সৌমিতা রায় চৌধুরী
পর্ব – ১৪
প্রথম বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্র হল ‘বিল্বমঙ্গল’। ১৯১৯ সালে সাদা-কালো এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। পার্শি রুস্তমজি ধোতিওয়ালা ছিলেন এই চলচ্চিত্রের পরিচালক। চম্পশি উদেশি রচিত একটি গল্পের উপর ভিত্তি করে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। গল্পটি মধ্যযুগীয় হিন্দু ভক্তি কবি বিল্বমঙ্গল সম্পর্কে। কলকাতার এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানি প্রযোজিত এই চলচ্চিত্রটি বাংলা অন্তর্লিপি ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি প্রথম বাংলা পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। কলকাতার কর্ণওয়ালিশ থিয়েটারে (বর্তমান স্টার থিয়েটার) ১ নভেম্বর, ১৯১৯ সালে মুক্তি পায়। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র সংগ্রহশালা ফ্রান্সের সিনেমা ফ্রঁসেজ থেকে চলচ্চিত্রটির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত ফুটেজটি ৫৫৪ মিটার দীর্ঘ, যা আঠারো ফ্রেম প্রতি সেকেন্ড গতিতে আঠাশ মিনিট ধরে প্রদর্শন করা হয়।
ছবিটিতে বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মিস গোহুর, মিস গুলাব দেবী ও দোরাবজি মেওয়াওয়ালা। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন কলকাতার এলফিনস্টোন ও পন্ডিত কানহাইয়া লাল বায়োস্কোপ কোম্পানি। এই চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য একশো বত্রিশ মিনিট।
‘বিল্বমঙ্গল’ প্রকৃতপক্ষে এক আবেগ সর্বস্য উদ্ভ্রান্ত প্রেমিকের কৃষ্ণ প্রেমে মাতোয়ারা হওয়ার গল্প। সচ্ছ্বল পরিবারে আদর যত্নে বড় হওয়া সত্ত্বেও যৌবনকাল থেকে সে ইন্দ্রিয় তারিত হয়ে পড়ে। চিন্তামণি নামে এক বারবণিতার প্রতি আকর্ষিত হয়। নিজের সমস্ত সম্পত্তি ও সুখ সাচ্ছন্দের বিনিময়ে চিন্তামণির সাহচর্য লাভ করতে চায় বিল্বমঙ্গল। কিন্তু চিন্তামণি বারবণিতা। সম্পদের বিনিময়ে কিছুদিন তার সাহচর্য পাওয়া গেলেও সম্পদহীন অবস্থায় তাকে কাছে পাওয়া অসম্ভব। বারবণিতা হলেও চিন্তামণি আসলে একজন নারী। তাই বিল্বমঙ্গলের সমর্পণকে যেমন সে অস্বীকার করতে পারে না, তেমনই তার ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে।

এক ঝড় বৃষ্টির রাতে চিন্তামণির অদর্শনে অস্থির হয়ে উত্তাল নদীর ধারে এসে উপস্থিত হয় বিল্বমঙ্গল। মাঝি মাল্লা কেউই দূর্যোগের রাতে বিপদের ঝুঁকি নিতে রাজি না হলে বিল্বমঙ্গল নদীতে ঝাঁপ দিয়ে একটি কাঠের টুকরোকে ধরে নদী পার হয়ে চিন্তামণির বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হয়। বিশাল পাঁচিল দড়ি বেয়ে উঠে চিন্তামণির ঘরের সামনে উপস্থিত হয়। বৃষ্টির রাতে বিল্বমঙ্গলকে সেখানে দেখে চিন্তামণি ও তার বাড়ির কাজের লোকেরা হতবাক হয়ে যায় এবং জানতে চায় সে কীভাবে এখানে এসে উপস্থিত হল? বিল্বমঙ্গল নির্বিকার চিত্তে জানায় সে নদী পেরিয়েছে একটি কাঠের টুকরো ধরে আর পাঁচিল টপকেছে একটি দড়ি ধরে।
চিন্তামণি এই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য নদীর ঘাটে লোক পাঠালে জানতে পারে কাঠের টুকরো ভেবে যে বস্তুটিকে ধরে বিল্বমঙ্গল নদী পার করেছিল, সেটি মূলত একটি পচাগলা শবদেহ। আর যে দড়ি বেয়ে সে পাঁচিল টপকেছিল সেটি একটি বিষধর সাপ। একথা জানার পরে চিন্তামণি বিল্বমঙ্গলকে তীব্র ভর্ৎসনা করে। সে বলে, তোমার এই মন যদি একজন বেশ্যার পাদপদ্মে না দিয়ে শ্রীহরির পাদপদ্মে দিতে তবে তোমার মোক্ষ লাভ হয়ে যেত। বারবণিতা কারো একার নয়।
দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত, অবসন্ন বিল্বমঙ্গল শান্তির আশ্রয়ের খোঁজে চিন্তামণির কাছে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু চিন্তামণির এমন তিরষ্কারে বিল্বমঙ্গলের মনে হয় এত বিপদ উপেক্ষা করে সে চিন্তামণির কাছে উপস্থিত হল, চিন্তামণি তো আসলে তার কেউ নয়। আর তার সম্পদও সীমিত প্রায়। তাই কোনোভাবেই সে আর চিন্তামণিকে পেতে পারবে না। সম্পদের বিনিময়ে চিন্তামণিকে পাওয়ার ইচ্ছাও তার মন থেকে চলে যায়। যে শান্তির আশ্রয়ের খোঁজ সে করেছিল, সম্পদের বিনিময়ে তা পাওয়া যায় না। কামিনী কাঞ্চনের প্রতি মুহূর্তেই মোহভঙ্গ হয় বিল্বমঙ্গলের। সেই রাতেই চিন্তামণির বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে বৃন্দাবন ধামের উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং প্রকৃতই কৃষ্ণ নামে নিজের জীবন সমর্পণ করে।
এইদিকে চিন্তামণি বারবণিতা হলেও বিল্বমঙ্গলের সহৃদয় প্রেমকে উপেক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু সেই রাতে বিল্বমঙ্গলকে তিরস্কার করেছিল কারণ সামাজিকভাবে সে বিল্বমঙ্গলের সাথে থাকতে পারবে না। আবার তার বারবণিতার জীবন বিল্বমঙ্গল সহ্য করতে পারবে না। এছাড়াও বিল্বমঙ্গল যদি অন্য কোনো নারীতে আসক্ত হয় সে-ই নানানভাবে হেনস্থা হবে। তাই বিল্বমঙ্গলের প্রতি তার ভালবাসাকে বুঝতে দেয়নি।
এইধরনের সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা বিল্বমঙ্গলকে উপলব্ধি করিয়েছিল মাত্র। তার কানে কৃষ্ণ নামের দিশাও দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চিন্তামণিও সবকিছু ছেড়ে বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় বিল্বমঙ্গল কৃষ্ণ দর্শন লাভ করেছে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)