ঝুমুর পান্ডে

চ চ রাস্তা আর থোড়া বাকি বা।

কিন্তু কোথাও থোড়া বাকি। *মাত্র* বিশ কিলোমিটার হেঁটেছে এই দুদিনে। বাকি সাথীরা এখন অনেক দূর পৌঁছে গেছে বোধহয়। দিল্লি থেকে বিহার আর কত কি: মি: রাস্তা তাও জানে না পরকাশ। শুধু জানে অনেক অনেকদূর। প্রথম বার যখন মানে গাঁও থেকে যখন দিল্লি গেল চাচার সঙ্গে তখন কত আর বয়স চৌদ্দ পনেরো হবে। ওই প্রথম রেল গাড়িতে চড়া। পরকাশ ইস্কুলে পড়ছিল। তখনই বাপ লাঠি খেয়ে মরল। হ্যাঁ একটা খেতের ঝগড়ায় জড়িয়ে মরল। নিজের খেত নয়। মালিকের খেত। তিন চারটি ভাই বোনের মধ্যে পরকাশই বড়। তাই কাকার কথায় চলে এসেছিল দিল্লি। সে কবেকার কথা। 

আর না সেকব হাম। 

বসে গেল বউটা। মেয়েটাকে কাঁধে নিয়েছিল এখন নামিয়ে দিল পরকাশ! মেয়েটা বড় করুণ চোখে তাকাল। তারপর মেয়েটাও রাস্তার উপর বসে গেল। 

কা ভইল?  

বউটা। হ্যাঁ, ভর পোয়াতি বউটা বড় করুণ চোখে তাকাল। ডাক্তার দেখিয়েছিল আর দুমাস না তিন মাস আছে ডেলিভারির। কিন্তু কে জানে এমন বিপর্যয় আসবে। 

চ চ কলোতি চ। আর থোড়া চ। 

এতদিন এতমাস বউটাকে শরীর ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি পরকাশ। কী করবে কুলির কাজ বলে কথা। দিনরাত খাটুনি। মা বিমার হল তখনো বেশ একটা খরচ হল। বোনটার বিয়ে দেবে বলে এখন টাকা জমাচ্ছিল। কিন্তু যাকগে, কী আর করা। নিজের বিয়েতেও একটা খরচা হল। বউকে রুপোর সবকিছু গয়না পাতি দিতে হল। শাড়ি কাপড়,খাওয়া দাওয়া, বাজনা। বউটা এখন বমি করছে। রাস্তায় একটা এনজিও খিচুড়ি খাইয়েছিল। ওটাই সব বেরিয়ে গেল। পরকাশেরও এখন বমি পাচ্ছে। ছোট্ট মেয়েটা ছোট্ট গাছে একটা ছোট্ট পাখি দেখে হাততালি দিল। হাসল ও। যাক্ তবু তো হাসল। 

পানি পিবে?

না। মাথা নাড়ে বউটা। 

পিলে থোড়া। 

বোতলের ছিপি খুলে বউকে জল খাওয়ায় প্রকাশ। 

পি। পি।

বউটা এখন শুয়েই পড়ল। বড় ঝামেলা হল। সাথীরাও এগিয়ে গেল। এখন পথ চিনে যায় কী করে? আর বউ যদি হাঁটতে না পারে তাহলে কী হবে? চারদিক শুনশান। না, গাড়ি না মানুষ। জনপ্রাণী শূন্য। মাঝে মাঝে দূরে দূরে জনপদ দেখা যায়। কিন্তু কেউ কি বের হবে? না, বের হয়ে এক লোটা পানিও দেবে না। কিছু দেবে না। সবাই বন্ধ হয়ে বসে আছে। যে যেখানে ছিল সবাই। হ্যাঁ– সবাই। কেউ কারওর মুখ দেখছে না। বাতাসেও মৃত্যুর গন্ধ।  শুধু পরকাশরা হাঁটছে।  হ্যাঁ, শত শত পরকাশরা হাঁটছে৷ খোলা আকাশের নীচে, শুনশান রাস্তা, রেল লাইন দিয়ে হাঁটছে। আর আকাশে পাখিরা উড়ছে। শত শত পাখি। প্লেন উড়ছে না, গাড়ি চলছে না। রেলও বন্ধ। আকাশের দিকে তাকাল পরকাশ। আবহাওয়ার গতিবিধি দেখতে। চকচক নীল আকাশ। একদম ধুলো বালি মুক্ত। উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি। একসময় সেই ছোট্টবেলায় যখন গুরুজীর ইস্কুলে যেত পরকাশ। নন্দ, রামা, লক্ষণ কতজন সেথায় পড়তে যেত। হ্যাঁ, তখন পাখি দেখতে খুব ভালোবাসত পরকাশ। গাছে গাছে আকাশে নদীর উপর কত কিসিমের পাখি যে দেখে বেড়াত। বাবু কখনও রেগে যেত। খেত থেকে ফিরে পানি পিয়ে বলত, 

পরকাশ কাঁহা? হে পরকাশ? 

মা তখন কথা ঢাকতে বলত,

চায় পিবে?

চায় বাদমে পিয়ব। বাতা পরকাশ কাঁহা বা? 

আর পরকাশ তো তখন নদীর ধারে বসে বসে পাখি দেখছে। আকাশ দেখছে। 

দেখছে নদীর ধারা।

বউটা একদম নেতিয়ে গেছে। বমির কাছ থেকে ওকে দূরে সরিয়ে নিল পরকাশ। মেয়েটা একটু দূরে গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। বোধহয় পাখি দেখছে না—- গাছটাকেই ভালোবেসে ফেলেছে? এইটুকু বাচ্চা মেয়ে ওকেও কি বাপের ভূতে পেল?

আভি কেইসন লাগথো? 

মাথা নাড়ে বউটা ভালো না। 

এখন কী করে পরকাশ? যদি প্রসব হয়ে যায়। ডাক্তার তো বলছিল দুমাস বাকি। তবে? এই সময় কি এত দূর হাঁটা ঠিক হল? আর হলেও তো হাতে কোনও উপায় ছিল না পরকাশের। লকডাউন হল। করোনা রোগ এসেছে। লকডাউনও বা কি করোনাই বা কি কিছু বোঝার আগেই বাড়ির মালিক ওদের ঘর থেকে বের করে দিল। শুধু প্রকাশ নয়। হাজার হাজার শ্রমিক পথে নামল। নামল না নামিয়ে দেওয়া হল। কী করে শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে ঘরে পৌঁছবে কেউ চিন্তা করল না। কেউ না। না মালিক না সরকার। পরকাশ তো হ্যাঁ পরকাশের লুকানো কিছু টাকা ছিল। মানে পাঁচ দশটাকা করে জমাচ্ছিল হায়রে, ওটা ও নিতে ভুলে গেল। কী করবে? মাথা তখন কিছুই কাজ করছিল না। এখনও কি করছে? না– এখনো মাথাটা ঠিকমতো কাজ করছে না পরকাশের।

একটা কুকুর এসে বমিটা খাচ্ছে। প্রকাশের ও এখন বমি পাচ্ছে। কী করবে বেচারা কুকুর বোধহয় কদিন থেকে অভুক্ত আছে। কোথায় পাবে খাবার! কয়েকটা পাখি কিচিরমিচির করল। শাদির পর থেকে বউটা জিদ করছিল দিল্লি যাওয়ার। দিল্লি কত বড় শহর। ওখানে যন্তরমন্তর আছে। আগ্রা গেলে তাজমহল আছে। লালকেল্লা আছে। আছে চাঁদনি চক বাজার। এসব কথা পরকাশই বউকে বলেছিল আদর করতে করতে। যদিও নিজে চাঁদনি চকের বাজার ছাড়া আর কিছু দেখিনি। তাও একবার বাড়িতে যাওয়ার আগে সস্তায় জিনিস আনতে গিয়েছিল। কিন্তু এমন ঠকেছিল। সে আরেক কিসসা কাহিনি। মাই ও বলেছিল, বৃন্দাবন, মথুরা দেখবে। দেখবে কানহাইয়ার গাঁও। কিন্তু আনব আনব করে মাকেও আর আনা হল না। 

দেখানো হল না বৃন্দাবন, মথুরা। যমুনা নদী, কানাইয়ার গাঁও। 

পড়শি লছমন চাচাও চেয়েছিল দিল্লি যেতে। কতবার পরকাশকে বলেছে, হামকে একবার দিল্লি লে চল বেটা। রোজ রাতে ঢোলক বাজিয়ে গান করত এই চাচা। রামা হো রামা হো রামা। 

কিন্তু একদিন ওই সাদাসিধা চাচাকে পুলিস ধরে নিয়ে গেল এক খুনের কেইসে! কে জানে কার কেস কার ঘাড়ে চাপাল হায়রে পুলিশ নেতা মিলে!আগে লাশ হয়ে পড়েছিল বউটা। এখন কাতরাচ্ছে। হায়রে কী করবে পরকাশ। এত বিপদ জীবনে লেখা ছিল জানত না পরকাশ। এই দুদিন আগেও কি জেনেছিল? কী খুশি হয়ে বউ মেয়ের জন্য পাপড়ি চাট এনেছিল। বউ খেয়ে বলছিল একদিন পনির পকোড়া খাবে। মেয়ে বলেছিল হাওয়া মিঠাই। এখন চোখের সামনে পৃথিবীটা দুলছে। ভূচাল হচ্ছে নাকি? না তো? সবাই এগিয়ে গেল। যারা একসাথে হাঁটছিল। পিছিয়ে গেল শুধু পরকাশ। রাস্তা চিনে যাবেই বা কী করে? তবু যেতে তো হবেই। এখানে এই শুনশান জায়গায় থাকলে তো মরবেই। যেতে যেতেই না হয় মরবে। সে টুকটাক জিনিসপত্রগুলো আছে ওগুলো নাহয় থাক্। বউকে বলল, চল। হিম্মত রাখ তনি।

হাম না সেকব। না সেকব। 

বড় মিনমিন করে বলছে বউটা। 

বউটাকে এখন কাঁধে তুলে নিল পরকাশ। 

তারপর বাচ্চাটার হাত ধরে হাঁটতে লাগল। 

ভুখ লাগল বাবা। ভুখ। 

পরকাশের পেটেও তো খিদে। মাথাটা ঘুরছে হ, দেখ বাবা এগো আমরুত। 

সত্যি ছোট্ট একটা গাছে বেশ বড় একটা পেয়ারা ঝুলে আছে। মেয়েটা কী করে যে দেখতে পেল! মেয়েটার হাত ছেড়ে বউকে কাঁধে নিয়েই পেয়েরাটা পাড়ল। হ্যাঁ– পাড়ল পরকাশ বড় কসরত করে। কিন্তু হাত থেকে পড়ে গেল ঝোপটার ভেতরে। যেখানে বড় একটা ঝুরুঙ!

পাওয়ার আর কোনও উপায় নেই। মেয়েটার মুখ কালো হয়ে গেল। পরকাশেরও। তবু বলল,  ঘর যাকে তোখে হাম বহুত সারে আমরুত আনকে দেইব। রো মত বেটি। রো মত। কোথায় কাঁদছে মেয়েটা। মেয়েটা যেন এখন পাথর হয়ে গেছে। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। কোথাও যাওয়ার কথা হলেই খুশি হয়ে উঠে মেয়েটা। ঘুরতে যাওয়া মানেই ছোট্ট পাঁচ বছরের মেয়েটার কাছে আনন্দ। তাই মেয়েটাও ঘর থেকে বের হওয়ার সময় খুব আনন্দে ছিল। জানত যদি আহারে কী হতে যাচ্ছে। পরকাশের ফোনটাও নষ্ট হয়ে গেছে। কাউকে কিছু জানাতেও পারছে না। মা হয়ত ছোটভাই পরমুদের ফোনে নয়ত কোনও পড়শির ফোনে কতবার ফোন করছে। বউকে মেয়েকে নিয়ে আসার সময় বারবার বারণ করেছিল মা। বহুকে লেকে মত যো বেটা। মত যো। ও জাঘা ঠিক নেইখে। তবু পরকাশ ওদের নিয়ে এল। কে জানে এমন দিন দেখতে হবে। একা থাকলে তো এমন বিপদে পড়তে হত না। আর বউটা যদি ‘পেট সে’ না হত। কত ছুটত বউটা। ছুটে ছুটে কত রকম কাজ কাম করত। গাঁয়ে থাকতে কুয়ো থেকে জল আনা, বর্তন মাজা, কাপড় কাচা, রুটি সেঁকা আরও কত কিছু করত। উঠোনটাও ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে রাখত। ছটের সময় ঠেকুয়া বানাত পুরি ভাজত। গানও করত। 

খড়ী রহি ছোটি মাইয়া 

নদীয়া কে পার 

সুর‍য ভাইয়া আভি না আয়েলন 

অন্ধকার হয়ে আসছে৷ এখন রেললাইন ধরে হাঁটছে পরকাশ কাঁধে বউকে নিয়ে। মেয়েকেও মাঝে মাঝে কোলে নিচ্ছে। বউটা আবার বমি করল। এবার শুধু জল। ঝোপের ভেতর থেকে দুটো বানর বের হয়ে এসে ওদের মুখ ভেঙচালো। কেন ভেঙচালো কে জানে! মেয়েটা ভয় পেল না। মনে হয় একটু খুশিই হল। সন্ধে মিলিয়ে গেল। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার ছেয়ে গেল। পরকাশ তবু হাঁটতেই থাকল। হ্যাঁ রেললাইন ধরে হাঁটতেই থাকল। সামনেই শেয়াল ডাকল। হুক্কা হুয়া। হুক্কা হুয়া। মা হয়ত রুটি বানিয়ে বসে থাকবে শাক আর রুটি। পরকাশ গিয়ে খেতে বসবে। কতটা খাবে? দুটো, চারটে, পাঁচটা, ছটা। যত ইচ্ছে খাবে। একি ট্রেনের শব্দ। হুস– স- স- স- সস- সস। আরে কী হল এক মিনিটেই আপনা ঘরে পৌঁছে গেল। একেবারে বউ, মেয়ে সমেত। শরীরটা কী করে একদম হালকা হয়ে গেল। নিকানো ছোট্ট উঠোনে একঢাল জোছনা তার ভেতর জমে আছে কেমন মায়া মায়া আলো!

ঘরে ঠিকইতো মা বসে বসে মাটির উনোনে রুটি সেঁকছে। গন্ধে ভুরভুর করছে বাতাস। ওই তো নদী, গম খেত, কেতারি গাছের সারি। আঃ কী শান্তি। কী শান্তি। কী শান্তি আহারে…

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *