অপরাজিতা কুণ্ডু

বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে নতুন রঙ, গোলাপ, রজনীগন্ধা, রুম ফ্রেশনারের গন্ধ ; সাথে গত কয়েকদিনের ধকল — সব মিলিয়ে মাথাটা টিপটিপ করছিল পুষ্পিতার। বছর চারেকের বিন্নি ওর কোলেই ঘুমোচ্ছে। আজ কালরাত্রি। শাম্ব এই ঘরে আসবেনা। কিন্তু ওবাড়ি থেকে এবাড়িতে আসার পরে সেই যে এই শোওয়ার ঘরে এনে বসানো হয়েছে তাকে, আর কেউ এদিকে আসেনি। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে পুষ্পিতার। অঘ্রাণ মাস। বেশ শিরশিরে ঠান্ডা এরমধ্যেই কলকাতা কাঁপাচ্ছে। তবু পুষ্পিতার কপালে, নাকে ঈষৎ ঘাম জমেছে। পরিস্থিতি ভালোই আঁচ করতে পারছে সে। শাম্ব বাড়ির সকলের ইচ্ছের বিরূদ্ধে গিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, সকলের অমত সত্ত্বেও তাকে এই বাড়ির বউ করে এনেছে। তাই হয়তো নতুন বউকে নির্জনে একা বসিয়ে রেখে বাইরের ঘরে চা এবং টা সহযোগে জমজমাট আড্ডা চলছে। হয়তো বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তুমি আমাদের একজন নও, তুমি আলাদা। তুমি আমাদের আপন নও, আপন হতেও চেয়ো না। আচমকাই পুষ্পিতার গলার কাছটা টনটন করে ওঠে। শাম্বও কি ওই আড্ডাতেই মেতে রয়েছে ! এই ঘরে পুষ্পিতা একা একা কি করছে, একবার উঁকি দিয়েও কি দেখতে ইচ্ছে করছে না !

অনিশ বারেবারে শোয়ার ঘরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তাই নিয়ে প্রবল হাসির রোল উঠছে। পুষ্পিতা লজ্জায় কারো দিকে তাকাতে পারছে না। অনিশ বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তবে তুতো ননদ-দেওরে ঘর ভরে রয়েছে। অনিশের দু’একজন খুব কাছের বন্ধু আর পুষ্পিতার মামাতো বোনও রয়েছে ঘরে। গান, গল্প, হালকা আদিরসাত্মক মন্তব্য – টুকটাক সবই চলছে। অনিশের ‘চাড্ডি বাড্ডি দোস্ত’ প্রবালটার একদমই মুখের আগল নেই। পুষ্পিতার বোন মনস্বিতাকে কথায় কথায় নাস্তানাবুদ করছে। মনার চোখে কপট রাগ, গালে লালচে ছোপ। এমন সময় অনিশের মণিমা মানে পুষ্পিতার জেঠিশাশুড়ি ঘরে এসে মৃদু ধমক দিলেন। “তোরা পুষিকে এবার বিশ্রাম নিতে দে’তো। সারাদিনে কত ধকল গেছে মেয়েটার ! আয় মা তোকে খাইয়ে দিই “। একটা ঝকঝকে কাঁসার থালায় সুন্দর করে ভাত ও অন্যান্য পদ সাজিয়ে নিয়ে এসেছেন। কাঁসার গ্লাসে করে জলও ভরে এনেছেন। মুগের ডাল দিয়ে ভাত মেখে আলুভাজা দিয়ে ছোট ছোট দলা পাকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেন তাকে। সাবধানে মাছের কাঁটা বাছছেন। এত যত্নে মায়ের কথা মনে পড়তেই চোখের কোণটা হালকা ভিজে ওঠে পুষ্পিতার।

“তোমার খাবার ” কর্কশ ডাকে চমকে ওঠে পুষ্পিতা। সবসময়ের কাজের দিদি, শান্তর হাতে অগোছালো ভাতের থালা দেখে কান্না পেলো তার। রাতের খাবার নিয়েও বাড়ির কেউ এলো না ? বিন্নি কি খাবে কেউ ভাবলো না ? ও বাড়ি থেকে আসার সময় মা ফ্লাস্কে গরম জল করে দিয়েছিল, ওর হ্যান্ডব্যাগে সেরেল্যাক আছে, ওটাই ভরসা এখন। তার নিজের আর কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। রাত বাড়লেও কেউ আসছে না দেখে বিন্নির পাশে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ে পুষ্পিতা। হালকা তন্দ্রা এসেছে কি আসেনি একটা চিৎকারে লাফিয়ে উঠল সে। “অ মা, কি নক্কীছাড়ি বউ গো, বাড়িতে পা রেখেই ভাত নষ্ট … বড়মা দ্যাকো দিকি কাণ্ডখানি… ” আরো কী কী যেন বলেই চলেছে শান্তদি। লজ্জায়, ঘৃণায় পুষ্পিতা ততক্ষণে বধির। চোখ দিয়ে নেমেছে জলের ধারা। “সারাদিন গাধার খাটুনি খেটে বিছানাতে বসেছি কি বসিনি তাও একটু নিস্তার নেই”, গজগজ করতে করতে ঘরে ঢোকেন শাম্বর মা।  বলেন, “অ শান্ত, রাতদুপুরে এমন গলা সাধছো কেন, মা গো?” 

“কিরে মা,আর খাবিনা ? মনখারাপ করছে ?”… “শোন; আজ আমি শোবো তোর পাশে, চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়িয়ে দেব।” পুষ্পিতার চোখের কোণের ভেজা ভাব নজর এড়ায় নি অনিশের মায়ের। জেঠিশাশুড়ি ও শাশুড়িমায়ের এমন স্নেহের ছোঁয়ায় অচেনা পরিবেশের অস্বস্তি কাটতে থাকে পুষ্পিতার। “শোন রে মেয়ে, প্রথম প্রথম অমন হয়, কথায় কথায় চোখে জল আসে। আমাদেরও হতো। কিন্তু পরে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বাড়িটাও তোর নিজের হয়ে যাবে।”, কে যেন বললেন কথাগুলো! বোধহয় অনিশের মামী নাকি মাসিমণি! এখনো নতুন মুখগুলোর সাথে সড়গড় হয়ে উঠতে পারেনি সে। খবরের কাগজে বাবা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। অনিশের বাড়ি থেকেই যোগাযোগ করেছিল। পুষ্পিতার মন কেড়েছিল অনিশের সততা ও খোলামেলা ব্যবহার। পণ নিতে দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করে ও। ওদের বাড়ি থেকেও পুষ্পিতাকে পছন্দ করে এক দেখাতেই। বিয়ের তারিখও পাকা হয়ে যায়। তারপরের দিনগুলো স্বপ্নের মতো কেটে যায়। মাঝে দু’এক বার অনিশের সাথে ফোনে কথা হলেও আলাদা করে দেখা করেনি ওরা। মুখচোরা পুষ্পিতা ওবাড়ির কারো সাথে বিয়ের বাজার করতেও বেরোয় নি। যা করার দুই বাড়ির বড়রাই করেছেন। কিন্তু এখন এই কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পুষ্পিতার কেমন আপন মনে হচ্ছে সকলকে।

“আপনার ভুল মনে হচ্ছে শাম্ব। আপনার পরিবারের কেউ আমাকে আপনার স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারবেন না।” বারংবার পুষ্পিতার একই আপত্তি সত্ত্বেও শাম্ব নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরতে নারাজ। উত্তর কলকাতায় শাম্বদের বাড়ি। গোঁড়া, একান্নবর্তী পরিবার। পেশায় ডাক্তার শাম্বর নিজস্ব চেম্বার পার্ক স্ট্রীট এলাকায়। এছাড়াও কয়েকটি প্রাইভেট নার্সিংহোমের সাথেও সে জড়িত। সেই রকমই একটি নার্সিংহোমে পুষ্পিতাকে সুস্থ করে তোলার আশায় নামকরা নিউরোলজিস্ট ড. শাম্ব সেনগুপ্তের কাছে নিয়ে আসে তার দু’বাড়ির বাবা-মায়েরা। মুখে কোনো কথা নেই, চোখও ভাষাহীন। আশেপাশের পরিবেশ, লোকজন সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন রোগিণীকে দেখেই শাম্ব বুঝতে পেরেছিল প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা থাকলেও সমস্যাটা মূলত মানসিক। “আপনারা হঠাৎ আমার কাছে এলেন কেন?”, শাম্বর এহেন প্রশ্নে অনিশের বাবা অমলেশ বাবু সামান্য থমকে গেলেন। তবে এও বুঝলেন যে এই অল্পবয়সী ডাক্তারবাবুটি একজন সৎ মানুষ। তিনি জানান ওনাদের গৃহ চিকিৎসকই ড: শাম্ব সেনগুপ্তের নাম সাজেস্ট করেন। শাম্ব প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন করে পুষ্পিতাকে। অল্প কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে প্রেসক্রিপশন লিখে ফেলে ঝটপট। সামান্য দু’একটি ওষুধ ও কাউন্সেলিং-এর পরামর্শ দেন। শাম্বর রেফার করা এক সাইকোলজিস্টের কাছেই শুরু হয় পুষ্পিতার কাউন্সেলিং। চার-পাঁচটা সিটিং-এর পরে উল্লেগযোগ্য পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায় তার। অনেকটাই স্বাভাবিক সে এখন। এদিকে শাম্বর কাছে কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকার জন্য পুষ্পিতাকে তার চেম্বারে আসতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। কখনো একা, কখনো কারো সঙ্গে। তবে রোগিণীর চিত্তবৈকল্যের উপশমে ব্যস্ত ডাক্তারবাবু কখন যেন নিজেরই চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিয়ে বসেছিল তা আর ঠিক বুঝে উঠতে পারে নি। পুষ্পিতার দুই বাড়ির কারোরই আপত্তি ছিল না। অনেক যুক্তিতর্কের পরে পুষ্পিতাও সম্মত হয়। আর শত আলোচনার পরে শাম্বর জেদের সামনে অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতোই এই সম্পর্ক মানতে বাধ্য হন শাম্বর বাবা-মাও।

ঘরভরা মহিলাদের সুউচ্চ আলোচনার মাঝে বিন্নির নাম শুনে পুষ্পিতার ঘোর কাটে। এক লহমায় কতকিছুই যে মনে পড়ে গেল ! তখনই খেয়াল হয় কখন যেন শাম্ব এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের দরজায়। শান্তদির চিৎকারে বেশ কিছু আত্মীয়াও জড়ো হয়েছেন এই প্রায় মাঝরাতে। এখনো গজগজ করছেন শাম্বর মা, “অতবড় মেয়ে কোলে ঐ ধিঙ্গি বুড়ি নাকি কনে বৌ ! বলিহারি যাই শাম্বর। আর কোনো মেয়ে চোখেই পড়লো না তার। মেয়ে বিদুষী, রিসার্চ করছে … তাহলে আরকি, চাট্টি শিং গজালো আমার। মরণ ! ” 

আজ অনেক দিন পরে অনিশের সাথে কোথাও বেড়াতে যাবে ভেবেছে পুষ্পিতা। অনি কথা দিয়েছে তাড়াতাড়ি ফিরবে অফিস থেকে। ডাক্তার দেখাতে যাওয়া ছাড়া এখন আর কোথাও যাওয়াই হয় না। অনিশ আসলে চায় না এই শারীরিক অবস্থায় পুষির ধকল হোক। অনি যথারীতি আপত্তি করেছিল, এই ভরামাসে ঘুরতে নিয়ে যেতে চায়নি বৌ কে। পুষ্পিতার জোরাজুরিতেই অবশেষে রাজি হয়েছে। তাই আজ ভীষণ খুশি পুষ্পিতা। বিবাহবার্ষিকীতে অনি যে শাড়িটা নিজে পছন্দ করে নিয়ে এসেছিল ওর জন্য ওটাই পরবে ভেবেছে আজ। কিন্তু অনিশ ফিরতে এত দেরি করছে কেন ? টকটকে লাল শাড়িটাতে সুন্দর সোনালি জড়ির পাড়। তৈরি হয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল পুষ্পিতা। অনিশ আজ ওকে দেখে পাগল হয়ে যাবে ভেবেই পুষ্পিতার ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি ফুটে উঠলো। আর ঠিক সেই সময়েই ওদের বাড়ির দরজায় এসে থামলো একটা অ্যাম্বুল্যান্স। সাদা চাদরে মোড়া অনিশ সেদিন ফিরেছিল তাড়াতাড়িই। এর দিন সাতেক পরে ওদের বাড়ির দরজায় এসে থামে আরেকটা অ্যাম্বুল্যান্স। নেমে আসে সাদা শাড়িতে মোড়া প্রায় মানসিক ভারসাম্য হীন, স্তব্ধ পুষ্পিতা, বিন্নিকে কোলে নিয়ে। সময়ের আগেই পৃথিবীর আলো দেখা বিন্নির বিশেষ যত্নের দিকেও পুষ্পিতার কোনো নজর ছিল না তখন। নিজের দিকেও নজর ছিল না। উপযুক্ত চিকিৎসা, বাড়ির যত্নে ধীরে ধীরে জীবনের দিকে মুখ ফেরায় সে। নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে। এই কঠিন সময়ে পরিবারের  সাথে সাথে শাম্বও পুষ্পিতার পাশে থেকেছে। তবুও পুষ্পিতার মনে অনিশের আনাগোনা অহর্নিশ।

মায়ের কটু কথায় শাম্বর মাথা নিচু হয়ে আসে। ঘর ভর্তি আত্মীয়-স্বজনের সামনে তার মায়ের ব্যবহারে যেন কুঁকড়ে যায় শাম্ব। পুষ্পিতার দিকে তাকাতে অস্বস্তি হয়। মা এবং পুষ্পিতা, একই সাথে দুজনের সম্মান রক্ষার জন্যই আর চুপ করে থাকতে পারে না সে। শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলে ওঠে, “একজন মানুষ চলে গেলে, তার শাস্তি অন্য আরেকজন মানুষকে কেন পেতে হবে মা ? প্রত্যেক মানুষের জীবনই তার নিজের। শুধুমাত্র মেয়ে বলেই যদি সারাজীবন কৃচ্ছসাধন করতে হয়, তাতো অন্যায়। তাই না, মা ? পু্ষ্পিতা অনেক কষ্টে অবসাদের দুনিয়া থেকে বেরিয়ে এসে পড়াশোনা করছে, নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছে। তুমি মা হয়ে তাকে আশ্রয় না দিতে পারো, গালমন্দ কোরো না। জানি তোমাদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও, তোমাদের মতের বিরূদ্ধেই ওকে জীবনসঙ্গী করেছি। তাই ওকে ভালো রাখার পাশাপাশি ওর সম্মানরক্ষার দায়িত্বও আমার।” 

পূর্ণদৃষ্টিতে, অনিশ নয়, শুধুই শাম্বর চোখে চোখ রাখলো পু্ষ্পিতা, এই প্রথমবার।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *