, ইংরাজী বলে, ব্যাবহার কত সাবলীল। এসবই মিশনারি স্কুলের প্রভাব। পাহাড়ে প্রায় সবই মিশনারি স্কুল। সেই থেকে বোধহয় এই মুক্ত জীবনের প্রথা এরা গ্রহণ করেছে বহু কাল আগে থেকেই।
আমি বললাম, হতেও পারে।
৩)
পরেশ যে প্রতিদিন রুটি বেলতে আসে তাতে পারিজার কাজের সুবিধা হয় আবার তাকে সঙ্গে করে রাতে বাড়িও নিয়ে যেতে পারে। দু জনকে মানিয়েছেও বেশ। অরুণা কথাটা অনেকবার বলেছে, কি সুখী দম্পতি দেখো । এর মধ্যে কাজের মেয়েটা এসে গেছে। জিনিয়া। সে সিকিম থেকে চলে এসেছে তার বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে এই সিটং পাহাড়ে। লম্বা ছিপ ছিপে জিনিয়া সারা দিন কাজ করে । হাউস কিপিং , সাফাই, বাজার কিছুই তার কাজের বাইরে নয়। পরপর দু দিন পারিজাকে দেখা গেল না। অরুণা সাইট ভিজিট থেকে এসে প্রথম দিন জিজ্ঞাসা করলে জিনিয়া বলল, দার্জিলিং গেছে ডাক্তার দেখাতে।
অরুণা বলল, কার কী হয়েছে?
–পরেশের।
–কি হয়েছে পরেশের?
–জানি না দিদি। মাসে একবার পারিজা যায়। আর কিছু জানি না।
তিন দিন পর পারিজা এলো হোমস্টেতে। সকালে দেখা হতেই সেই অমলিন হাসি। অরুণা দেখেই প্রশ্ন করল, কী হয়েছে পরেশের? তুমি দার্জিলিং গিয়েছিলে শুনলাম?
পারিজা সেই একমুখ হাসি ছড়িয়ে বলল, ঘুরে এসো দিদি। এখন কাজের সময়। রাতে বলব। বলে চলে গেলো কিচেনে। কখন আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছে পারিজা। আমরা সে দিনের বেড়াতে যাবার গাড়িতে উঠলাম।
রাতে দেখা হতেই অরুণা জিজ্ঞেস করল, এবার বলো, কি ব্যাপার?
ফর্সা মুখমন্ডলে যেন কালো মেঘ ভেসে উঠল। মুখের চোয়ালের দু পাশে কষ্টের বলি রেখা চোখে পড়ল। পারিজার মুখেই সে কথা শুনুন। পরেশরা আগের জন্মে কালিম্পং পাহাড়ে থাকত। একবার সে বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে সিকিম বেড়াতে যায়। সে সময় তাদের পাহাড়ে টানা চারদিন প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ে ধস নামে। তাদের গোটা বাড়ি ধসের তোড়ে ভেঙে নেমে আসে নিচের রাস্তায়। খবর পেয়ে সে এসে দেখে কিছু নেই। পরিবারের কেউ নেই। সেই পুর্ব জন্মের স্মৃতি তার ঘুমের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে। এক এক দিন সে সারা রাত ভয়ে জেগে থাকে। মাঝে মাঝে চাপা গলায় গোঁ গোঁ শব্দ করে। আমি তাকে অনেক কান্ড করে ঘুম পাড়াই। মাথায় হাত বুলিয়ে দিই । সকালে সে লোকটাই একবারেই অন্য মানুষ । হাসি খুশি।
বিয়ের আগে জানতে পারনি? অরুণা জানতে চায়।
পারিজা বলল, কি করে বুঝবো দিদি। বিয়ের আগে তো রাত কাটাই নি।
–কত দিন ডাক্তার দেখাচ্ছো?
–প্রায় আট বছর।
অরুণা অবাক হয়ে বলল, আট বছর?
পাহাড়ে মানুষের সহজে শরীর খারাপ হয় না। উপর থেকে নিচ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে করতে শরীরে রোগ ঢোকার সব রাস্তা বন্ধ। তার উপর এই বিশুদ্ধ হাওয়া আর শান্ত প্রকৃতি মানুষকে রোগমুক্ত রাখে। তাবলে কি অসুস্থ হয় না এখানের মানুষ? হয়। যে ছোট খাটো হয় তার জন্য জরিবুটি, টোটকা আছে। তাতেই কাজ চলে যায়। কিন্তু মনের অসুখের জরিবুটি হয় না পাহাড়ে। মনের রোগ হলে সেই যেতে হয় দার্জিলিং। সারা দিন নষ্ট। তা পারিজার কোন উপায় নেই। সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়ে সে। ফিরতে ফিরতে রাত। এবার দু দিন থাকতে হয়েছিল। প্রথম দিন ডাক্তার আসে নি।
–এতো দিন যাচ্ছ ফল হয়েছে কিছুটা?
— হয়েছে কিনা ঠিক বুঝতে পারি না দিদি। মাঝে মাঝে প্রথমের দিকের মতো রাতে জেগে ওঠে, কাঁদে, মাথা চাপড়ায়। আবার কোন দিন উঠে বসে। কিছুই করে না । অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে। কমে বাড়ে।
কি বলব কিছুই মাথায় আসছে না আমার। চুপ করে একবার পারিজার দিকে একবার অরুণার দিকে তাকাই। এ এক কঠিন রোগ। আগে তো আমি শুনিনি। পুর্ব জীবনের কথার মনে আসে শুনেছি। কিন্তু কেবল একটি ঘটনা বারবার আসে এ এক অভিনব সমস্যা।
–ডাক্তার কি বলছে? কত দিন সারতে লাগবে বলেছে? প্রশ্ন করে অরুণা।
–কিছুই বলে নি । শুধু বলেছে সময় লাগবে। অনেক সময়। অপেক্ষা করতে হবে। তাই করছি দিদি। কি আর করব বলো? তাই তো আমি সন্তান নিতে পারি নি।
হঠাৎই চমকে ওঠে অরুণা। চাপা গলায় বলল, কেন?
পারিজা মুখ মুছল। তার পর বলল, তার মধ্যে যদি এই রোগ আসে? এই ভয়ে। আমি একজনকে নিয়ে বিয়ের পর এই আট বছর আর একজনকে নিয়ে সারা জীবন কাটাতে পারবো না দিদি। তাতে এক জনই থাক। তখন পারিজার মুখ অসহায়, যন্ত্রাণাক্লিষ্ট। কিন্তু মুখ থেকে হাসিটা মিলিয়ে যায় নি।
অরুণা বলল, দেখি, কলকাতায় আমার চেনা একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলব। দরকার হলে কলকাতায় আসতে পারবে তো?
৪)
পরদিন ফেরার পালা। সকালে গাড়ি এসে গেছে। মাল বোঝাই হচ্ছে। পারিজা সেই সুন্দর হাসি হেসে বলল, আবার আসবে দিদি। তোমরা না এলে আমারা বাঁচব কি করে ? আবার আসতেই হবে।
অরুণা বলল, আসব।
পারিজা বলল, ডাক্তারের কথাটা মনে রেখো। ভুলো না যেন।
অরুণা গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, না না, মনে আছে।
পারিজা বলল, একটা রিকোয়েস্ট করব দিদি? যদি মনে না করো?
–বলো। গাড়ির ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল অরুণা।
–দিদি, ওই ডাক্তারবাবুকে আমাদের এখানে আমাদের গেস্ট করে পাঠাবে দিদি? খুব যত্ন করবো। খুব আরামে রাখবো । তাহলে আমার দুটো কাজই হবে। সেবাও হবে দেখানোও হবে। বলে বিদায়ের হাত নাড়ল পারিজা।
গাড়িটি পাহাড়ের রাস্তা ঘুরে ঘুরে নিচে নামতে লাগল সমতলে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন