সৌমিতা রায় চৌধুরী
পর্ব – ১
মঞ্চাভিনয় ছিল বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। সেলুলয়েড আসে পরবর্তী যুগে। আজ থেকে প্রায় একশো বছরেরও বেশি আগে। সরাসরি মঞ্চাভিনয় না করে চলমান ছবিকে প্রোজেকশন বা অভিক্ষেপণের মাধ্যমে সফলভাবে প্রদর্শনই হল সেলুলয়েডের প্রাথমিক পর্যায়।
ঠিক কবে এই কাজ শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা না গেলেও ১৮৯৫ সালে প্যারিস শহরে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় নিজেদের তৈরি ছোট ছোট দশটি চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক ভাবে প্রদর্শন করেন। এই ঘটনার পরেই বিশ্বজুড়ে ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানি প্রচুর পরিমাণে তৈরি হতে থাকে। এক দশকের মধ্যে চলচ্চিত্র সার্বজনীন বিনোদন শিল্পে পরিণত হয়।

সাদা কালো ক্যামেরায় তোলা নির্বাক এক মিনিট দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রথমদিকে তৈরি হত। পরবর্তীকালে একাধিক শট সম্বলিত কয়েক মিনিট দৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি হতে থাকে। ১৮৯৮ সালে ঘূর্ণায়মান ক্যামেরা দিয়ে প্যানিং শট নেওয়া শুরু হয়। ছবির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার নানান কৌশল ব্যবহার হতে থাকে।
১৯০০ সালে ক্লোজ আপ শটের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯০৫ সালে জার্মানির পিটসবার্গে ‘দ্য নিকেলোডিয়ান’ প্রথম স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ, যেখানে শুধুমাত্র চলচ্চিত্রই প্রদর্শন করা হত। চলচ্চিত্র শিল্প তার গ্ল্যামার নিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জনপ্রিয়তার রাস্তা খুলে দেয়। এই সময়ে তৈরি হওয়া মার্কিন চলচ্চিত্র গুলি অস্ট্রেলিয়া এবং ইওরোপের বিভিন্ন দেশে শেয়ার মার্কেটের বৃহত্তম ভাগীদার হয়ে দাঁড়ায়।
চলচ্চিত্রায়নে নতুন নতুন প্রয়োগ কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে আকর্ষণীয়তা বৃদ্ধির প্রয়াস চলতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চলচ্চিত্র শিল্পে এক রূপান্তর ঘটে যায়। ছোট ছবির জায়গায় পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কাহিনী চিত্র শুরু হয়। প্রেক্ষাগৃহ বড় হতে থাকে এবং টিকিটের দামও বাড়তে থাকে। চলচ্চিত্র নির্মাতারা বিনোদনের মাধ্যম দিয়ে মতামত প্রকাশের সুযোগ পেয়ে যান।
ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ সেই সময় মার্কিন চলচ্চিত্রে দর্শকদের মধ্যে নাটকীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারতেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের প্রান্তে হলিউড অঞ্চলে তিনিই প্রথম শুটিং করেন, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই সময়ে বছরে গড়ে আটশোটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হত, যা সারা বিশ্বের প্রায় বিরাশি শতাংশ ছিল। ১৯২৭ সালে বিশ্বখ্যাত বিনোদন কোম্পানি ওয়ার্নার ব্রাদার্স তৈরি করে ‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’। এই ছবিতে সম লয়ে সংলাপ ও সম লয়ে সংগীত ব্যবহার করা হয়। এই ছবি মুক্তি পাওয়ার পরে নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অবসান ঘটে।
১৯২৯ সালের শেষের দিকে হলিউডের সমস্ত ছবিই ছিল সবাক। এই সময়ের চলচ্চিত্রে বাস্তব বিষয় এবং যুদ্ধ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে প্রচুর চলচ্চিত্র তৈরি হয়। এই সময়ে তৈরি চলচ্চিত্র গুলি বিভিন্ন মতামত প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
১৯৫০ সালের আশেপাশে হাউজ আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটস কমিটি হলিউডে তদন্ত চালিয়ে অনেক কলাকুশলীকে কালো তালিকাভুক্ত করে। এরমধ্যে প্রথিতযশা চলচ্চিত্র শিল্পী চার্লি চ্যাপলিনও এই তালিকাভুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সমগ্র বিশ্বে বিনোদন শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। উন্নত প্রয়োগ কৌশলের আবির্ভাব হয়।
পর্ব – ২
চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা আলোচনা করতে গেলে যে জনপ্রিয়তম অভিনেতা আজও সমানভাবে দর্শকের মনে স্থান করে নিয়েছেন তিনি স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র, যিনি চার্লি চ্যাপলিন নামেই জগদ্বিখ্যাত। হলিউড চলচ্চিত্র শিল্পের শুরুর সময় থেকে চার্লি চ্যাপলিন অভিনয় ও পরিচালনা দুইই করেছিলেন এবং সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন।
ভিক্টরিয়ো যুগে এই ব্রিটিশ অভিনেতা প্রায় পচাত্তর বছরের কর্মজীবনে খ্যাতির শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর অভিনীত ছবিগুলো আজও এক আলাদা মাত্রা যোগ করে।
১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল ব্রিটেনের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন চার্লি চ্যাপলিন। বাবার অনুপস্থিতি এবং মায়ের অর্থকষ্টের কারণে শৈশবেই তাঁকে কর্মশালায় কাজ করতে পাঠানো হয়েছিল। চোদ্দো বছর বয়সে তাঁর মাকে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হলে কৈশোরেই তাঁর একলা পথ চলা শুরু হয়। ওই সময় থেকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রঙ্গশালায় শিশুশিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করতেন। মঞ্চাভিনেতা এবং কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
উনিশ বছর বয়সে “ফ্রেড কার্নো” কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। হলিউড চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। ১৯১৪ সালে কিস্টোন স্টুডিওজের সাথে যুক্ত হয়ে বড় পর্দায় অভিনয় শুরু করেন। তাঁর নিজের সৃষ্ট ভবঘুরে চরিত্র “দ্য ট্রাম্প” চরিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন।

ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগালে ব্রিটিশ ভদ্রজনোচিত আদব কায়দায় কেতাদুরস্ত ‘ট্রাম্প’ চরিত্রটি দর্শকদের কাছে সমীহ আদায় করে নেয়। চাপা কোট, সাইজে বড় প্যান্ট, বড় জুতো, মাথায় বাউলার হ্যাট, হাতে ছড়ি আর টুথব্রাশ গোঁফ গেট আপটি শিক্ষিত জনমানসে প্রভাব বিস্তার করে।১৯১৮ সালের মধ্যে চার্লি চ্যাপলিন বিশ্বের বিশেষ ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লাভ করেন।
১৯১৯ সালে সহ প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান “ইউনাইটেড আর্টিস্টস” গঠন করেন। তাঁর নির্মিত প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হল, ‘দ্য কিড’। এই চলচ্চিত্রটি ১৯২১ সালে নির্মিত হয়েছিল। ১৯২৩ সালে নির্মিত হয়েছিল ‘আ উওম্যান অব প্যারিস’। ‘দ্য গোল্ড রাশ’ নির্মিত হয় ১৯২৫ সালে। ১৯২৮ সালে নির্মিত হয় ‘দ্য সার্কাস’। সবকটি চলচ্চিত্রে তিনি তাঁর অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
১৯৩০ সালে তিনি সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। নিজের দায়িত্বে ১৯৩১ সালে নির্বাক চলচ্চিত্র ‘সিটি লাইটস’ ও ১৯৩৬ সালে ‘মডার্ন টাইমস’ নির্মাণ করেন, যা চলচ্চিত্র শিল্পের মাইল স্টোন স্বরূপ।
১৯৪০ সালে সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে অ্যাডলফ হিটলারকে ব্যঙ্গ করে তৈরি করেন ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’। ওই বছর এবং তার পরবর্তী সময়ে চার্লি চ্যাপলিনকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সমাজতান্ত্রিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে অভিযোগ ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে পিতৃত্বের মামলা চলাকালীন অপর এক মহিলাকে বিয়ে করায় তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার শুরু হয়। এফ বি আই চার্লি চ্যাপলিনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে চলে যান।
১৯১৮ সালে মার্কিন অভিনেত্রী মিলড্রেড হ্যারিসের সাথে চার্লি চ্যাপলিনের বিয়ে হয় এবং এই সম্পর্ক ১৯২১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই সময় তাঁদের একমাত্র পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। অপর এক মার্কিন অভিনেত্রী লিটা গ্রে এর সাথে ১৯২৪ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত দাম্পত্যজীবন যাপন করেছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। এই সময়ে তাঁর দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। আরও এক অ্যাকাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত মার্কিন অভিনেত্রী পলেট গডার্ড ১৯৩৬ সালে চার্লি চ্যাপলিনের সাথে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি চ্যাপলিন অভিনীত ‘মডার্ন টাইমস’ এবং ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’-এও অভিনয় করেছিলেন। ১৯৪২ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ১৯৪৩ সালে নোবেল ও পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন নাট্যকার ইউজিন ওনিলের কন্যা উনা ওনিল চ্যাপলিনের চতুর্থ এবং শেষ স্ত্রী। এই সময়ে তাঁদের তিন পুত্র ও পাঁচ কন্যার জন্ম হয়।
পরবর্তীকালে তাঁর নির্মিত ও অভিনীত চলচ্চিত্রগুলিতে ‘ট্রাম্প’ সত্তাকে বিসর্জন দেন। এরপর একে একে ১৯৪৭ সালে ‘মঁসিয়ে ভের্দি’, ১৯৫২ সালে ‘লাইমলাইট’, ১৯৫৭ সালে ‘আ কিং ইন নিউ ইয়র্ক’ এবং ১৯৬৭ সালে ‘আ কাউন্টেস ফ্রম হংকং’ চলচ্চিত্রগুলি নির্মাণ করেন।
নির্বাক চলচ্চিত্র যুগে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব চ্যাপলিন সবাক এবং নির্বাক, দুই ধরনের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে নিজের মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রথম দিকের চলচ্চিত্র গুলোতে বিরুদ্ধ পরিবেশের সাথে ‘দ্য ট্রাম্প’-এর সংগ্রামের করুণ রসের সাথে এক কৌতুকময় হাস্যরসের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। কয়েকটি চলচ্চিত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তু তুলে ধরেছেন এবং কয়েকটিতে আত্মজীবনী মূলক বিষয়বস্তু পরিবেশন করেছেন।
নিজের কাজের প্রতি তাঁর উৎসর্গিত প্রাণ চলচ্চিত্র শিল্পে চিরকালীন মাত্রা যোগ করেছে। ১৯৭১ সালে ফরাসি সরকার লেজিওঁ দনরের কমান্ডার সম্মান প্রদান করে চার্লি চ্যাপলিনকে। ১৯৭২ সালে তাঁকে অ্যাকাডেমি সম্মান সূচক পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ তাঁকে ‘নাইটহুড’ সম্মানে ভূষিত করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। চলচ্চিত্র শিল্পের পটভূমি নির্মাণ করেছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। পরবর্তীকালে প্রযুক্তির প্রভুত উন্নয়ন হলেও তাঁর মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি পরে তাঁর নির্মিত “দ্য গোল্ড রাশ”, “সিটি লাইটস”, ” মডার্ন টাইমস”, “দ্য গ্রেট ডিক্টেটর” চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে তিনি অমর হয়ে উঠেছিলেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই চলচ্চিত্রগুলোকে মার্কিন চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরার তালিকায় প্রায়শই স্থান করে নিতে দেখা যায়।
ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট চার্লি চ্যাপলিনকে “বিশ্ব সংস্কৃতির অতি উচ্চ ব্যক্তিত্ব” বলে বর্ণনা করে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে ইতালিও চলচ্চিত্রকার ‘ফেদেরিকো ফেল্লিনি’ মন্তব্য করেন, “চ্যাপলিন অনেকটা আদমের মত, আমরা সবাই যার উত্তরসূরি”। ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাক তাতি বলেন, “চ্যাপলিন না থাকলে হয়তো আমি কখনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতাম না”।
সুইজারল্যান্ডের কর্সিয়ের-সুর-ভেভিতে চ্যাপলিনের বাড়ি মনোইর দে বানকে “চ্যাপলিনস ওয়ার্ল্ড” নামে একটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে, যা ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে চালু করা হয়েছিল। লণ্ডনের লেস্টার স্কোয়ারে ১৯৮১ সালে উন্মোচিত চ্যাপলিনের “দ্য ট্রাম্প” চরিত্রের একটি ভাস্কর্য রয়েছে। ওই জায়গার একটি রাস্তার নাম “চার্লি চ্যাপলিন ওয়াক”।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ চার্লি চ্যাপলিনকে নানানভাবে সম্মান প্রদর্শন করেছে। ১৯৮১ সালে সোভিয়েত জ্যোতির্বিদ লুদমিলা কারাচকিনা আবিষ্কৃত একটি ছোট গ্রহের নামকরণ করা হয় “৩৬২৩ চ্যাপলিন”। বিশ্বের ছয়টি মহাদেশের অনেক দেশ চ্যাপলিনের পোস্টাল স্ট্যাম্প প্রকাশের মাধ্যমে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেছে।
চ্যাপলিনের সন্তানেরা প্যারিসে অবস্থিত চ্যাপলিন কার্যালয় থেকে উত্তরাধিকারের দেখাশোনা করেন। চ্যাপলিনের কাজের নাম, ভাবমূর্তি ও অধিকার রক্ষা করার জন্য ‘অ্যাসোসিয়েশন চ্যাপলিন’ নামে একটি কার্যালয় স্থাপন করেন তাঁর কয়েকজন সন্তান। রয় এক্সপোর্ট এস এ এস ১৯১৮ সালের পর চ্যাপলিনের নির্মিত চলচ্চিত্রের স্বত্ব অর্জন করে। বাবলস ইনকর্পোরেটেড এস এ চ্যাপলিনের ছবি ও নামের স্বত্ব অর্জন করে।
ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট ‘চ্যাপলিন রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করে। সিনেতিকা দি বোলোগ্নাতে অবস্থিত ‘চ্যাপলিন রিসার্চ সেন্টার’-এ তাঁর ছবি, পাণ্ডুলিপি ও চিঠি গবেষণার জন্য পাওয়া যায়।
চ্যাপলিনের জীবনী অবলম্বনে রিচার্ড অ্যাটেনব্রো একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চ্যাপলিনের জীবনীর ওপরে। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তাঁর নিজস্ব জীবন ও চলচ্চিত্র চরিত্র নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়ে চলেছে। চ্যাপলিন যেহেতু নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান স্বরূপ, তাঁকে নিয়ে তাই তাঁর জন্মের ১৩৫ বছর পরেও সমানতালে গবেষণা চলছে।
পর্ব – ৩
চার্লি চ্যাপলিনের কর্মজীবনের স্থায়িত্ব পচাত্তর বছর। দু’টি বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বিশেষ রকমের পরিবর্তন ঘটেছিল। নির্বাক থেকে সবাক, সবধরনের চলচ্চিত্র এইসময়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিমাণ ছিল প্রায় বিরানব্বইটি। কৌতুকের মধ্যে দিয়ে তৎকালীন সময়কে তাঁর তৈরি চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা করেছেন।

চ্যাপলিন কি স্টোন স্টুডিওতে ছত্রিশটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এই চলচ্চিত্রগুলোর প্রযোজনা করেন মার্ক সিনেট। ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাক চলচ্চিত্র ‘মেকিং আ লিভিং’-এ চ্যাপলিন ছাড়াও অভিনয় করেন হেনরি লেহম্যান, ভার্জিনিয়া কার্টলি, চেস্টার কঙ্কলিন এবং মিন্টা ডার্ফি। এই ছবির চিত্রগ্রাহক ছিলেন এনরিক হুয়ান ভাইজো এবং ফ্র্যাংক ডি উইলিয়াম। এই ছবিটির মূল বিষয়বস্তু মানুষের জীবনের ভালোভাবে বাঁচা এবং সেই বাঁচতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে নানান চারিত্রিক উত্থান পতনের কাহিনী।
ছবির শুরুতে দেখা যায় চ্যাপলিন এক যুবতীকে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছেন। লেহম্যান চরিত্রটি ওই একই যুবতীকে ফুল ও আংটি দিতে চাইলে, সে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং জানায় তার অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্ক আছে। ঘটনাচক্রে চ্যাপলিন সেইখানে উপস্থিত হলে তাদের মধ্যে স্ন্যাপস্টিক যুদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে লেহম্যান চরিত্রটি একটি গাড়ি দুর্ঘটনার ছবি তোলে এবং মোটর চালককে সাহায্য করার সময়ে চ্যাপলিন তার ক্যামেরা চুরি করে নেন এবং সংবাদপত্রের অফিসে গিয়ে তা নিজের বলে ছাপিয়ে দেন। পরে তাদের মধ্যে আবার মারপিট শুরু হয়ে যায়।
এইসময় তাঁর নির্বাক ছবিগুলি পরপর প্রকাশ হতে থাকে। ‘মেকিং আ লিভিং’ ছবিটি প্রকাশ হওয়ার দিন কয়েক পরেই প্রকাশিত হয় ‘কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস’। মুখ্য ভূমিকায় চার্লি চ্যাপলিন ছাড়াও এই ছবিতে অভিনয় করেন হেনরি লেহম্যান, ফ্র্যাংক ডি উইলিয়াম এবং গর্ডন গ্রীফিত। ছয় মিনিট দীর্ঘ এই ছবির চিত্রগ্রাহক ছিলেন এনরিক হুয়ান ভাইজো এবং ফ্র্যাংক ডি উইলিয়াম।
এই ছবির মূখ্য বিষয়বস্তু হল, কিশোরদের একটি গাড়ি প্রতিযোগিতা। দ্য ট্রাম্প এই প্রতিযোগিতার একজন দর্শক। কিন্তু তিনি প্রতিযোগিতার চিত্রগ্রহণে সমস্যার সৃষ্টি করছেন, শুধুমাত্র ক্যামেরার সামনে চলে এসে। এতে দর্শক এবং প্রতিযোগীরা উভয়েই বিরক্ত হচ্ছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই চলচ্চিত্রে ট্রাম্প চরিত্রটিকে প্রথম দর্শকদের সামনে উপস্থিত করা হয়।
চার্লি চ্যাপলিনের অন্যান্য সিনেমা গুলির মধ্যে ‘দ্য গোল্ড রাশ’, ‘দ্য সার্কাস’, ‘সিটি লাইট’, দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ ইত্যাদি সিনেমা অত্যন্ত জনপ্রিয়। সমসাময়িক সময়ে জীবনধারা এবং মানুষের মানষিক বোধকে চিত্রায়িত করেছে চার্লি চ্যাপলিনের সিনেমা। ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমার মধ্যে দিয়ে বাস্তব জীবনকে অভিনয় দক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন এই শিল্পী।
পর্ব – ৪
চলচ্চিত্র শিল্পের ধ্রুপদী অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনকে নিয়ে আমরা গত সংখ্যাগুলিতে আলোচনা করেছি। চলচ্চিত্রের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে দেখেছি দু’টি বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র শিল্প বিকাশ লাভ করেছে। সমসাময়িক সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বলতে অবিভক্ত বঙ্গ (১৯৪৭ সাল পর্যন্ত) থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বোঝায়। পৃথিবীর অনেক দেশের মত ১৮৯০ এর দশকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। এই সুত্র ধরে ১৯০০ শতকে নির্বাক চলচ্চিত্র শুরু হয়। ১৯১০ সালে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এর পরবর্তী সময়ে সবাক পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র সৃষ্টি হতে প্রায় পঞ্চাশ বছর সময় লেগেছিল এবং বাংলাদেশে একটি অর্থকরী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই চলচ্চিত্র শিল্প।
বাংলাদেশে প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় কলকাতার ব্রেডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানির উদ্যোগে। ১৮৯৮ সালে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার ভোলা মহকুমার এস ডি ও-র বাংলোতে। পরবর্তী প্রদর্শনী হয় ঢাকার পাটুয়াটুলির ক্রাউন থিয়েটারে। এইগুলি বায়োস্কোপের বিচ্ছিন্ন চলচ্চিত্র ছিল। গবেষক অনুপম হায়াতের অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এইসব চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল মহারানি ভিক্টোরিয়ার জুবিলী মিছিল, গ্রিস ও তুরস্কের যুদ্ধ, ইংল্যান্ডের তুষারপাতের ক্রীড়া, সিংহ ও মাহুতের খেলা ইত্যাদি। তখন বায়োস্কোপ দেখানোর জন্য সাধারণ দর্শকের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা ছিল।

কলকাতায় যে বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠিত হয় তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ঢাকার মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুরি গ্রামের হীরালাল সেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বায়োস্কোপ কোম্পানির নাম ‘দ্য রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’। এইসময় কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে যে সমস্ত নাটক প্রদর্শিত হয় সেইগুলির কিছু অংশ ক্যামেরায় ধারণ করে বায়োস্কোপ আকারে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এইসব জনপ্রিয় থিয়েটার গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘আলীবাবা’, ‘দোল লীলা’, ‘সীতারাম’, ‘ভ্রমর’। বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে হীরালাল সেন এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বিজ্ঞাপন চিত্র ও সংবাদ চিত্র নির্মাণের পথিকৃতও ছিলেন তিনি।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো। ১৯১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে নির্মিত ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ ছিল বাংলা ভাষার প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র। ১৯১৬ সালে কলকাতায় ম্যাডান থিয়েটারের পক্ষ থেকে জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত বাংলা নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ মুক্তি পায়। ১৯২১ সালে কলকাতায় ‘বিলাত ফেরত’ নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়, যার প্রযোজক ও অভিনেতা ছিলেন বড়িশালের ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়।
১৯২৭-২৮ সালে নবাব পরিবারের কয়েকজন সংস্কৃতি মনস্ক তরুণ ‘সুকুমারী’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তখনো পর্যন্ত নাট্য মঞ্চেও নারী চরিত্রের অভিনয় পুরুষেরাই করতেন। চলচ্চিত্রও তার ব্যতিক্রম ছিল না। এই নবাব পরিবারের উদ্যোগেই ঢাকায় ইস্টবেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি গঠিত হয়। অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত এই কোম্পানির প্রযোজনায় নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’ নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বৈপ্লবিক বিষয়টি হল, নারী চরিত্রে নারীরাই অংশগ্রহণ করেন। নায়িকা চরিত্রে ছিলেন ললিটা বা বুড়ি নামে এক বাঈজী। চারুবালা ও দেবী নামে আরও দুই বাঈজী এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। হরিমতী নামে এক অভিনেত্রীরও আবির্ভাব ঘটে এই চলচ্চিত্রে। ১৯৩১ সালে এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ঢাকার মুকুল হলে। ১৯৪৬ সালে ওবায়েদ উল হক হিমাদ্রি চৌধুরী ছদ্মনামে ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। কলকাতায় এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশী কোনো মুসলিম পরিচালকের হাতে নির্মিত এটি একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র।
উদয়ন চৌধুরী ছদ্মনামে ইসমাইল মহম্মদ নির্মাণ করেন ‘মানুষের ভগবান’ নামে চলচ্চিত্রটি ১৯৪৭ সালে। দেশ ভাগের পরে এই চলচ্চিত্র পরিচালকেরা ঢাকায় ফিরে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ প্রদান করেন। ১৯৪৮ সালে নাজির আহমেদ ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা বাংলাদেশের প্রথম তথ্যচিত্র হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পরের বছর সরকারি প্রচারচিত্র নির্মাণের জন্য জনসংযোগ বিভাগের অধীনে চলচ্চিত্র ইউনিট গঠন করা হয়। ১৯৫৪ সালে নাজির আহমেদের পরিচালনায় নির্মাণ করা হয় প্রামাণ্য চিত্র ‘সালামত’। তিনি একাধারে অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, বেতার কর্মী ও লেখক ছিলেন। ১৯৫৫ সালে তাঁরই উদ্যোগে ঢাকায় প্রথম ফিল্ম ল্যাবরেটরি ও স্টুডিও চালু হয়। তিনি পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার প্রথম নির্বাহী পরিচালক। তাঁর কাহিনী থেকে ফতেহ লোহানী নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘আসিয়া’ এবং ‘নবারুণ’ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র। ‘নতুন দিগন্ত’ নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন তিনি।
তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’ ২০০২ সালে কান ফেস্টিভ্যালে ডিরেক্টরস ফোর্ট নাইট ক্যাটাগরিতে মনোনীত ও প্রদর্শিত হয়। ২০০৩ সালে এই ছবিটি সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কারে প্রতিদ্বন্দিতার জন্য পেশ করা হয়। এটি প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্র, যা অস্কারে প্রতিদ্বন্দিতার জন্য পেশ করা হয়। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনটি সিনেমা অস্কারের জন্য পেশ করা হয়। হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, আবু সাঈদের ‘নিরন্তর’ এবং গোলাম রাব্বানীর ‘বিপ্লবের স্বপ্ন ডানায়’। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত বাংলাদেশী ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নাসিরউদ্দিন ইউসুফের ‘গেরিলা’, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’, অমিত আশরাফের ‘উধাও’ রুবাইয়াত হোসেনের ‘মেহেরজান’।
বাংলাদেশী চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রযুক্তিগতভাবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে। ভবিষ্যতে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গন আরও কিছু সমৃদ্ধ ভাণ্ডার বাংলাদেশ থেকে পাবে বলে আশা করা যায়।
পর্ব – ৫
১৯১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে নিবেদিত প্রথম নির্বাক ভারতীয় চলচ্চিত্র ছিল ‘রাজা হরিশচন্দ্র’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। অবিভক্ত ভারতের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের নাম ‘আলম আরা’। ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন ‘আরদেশির ইরানি’।

প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা শুরু হয় ১৯৩০ সালের প্রথম থেকে। বাজার ধরার আশায় উর্দু কিংবা ফরাসি ভাষায় চলচ্চিত্রগুলি প্রথমে নির্মাণ করা হত। ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানি প্রথমে এইগুলি নির্মাণ করত। বাংলা ভাষায় প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় ১৯৩১ সালে। ছবিটির নাম ‘জামাই ষষ্ঠী’। প্রমথেশ বড়ুয়া, দেবকী বোস এই চলচ্চিত্র গুলিতে অভিনয় ও পরিচালনা করতেন।
পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রথম বাংলা ছবি ‘দেনা পাওনা’ কলকাতার চিত্রা সিনেমা হলে মুক্তি পায় ১৯৩১ সালে। ১৯৩২ সালে ‘চণ্ডীদাস’ একটি উল্লেখযোগ্য সবাক চলচ্চিত্র। এর পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র জগত কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামা এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিনোদন জগত কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয় নিয়ে কিছু সিনেমা জনমানসে প্রবল প্রভাব বিস্তার করেছিল।
প্রাচীন বাংলা সিনেমায় যে সব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অবদান অসামান্য তাদের মধ্যে কানন দেবী অন্যতম। ১৯২৬ সালে জয়তিশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জয়দেব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে কানন দেবীর অভিনয় জীবন শুরু। তখন তিনি নিতান্তই কিশোরী। দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে অভিনয় জগতে প্রবেশ। প্রথম জীবনে তাঁকে বহুবার প্রতারিতও হতে হয়েছে। এই সময় তিনি জোর বরাত এবং বাসবদত্তা নামে দু’টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছবি দু’টির কিছু বিষয়বস্তু তাঁর কাছে আপত্তিকর ছিল।
১৯৩৫ সালে ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ চলচ্চিত্রে নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৩৭ সালে ‘মুক্তি’ ছবিটি তাঁর সফল জীবনের চাবিকাঠি। পরবর্তীকালে অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, যার বেশিরভাগই কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে। তাঁর অভিনীত ছবিগুলির মধ্যে ‘ঋষির প্রেম’, ‘কংশ বধ’, ‘মা’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘পরাজয়’, ‘যোগাযোগ’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘মেজদিদি’ উল্লেখযোগ্য।
কানন দেবী একজন সুগায়িকা ছিলেন। ওস্তাদ আল্লারাখার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিক্ষা নেন। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিকের কাছেও তিনি গানের তালিম নেন। আধুনিক গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীতও তিনি গেয়েছিলেন যা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও খুশি করেছিল।
নিজের অভিনয় জীবনে কানন দেবী অনেকগুলি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। ‘পরিচয়’ এবং ‘শেষ উত্তর’ দু’টি চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৪২ ও ১৯৪৩ সালে বি এফ জে পুরস্কার পান। ১৯৬৮ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৭৬ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেন। ২০১১ সালে ভারতীয় ডাক বিভাগ কানন দেবীর নামে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেন।
আসামের রাজপরিবারের সন্তান প্রমথেশ বড়ুয়া বাংলা চলচ্চিত্র জগতে বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। কলকাতার হেয়ার স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। ইওরোপ ভ্রমণ করে এসে শান্তিনিকেতনে থাকার সময় ১৯২৯ সালে দেবকী কুমার বোস পরিচালিত ‘পঞ্চাশর’ নামে একটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় পা রাখেন। ১৯৩২ সালে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তখন টকি যুগ। ‘বেঙ্গল — ১৯৮৩’ নামে একটি টকি নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক প্রকাশিত এটি একটি সাহসী প্রচেষ্টা। এই টকিটি চার দিনে নির্মাণ করা হয়েছিল। এই প্রচেষ্টা প্রমথেশ বড়ুয়ার দৃঢ় মনোভাবের পরিচয় ছিল।
১৯৩৩ সালে বি এন সরকার নিউ থিয়েটারে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। এই ঘটনা চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁকে কেরিয়ারের শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়া অভিনীত ‘দেবদাস’ মুক্তি পায়। এই সিনেমাটি কৌশল প্রবর্তনের জন্য বিশ্ব চলচ্চিত্রের ল্যান্ডমার্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। কৌশলটি ছিল “ইন্টারকাট টেলিপ্যাথি শট”। ‘মুক্তি’ ছিল প্রমথেশ বড়ুয়ার আরেকটি সাহসী ছবি। অসমের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পটভূমিতে এই ছবির শুটিং হয়েছিল। রবীন্দ্রসংগীত এই চলচ্চিত্রে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘দেবদাস’। যা বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষাতেই নির্মিত হয়েছিল। এছাড়া ‘মায়া’, ‘মঞ্জিল’, ‘মুক্তি’, ‘রজত জয়ন্তী’, ‘অধিকার’, ‘সুবহ শাম’, ‘রানী’, ‘জবাব’ ইত্যাদি। অভিনয়ের পাশাপাশি কিছু ছবি তিনি পরিচালনা করেছিলেন এবং কিছু ছবির চিত্রনাট্য তিনি নিজে রচনা করেছিলেন।
বাংলা চলচ্চিত্রকে প্রথম পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে কানন দেবী ও প্রমথেশ বড়ুয়ার অবদান অনস্বীকার্য। পরবর্তীকালে আরো অনেক শিল্পী বাংলা চলচ্চিত্রকে স্বর্ণযুগের শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় পথ প্রশস্ত করেছিলেন এই দুই শিল্পী ও তাদের সহযোদ্ধারা।
পর্ব – ৬
বাংলা চলচ্চিত্রের মাইলস্টোন সত্যজিৎ রায়। ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। মুখ্য চরিত্র অপুর শৈশবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ বাংলার নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনযাপনকে চিত্রায়িত করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। স্বল্প নির্মাণ ব্যয়ে সরকারি সহায়তায় অপেশাদার অভিনেতা ও অনভিজ্ঞ শিল্পীদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী হন আজকের কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায়।
সুব্রত মিত্র এই ছবির চিত্র গ্রহণ করেন। দুলাল দত্ত ছিলেন সম্পাদনার কাজে। এই চলচ্চিত্রে স্বনামধন্য সেতার বাদক রবিশঙ্কর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ ব্যবহার করেছেন। ১৯৫৫ সালের ৩ মে নিউ ইয়র্ক শহরে মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের একটি প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। ওই বছরেই কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্রটি মুক্তি লাভ করলে গুণীজনদের প্রশংসা লাভ করে। এই চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত বাস্তববাদ, মানবতা এবং মানব জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ের চিত্রায়ন চলচ্চিত্রটিকে অন্য মাত্রা দান করে।
নিশ্চিন্তপুর নামে বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে হরিহর (কানু বন্দোপাধ্যায়) এবং তার স্ত্রী সর্বজয়া (করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়), তাদের দুই সন্তান অপু (সুবীর বন্দোপাধ্যায়) এবং দুর্গা (উমা দাশগুপ্ত) কে নিয়ে দৃশ্যায়িত হয়েছে একটি ছোট পরিবার। সেই সংসারে হরিহরের দূরসম্পর্কের বিধবা পিসি ইন্দির ঠাকরুণ (চূনীবালা দেবী)-র বসবাস। পেশায় পুরোহিত হরিহর ছিলেন শিক্ষিত মানুষ। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, যাত্রাপালা লিখে সচ্ছল সংসার নির্বাহ করবেন। অভাবের সংসারে ইন্দির ঠাকরুণের সঙ্গে সর্বজয়ার মনোমালিন্যের জেরে ইন্দির ঠাকরুণ মাঝেমাঝেই অন্যত্র চলে যান। আবার এই ইন্দির ঠাকরুণের সঙ্গে দুর্গার ভারি সখ্যতা। গ্রামের বিভিন্ন বাগান থেকে ফলমূল পেড়ে এনে দুর্গা, ইন্দির ঠাকরুণ ও অপু ভাগাভাগি করে খায়। নিখুঁত সেইসব দৃশ্যায়ণ ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটিকে অন্য মাত্রা দান করেছে।
আবার ভাইবোন অপু-দুর্গার মধ্যেও ভীষণ ভাব। শোলার মুকুট পরে আঁখ চিবতে চিবতে কাশফুলের বনের মধ্যে দিয়ে অপু-দুর্গার প্রথম ট্রেন দেখার দৃশ্যটিকে বাংলা চলচ্চিত্রের আইকন বলা চলে। পরবর্তী সময়ে ভাল উপার্জনের আশায় হরিহর শহরে চলে যান। ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে তাদের একমাত্র কন্যা দুর্গার মৃত্যু ঘটে। ইন্দির ঠাকরুণও মারা যান। হরিহর ফিরে এলে পৈতৃক ভিটে ছেড়ে একমাত্র পুত্র অপুকে নিয়ে সর্বজয়া ও হরিহর শহরের পথে পা বাড়ান।

‘পথের পাঁচালী’ একটি জীবনীমূলক ধ্রুপদী উপন্যাস। সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ নামক অংশে শিশু থেকে কিশোর অপুর গ্রামীণ জীবন, শৈশবের সারল্য, শৈশবেই স্বজন হারানোর অব্যক্ত ব্যথা এবং শৈশবে গ্রাম ছেড়ে আসার কাহিনীকে দৃশ্যায়িত করেছেন। চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণ শুরু হয় ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর। কলকাতার নিকটবর্তী বড়াল গ্রামটিকে নির্বাচন করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। রাতের দৃশ্যগুলি স্টুডিওতে গ্রহণ করা হয়েছিল।
চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছিল আনুমানিক সত্তর হাজার টাকা। এই টাকা সংগ্রহের জন্য সত্যজিৎ রায় গ্রাফিক্স হিসেবে নিজের কাজ যেমন চালিয়ে যান, পাশাপাশি নিজের জীবন বিমা পলিসি বন্ধক রাখেন, নিজস্ব গ্রামাফোনের সংগ্রহ বিক্রি করে দেন এবং নিজের স্ত্রী বিজয়া রায়ের গয়নাগুলিও বন্ধক রাখেন। এতকিছুর পরেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যয় নির্বাহের জন্য কিছু পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে হয়।
নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টের বিভাগীয় প্রধান মনরো হুইলার ১৯৫৪ সালে কলকাতায় ছিলেন। তিনি এই চলচ্চিত্রের ব্যাপারে যখন শোনেন এবং কিছু কিছু দৃশ্যায়ণ যখন দেখেন, তখন অতি উচ্চ মানের কাজ বলে পরের বছরের মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টের প্রদর্শনীতে প্রথম বারের জন্য প্রদর্শন করার ব্যবস্থা করেন।
সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ ছবিতে অপুর শৈশব ও কৈশোরকে চিত্রায়িত করেছেন। ‘অপরাজিত’ শিরোনামের চলচ্চিত্রে অপুর ছাত্র জীবন ও যুবক অপুকে চিত্রায়িত করেছেন। ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে অপুর প্রেম ও সাংসারিক জীবনকে চিত্রায়িত করেছেন। এই চলচ্চিত্র দুটিকে নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় আলোচনা করা হবে।
পর্ব – ৭
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অপরাজিত’। ‘পথের পাঁচালী’-র অপুর কাহিনীর সম্প্রসারিত অংশই ‘অপরাজিত’। বাংলার ১৩৩৬ সালের পৌষ থেকে আশ্বিন মাসিক পত্রিকা ‘প্রবাসী’-তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
‘পথের পাঁচালী’ যেখানে শেষ ‘অপরাজিত’ সেখান থেকেই শুরু। ছোট্টো অজ পাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা অপুর যৌবনের আশা আকাঙ্খার গল্প ‘অপরাজিত’। বিভূতিভূষণের লেখায় প্রকৃতির বর্ণনা একটু বেশিই থাকে। গ্রাম থেকে শহরে আসা অপুর জীবনের পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক পরিবেশের যেমন বদল ঘটে তেমনই কলেজ জীবন, বন্ধুত্ব, সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের সম্পর্ক বিষয়ে নতুন নতুন চমক আসে অপুর জীবনে।
‘অপরাজিত’ উপন্যাসকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। যদিও ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণ করার সময় ‘অপরাজিত’ নির্মাণ করার পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’-র বাণিজ্যিক সাফল্য এবং কিশোর অপুর ভবিষ্যৎ নিয়ে চলচ্চিত্র প্রেমীদের কৌতূহল তাঁকে ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্র নির্মাণে প্ররোচনা দিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে ‘অপরাজিত’ মুক্তি পায়। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনাকী সেনগুপ্ত, রমণীরঞ্জন সেনগুপ্ত, চরপ্রকাশ ঘোষ, স্মরণ ঘোষাল এবং সুবোধ গাঙ্গুলী। চলচ্চিত্রটিতে সিনেমাটোগ্রাফি করেছিলেন সুব্রত মিত্র। সম্পাদনা করেছিলেন দুলাল দত্ত। সংগীত পরিবেশনায় ছিলেন রবিশঙ্কর।
অপুর শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ, গ্রাম থেকে শহুরে কায়দায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, নতুন বন্ধু পাওয়া, বিভিন্ন বই পড়ার দিকে ঝোঁক ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়গুলি এই চলচ্চিত্রে চিত্রায়িত হয়েছে। ছবিটি এগারোটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার জয় করে। যার মধ্যে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘স্বর্ণ সিংহ’ পুরস্কার অন্যতম।

অপু ত্রয়ীর শেষ পর্ব ‘অপুর সংসার’। তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক অপুর আকস্মিকভাবে সংসার জীবনে প্রবেশ প্রেম এবং বিরহ নিয়ে ‘অপুর সংসার’ দর্শকাসনে এক আলাদা শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে। এই চলচ্চিত্রে অপুর ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অপুর স্ত্রী অপর্নার চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুর প্রথমবার অভিনয় করেন। এছাড়াও অলক চক্রবর্তী ও স্বপন মুখার্জী অভিনয় করেন। একশো সাত মিনিটের এই চলচ্চিত্রের সুরকার ছিলেন রবিশঙ্কর এবং চিত্রগ্রাহক ছিলেন সুব্রত মিত্র। ১৯৫৯ সালের ১ মে চলচ্চিত্রটি মুক্তিলাভ করে এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। লণ্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে ১৯৬০ সালে ‘সাদারল্যান্ড’ ট্রফি, এডিনবরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ডিপ্লোমা অফ মেরিট’ পুরস্কার লাভ করে। ব্রিটিশ আকাদেমি চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার পায়।
অপু আই এ পাশ করে চাকরির সন্ধানে কলকাতার ভাড়া বাড়িতে থেকে টিউশন করে নিজের খরচ চালাতে শুরু করে। বাড়িওয়ালা বকেয়া ভাড়া চাইতে এলে পাকা শহুরে লোকের মত ঝগড়া করে অপু। বাড়িওয়ালা ভাড়া না পেয়ে অপুকে তুলে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যাওয়ার সময় ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে গেলে অপু সেটা ও সঙ্গে বাইরের আলো সঙ্গে সঙ্গে জ্বালিয়ে দেয় এবং দাঁড়ি কামানোয় মন দেয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় নিশ্চিন্তপুরের সরল গ্রাম্য বালক এখন পুরোপুরি কলকাতার নাগরিক।
কয়েকবছর বাদে কলেজের প্রাণের বন্ধু পুলুর সাথে দেখা হয় অপুর। পুলু অপুকে ভাল রেস্টুরেন্টে খাওয়ায় এবং একটি চাকরিতে যোগদানের কথা বলে। অপু জানায় সে চাকরি করবে না। আত্মজীবনীমূলক একটা উপন্যাস তখন লিখছে অপু। পুলু বলে, অপু কিছুতেই একটা সফল উপন্যাস লিখে উঠতে পারবে না। কারণ সেই উপন্যাসে যেহেতু প্রেমের বিষয়বস্তু রয়েছে তা কল্পনা করে অপুর পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। যেহেতু অপুর প্রেমের কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। যদিও একটি দৃশ্যে দেখা যায় এক প্রতিবেশিনী অপুর বাঁশি শোনার জন্য জানলার ধারে এসে দাঁড়ালে অপু তাকে দেখে লুকিয়ে পড়ে।
পুলু অপুকে তার মাসির মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করে। ঘটনাচক্রে পুলুর মাসতুতো বোন অপর্নাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয় অপু। বিয়ের আগে অপু পুলুকে যে চাকরিটা নেবে না বলেছিল, সেই চাকরিটা পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে বিয়েতে রাজি হয় অপু। অপর্না শহুরে দরিদ্র জীবনে স্বামীর সাথে ভাড়া বাড়িতে মানিয়ে নেয়। স্বামী অফিস থেকে ফিরলে মশকরা করে কাগজের ঠোঙা ফাটায়। সিগারেটের প্যাকেটে একটি মাত্র সিগারেট খাওয়ার অনুরোধ লিখে রাখে। বাড়তি টিউশন ছেড়ে দিয়ে অফিসের পরে বাড়িতে ফিরে এসে তার সাথে সময় কাটানোর কথা বলে অপর্না। আবার অপর্না খেতে বসলে অপু পাশে বসে তাকে বাতাস করে। এইভাবে তাদের দাম্পত্য প্রেম মধুর হয়ে ওঠে।
পরবর্তী পর্যায়ে তাদের সন্তান কাজলের জন্ম দিতে গিয়ে অপর্নার মৃত্যু হয়। এই আঘাত অপুকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করলেও অপু তা পারে না। কিন্তু সন্তান কাজলকে সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। কারণ অপুর মনে হয়, কাজল রয়েছে বলেই অপর্না পৃথিবীতে নেই।
সত্যজিৎ রায় বেশ কয়েকটি কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। যেগুলি তাঁকে চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ সম্মান ‘অস্কার’ এনে দিয়েছে। ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’ ব্যক্তি মানুষের ধারাবাহিক জীবনের যে মূল্যমান চিত্রায়িত করেছে, তা দর্শকের মনে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিৎ রায়কে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পর্ব – ৮
বিশ্ববন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের বাস্তববাদী ত্রয়ী যদি ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’ হয়, তবে বাংলা ভাষার প্রথম সুপার হিরো সৃষ্টির গৌরবও তাঁর। শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ রূপকথার গল্প অবলম্বনে ১৯৬৯ সালে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। সত্যজিৎ রায় নিজেই এই ছবির চিত্রনাট্য রচনা ও সংগীত পরিচালনা করেছেন।
দুই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংগীতশিল্পী গুপী এবং বাঘার যাত্রা অনুসরণ করে এই চিত্রনাট্যের শুরু। যাদের ভূতের রাজা তিনটি যাদুকরী বর প্রদান করে। গুপী তার গানের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তিকে মন্ত্রমুগ্ধ করার ক্ষমতা অর্জন করে অন্যদিকে বাঘা তার বাজনার মাধ্যমে মানুষকে গতিহীন করে দিতে পারে।
‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমায় তপেন চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্ত, হরিন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, জহর রায় ও শান্তি চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেন। চিত্রগ্রাহক ছিলেন সৌমেন্দু রায়। সম্পাদক ছিলেন দুলাল দত্ত।

গল্পের দুই নায়ক গুপী এবং বাঘা সংগীতের প্রতি অনুরক্ত হলেও সাঙ্গীতিক প্রতিভা তাদের মধ্যে ছিল না। এই কারণে গুপীর গ্রাম আমলকি ও বাঘার গ্রাম হরিতকী থেকে তারা বিতাড়িত হয়। পথে বনের মধ্যে দুই সরল একনিষ্ঠ মানুষের সাক্ষাত হয়। সেখানে ভূতের রাজার বরে তারা সুপার হিরো হয়ে ওঠে। প্রথম বরে তারা যখন ইচ্ছে তখনই মনের মত খাবার পেতে পারে এবং দ্বিতীয় বরে দু’জোড়া বিশেষ জুতো ও দু’জনের হাতে হাতে তালি দিয়ে দেশবিদেশ ঘোরার ক্ষমতা পায় এবং তৃতীয় বরে সংগীত এবং বাদনের মাধ্যমে মানুষকে গানবাজনা শুনিয়ে অবশ করে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে।
এরপর শুন্ডীর রাজাকে গান শুনিয়ে তাঁর সভা গায়ক হয়ে তারা সেখানে থেকে যায়। শুন্ডীর প্রতিবেশী রাজা হাল্লা শুন্ডীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে গুপী এবং বাঘা হাল্লায় গুপ্তচরের বেশে যায় এবং সেখানে ভূতের রাজার বরে পাওয়া সংগীত প্রতিভা দিয়ে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়। এরপর শুন্ডীর রাজকন্যা মণিমালার সাথে গুপীর এবং হাল্লার রাজকন্যা মুক্তামালার সাথে বাঘার বিয়ে হয়ে যায়।
মূলত ছোটদের জন্য নির্মিত হলেও ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সব বয়সের দর্শকদের কাছে সমান উপভোগ্য। ছবির মূল আকর্ষণ সত্যজিৎ রায় রচিত গানগুলি। সাড়ে ছ’মিনিটের ভূতের নৃত্যের একটি দৃশ্য ভারতীয় ঘরানায় নির্মিত একটি স্পেশাল এফেক্ট। ভূতের রাজার দেওয়া বর সত্যজিৎ রায় নিজের গলায় উপস্থাপন করেছেন। এই ছবির গানগুলি গেয়েছেন অনুপ ঘোষাল, রবি ঘোষ এবং কানু মুখার্জী।
এই ছবিটি অনেকগুলি পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক ১৯৭০। শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে ১৯৬৯ সালে অকল্যান্ড থেকে পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৭০ সালে টোকিও থেকে ‘মেধা’ পুরস্কার এবং মেলবোর্ন থেকে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার অর্জন করে। আকাদেমি ফিল্ম আর্কাইভ ২০০৩ সালে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমাটি সংরক্ষণ করে।
পর্ব – ৯
ভারতীয় চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক আঙিনায় পৌঁছে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর অপু ত্রয়ী এবং ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ নিয়ে বিগত সংখ্যাগুলিতে আলোচনা হয়েছে। তাঁর আরো কয়েকটি কালজয়ী ছবির নাম ‘হীরক রাজার দেশে’, যা মূলত গুপী বাঘার ধারাবাহিক কার্যক্রম। এছাড়া ‘সদগতি’, ‘ঘরে বাইরে’ এবং ‘আগন্তুক’ ভিন্ন মাত্রার ছবি।
গুপী বাঘা জুটি রাজ জামাতা হওয়ার পরে হীরক রাজ্য থেকে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য রাজদরবারে আমন্ত্রিত হয়। এদিকে শুন্ডী ও হাল্লার দুই রাজ জামাতা গুপী এবং বাঘা মনে মনে হীরক রাজ্যের হীরার খনি দেখার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। গানের সভায় আমন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে সেই সুযোগ এসে যায়। হীরক রাজ্য হীরক রাজার মনের মত করে চালিত হয়। হীরা কোষাগারে জমা হয়। আর প্রজারা যথেষ্ট পরিমাণে পারিশ্রমিক পায় না। তারা ক্ষুধার্ত হয়ে কষ্ট পায়। প্রতিবাদী মানুষকে ‘যন্তরমন্তর’ ঘরে পুরে রাজ বিজ্ঞানীকে দিয়ে মগজ ধোলাই করানো হয়। যার ফলে প্রতিবাদী প্রজারা রাজার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। একজন মাত্র শিক্ষক উদয়ন পন্ডিতকে কিছুতেই বাগে আনতে পারে না হীরক রাজা। সে পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে রাজাকে জব্দ করার ব্যবস্থা করতে থাকে।

এই সময়ে উদয়ন পন্ডিতের সঙ্গে দেখা হয় গুপী এবং বাঘার। উদয়ন পন্ডিত ও তার ছাত্ররা এবং গুপী বাঘা মিলে শোষক রাজার কবল থেকে দেশকে রক্ষা করার ব্রত নেয়। গুপী বাঘা তাদের জাদুকরী সংগীতের মাধ্যমে শুধু মানুষ নয়, এমনকি একটি বাঘকেও গানের ছন্দে জব্দ করে হীরক রাজার কোষাগার লুঠ করে। লুঠ করা হীরা হীরার খনির শ্রমিক ও রক্ষীদের মধ্যে বন্টন করে তাদের রাজার বিরুদ্ধে কাজ করতে প্ররোচিত করে। উদয়ন পন্ডিত এবং তার ছাত্রদের রাজা যখন যন্তরমন্তর ঘরে ঢোকানোর ব্যবস্থা করে তখন রাজ বিরোধী মন্ত্র যন্তরমন্তর মেশিনে দিয়ে হীরক রাজারই মগজ ধোলাই করা হয়। শেষ দৃশ্যে দেখা যায় রাজার মূর্তি উদ্বোধনের দিনে অন্যান্য প্রজাদের সঙ্গে রাজাও স্লোগান দিতে থাকে, “দড়ি ধরে মারো টান রাজা হবে খান খান”। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কোষাগার লুঠ করার সময় যে বাঘটি কোষাগার পাহারা দিচ্ছিল, সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় সেই বাঘটি আসল ছিল।
গুপী বাঘার চরিত্রে তপেন চ্যাটার্জী ও রবি ঘোষ, হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্ত, বিজ্ঞানীর চরিত্রে সন্তোষ দত্ত ও উদয়ন পন্ডিতের চরিত্রে সৌমিত্র চ্যাটার্জী অভিনয় করেন। সমগ্র সিনেমাটি পরিচালনা করেন সত্যজিৎ রায়। এই চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি গানের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
১৯৮০ সালে এই চলচ্চিত্রে সেরা প্লেব্যাক গায়কের জন্য অনুপ ঘোষাল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সেরা সংগীত পরিচালনা এবং শ্রেষ্ঠ বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সত্যজিৎ রায়।
এই চলচ্চিত্রে মোট বারোটি গান ব্যবহৃত হয়েছিল। শিল্পী অমর পালের গাওয়া “কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়” ছাড়া বাদবাকি সমস্ত গান অনুপ ঘোষালের গাওয়া। তাঁর গাওয়া গানগুলি হল, “মোরা দু’জনায় রাজার জামাই”, “আর বিলম্ব নয়”, “আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে”, “আহা সাগরে দেখো ছায়ে”, “এ যে দৃষ্টি দেখি অন্য”, “এবারে দেখো গর্বিত বীর”, “এসে হীরক দেশে”, “ধরো নাকো সান্ত্রী মশাই”, “পায়ে পড়ি বাঘ মামা”, “নহি যন্ত্র” এবং “মোরা গুপী বাঘা দু’জন ভায়েরা ভাই”। এই গানগুলি বাংলা চলচ্চিত্রের চিরকালীন সম্পদ হিসেবে রয়ে গেছে।
পর্ব – ১০
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে সত্যজিৎ রায় একজন আইকন। তাঁর সৃষ্টি কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা। যার পুরো নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্র। উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট। তিনি পেশায় একজন বেসরকারি তদন্তকারী। তাঁর বাড়ি ২১, রজনী সেন রোড, কলকাতা – ২৯। ভাইপো তপেশ রঞ্জন মিত্র বা তোপসেকে নিয়ে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন তদন্ত মূলক অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। এইসব অভিজানে তাঁর সঙ্গী হন বন্ধু লালমোহন গাঙ্গুলী। যিনি জটায়ু ছদ্মনামে বিভিন্ন রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস লিখে থাকেন।
১৯৬৫ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এই সিরিজের মোট পয়ত্রিশটি সম্পূর্ণ গল্প এবং চারটি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস রচিত হয়েছিল।
সত্যজিৎ রায় ফেলুদা চরিত্র নিয়ে দুটি ছবির পরিচালনা করেছেন। ১৯৭৪ সালে ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’। ১৯৭৮ সালে সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায় একটি নতুন ফেলুদা চলচ্চিত্র সিরিজ তৈরি করেছিলেন। সন্দীপ রায় নির্মিত স্বতন্ত্র ফেলুদা চলচ্চিত্র ‘বাদশাহী আংটি’ ও ‘বোম্বাইয়ের বম্বেটে’ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র চ্যাটার্জী, জটায়ুর চরিত্রে সন্তোষ দত্ত, তোপসের চরিত্রে সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জী এবং একটি বিশেষ ও মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কুশল চক্রবর্তী। এই ছবির বাজেট ছিল বারো লক্ষ টাকা এবং বক্স অফিস বাজার করেছিল পচাত্তর লক্ষ টাকা।

ছবিটি শুরু হয় এক স্কুল ছাত্র মুকুল ধর (কুশল চক্রবর্তী) সর্বদা বিষন্ন থাকে এবং মধ্য রাতে ময়ূর, দূর্গ, উট — এইসবের ছবি আঁকে। কখনো কখনো বলে সে সোনার দূর্গে বসবাস করত এবং তাদের বাড়িতে অনেক রত্ন ছিল। প্যারা সাইকোলজিস্ট ডক্টর হেমাঙ্গ হাজরা (শৈলেন মুখার্জী) মুকুলের বাবা-মাকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন। মুকুলের এই আচরণ তাঁর গবেষণায় সাহায্য করতে পারে বলে বিশ্বাস করেন। ড. হাজরা মুকুলকে নিয়ে রাজস্থানে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। মুকুলের মনস্তত্ত্ব ও তাকে সুস্থ করার ব্যাপারে সাহায্য হবে ভেবেই ড. হাজরা এই পরিকল্পনা করেন।
এদিকে মন্দার বোস (কামু মুখার্জী) ও অমিয় নাথ বর্মন (অজয় ব্যানার্জী) এই চলচ্চিত্রের দুই খল চরিত্র এই ঘটনার কথা জানতে পারে এবং তারা ধারণা করেছিল যে রত্নের কথা মুকুল বলত, তা ওই কেল্লার মধ্যে গুপ্তধন হিসেবে রয়েছে। এই উদ্দেশ্যে তারা মুকুলকে অপহরণের পরিকল্পনা করে। আবার মুকুলের বাবা এই দুষ্ট চক্রের কথা জানতে পেরে মুকুলের রক্ষার জন্য ফেলুদাকে নিয়োগ করে। কুচক্রী বর্মন এবং বোস ড. হাজরার সাথে বন্ধুত্ব করে এবং তাকে পাহাড়ের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে মুকুলকে অপহরণ করে। ফেলুদার সাথে নকল হাজরার দেখা হয় এবং সে সহজেই ফেলুদার সন্দেহের তালিকায় চলে আসে।
মন্দার বোস মুকুলকে সম্মোহিত করে জেনে যায় যে কেল্লাটি জয়সলমিরে। পরেরদিন ফেলুদারাও জয়সলমিরে পৌঁছে যায়। কেল্লার কাছাকাছি ময়ূর দেখে মুকুল উৎসাহিত হয়। এদিকে বর্মন ময়ূরের প্রতি ভয়ের কারণে ময়ূরটিকে গুলি করতে যায়। এই ঘটনা মুকুলের শিশু মনে গভীর দাগ কাটে। সে বর্মন এবং তার সঙ্গীকে ‘দুষ্টু লোক’ বলে সম্বোধন করে এবং বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে ছুটে পালায়। ফেলুদা সমস্ত ঘটনার জন্য তৈরি ছিল। সে মুকুলকে ধরে ফেলে এবং নকল হাজরা পালাতে গেলে ফেলুদার ড্রাইভার তাকে পাকড়াও করে।
ইতিমধ্যে মুকুলকে সোনার কেল্লার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মুকুল জানায় যে সে বাড়ি যেতে চায়। এরপর ফেলুদা নিজের বুদ্ধিমত্তার জোরে বুঝে যায় এবং জানিয়ে দেয় সোনার কেল্লা বলে কিছু নেই। সেখানে কোনো রত্নও নেই এবং কোনোদিন ছিলও না।
পর্ব – ১১
সত্যজিৎ রায় সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন। তাঁর স্বরচিত ছোট গল্প ‘অতিথি’ অবলম্বনে ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন। এটি একটি বাংলা ভাষার নাট্য চলচ্চিত্র। ১৯৯১ সালে সত্যজিৎ রায়ের শেষ চলচ্চিত্র হিসেবে এটি উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্রটি একটি ইন্দো-ফরাসি প্রযোজনা। আন্তর্জাতিক নামী প্রোডাকশন কোম্পানিগুলি থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল এই চলচ্চিত্রটি।
মুখ্য অভিনেতা ছিলেন উৎপল দত্ত। এছাড়া মমতাশঙ্কর, দীপঙ্কর দে, ধৃতিমান চ্যাটার্জী, রবি ঘোষ, প্রমোদ গাঙ্গুলী বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফি করেছিলেন বরুণ রাহা।
অনিলা বোসের চরিত্রে মমতাশঙ্কর, সুধীন্দ্র বোসের চরিত্রে দীপঙ্কর দে এবং তাদের একমাত্র ছেলে সাত্যকিকে নিয়ে ছিমছাম সংস্কৃতি মনস্ক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার। সেই বাড়িতে একটি চিঠি আসে যে প্রায় পয়ত্রিশ বছর ধরে বিদেশে ভ্রমণরত অনিলা দেবীর একমাত্র মামা দেশে ফিরে তার সঙ্গে দেখা করতে চান। অনিলা দেবীর এই মামা দেশের কোনো পরীক্ষাতেই কোনোদিন দ্বিতীয় হননি। খুব অল্প বয়সেই বিদেশ ভ্রমণের নেশায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। অনিলা দেবী এহেন ব্যক্তির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তার স্বামী সুধীন্দ্র এই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান থাকেন।

মামা মনমোহন মিত্রের পাসপোর্ট যাচাই করতে কৌশলে উদ্যোগী হন সুধীন্দ্র। ছোট্ট সাত্যকি কিন্তু তার নতুন দাদুর সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ক্রমে অনিলা দেবীও তার দাদুর উইলের কথা মনে করে ভাবে যে লোকটি হয়তো তার উত্তরাধিকারের অংশ দাবি করতেই এসেছে। কিন্তু লোকটির প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।
সুধীন্দ্র কৌশলে তার এক আইনজীবী বন্ধুকে আমন্ত্রণ জানায়। নানাভাবে সেই আইনজীবী বন্ধু মনমোহন বাবুকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে তার প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করতে থাকেন। স্কলার মনমোহন মিত্রের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গভীর জ্ঞান ও অতি সক্রিয় অভিজ্ঞতা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি নিবিড় দৃষ্টিভঙ্গি অনিলা দেবী এবং সুধীন্দ্রকে মুগ্ধ করে। আইনজীবী বন্ধু এত বড় ব্যক্তিত্বের সামনাসামনি হয়তো কখনো হননি। মনমোহন বাবুর জ্ঞানবোধ, বিচক্ষণতা, আবেগ শহুরে সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা আইনজীবীর কাছে বাতুলতা বলে মনে হয় এবং তিনি অতিথিকে বলে দেন, “হয় পরিষ্কার হয়ে আসুন অথবা কেবল পরিষ্কার হয়ে যান” বলে নির্দেশ দেন।
পরেরদিন সকালবেলা মনমোহন বাবুকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না বাড়িতে। বোস পরিবার উতলা হয়ে ওঠে নিজেদের পর্যবেক্ষণে চিনতে না পারা মামাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। ব্যক্তিত্বের তল আবিষ্কার করে তারা অনুমান করে কাছের আদিবাসী গ্রামই মামার বর্তমান ঠিকানা। তারা পৌঁছে যায় সেই ঠিকানায়। আদিবাসী রমণীদের সঙ্গে অনিলা দেবী নৃত্যে মেতে উঠলে মামা বলেন, “বুঝলাম, তুমিই আমার আসল ভাগনি।” বোস দম্পতি তার কাছে ক্ষমা চান এবং কলকাতায় আসতে রাজি করান।
পরেরদিন মামা মনমোহন মিত্র আবার বিদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হন বোস দম্পতির হাতে একটি মুখবন্ধ খাম দিয়ে। তিনি রওনা হওয়ার পরে বোস দম্পতি জানতে পারে মামা মনমোহন মিত্র তার সমস্ত উত্তরাধিকারের অংশ একমাত্র ভাগনিকেই দান করে গেছেন।
১৯৯২ সালে ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘আগন্তুক’ সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং সেরা পরিচালনার জন্য পুরস্কার জিতেছিল। অনিলা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মমতাশঙ্কর পেয়েছিলেন বিশেষ জুড়ি পুরস্কার। ঋত্বিক ঘটক পুরস্কারে এটি সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে মনোনীত হয়েছিল। সত্যজিৎ রায়কে সেরা দৃশ্যকল্প লেখক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল।
পর্ব – ১২
ভারতীয় চলচ্চিত্রে যে ক’জন চলচ্চিত্র পরিচালককে আইকন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তাঁরা হলেন সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহা এবং মৃণাল সেন। এদের পূর্বসূরী হিসেবে ভিন্ন ধারায় বাস্তববাদী চলচ্চিত্র নির্মাণে যে ব্যক্তির নাম অবশ্যম্ভাবী ভাবে উঠে আসে তিনি ঋত্বিক ঘটক। ক্ষণজন্মা এই ব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা এবং নাট্যকার হিসেবেও স্বকীয়তার প্রমাণ রেখে গেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে দেশ ভাগের পরবর্তী সময়ে সামাজিক বাস্তবতা এবং নারীবাদের সূক্ষ্ম বিষয়গুলি চিত্রায়িত হয়েছে।
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন ঋত্বিক ঘটক। রাজসাহী কলেজিয়েট স্কুল এবং বালীগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং উচ্চ শিক্ষায় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চলচ্চিত্র নির্মাণকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে কালজয়ী বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর জীবন সঙ্গী ছিলেন সূরমা ঘটক।
১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর জীবন স্তব্ধ হয়ে যায়। এই সীমিত সময়ের মধ্যে ১৯৭০ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার এবং ১৯৭৪ সালে শ্রেষ্ঠ গল্পের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
ঋত্বিক ঘটকের নির্মিত চলচ্চিত্র গুলি হল ‘অযান্ত্রিক’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘মধুমতি’, ‘কত অজানারে’, ‘মুসাফির’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণ রেখা’, ‘যুক্তি তক্ক গপ্পো’, ‘ছিন্নমূল’, ‘রাজকন্যা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ইত্যাদি এই চলচ্চিত্রগুলি নির্মাণ করেন। ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’, ‘রামকিঙ্কর বেজ’ এবং ‘আমার লেনিন’ নামের জীবনীমূলক তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন।
ঋত্বিক ঘটক ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা। সুবোধ ঘোষ রচিত বাংলা ছোট গল্প ‘অযান্ত্রিক’ অবলম্বনে ‘অযান্ত্রিক’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। এটি একটি কমেডি নাট্য চলচ্চিত্র। একটি জড় পদার্থকে গল্পের চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
বিমল একজন মফস্বলে বসবাসকারী ট্যাক্সি ড্রাইভার। এই ট্যাক্সিটি হল ১৯২০ সার্ভোলেট জালোকি ট্যাক্সি। বিমল এই ট্যাক্সির নাম রেখেছেন জগদ্দল। একাকী বিমলের এই ট্যাক্সিই একমাত্র সঙ্গী। ভাঙাচোরা এই ট্যাক্সি বিমলের নয়নের মণি। একটি যন্ত্রশিল্প বিবর্জিত এলাকায় ট্যাক্সি চড়িয়ে মানুষকে একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছে দেওয়াই ছিল বিমলের কাজ। এই ভাঙাচোরা ট্যাক্সির সঙ্গে বিমলের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। প্রতিদিনের যাত্রাপথে যেসব অনুভূতি বিমলের হত এবং দিন শেষে এই জড় বস্তুর সাথে তার রাত কাটত, তা ছবির বিভিন্ন পর্যায়ে চিত্রায়িত হয়েছে।

এই ছবিতে বিমলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্রীমান দীপক, কাজল গুপ্ত, অনিল চট্টোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, সীতা মুখোপাধ্যায় এবং কেষ্ট মুখোপাধ্যায়। এই ছবির সুরকার ছিলেন আলী আকবর খান। চিত্রগ্রাহক ছিলেন দীনেন গুপ্ত ও সম্পাদক রমেশ যোশী এবং প্রযোজনা কোম্পানির নাম এল বি ফিল্মস ইন্টারন্যাশনাল। একশো চার মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি ১৯৫৮ সালের ২৩ মে মুক্তি পেয়েছিল।
বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও জার্মান বিশেষজ্ঞ অলোক রঞ্জন দাশগুপ্তের মতে “বিবর্ণ প্রকৃতি ও যান্ত্রিক সভ্যতার নির্দয় বিরোধটি ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমল ও তার করুণ যানটির সঙ্গে প্রেমের মধ্যে দিয়ে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তাকে আধুনিকতার — একটি ব্যতিক্রমী উপহার মনে হয়”। প্রতিভাস ম্যাগাজিন
পর্ব – ১৩
শিবরাম চক্রবর্তীর একটি উপন্যাস ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ অবলম্বনে পরিচালক ঋত্বিক ঘটক ১৯৫৮ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই ছবিতে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে একটি শিশু চরিত্র। শিশুর ভূমিকায় অভিনয় করেন পরমভট্টারক লাহিড়ী। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, কেষ্ট মুখোপাধ্যায়, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য, শ্রীমান দীপক, শৈলেন ঘোষ, কৃষ্ণা জায়া, নীতি পণ্ডিত, পদ্মাদেবী ও জহর রায়। একশো সতেরো মিনিটের এই চলচ্চিত্রটির সুরকার ছিলেন সলিল চৌধুরী।
কাঞ্চন নামের একটি আট বছরের ছেলে গ্রামের বাড়িতে সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে বেড়ায়। মা কিছুটা প্রশ্রয় দিলেও বাবা কাঞ্চনের এই দুষ্টুমির শাস্তি স্বরূপ কঠোর দণ্ড দেন। মাঝেমাঝেই তাকে গৃহবন্দি করে রাখেন। কাঞ্চন বাবাকে একজন নিষ্ঠুর দৈত্য বলে মনে করে। সে মনে মনে কলকাতা মহানগরীর একটি ছবি কল্পনা করে, যা তার কাছে রূপকথার রাজ্য এল ডোরেডো। কাঞ্চনের আবেগপ্রবণ মন ও বাবার শাসন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সে একদিন ক্ষোভে, অভিমানে তার স্বপ্নের এল ডোরেডো রাজ্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।

কোনক্রমে কাঞ্চন কলকাতায় পৌঁছে বিশাল অট্টালিকা, দোকান, বাজার, সেতু, শহুরে জাকজমক দেখে খানিকটা ঘাবড়ে যায়। কিন্তু এত বড় শহরে তাকে বাবার মত শাসন করারও কেউ ছিল না। সে যা ইচ্ছে তাই করতে পারত। আবার মায়ের মত আদর করে খেতে ডাকারও কেউ ছিল না। গ্রাম্য ছেলেটির সঙ্গে শহুরে উচ্চবিত্ত মানুষের কোনরকম যোগাযোগের সুযোগও ছিল না। তাই শহরের প্রান্তিক মানুষদের সাথেই তার পরিচয় ঘটে, যাদের তার মত গ্রামের বাড়িটাও নেই।
দেশ ভাগের সময় ওপার বাংলা থেকে ঘরবাড়ি, জমিজমা এমনকি দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারের মানুষজনকে পর্যন্ত হারিয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে কলকাতা শহরে অনেক মানুষ জীবনযাপন করছে। কাঞ্চনের আলাপ হয় বহুরূপী হরিদাসের সাথে যে মুখোশ পরে বুলবুল ভাজা বেচে। এছাড়া ফুটপাতের জাদুকর, ভবঘুরে বাউল, চোর ব্যবসায়ী এবং ছোট্ট মেয়ে মিনি এবং তার পরিবারের সাথে। মিনি ও তার পরিবার কাঞ্চনকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। কাঞ্চনের স্বপ্নের ডোরেডোকে সে চেনে একটি আজব নগরী রূপে।
এদিকে গ্রামের বাড়িতে কাঞ্চনের মা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তার বাবা ছেলের হারিয়ে যাওয়ার বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন। ফলে শহরে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়।
যে শিশুসুলভ রঙিন স্বপ্ন নিয়ে সে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল সেই স্বপ্ন পুরোপুরি চুরমার হয়ে যায়। এই সময় কাঞ্চন আবেগময় স্বপ্নের জগত ছাড়িয়ে বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে উপলব্ধি করে তার গ্রামের বাড়ি, বাবা মায়ের সুরক্ষা বলয় অনেক ভাল। সে তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে চায়। বুঝতে পারে তার বাবা কোনো দৈত্য নন বরং দারিদ্রের সাথে সংগ্রামরত এক স্নেহময় পিতা।
কাঞ্চনের কলকাতা ভ্রমণ মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই তাকে আবেগপ্রবণ শৈশব থেকে পরিপক্ক মানুষে পরিণত করে। খবরের কাগজের বিজ্ঞপনে মায়ের অসুস্থতার খবর জেনে কাঞ্চন বাড়ি ফিরতে উদ্যোগী হয়। বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় হরিদাসের কাছ থেকে একটি মুখোশ উপহার পায় সে।
শিবরাম চক্রবর্তীর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ উপন্যাসে শিশুমন এবং বাস্তবতার কাহিনী বিন্যাস দারুন ভাবে ঘটিয়েছেন লেখক। ঋত্বিক ঘটক তাঁর সিনেমায় পুরো বিষয়বস্তু একটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। একের পর এক ঘটনা নিখুঁত দৃশ্য নির্মাণে দর্শককে টানটান কৌতূহলে বেঁধে রাখে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন
পর্ব – ১৪
প্রথম বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্র হল ‘বিল্বমঙ্গল’। ১৯১৯ সালে সাদা-কালো এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। পার্শি রুস্তমজি ধোতিওয়ালা ছিলেন এই চলচ্চিত্রের পরিচালক। চম্পশি উদেশি রচিত একটি গল্পের উপর ভিত্তি করে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। গল্পটি মধ্যযুগীয় হিন্দু ভক্তি কবি বিল্বমঙ্গল সম্পর্কে। কলকাতার এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানি প্রযোজিত এই চলচ্চিত্রটি বাংলা অন্তর্লিপি ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি প্রথম বাংলা পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। কলকাতার কর্ণওয়ালিশ থিয়েটারে (বর্তমান স্টার থিয়েটার) ১ নভেম্বর, ১৯১৯ সালে মুক্তি পায়। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র সংগ্রহশালা ফ্রান্সের সিনেমা ফ্রঁসেজ থেকে চলচ্চিত্রটির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত ফুটেজটি ৫৫৪ মিটার দীর্ঘ, যা আঠারো ফ্রেম প্রতি সেকেন্ড গতিতে আঠাশ মিনিট ধরে প্রদর্শন করা হয়।
ছবিটিতে বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মিস গোহুর, মিস গুলাব দেবী ও দোরাবজি মেওয়াওয়ালা। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন কলকাতার এলফিনস্টোন ও পন্ডিত কানহাইয়া লাল বায়োস্কোপ কোম্পানি। এই চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য একশো বত্রিশ মিনিট।
‘বিল্বমঙ্গল’ প্রকৃতপক্ষে এক আবেগ সর্বস্য উদ্ভ্রান্ত প্রেমিকের কৃষ্ণ প্রেমে মাতোয়ারা হওয়ার গল্প। সচ্ছ্বল পরিবারে আদর যত্নে বড় হওয়া সত্ত্বেও যৌবনকাল থেকে সে ইন্দ্রিয় তারিত হয়ে পড়ে। চিন্তামণি নামে এক বারবণিতার প্রতি আকর্ষিত হয়। নিজের সমস্ত সম্পত্তি ও সুখ সাচ্ছন্দের বিনিময়ে চিন্তামণির সাহচর্য লাভ করতে চায় বিল্বমঙ্গল। কিন্তু চিন্তামণি বারবণিতা। সম্পদের বিনিময়ে কিছুদিন তার সাহচর্য পাওয়া গেলেও সম্পদহীন অবস্থায় তাকে কাছে পাওয়া অসম্ভব। বারবণিতা হলেও চিন্তামণি আসলে একজন নারী। তাই বিল্বমঙ্গলের সমর্পণকে যেমন সে অস্বীকার করতে পারে না, তেমনই তার ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে।

এক ঝড় বৃষ্টির রাতে চিন্তামণির অদর্শনে অস্থির হয়ে উত্তাল নদীর ধারে এসে উপস্থিত হয় বিল্বমঙ্গল। মাঝি মাল্লা কেউই দূর্যোগের রাতে বিপদের ঝুঁকি নিতে রাজি না হলে বিল্বমঙ্গল নদীতে ঝাঁপ দিয়ে একটি কাঠের টুকরোকে ধরে নদী পার হয়ে চিন্তামণির বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হয়। বিশাল পাঁচিল দড়ি বেয়ে উঠে চিন্তামণির ঘরের সামনে উপস্থিত হয়। বৃষ্টির রাতে বিল্বমঙ্গলকে সেখানে দেখে চিন্তামণি ও তার বাড়ির কাজের লোকেরা হতবাক হয়ে যায় এবং জানতে চায় সে কীভাবে এখানে এসে উপস্থিত হল? বিল্বমঙ্গল নির্বিকার চিত্তে জানায় সে নদী পেরিয়েছে একটি কাঠের টুকরো ধরে আর পাঁচিল টপকেছে একটি দড়ি ধরে।
চিন্তামণি এই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য নদীর ঘাটে লোক পাঠালে জানতে পারে কাঠের টুকরো ভেবে যে বস্তুটিকে ধরে বিল্বমঙ্গল নদী পার করেছিল, সেটি মূলত একটি পচাগলা শবদেহ। আর যে দড়ি বেয়ে সে পাঁচিল টপকেছিল সেটি একটি বিষধর সাপ। একথা জানার পরে চিন্তামণি বিল্বমঙ্গলকে তীব্র ভর্ৎসনা করে। সে বলে, তোমার এই মন যদি একজন বেশ্যার পাদপদ্মে না দিয়ে শ্রীহরির পাদপদ্মে দিতে তবে তোমার মোক্ষ লাভ হয়ে যেত। বারবণিতা কারো একার নয়।
দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত, অবসন্ন বিল্বমঙ্গল শান্তির আশ্রয়ের খোঁজে চিন্তামণির কাছে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু চিন্তামণির এমন তিরষ্কারে বিল্বমঙ্গলের মনে হয় এত বিপদ উপেক্ষা করে সে চিন্তামণির কাছে উপস্থিত হল, চিন্তামণি তো আসলে তার কেউ নয়। আর তার সম্পদও সীমিত প্রায়। তাই কোনোভাবেই সে আর চিন্তামণিকে পেতে পারবে না। সম্পদের বিনিময়ে চিন্তামণিকে পাওয়ার ইচ্ছাও তার মন থেকে চলে যায়। যে শান্তির আশ্রয়ের খোঁজ সে করেছিল, সম্পদের বিনিময়ে তা পাওয়া যায় না। কামিনী কাঞ্চনের প্রতি মুহূর্তেই মোহভঙ্গ হয় বিল্বমঙ্গলের। সেই রাতেই চিন্তামণির বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে বৃন্দাবন ধামের উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং প্রকৃতই কৃষ্ণ নামে নিজের জীবন সমর্পণ করে।
এইদিকে চিন্তামণি বারবণিতা হলেও বিল্বমঙ্গলের সহৃদয় প্রেমকে উপেক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু সেই রাতে বিল্বমঙ্গলকে তিরস্কার করেছিল কারণ সামাজিকভাবে সে বিল্বমঙ্গলের সাথে থাকতে পারবে না। আবার তার বারবণিতার জীবন বিল্বমঙ্গল সহ্য করতে পারবে না। এছাড়াও বিল্বমঙ্গল যদি অন্য কোনো নারীতে আসক্ত হয় সে-ই নানানভাবে হেনস্থা হবে। তাই বিল্বমঙ্গলের প্রতি তার ভালবাসাকে বুঝতে দেয়নি।
এইধরনের সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা বিল্বমঙ্গলকে উপলব্ধি করিয়েছিল মাত্র। তার কানে কৃষ্ণ নামের দিশাও দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চিন্তামণিও সবকিছু ছেড়ে বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় বিল্বমঙ্গল কৃষ্ণ দর্শন লাভ করেছে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন
পর্ব – ১৫
‘লা পিয়েরে ফিলোসফেল’ ফরাসি ভাষায় যার অর্থ পরশপাথর। ১৯৫৮ সালের বাংলা ভাষার একটি ফ্যান্টাসি কমেডি চলচ্চিত্র ‘পরশপাথর’। নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। পরশুরাম ছদ্মনামে রাজশেখর বসুর ‘পরশপাথর’ ছোট গল্প অবলম্বনে কাহিনীটি চিত্রায়িত হয়েছে। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সত্যজিৎ রায়। প্রধান চরিত্রটি অতুলনীয় রসবোধের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী। রাণীবালা দেবীর অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটেছিল।
পরেশচন্দ্র দত্ত (তুলসী চক্রবর্তী) কলকাতার একজন মধ্যবিত্ত ব্যাংক কেরানি। বৃষ্টির দিনে অনিচ্ছুকভাবে তিনি একটি দাতব্য ম্যাচে যোগ দেন। যেখানে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল সেখানে তিনি একটি ছোট গোলাকার পাথর খুঁজে পান। এটিকে মার্বেল ভেবে নিজের ভাগনেকে সেই পাথর দিয়ে দেন। শিশুটি সেটি নিয়ে খেলতে গিয়ে যাতেই ছোঁয়ায় সেটি তৎক্ষণাৎ সোনা হয়ে যায়। এই বিস্ময়কর বিষয়টি দেখার পরে পরেশবাবু কিছু মিষ্টির বিনিময়ে পাথরটি নিয়ে নেন। নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কিছু জিনিসের উপর পাথরটির শক্তি পরীক্ষা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রচুর পুরনো কামানের গোলা ডাস্টবিনে পড়ে থাকত। পরেশবাবু কিছু কামানের গোলাকে সোনায় পরিণত করে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। এইভাবে সহজেই হাতে প্রচুর অর্থ আসার কারণে পরেশবাবুর জীবনযাত্রার মান সম্পূর্ণ বদলে যায়। নতুন বাড়ি, গাড়ি, বিভিন্ন আসবাবপত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন সভা সমিতিতে যোগদান এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগের পরিমাণ বেড়ে যায়। প্রিয়তোষ হেনরি বিশ্বাস (কালী ব্যানার্জী) নামে একজন তরুণ ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিয়োগ করেন।
পরেশবাবু ছিলেন একজন সাধারণ মানের ব্যাংক কর্মী। শহুরে উচ্চবিত্ত জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু হঠাৎ হাতে প্রচুর অর্থ আসায় বিভিন্ন পার্টিতে যোগদানের আমন্ত্রণ পান। একটি ককটেল পার্টিতে বিদেশী মদ খেয়ে মাতাল হয়ে কিছু অস্বাভাবিক আচরণ করেন। পার্টির নিয়ম অনুযায়ী তাকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়। সেই মুহূর্তে তিনি একটি লোহার মূর্তিকে সোনায় রূপান্তরিত করেন। ঘটনাটি সংবাদপত্রের শিরোনামে চলে আসে। চারদিক থেকে প্রচুর কৌতুহলী মানুষের প্রশ্ন পরেশ দত্তকে আতঙ্কিত করে তোলে। স্ত্রী গিরিবালা দেবীকে নিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চলে যাওয়ার আগে ব্যক্তিগত সচিব প্রিয়তোষের হাতে নিজের যাবতীয় সোনায় পরিণত করা সম্পত্তি এবং পাথরটি হস্তান্তর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলে যান। কিন্তু পুলিশ মিস্টার ও মিসেস দত্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য থানায় নিয়ে যায়। প্রিয়তোষের কাছে সবকিছু আছে জানার পরে পুলিশ প্রিয়তোষের খোঁজে গিয়ে জানতে পারে পরশপাথরটি রক্ষা করতে মরিয়া প্রিয়তোষ পাথরটি গিলে ফেলেছে। প্রিয়তোষকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ডা. নন্দী (মণি শ্রীমানি) বিস্ময়ের সাথে জানান পাথরটি প্রিয়তোষ হজম করে ফেলেছে। প্রিয়তোষের পাথর হজম সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরেশ দত্তের লোহা থেকে বানানো সোনার জিনিসগুলি আবার লোহায় রূপান্তরিত হয়।
দত্ত দম্পতি তাদের পুরনো ভৃত্য (জহর রায়)-এর সাথে মিলিত হয় এবং মাঝখানের ধনী হওয়ার বিড়ম্বনার সময়টুকু বাদ দিয়ে নিজেদের স্বস্তির জীবনে ফিরে যাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে। মুক্তি পেয়ে পরেশবাবু স্ত্রী, ব্যক্তিগত সচিব ও পুরনো ভৃত্যকে নিয়ে গড়ের মাঠে জুড়ি গাড়ি করে বেরিয়ে পরেন। মধ্যবিত্ত পরিশ্রমী বাস্তব জীবনে বাঁচার প্রকৃত স্বাদ খুঁজে পায়।
এই ছবিটিতে অভিনয় করেছেন তুলসী চক্রবর্তী, রাণীবালা দেবী, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, হরিধন মুখোপাধ্যায়, বীরেশ্বর সেন, মণি শ্রীমানি, সন্তোষ দত্ত, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র, নীতিশ মুখোপাধ্যায়, সুবোধ গাঙ্গুলী, তুলসী লাহিড়ী, অমর মল্লিক, চন্দ্রাবতী দেবী, রেণুকা রায় এবং ভারতী দেবী। ছবিটি সম্পাদনা করেছেন দুলাল দত্ত এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন রবিশঙ্কর।
সত্যজিৎ রায় এই চলচ্চিত্রটিকে কৌতুক, কল্পনা, ব্যঙ্গ, প্রহসন এবং উদ্দীপনার সংমিশ্রণ হিসেবে আখ্যা দেন। চলচ্চিত্রটি ১৯৫৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্থান পায়। সেখানে এটি ‘পাম ডি অর’ ( শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র) বিভাগে প্রতিযোগিতা করে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
পর্ব – ১৬
মানুষের কর্মফল অনুযায়ী মৃত্যুর পর যমলোকে নিয়ে গিয়ে স্বর্গ বা নরকে থাকার বিচার হয়। কর্মফল ভাল হলে স্বর্গ এবং কর্মফল খারাপ হলে নরকে স্থান পায়। এই বিষয়বস্তু নিয়ে দীনবন্ধু মিত্রের উপন্যাস ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ অবলম্বনে প্রণয়ধর্মী একটি হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন প্রফুল্ল চক্রবর্তী। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের অন্যতম সদস্য অনন্ত শীল। রাজকুমারী চিত্র মন্দিরের ব্যানারে এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে।

‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ একটি গভীর প্রণয় ভিত্তিক এবং রূপকের আড়ালে চরম আর্থ সামাজিক সমালোচনামূলক চলচ্চিত্র। গ্রামের ছেলে সিদ্ধেশ্বর ওই গ্রামেরই মেয়ে মাধুরীকে প্রকৃতই ভালবাসে এবং তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। কিন্তু মাধুরী গ্রামের গ্রামপ্রধান বড়লোক হরির একমাত্র মেয়ে। জামাই হিসেবে সিদ্ধেশ্বরকে তার একদমই পছন্দ নয়। কিন্তু সিদ্ধেশ্বরও মাধুরীকেই বিয়ে করতে বদ্ধপরিকর। প্রয়োজনে সে মাধুরীকে তুলে এনে বিয়ে করতেও পিছপা নয়। এই ঘটনা জানতে পেরে হরি কিছু লোক পাঠায় সিদ্ধেশ্বরকে মেরে ফেলার জন্য। এই ঘটনায় মাধুরী হতবাক হয়ে যায় এবং সে নিজে আত্মহত্যা করে।
সিদ্ধেশ্বরকে মারতে এলেও সে কোনোভাবে রক্ষা পায় এবং মাধুরীর আত্মহত্যার খবরে বিচলিত হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে যমের পাঠানো দূতেরা মৃতদেহ নিতে এসে ভুল করে সিদ্ধেশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায় এবং যমলোকে উপস্থিত করে। সিদ্ধেশ্বরকে যেহেতু জীবিত যমলোকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যমরাজ সিদ্ধেশ্বরকে পৃথিবীতে ফিরে যেতে অনুরোধ জানায়। কিন্তু সিদ্ধেশ্বরও নাছোড়। সে যখন এমন একটা জায়গায় এসে উপস্থিত হয়েছে তার মনের সুপ্ত বাসনা সে মাধুরীর সাথে দেখা করবে এবং তাকে নিয়েই পৃথিবীতে ফিরবে। এছাড়াও বিষ্ণুর সাথে দেখা করার বাসনা মনে মনে পোষণ করে।
যমালয়ে গিয়ে সে নরক ও স্বর্গের মধ্যে বিপ্লব ঘটাতে শুরু করে। তার মৃত ষাঁড় ভোলা যা সে তার পিসিমাকে দান করেছিল সেই ষাঁড় দানের পূণ্য বলে ওই ষাঁড়কে যমরাজ ও চিত্রগুপ্তকে যমলোক থেকে বিতাড়িত করার কাজে লাগায়। সিদ্ধেশ্বর নিজে স্বর্গলোক ভ্রমণের অনুমতি লাভ করে এবং এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে মাধুরীর দেখা পায়। মাধুরী স্বর্গলোকে উর্বশী, রম্ভাদের সঙ্গে দিনযাপন করছিল।
স্বর্গ এবং নরকের বিভিন্ন নিয়মকানুন সিদ্ধেশ্বরের পছন্দ হয়নি। বিষ্ণুলোকে গিয়ে সে প্রত্যেকটি অনৈতিক কাজের বিবরণ জানায় এবং স্বর্গ ও নরকের নিয়মাবলীতে বদল আনার জন্য সচেষ্ট হয়। যেমন নরকে চিত্রগুপ্তের খাতায় অকাল মৃত্যু নিবারণের ব্যবস্থায় জোর দেয় আবার চিত্রগুপ্ত ও বিচিত্রগুপ্তের হাজার হাজার বছরের চাকরিতে পাকাপাকিভাবে বহাল করার ব্যবস্থা করে। স্বর্গে উর্বশী, রম্ভা, অপ্সরাদের একই ক্লাসিক্যাল নাচের পরিবর্তে নিজস্ব শৈলীর “হাম হাম গুড়ি গুড়ি” নাচকে স্বর্গমঞ্চে উপস্থাপন করার ব্যবস্থা করে। এই ব্যঙ্গাত্মক ও হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতি চলচ্চিত্রটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। শ্রীহরি বিষ্ণুর আশীর্বাদে সিদ্ধেশ্বর ও মাধুরী ফিরে আসে এবং মাধুরীর বাবা হরি তাদের আনন্দের সাথে গ্রহণ করে।
‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ চলচ্চিত্রটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ভানু বন্দোপাধ্যায়। সিদ্ধেশ্বর চরিত্রে একজন প্রকৃত প্রেমিক যুবকের প্রেমকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিয়ের বাসনা এবং প্রেমিকার মৃত্যুর পরে প্রতীকী অর্থে স্বর্গের দেবতাদের সঙ্গেও তর্কযুদ্ধে জড়িয়ে প্রেমিকাকে ফিরিয়ে আনার ঘটনা এক অনবদ্য চিত্রনাট্য সৃষ্টি করেছে। হাস্যরসের মাধ্যমে সমাজ, অর্থনীতি এবং যৌবনের টানাপোড়েন নিখুঁত ভঙ্গিতে চিত্রিত হয়েছে।
মাধুরী চরিত্রে বাসবী নন্দী দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। যমরাজ চরিত্রে কমল মিত্র নিজের অভিনয় ক্ষমতাকে যথাযথ ভাবে প্রকাশ করেছেন। বিচিত্রগুপ্ত চরিত্রে জহর রায় নিজের কমেডিয়ান চরিত্রকে দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। নারদ চরিত্রে পাহাড়ি সান্যালকেও কমেডিয়ান চরিত্র হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় এই চলচ্চিত্রে। এছাড়া তুলসী চক্রবর্তী, হরিধন মুখার্জী, শ্যাম লাহা, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, জীবেন বোস, অজিত চ্যাটার্জী, অপর্না দেবী প্রমুখ বিভিন্ন পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেছেন। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
পর্ব – ১৭
১৯৭১ সালে জয়দীপ পিকচার্সের ব্যানারে পূর্ণেন্দু রায় চৌধুরী পরিচালিত বাংলা ভাষার গোয়েন্দা কমেডি চলচ্চিত্র ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’ মুক্তি পায়।
দিগম্বর চ্যাটার্জীর মেয়ে নুপুর চ্যাটার্জীর জন্য তার বাবা পাত্র নির্বাচন করেন। কিন্তু আধুনিকা, শিক্ষিতা, সুন্দরী নুপুর বাবার নির্বাচিত পাত্রের বিষয়ে পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে অতি সাধারণ ভাবে পাত্রের বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে সেই ব্যক্তি জানায় পাত্র মোটা, কালো এবং বেঁটে। পাত্রের এমন বর্ণনা শুনে নুপুর রাশভারী বাবার ওপরে কিছু বলতে না পেরে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়।
নুপুর কলকাতায় পালিয়ে আসে এবং অঞ্জন মুখার্জী নামে একজন সজ্জন, সুদর্শন ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। অঞ্জনের মা সেই সময় তার পুত্রের জন্য পাত্রী নির্বাচন করছিল। কম বয়সে ভাল মাইনের চাকরি পাওয়ার জন্য পাত্রীর আনাগোনায় অঞ্জন বীতশ্রদ্ধ ছিল। তাই মায়ের নির্বাচিত পাত্রীর ব্যাপারে সে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছিল। এই সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা নুপুরের সাথে অঞ্জনের সাক্ষাত হয়। অঞ্জন সহজেই নুপুরের সমস্যা বুঝতে পারে। অঞ্জন নুপুরকে বাড়িতে আশ্রয় দেয়। নুপুর মরিয়া হয়ে চাকরির চেষ্টা করতে থাকে।
দীগম্বর চ্যাটার্জী মেয়েকে খুঁজে দেওয়ার জন্য দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। এই পটভূমিতে ভানু গোয়েন্দা এবং জহর অ্যাসিস্টেন্টের আবির্ভাব ঘটে। চাকরির খোঁজে নুপুর যখন মরিয়া তখন অঞ্জন নুপুরকে খুশীবানু ছদ্মনামে স্টুডিও পাড়ায় নিয়ে যায়। তার মা একজন বাঈজী এবং সে ফৈজাবাদ থেকে এসেছে বলে পরিচয় দেয়। বাংলার বাইরে থেকে এসেছে শুনেই স্টুডিওতে হইচই পড়ে যায়। জহর অ্যাসিস্টেন্ট এই খবর সংগ্রহ করে এবং ভানু গোয়েন্দাকে জানায়। এইভাবেই তারা দশ হাজার টাকার জন্য গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে যেতে থাকে।
এছাড়াও অনেকেই নুপুর চ্যাটার্জীকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই অবস্থায় নুপুর ও অঞ্জন কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়। এইভাবে কিছুদিন লুকোচুরি খেলার পরে অঞ্জনের বাড়িতে তার মা এসে উপস্থিত হন। দীগম্বর চ্যাটার্জীও মেয়ের খোঁজ করতে করতে ওই বাড়িতে এসেই উপস্থিত হন।
ছেলেকে তার বাড়িতে একটি মেয়ের সাথে থাকতে দেখে অঞ্জনের মা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। একইরকম অভিব্যক্তি ঘটে দীগম্বর চ্যাটার্জীরও। কথায় কথায় অঞ্জনের মা জানায় যে দীগম্বর চ্যাটার্জীর মেয়ের সাথেই তিনি তার পুত্রের বিয়ে স্থির করেছিলেন। এদিকে দীগম্বর চ্যাটার্জীও কথায় কথায় জানান অঞ্জন মুখার্জীর সাথেই তিনি মেয়ের বিয়ে স্থির করেছিলেন। অবশেষে দুই বাড়ির ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। অঞ্জন মুখার্জীর সাথেই নুপুরের বিয়ে স্থির হয়। এই পরিস্থিতিতে ভানু গোয়েন্দা আর জহর অ্যাসিস্টেন্ট দশ হাজার টাকা দাবি করলে দীগম্বর চ্যাটার্জী জানান তিনি নিজেই মেয়েকে ফিরে পেয়েছেন। তাই অর্থপ্রাপ্তি তাদের ঘটবে না। বিয়ে স্থির হওয়া উপলক্ষে আনন্দঘন মুহূর্তে সামান্য কিছু প্রাপ্তিই তাদের জন্য যথেষ্ট।
এই হাস্যরসাত্মক গল্পটি রচনা করেছেন প্রণব রায়। প্রযোজনা করেছেন বাদল রাজ সিনহা। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন নুপুর চ্যাটার্জীর চরিত্রে লিলি চক্রবর্তী, অঞ্জন মুখার্জীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন শুভেন্দু চ্যাটার্জী। দীগম্বর চ্যাটার্জীর চরিত্রে পাহাড়ি সান্যাল, ভানু গোয়েন্দার চরিত্রে ভানু ব্যানার্জী, জহর অ্যাসিস্টেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জহর রায়। অন্যান্য বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম ঘোষ, নীলিমা চ্যাটার্জী, হরিধন মুখার্জী, বীরেন চ্যাটার্জী, শৈলেন গঙ্গোপাধ্যায় ও শীতল বন্দোপাধ্যায়। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন শ্যামল মিত্র। মহিলা কণ্ঠের গানগুলি গেয়েছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
পর্ব – ১৮
উনিশ শতকের বাংলা সিনেমায় পরিবারগত বা সামাজিক, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের কমেডি চলচ্চিত্রের নির্মাণও হয়েছে। এই সময় সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটকদের মত পরিচালকদের পেয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প। বিশ শতকে সেই ধারাবাহিকতাকে বহন করে চলার চেষ্টা করছেন নতুন প্রজন্মের পরিচালকেরা। চিন্তাভাবনায় বেশ কিছু পরিবর্তনের রেশ থাকছে ধারাহিকতাকে বজায় রেখে। এমনই একটি ভিন্ন চিন্তার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন পরিচালক অনীক দত্ত। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া এমনই একটি চলচ্চিত্র ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’।

‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ চলচ্চিত্রে যে সমস্ত চরিত্র একসময় জীবিত অবস্থায় দাপটের সাথে জীবনকে যাপন করেছেন, মৃত্যুর পর অশরীরী আত্মা হয়ে সেই জীবনের ধারাবাহিকতা বহন করেছেন। তাই এই সিনেমায় চরিত্রেরা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সাথেই আগে পরিচয় করাই আপনাদের।
অভিনেতা পরাণ বন্দোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন রায়বাহাদুর দর্পনারায়ণের চরিত্রে। চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয়েছে গ্রামীণ বাংলার জমিদারি এস্টেটে ভ্রমণের সময় ডাকাতদের হাতে তিনি মারা যান এবং ভূত হয়ে নিজের তৈরি প্রাসাদেই বসবাস শুরু করেন। স্বস্তিকা মুখার্জী অভিনয় করেন কদলিবালা দাসী নামে ১৯৪০ সালের একজন অভিনেত্রীর চরিত্রে। যিনি দর্পনারায়ণের পুত্রের প্রেমে প্রতারণার কবলে পড়ে আত্মহত্যা করেন এবং ভূত হয়ে ওই প্রাসাদেই বসবাস শুরু করেন। ভূতনাথ ভাদুড়ীর চরিত্রে অভিনয় করেন সুমিত সমাদ্দার। নোয়াখালীর দাঙ্গা থেকে পালিয়ে আসা এক হিন্দু বাঙালি উদ্বাস্তু ভূত। ঘটনাচক্রে তিনিও এই বাড়িরই বাসিন্দা।
সব্যসাচী চক্রবর্তী অভিনয় করেন বিপ্লব দাশগুপ্তের চরিত্রে। তিনি এই চলচ্চিত্রের গল্পকার। প্রকৃতপক্ষে তিনি নকশাল বিদ্রোহে জড়িত একজন সি পি আই এম এল ক্যাডারের ভূত। যাকে পুলিশ বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করে। বিপ্লব এই বাড়িরই ছেলে। স্যার ডোনাল্ড রাম্পসের চরিত্রে অভিনয় করেন জর্জ বেকার। ইনি একজন ইংরেজ ভূত। রাম্পসে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী সশস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে নিহত হন। দর্পনারায়ণের ইংরেজ বন্ধু হিসেবে মৃত্যুর পরে এই বাড়িতেই এসে বসবাস শুরু করেন।
প্রোমোটার গণেশ ভূতোরিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন মীর আফসার আলী। একে ভূতেরাই ভয় দেখিয়ে এলাকা ছাড়া করে। অভিনেতা উদয় শংকর পাল অভিনয় করেন আত্মারাম পাসোয়ান নামে একজন নিম্ন বর্ণের রিকশা চালকের ভূমিকায়। তিনি একটি গাড়ি দূর্ঘটনায় মারা যান এবং দর্পনারায়ণের ইচ্ছা অনুসারে রিকশা করে এদিক ওদিক যাওয়ার সুবিধার জন্য এই বাড়িতেই তাকে রেখে দেওয়া হয়। পলাশীর যুদ্ধে নিহত সিরাজ উদ দৌলার সেবাকারী রাঁধুনি খাজা খাঁয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন প্রদীপ দাশগুপ্ত। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ উদ দৌলার পক্ষ নিয়ে তিনিও মৃত্যুবরণ করেছিলেন। দর্পনারায়ণের প্রাসাদে রাঁধুনি হিসেবে কাজ করছিলেন এই খাজা খাঁ।
সমদর্শী দত্ত সংগীতশিল্পী পাবলো পাত্রনবীশের চরিত্রে অভিনয় করেন। অতিরিক্ত মাদক সেবনের জন্য তার মৃত্যু হয়। সংগীত চর্চার জন্যই তাকে প্রাসাদে স্থান দেওয়া হয়। কোয়েল ধরের চরিত্রে অভিনয় করেন মমতাজ সরকার। একজন শিল্পপতির মেয়ে বাবার অভিভাবকত্বের কারণে প্রেমিকের ধোঁকাবাজির জন্য আত্মহত্যা করে। চার্মিং লেডি হিসেবে নাতনির বয়সী মেয়েটি দর্পনারায়ণের এই প্রাসাদেই স্থান পায়।
অয়ন সেনগুপ্তের ভূমিকায় অভিনয় করেন পরমব্রত চ্যাটার্জী। তিনি একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভাবী পরিচালক। ভূতের থেকে সাহায্য পাওয়া এক জীবন্ত চরিত্র হল অয়ন। ব্রিগেডিয়ার যুধাজিত সরকারের চরিত্রে অভিনয় করেন বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। কার্গিল যুদ্ধে নিহত একজন সেনা কর্মকর্তার ভূত হল এই ব্রিগেডিয়ার। প্রাসাদের সিকিউরিটির দায়িত্ব নিয়ে এই প্রাসাদেই বসবাস করেন তিনি।
শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেন হাতকাটা কার্তিকের চরিত্রে। সে একজন মস্তান। একে ঘুমন্ত অবস্থায় তারই শিষ্য হত্যা করে। স্থানীয় রাজনৈতিক গুন্ডার চরিত্রে অভিনয় করেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। এটি একটি জীবন্ত চরিত্র। মনামী ঘোষ অভিনয় করেন লক্ষ্মীর চরিত্রে। যে প্রোমোটার গণেশ ভূতোরিয়ার স্ত্রীর ভূত। যাকে গণেশ ভূতোরিয়া পণের জন্য পুড়িয়ে মেরেছিল। নায়িকা মধুমিতা সান্যালের চরিত্রে অভিনয় করেন শ্রীলেখা মিত্র।
কদলিবালার প্রেমিক কেশব নারায়ণ চৌধুরীর ভূমিকায় অভিনয় করেন দেবদূত ঘোষ। সঞ্জয় বিশ্বাস গণেশ ভূতোরিয়ার সেক্রেটারি টি কে গুছাইতের ভূমিকায় অভিনয় করেন। চৌধুরী প্যালেসের কেয়ারটেকার হিসেবে সুধীরবাবুর ভূমিকায় অভিনয় করেন বিভু ভট্টাচার্য্য।
তরুণ উদ্যমী হবু চিত্র পরিচালক অয়ন সেনগুপ্ত নিজের প্রথম সিনেমার শ্যুটিংয়ের জন্য লোকেশন দেখতে আসেন। স্থানটি হল হানাবাড়ি বলে কুখ্যাত চৌধুরী প্যালেস। সাধারণত সূর্য ডোবার আগেই এখানে কাজকর্ম শেষ করার নিয়ম। বিশেষ কারণে অয়ন সন্ধের পরেও এই বাড়িতে অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। এই সময়ে বাড়িরই একজন ব্যক্তি বিপ্লব চৌধুরীর সঙ্গে তার আলাপ হয়। আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি জানতে পারেন সত্তর দশকের আগে পর্যন্ত সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি এমনকি সাংস্কৃতিক বিষয়েও এই ব্যক্তির জ্ঞান প্রখর। কথা প্রসঙ্গে নিজের সিনেমা তৈরির গল্প খুঁজছেন বলে জানান পরিচালক অয়ন। বিপ্লব বলেন, প্রোমোটারি আর দখলদারির জেড়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে জাতি, ধর্ম, পেশা, লিঙ্গ ও প্রজন্ম নির্বিশেষে গৃহহীন ভূতেরা আস্তানার খোঁজে এই পরিত্যক্ত প্রাসাদে এসে জড়ো হয়। নিজেদের মত করে তারা তাদের ভৌতিক জীবন কাটাচ্ছিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য দর্পনারায়ণ চৌধুরীর বর্তমান জীবিত প্রজন্ম এই প্রাসাদের একাংশে বসবাস করে। বিশাল প্রাসাদের মেরামতি ও প্রাচীন জিনিসপত্রের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে বিশাল অর্থের প্রয়োজন তা কিছুটা সামলানোর জন্য বাড়ির একাংশ শ্যুটিংয়ের কাজে ভাড়া দিলে তা ভূতের উপদ্রবে পণ্ড হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে গণেশ ভূতোরিয়া এই প্রাসাদ ভেঙে শপিং মল তৈরির চেষ্টা চালালে ভূতেরা একযোগে সেই মতলব পণ্ড করে দেয়।
ভূতেরা নিজেদের পিকনিক, চিংড়ি ইলিশ লড়াই, কার্গিল যুদ্ধের বর্ণনা, যুবক ভূত পাবলো পত্রনবীশ এবং যুবতী ভূত কোয়েল ধর নিজেদের জীবিত জীবনের আলোচনায় বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এইভাবেই কাটছিল ভৌতিক জীবনযাপন। এক ভূত চতুর্দশীর রাতে ভূতেদের ফাংশন এবং ফ্যাশন প্যারেড চলার সময় ব্রিগেডিয়ার যুধাজিত প্রোমোটার গণেশ ভূতোরিয়াকে দেখে ফেলে এবং তাকে এলাকা ছাড়া করার পরিকল্পনা করে সকলকে সঙ্গে নিয়ে।
গণেশ ভূতোরিয়ার মৃত স্ত্রী লক্ষ্মী ভূতোরিয়াকে কাজে লাগানো হয়। হাতকাটা কার্তিক গণেশ ভূতোরিয়াকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানায়। তাকে বোঝানো হয় সেখানেই বাড়ির দলিল হস্তান্তর হবে। কিছুটা নাচ, গান ও মদ্যপানের মধ্য দিয়ে বিষয়টা সেলিব্রেট করা হবে। ভূতোরিয়া প্রাসাদে এলে লক্ষ্মী ভূতোরিয়ার নাচে উৎসাহিত হন গণেশ ভূতোরিয়া। আগাগোড়া ঘোমটা টানা লক্ষ্মী ভূতোরিয়া যখন গণেশ ভূতোরিয়ার সামনে নিজের অগ্নিদগ্ধ মুখ প্রকাশ করে, কোনোমতে তখন সেই ভৌতিক পরিবেশ থেকে পালিয়ে বাঁচে গণেশ ভূতোরিয়া। অয়ন এই কাহিনী শোনে বিপ্লব চৌধুরীর কাছ থেকে। একটি ফোনের আওয়াজে অয়নের যখন ঘুম ভাঙে তখন সে দেখে তার সামনে এক থলি মোহর পড়ে আছে।
ভূতেদের দেওয়া টাকায় ভূতের বলা কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে সেই ভূতুরে প্রাসাদেই ভূতেদের ওপর তৈরি হল সিনেমা ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
পর্ব – ১৯
ভারতীয় চলচ্চিত্রে যে সব ছবিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে বর্ণনা করা হয় তার মধ্যে ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ উল্লেখযোগ্য। মেহেবুব খানের পরিচালনায় নার্গিস, সুনীল দত্ত, রাজেন্দ্র কুমার এবং রাজকুমার অভিনীত একটি কালজয়ী চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়বস্তু হল মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে এক দরিদ্র, সংগ্রামী, গ্রামীণ ভারতীয় মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের কাহিনী। যিনি সন্তানদের মানুষ করতে এবং সম্মানের সাথে জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। কঠিন পরিস্থিতিতে দেশ মাতৃকার কল্যাণ সাধনের জন্য নিজের সন্তানকে ত্যাগ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হন না।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাধা কৃষক পরিবারের গৃহবধূ, যিনি স্বামীর অনুপস্থিতির সময় দুই ছেলেকে মানুষ করার পাশাপাশি কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মহাজন সুখীলালের কুদৃষ্টি ছিল তার ওপর। সেই কুনজর থেকে নিজেকে রক্ষা করতেও সমর্থ হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের মূল বক্তব্য হল রাধা শুধু একজন মা নন, তিনি মাদার ইণ্ডিয়ার প্রতীক। তার বড় ছেলে বীরু যখন অপরাধের পথে চলে যায় তখন ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দেশের নৈতিকতা রক্ষা করেন।

রাধার সঙ্গে বিয়ে হয় কৃষক সন্তান সামুর। সামুর মা স্থানীয় মহাজন সুখীলালের কাছ থেকে বিয়ের খরচ বাবদ কিছু টাকা ধার করে এই শর্তে যে ফসলের এক তৃতীয়াংশ সুখীলালকে কিছু বছর দিয়ে ধার শোধ করবে। কিন্তু ধূর্ত সুখীলাল ফসলের তিন চতুর্থাংশ প্রাপ্য হিসেবে এবং বন্ধক হিসেবে জমির দলিল নিয়ে স্বাক্ষর করায় সামুর মায়ের অশিক্ষার সুযোগে।
বিয়ের পর রাধার দুই সন্তান রামু এবং বির্জু জন্ম নেয়। এই সময়ে ঋণের বোঝা চালাতে গিয়ে পুরো পরিবারকে চরম দারিদ্রের মুখোমুখি হতে হয়। সামু এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তাই সে স্ত্রী রাধা এবং দুই পুত্র রামু ও বির্জুকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। রামু মায়ের সঙ্গে এই দারিদ্রের মোকাবিলা করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। নাবালক বির্জু সুখীলালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং সুখীলালকে আক্রমণ করে। গ্রামীণ বিচারসভা বির্জুকে গ্রাম থেকে বহিষ্কার করে। পরবর্তী সময় বির্জু একজন দস্যুতে পরিণত হয়। অন্যায়ভাবে পরিবার থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে বির্জুর মন প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলতে থাকে।
সুখীলালের মেয়ের বিয়ের দিন বির্জু সুখীলালের রাইফেল চুরি করে এবং সুখীলালকে মারতে উদ্যত হয়। এই সময় রাধা নিজের সন্তান বির্জুকে গুলি করে এবং গ্রামকে আর কোনো অঘটন হওয়া থেকে রক্ষা করে নিজের সন্তানের বিনিময়ে।
১৯২৭ সালে আমেরিকান সাংবাদিক ক্যাথেরিন মেয়ো ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ বইটি রচনা করেন। এই বইটিতে নিন্দা করা হয়েছিল ভারতীয় সংস্কৃতির। ভারতীয় নারীর চির করুণ পরিস্থিতিকে উপস্থাপন করার পাশাপাশি ভারতীয় নারীর ত্যাগ ও আত্মমর্যাদাকে মহিমান্বিত করা হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ রূপকভাবে ভারতকে একটি জাতি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে এবং জাতীয়তাবাদ ও দেশ গঠনের দৃঢ় বোধ চিত্রায়িত করে। কয়েকজন লেখক রাধাকে নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন।
রাধার চরিত্রে অভিনয় করেছেন নার্গিস। বির্জুর চরিত্রে সুনীল দত্ত, রামুর চরিত্রে রাজেন্দ্র কুমার এবং সামুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাজকুমার। সুখীলালের চরিত্রে ছিলেন কন্যালাল। এছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিলুমা, কুমকুম, শীলা নায়েক, মাস্টার সুরেন্দ্র, মাস্টার সাজিদ এবং সিতারা দেবী।
‘মাদার ইণ্ডিয়া’ চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রাহক ছিলেন ফারদুন ইরানি। সম্পাদক ছিলেন সামসুদ্দিন কাদরি। পরিচালক মেহেবুব খানের প্রযোজনা কোম্পানি মেহেবুব প্রোডাকশনের ছবিটি মুক্তি পায় ২৫ অক্টোবর, ১৯৫৭ সালে হিন্দি ও উর্দু ভাষায়।
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পঞ্চম ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারের বিজয়ীর শিরোপা অর্জন করে ‘মাদার ইণ্ডিয়া’। নার্গিস ১৯৫৮ সালে পঞ্চম ফিল্ম ফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ ছবির জন্য। সেরা পরিচালক, শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফি ও সেরা সাউন্ড ডিজাইনিংয়ে পঞ্চম ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার ছিনিয়ে নেন যথাক্রমে মেহেবুব খান, ফারদুন ইরানি এবং কৌশিক। বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের এগারোতম কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন নার্গিস। এই চলচ্চিত্রটি ত্রিশতম আকাদেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
