শান্তশ্রী সোম
১)
চৈত্রের পড়ন্ত বিকেল। সুপুরি গাছের পাতায় কমলা রঙের রোদ ফিকে হয়ে আসছে দ্রুত। যে করেই হোক, সন্ধে নামার আগে বাড়িটা আজ খুঁজে বের করতেই হবে। কিন্তু সেটা কি এতই সহজ !
তিরিশ বছর তো আর নেহাৎ কম সময় নয়। কতকিছুই বদলে গিয়েছে এই ক’বছরে। ভোল পাল্টে এলাকাটি এখন ঘিঞ্জি বস্তি।
খালপাড়ে বাঁধ-রাস্তার দু’পাশে চালে চালে কানাকানি করা ঘরগুলোকে ডিঙিয়ে আন্দাজে ভর করে সরু একটা গলি মতো পথ ধরে ঢুকে পড়ল ওরা।
ওরা মানে বাসু আর সুচেতা। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা টিনের ছাউনি দেওয়া একটা কাঁচা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বাড়িতে গেট বলতে প্রায় হেঁজে যাওয়া একটা নড়বড়ে বাঁশের আগল। রোদবৃষ্টি লেগে আগলের বাখারিগুলোর এমন অবস্থা যে, একটু জোরে ধাক্কা লাগলেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে।
সন্তর্পণে আগলটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল দু’জন।
চারচালা ঘর। ভেতরে দু-তিনটে খুপরি কোঠা। সবগুলো ফাঁকা। শুনশান। এই ক’বছরে নিতাইয়ের পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে ওঠার কথা ! কিন্তু ঘরে তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না !
সামনে একফালি বারান্দা। সেখানে পা ছড়িয়ে বসে আছে ষাটোর্ধ্ব এক মহিলা। শনের মতো চুল। বিকেলের রোদ মাছির মতো ঘোরাঘুরি করছে তার মুখের বলিরেখার গলি-ঘুপচিতে। উদাসী চোখে আকাশের শূন্যতা।
সুচেতা দেখল, এ-ই নিতাইয়ের মা। সৌদামিনী। সেই একই রকম আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে। ঘন ঘন। দু’হাত তুলে দূর আকাশে পেন্নাম করছে। আর বিড়বিড় করে বলছে–‘নেতাই… নেতাই রে… তুই-ও চলে গেলি বাপ ! যশো… যশো মা আমার…
মহিলার বুক নিঙড়ানো আর্তির মাঝখানে মালিনীর মাঠের ওদিক থেকে ভেসে এল ঢাকের শব্দ, গাজনের কোলাহল।
আজ চৈত্র সংক্রান্তি। মাঠে চড়কের মেলা বসেছে। একটু আগে সুচেতারা ছিল সেখানেই।
ঢাকের বাদ্য, মেলার আওয়াজ আর কল্কের ধোঁয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চড়কের গাছে বড়শি দিয়ে গাঁথা ঝুলন্ত মানুষটার দিকে দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস করেনি বাসু। চোখ বন্ধ করে নেয় সুচেতাও।
এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে পালাবার উদ্দেশ্যে নিতাইদের বাড়ি খুঁজে বের করার প্রস্তাব দেয় বাসু। তখন সেটাকে উত্তম মনে হলেও এখানে এসে এরকম একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, স্বপ্নেও ভাবেনি সে।
এতবছর পরে-ও বাসু সুচেতাকে চিনতে ভুল করেনি সৌদামিনী। বুক চাপড়ে হাউমাউ করে বলে ওঠে, ‘মামণি গো, হেইদিন তোমার কথাডা শুনলে আইজগা এই দিনডা আমার দেখতে হইত না। সবডাই আমার কপাল।’
সৌদামিনীর কথায় ব্যাপারটা আন্দাজ করে নেয় সুচেতা। মাতৃহৃদয়ের এই করুণ আর্তি বুকে শেলের মতো বিঁধলেও কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায় না। সৌদামিনীর হাজারো পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও বাসুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। আসলে ঘরের ভেতরে দমবন্ধ হয়ে আসছিল তার।
আকাশের গায়ে দিনের আলো আর বিশেষ অবশিষ্ট নেই। তবে অন্ধকারও পুরোপুরি নামেনি। আশ্রমের ওদিক থেকে ভেসে আসছে প্রার্থনার সুর।
বাইরের খোলামেলা পরিবেশে খানিকটা স্বস্তি ফিরে আসে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারে না সুচেতা। বাসুকে নিয়ে খাল পাড়ের রাস্তা ধরে আবছা অন্ধকারে বাড়িমুখো হাঁটা লাগায় সে। চলতে চলতে চোখের সামনে সজীব হয়ে ওঠে তিরিশ বছর আগের কয়েকটি দিন।
সে সময়টাও ছিল চৈত্র সংক্রান্তি…
(২)
পিঠে বড়শি গেঁথে চড়ক গাছটার মধ্যে আড়াআড়ি করে বাঁধা শক্ত ডালে চরকিপাক খাচ্ছিল নিতাইয়ের শরীরটা। কতই বা বয়স। বড়জোর দশ বা এগারো।
ধীরেধীরে ঘুরতে থাকা ছাব্বিশ ইঞ্চি চওড়া নিতাইয়ের শরীরটাকে বড় সাধু মহেশ বৈষ্ণব এমন জোরে পাক খাওয়াতে শুরু করল যে, বেচারা অজ্ঞান হয়ে গেল। নিতাইয়ের মা সদু মানে সৌদামিনী ছেলের হাত পা ছোড়া বন্ধ দেখে ভিড় ঠেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মহেশের পায়ে।
‘বাবা ! ছেলেডা আমার আর ছটফট করতাছে না। কেমন অসার হইয়া দুইলতে আছে। দয়া কইরা ওরে নামাইয়া লন গুরুদেব !’
খুব বিরক্তি নিয়ে মহেশ তার আগুন জ্বালানো কয়লার টুকরোর মতো দুটি চৌকো চোখের তীব্র ভাটার দৃষ্টিতে সদুর দিকে তাকাল। তারপর প্রচণ্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাছটার কাছে গিয়ে ছেলেটার ঘুরন্ত শরীরটাকে স্থির করতে হাত বাড়াল।
চড়ক গাছ থেকে পাঁচ ছ’হাত দূরে তখন জায়গা জুড়ে বিছানো হয়েছে শুকনো কাঠকয়লা। সেগুলোর ওপর পেট্রোল ছড়িয়ে বেশ কয়েকটি জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি ছুঁড়ে দিয়েছে মহেশ। ধিকিধিকি আগুন কয়লার টুকরোগুলোকে একে একে গিলে নিচ্ছে।
পিঠের বড়শি খুলে এবার অর্ধ-অচেতন ছেলেটাকে এনে দাঁড় করানো হল কামারের গরম চুল্লির রঙের দপদপে কয়লার সামনে। মাথায় দেপ্তার প্রসাদী ফুল ছুঁইয়ে শরীর বাঁধানোর মন্ত্র পড়তে পড়তে নিতাইয়ের গোটা দেহে হাত বোলাতে লাগল মহেশ। তারপর ওকে দাঁড় করিয়ে দিল ঢিমে আঁচে জ্বলতে থাকা কয়লার ওপর।
আগুনের উত্তাপ ফের সতেজ করে তুলছে নিতাইয়ের দেহের অসার শিরা-উপশিরাগুলোকে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার মতো তার শরীরটা টানটান হয়ে গিয়েছে এবার। এক অদ্ভুত কায়দায় জ্বলন্ত অঙ্গারে পা ফেলে ফেলে সে খুব দ্রুত অতিক্রম করল সেই আগুন। আড়চোখে দেখে নিল তার চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকা স্কুলের বন্ধু বাসুকে।
এইমাত্র আগুনের ওপর খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার পরীক্ষায় পাশ করেছে সে। হয়তো সে কারণেই মুখে ফুটে ওঠেছে একটা অদ্ভুত বিজয়ীর হাসি। এবং অস্বাভাবিক দৃঢ়তা।
কয়েকটা মুহূর্ত এভাবেই কাটল। এতক্ষণে সম্পূর্ণ চেতনা ফিরে পেয়েছে নিতাই। দূরে মাঠের এককোণে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে পেন্নাম করল সৌদামিনী। আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছল আবার। বাসুর চোখে তখন অপার বিস্ময়। নিতাইয়ের এই অসাধারণ জয়ে তার বুকটাও যেন ফুলে ফেঁপে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি।
বাবা হর’কে মনে মনে প্রণাম করতে করতে সদু ভাবছিল, তিনমাস আগে যে মরণ বাঁচন লড়াইয়ে নেমেছিল নিতাই, এর থেকেও ঢের বেশি কঠিন ছিল আজকের এই পরীক্ষা। প্রতিটি পরীক্ষার শেষে লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলের শরীরটাকে জরিপ করছে সৌদামিনী। আর কোথায় খোঁচা লাগল ! নতুন করে কোন্ জায়গাটা পুড়ল ! কাটল !
এবার জিভে বড়শি গাঁথার পালা। দেবতার কাছে উৎসর্গ করা ঘটের জল দিয়ে আচমন করানো হল তাকে। জিভে মেখে দেওয়া হল মন্ত্রঃপুত তেল। তারপর… !
ব্রত আচরণের যাবতীয় পর্ব শেষ হলে নিতাই ও তার সঙ্গের চার ব্রতধারীকে উঠিয়ে দেওয়া হল পাঁচ পাঁচটি রূপোর মতো চকচকে ধারালো খাঁড়া রাম দায়ের উপর। পায়ের তলায় মাখিয়ে দেওয়া হল মন্ত্রঃপুত ধূলো।
চড়কের দলের দু’জন করে সঙ্গী ধরে রয়েছে দা’য়ের দুটি প্রান্ত। গোটা মাঠ ঘুরছে তিনজনের এক একটি দলের পাঁচটি মাগনদার বাহিনী।
অগ্রণী ক্লাবের বিশাল মাঠে জমায়েত প্রায় দেড় থেকে দু’হাজার দর্শনার্থীর সামনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের। প্রত্যেক ব্রতধারীর হাতে একটি করে থালা। তাতে প্রসাদী ফুল। ভক্তরা যে যার মতো করে দক্ষিণা দিচ্ছে থালায়। ব্রতধারীরা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন আশীর্বাদ।
একই ক্লাসে পড়া বাসুকে নাগালের মধ্যে পাচ্ছিল না নিতাই। রাম দায়ের ওপর উঠে সে এখন মস্ত মানুষ। বেশ একটা দেপ্তা দেপ্তা ভাব। তবু নীচু হয়ে বাসুর হাতে প্রসাদী ফুলের সঙ্গে একটা আপেলও গুঁজে দিল সে।
দুই বন্ধুতে চোখাচোখি হল এইবার। বাসুর চোখজোড়া তখন নিতাইয়ের দুটি পায়ের ওপর। অসম্ভব রকমের বিস্ময় সেই চাহনিতে।
ধারালো রাম দায়ের উপর অবলীলায় দাঁড়িয়ে নিতাই। রক্তের দাগ বা ব্যথার ছিঁটেফোঁটা চিহ্ন নেই ছেলেটির চেহারায়। বরং প্রসাদী তরমুজের ফালির মতো প্রশস্ত হাসি মুখে নিয়ে নিতাই তখন অশ্বমেধের টগবগে ঘোড়া।
এবারকার পুজোর সবচাইতে কম বয়সী ব্রতধারী হচ্ছে নিতাই। তিনমাস আগে মারণ জ্বরে ছেলেটির যখন প্রায় যায় যায় অবস্থা; সদুর শাশুড়ি, নিতাইয়ের ঠানদি হত্যে দিয়ে পড়েছিলেন মালীনের চরের বৃদ্ধ অশ্বত্থ গাছের তলায় গড়ে ওঠা বাবা হরের থানে।
ডাক্তার বদ্যি, ওষুধ পত্তর করেও কোনও কাজ না হওয়ায় তিনদিন তিনরাত মহাদেবের চরণে মাথা ঠুকে মানত করে ফিরিয়ে এনেছিলেন নাতিকে। মানত করেছিলেন, এ বছর চড়কের ব্রত করবে তার নেতাই।
চড়কের ব্রত সফলভাবে শেষ করে সে রাতে আবার প্রচণ্ড জ্বর এল নিতাইয়ের। সঙ্গে সারা শরীরে দগদগে ক্ষত। ঘা। ব্যাথা। ফের ডাক্তার, ওষুধ, পথ্য, মানত। সে যাত্রায় কী ঘটেছিল নিতাইয়ের ভাগ্যে, জানা হয়নি।
(৩)
আজ এই মালিনীর চরে গজিয়ে ওঠা বিশাল কলোনীর আমলকি গাছটার তলা দিয়ে যেতে যেতে বহু বছর আগের সেই ঘটনার প্রতিটি খুটিনাটি সব মনে পড়ে যাচ্ছে সুচেতার।
প্রায় তিরিশ বছর পর দুই ভাই বোন মিলে আবার এসেছে মালিনীর চরে। উদ্দেশ্য, চড়কের খেলা দেখবে, খুঁজবে তাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব- কৈশোর।
সময়ের বিবর্তনে এলাকাটির হালচাল পালটে গিয়েছে পুরোই। সব-কটা ঘরের সামনে অন্তত একটা টোটো। মোটর বাইক। স্কুটি। টিনের চাল। সিমেন্টের রংহীন দেয়াল। খোপ খোপ বাড়িঘর। সামনে ঝুটো বেঁধে কিশোরী যুবতীদের হাসি, হৈ হল্লা। শহুরে বাবুদের তুলনায় এদের রোজগার পাতি কম হলেও কাপড়চোপড়ের চাকচিক্য কোনও অংশেই কম নয়।
এত বছর পর গোটা এলাকা ঘুরেও নিতাইদের বাড়ি ঠাহর করা যাচ্ছে না। সব কেমন যেন ঘিঞ্জি। আগের বারোঘর এক উঠোনগুলো হাপিস। চড়কের সাধুর ছুঃমন্তরের বলে যেমন সব ব্যথা হরণ হতো, তেমনি।
রাস্তার পাশ থেকে সার দেওয়া তিনটি ঘরের পেছনে মাথা উঁচিয়ে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে আমলকি গাছটা। সেটা দেখেই বাসু থমকে গেল।
‘দিদি ! এটা নয়তো !’
এর পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। সৌদামিনীর সঙ্গে কথা বলে ফেরার পথে বাসুর ইশারা করা আমলকি গাছটির তলা দিয়ে যেতে যেতে এক ঝটকায় যেন আশির দশকের শেষের দিকে পৌঁছে যায় সুচেতা।
চৈত্র মাসের সংক্রান্তির দিন। দেশভাগের পর বিস্তার হওয়া এই মফস্বল শহর তখনও ততোটা যান্ত্রিক হয়ে উঠেনি। বেলা প্রায় আড়াইটে নাগাদ আওয়াজটা ভেসে এলো। যেন কোন্ সুদূর থেকে। হালকা অথচ মিঠে। ঢ্যাংকুরকুর ঢ্যাংকুরাকুর। ঢাকের সঙ্গে একটানা কাঁসরের ঢং ঢং আওয়াজ। সঙ্গে একঘেয়ে হুল্লোড়। শাঁ শাঁ শব্দ। আওয়াজটা খানিকটা কাছে আসতেই বাসু ধপাস করে রাস্তায় শুয়ে পড়ল। খানিকক্ষণ কান পেতে কী একটা শোনার চেষ্টা করল।তারপর হঠাৎ একলাফে তড়াক করে উঠে জুড়ল চিল চিৎকার। ‘কালী আআআইছেএএ!’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সুভাষনগর, শ্মশান রোড, শিবকলোনী ও আশপাশের এলাকার ছোট-বড় সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। সবার মুখে এক জিজ্ঞাসা। ‘কোনদিক দিয়া? কই? কই?’
ঢাকের এই অত্যাশ্চর্য শব্দ কানে আসতেই বাসুর হৃদপিণ্ডের আওয়াজও যেন কানে শোনা যাচ্ছিল। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি। এতে ভয়, উদ্বেগ, কান্না, হাসি, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, সাহস, বীরত্ব, এ্যাডভেঞ্চারের নেশা। সবকিছুকে ছাপিয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবনের স্বপ্ন। সে একলাফে রাস্তা থেকে উঠে পড়িমরি করে মায়ের কাছে এলো।
‘মা ! আমি যাই। কাআআআলীঈঈঈঈঈ…..!’
‘ভাতটা খেয়ে যা বাবা !’
মায়ের ডাকের তোয়াক্কা না করে একদৌড়ে সে তখন ছুট লাগিয়েছে শ্মশানের দিকে…..
৪)
রাস্তায় দলে দলে লোকজন জড়ো হতে শুরু করেছে। গোটা বছরের এই একটা মাত্র দিনে শিলচর নামের এই মফস্বল শহরের বহু এলাকার লোকেরা এখানে এই শ্মশান চত্বরে এসে জমায়েত হন। চড়কের কালীর উদ্বাহু নৃত্য দর্শন এবং গোটা পরিবেশের অসামান্য রোমাঞ্চ উপভোগ করার জন্য।
কখনও দাসকলোনী, কখনও অম্বিকাপট্টির দিক থেকে ভেসে আসছে ঢাকের আওয়াজ। দিক ঠাহর করতে কান পাতে বাসু।
শ্মশানের জায়গায় জায়গায় পোড়া কাঠ, মড়ার খুলি, কচি হাড় খুঁজতে খুঁজতে কখন কোন্ দিকে ছুট লাগাবে চড়কের কালী, তার কোনো হাল হদিশ আগে থেকে পাওয়া অসম্ভব।
সুচেতা তখন ক্লাস টেন-এর ছাত্রী। সংসারের কাজে মায়ের সঙ্গে হাত লাগিয়েছে সে। বাসুর চিৎকার শুনে তারও জেরবার অবস্থা। মনটা আকুপাকু করছে ছোটার জন্য।
ফি বছর চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সুচেতাদের বাড়িতে ঠাকুরকে অন্নভোগ দেওয়া হয়। ঘরে মেলা কাজ। মন চাইছে সব ছেড়ে ছুড়ে ছুট্টে পালিয়ে যায় সে-ও। কিন্তু কাজ তখনও শেষ হয়নি।
আজ সকাল থেকেই শুরু হয়েছে নানান জোগাড় যন্ত্র। কাঁচা আমের ডাল, গরম কালের নতুন সব্জি, সজনে ডাঁটা, এচোঁড়, তিত করলা, কাকরুল, ঝিঙে, পটল এ সব কিছু ভোগে লাগানো হবে। সঙ্গে তেতো অবশ্যই খেতে হবে। তাই নিমপাতা ভাজা।
ভোগ নৈবেদ্য লাগিয়ে পুজো শেষে ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। দরজা খুলে তিন তালি দিয়ে ভোগ খোলাও হয়ে গেছে। এবার সেই অতিপরিচিত দলা মাখাবার পালা।
ভাতের সঙ্গে পাঁচ রকমের ভাজাভুজি, পাট শাক, বিভিন্ন রকমের তরিতরকারি মায় অম্বল ও মিষ্টি দই এক গামলায় ঢেলে তাতে লেবুর রস নিংড়ে হাতা দিয়ে মাখতে হয় এই দলা।
এতক্ষণ একমনে সেই কাজটাই করছিল সুচেতা। এমন সময় কাআআআলীঈঈঈঈঈঈ চিৎকারে সব একাগ্রতা ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেল।
৪৭-এর দেশভাগের সময় পনেরো বছর বয়সে সুচেতার বাবা কোনও এক আগুন ঝরা রাতে তাদের মৌলভীবাজারের চৌদ্দ পুরুষের ভিটা পেছনে ফেলে রুদ্ধশ্বাসে ছুট লাগিয়েছিলেন তার বিধবা মায়ের সঙ্গে। বোঁচকায় করে এনেছিলেন চিড়ে গুড়, দু’এক পদ সোনার গয়না, কিছু টাকা পয়সা এবং নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতি।
সেই সংস্কৃতির হাত ধরেই সুচেতাদের ঘরে পাকাপাকি ঠাঁই নিয়েছে চৈত্র সংক্রান্তির পুজো, কর্মপুরুষের ব্রত, মঙ্গলচণ্ডী, ঝটপট ঠাকুরের ব্রত, ফুলকর ঠাকুরের ব্রত আরও অনেক কিছু। বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে সুচেতার মা-ও খুব নিষ্ঠাভরে সে-সব ধারণ করে চালিয়ে যাচ্ছেন।
খাবার বাড়া হবে। এদিকে বাসুর পাত্তা নেই।
সুচেতা লক্ষ্য করছে, প্রায় দশ পনের দিন থেকে চোখ মুখের ভাব ভঙ্গি কেমন পাল্টে গিয়েছে তার পাঁচ বছরের ছোট ভাই বাসুর।
এবছর হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে সে। সেই সঙ্গে বড় হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষায় টগবগ করে ফুটছে। নতুন স্কুল, নতুন ইউনিফর্ম, নতুন বই, নতুন দিদিমণি, নতুন বন্ধু।
বাসুর নতুন বন্ধুদের মধ্যে নিতাই থাকে শহরে নতুন করে গজিয়ে ওঠা এলাকা মালিনীর চরে।
মালিনী বিল তখনও শুকিয়ে যায়নি। সবুজের নীরব আলিঙ্গনে বন্দী জলাশয়টি যেন একটুকরো শান্তি ! বক, সারস, পানকৌড়ি, জলপিপির মতো প্রায় পঞ্চাশ রকমের নানান প্রজাতির পাখির মিলন বাসর।
দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রান্তর, ফকিরের মাঠ, সিঙ্গারির বিল পেরিয়ে বুধুরাইল পাহাড়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বিশাল এলাকা জোড়া জলাভূমি আর খাঁ খাঁ করা ভূষণ্ডির মাঠ। বিকেলের বাউল আলোয় গোধূলি আর বক সারসের জলকেলির জলোচ্ছ্বাসে এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি হতো চারদিকে ! যান্ত্রিকতাকে বিশ যোজন দূরে সরিয়ে এই বিস্তৃত সবুজ নীল প্রান্তরে ছিল আশপাশের বিক্ষিপ্ত কয়েকটি বাড়িঘরের ছেলেপুলেদের বেলাগাম কৈশোর যাপন। ঘুড়ি ওড়ানো, গরুর লেজ ধরে দৌড়ানো, মহিষের শিংয়ের গুঁতো না খাওয়ার প্রতিযোগিতা আরো কত কী।
(৫)
যাকগে সেসব কথা। ঘটনা হচ্ছে, নিতাই বেশ কদিন হল স্কুলে আসছে না। গেল শুক্কুরবার টিফিনের সময় হঠাৎ বড় দিদিমণির অফিস ঘরের সামনে নিতাইকে কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁক পাড়ল তার বন্ধুরা।
বেশ কদিন ধরে স্কুলে আসছে না বলে ছুটির দরখাস্ত দিতে এসেছে সে। কোমরে এক টুকরো লাল শালু। উদোম গা। বগলে কুশাসন। খালি পা। সমস্ত শরীর থেকে রোয়া উঠছে। ব্ল্যাক বোর্ডের মত শরীরে খড়ির দাগ। তেল সাবান পড়ে নি অনেকদিন বোঝাই যাচ্ছে।
সবাই মিলে হামলে পড়াতে কেমন যেন গুটিয়ে পড়ল সে। জানালো, সে ব্রত রেখেছে। চড়কের ব্রত।
গোটা চৈত্র মাস তাকে গাজনের দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে হবে। দা নাচ, কালী নাচ, শিব গৌরী নাচ দেখিয়ে সিধে সংগ্রহ করতে হবে। গায়ে হাতে জোর নেই । দিন শেষে এক সেদ্ধ ভাত খেয়ে খেয়ে শরীরটাতে জোর পাচ্ছে না। তাই আজ হই হুল্লোড় করতে পারবে না।
একথা শোনার পর বাসু সহ তার সঙ্গী দলটির সবার মুখ শুকিয়ে এক রত্তি হয়ে গেল।
হাড়ি বিষুর তিন চারদিন আগে রাত এগারোটা নাগাদ বিছানা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল বাসু। ইকড়ের বেড়ার ওপর পুরু করে মাটির প্রলেপ লাগানো দেয়ালে কান পেতে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপরেই হঠাৎ ফোঁপাতে শুরু করল।
সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর মা বিছানায় গিয়ে সবে গা এলিয়েছেন। বাবা সামনের ঘরে বসে তখনও ব্যবসার হিসেব নিকেশ করছেন। ফোঁপানো ছেড়ে একসময় হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো সে।
বাবা হাতের কাজ ফেলে আদর করে কোলে তুলে নিতেই মুখ খুলল সে। দূরে কোথাও নাকি ঢাকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ! সেখানে নিয়ে যেতে হবে তাকে !
ঢাকের শব্দ ততক্ষণে বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। সঙ্গে মিঠে সুরের লোকগান,
‘গাইঞ্জার চিরল চিরল পা~~~ত
গাইঞ্জা খাইয়া মগ্ন হইয়া নাচে~
এ~~ ভুলা নাথ…’
পরদিন সকালে উঠোনে মোড়ায় বসে শুকতারা পড়ছিল সুচেতা। ডাঙ্গুলির লাঠিটাকে হাতে তলোয়ারের মতন ধরে গোটা উঠোন জুড়ে, প্রায় উড়ে বেড়াচ্ছিল বাসু। ভাঙ্গা টেপ রেকর্ডারের মতো শুধু সেই চারটে লাইন আউড়ে কান একেবারে ঝালাপালা করে দিচ্ছিল পাগলাটা।
‘ও শিব নাচো রে~
নবীন কীর্তনের মাঝে
নন্দী ভৃঙ্গী আদি সনে
মৃদঙ্গ বাজিল রে…’
সুচেতা জিগ্যেস করল, হ্যাঁ রে বাসু, কাল রাতে অমন হেঁদিয়ে মরছিলি কেন?
– জানিস দিদি চড়কের বাজনা শুনলেই না আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। পেটের নাড়ি ভুড়ি সহ গোটা শরীর কিলবিল করতে থাকে। ও তুই বুঝবি না। আরও বড়ো হ, তারপর বুঝবি।
– কি বললি, বড় হব? অ্যাঁ…বড় আমার ঠাকুরদা এয়েচেন। শোন.. বেশি পাকামো না করে বল দেখি, কাল গিয়ে কি দেখেছিস?
– জানি তুই বুঝবি না দিদি। তাও বুঝিয়ে বলছি। কাল ওই আশ্রমের গলিতে নন্দুদের বাড়ি কালী নাচের দল এসেছিল। দেখলাম দলে নিতাইও আছে। আমার দিকে আড় চোখে তাকাল। কেমন ভাসা ভাসা সে চাহনি। জানিস দিদি, কেন জানি মনে হল যে, ওর পেটে প্রচণ্ড ক্ষিধে। শরীর যেন আর টানতে পারছে না। তবু কিসের যেন টানে সে নেচেই চলেছে। যন্ত্রের মতো। সেদিন রাজু বলছিলো, কালীর পায়ের রক্তজবা মন্ত্র পড়ে ব্রতধারীদের কপালে ছুঁইয়ে দিলে আর নাকি তাদের ক্ষিধে তেষ্টা পায়না। ক্লান্তিও আসে না। তাই বুঝি অমন দিশেহারা দেখাচ্ছিল ওর চোখ দুটো। আমার না ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল রে দিদি নিতাইয়ের জন্য। বুঝলি?
– হুমমম।
নতুন ক্লাসে উঠেই বাসু ফরমান জারি করেছে, এবারে সে অবশ্যই অগ্রণীর মাঠে চড়কের পুজো দেখতে যাবে। তাই হাড়ি বিষুর দিন থেকেই শুরু হয়েছে ছক কষা।
(৬)
চৈত্র সংক্রান্তির দিনটি হচ্ছে মহা বিষু। তার আগের দিন হাড় বিষু বা হাড়ি বিষু উদযাপন করা হয়। মায়ের কাছে একথা বহুবার শুনেছে সুচেতা।
হাড়ি বিষুর সকালেই ভাই-বোন নেমে পড়েছে লতাপাতা অভিযানে।
মায়ের আদেশ। তাই রাজুদের বাড়ি, ফুল পিসির বাড়ি, পেছনের গলির অলি কাকিমার ঘরে ঢুঁ মেরে মেরে বাসু-সুচেতা জোগাড় করে এনেছে নিশিন্দা পাতা, কুলের কচি পাতা, সপরির (পেয়ারা) কুঁড়ি, নিমপাতা, সাদা দুব্বোঘাস।
বাড়িতে সুচেতার মা তখন হাজারো কাজে ব্যস্ত। পাট করে বিছানা পাতানোর পর কাপড়চোপড় ধুয়ে তিনি এখন রান্নাঘরের যাবতীয় থালা বাসন বাটি কৌটো ধুয়ে মুছে সাফ করছেন। এঁটেল মাটির সঙ্গে গোবর মিশিয়ে মাটির উনুন, ঘরের বেড়া সব নিকোতে লেগেছেন।
সংক্রান্তির দিনে ঘরময় চলা এই কর্মযজ্ঞ দেখে সুচেতার বাবা প্রায়শই বলেন, তবে আর কৌটোয় রাখা চিনি-লবণ ও দোকানের ক্যাশ বাক্সগুলোই বা বাকি যায় কেন !’
দুব্বো ও পাতার গোছা মাকে সমঝে দিয়ে তবেই সুচেতার ছুটি।
হাড়ি বিশুর এইদিনে কাঁচা হলুদ ও বিভিন্ন ধরনের পাতা বেটে পেস্ট তৈরি করেন সুচেতার মা। আজও ধুচুনে ফেলে বাড়ির পুকুরে পাতাগুলো ধুয়ে শিলনোড়ায় বাটতে বসেছেন। ওমনি পেছন থেকে গলায় ঝুলে বায়না জুড়েছে বাসু।
‘ও মা ! ওসব তেতো পাতা আমি কিন্তু কিছুতেই খাবো না। আবার ওই হলুদ বাটা ! মশলা কেউ কাঁচা খেতে পারে বলো !’
ছেলের কথা শুনে হাতের কাজ ফেলে ফিরে তাকালেন মা।
‘তোকে খেতে বলেছি আমি? আজ চানের আগে এটা গায়ে বেশ করে ডলে ডলে মাখবি। তাতে দেখবি গায়ে কোনও চুলকুনি রোগ হবে না। নে এবার যা। দিদিকে বল তোকে চান করিয়ে দিতে। আর হ্যাঁ, আজ কিন্তু গায়ে তেল সাবান কিচ্ছু ছোঁয়াবি না।’
চান সেরে জানালার পাশের পেয়ারা গাছটার দিকে মুখ করে বিছানায় শুয়ে একটা বই পড়ছে সুচেতা। পাশে বাসু। মার্বেল ভর্তি কৌটো নিয়ে বিছানায় বসে বসেই টিপ প্র্যাকটিস করছে একমনে। কিন্তু একটাও গিয়ে জুতসই জায়গায় লাগছে না। প্রতিবারই তার টিপ লক্ষ্য থেকে দিগভ্রান্ত হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঘরের আনাচে কানাচে।
মার্বেল খেলায় সিদ্ধহস্ত এই লিটল চ্যাম্পের এহেন এলোমেলো অবস্থা দেখে হাসি আটকাতে পারল না সুচেতা। বলল, ‘কী রে হিরো ! আজ তো তুই বিগ জিরো। একটা টিপও ঠিকঠাক লাগাতে পারছিস না। ব্যাপারটা কি বল্ তো !’
‘না রে দিদি। আজ রাত পোহালেই মহা বিষু, মানে চড়ক পুজো। কালই তো নিতাইয়ের বড় পরীক্ষার দিন রে দিদি। যদি পিঠে বড়শির ধারালো মুখটা উল্টোপাল্টা গেঁথে যায় ! যদি জ্বলন্ত কয়লায় হাঁটতে গিয়ে পুরো পা-টাই পুড়ে যায় ! ধারালো রাম দা’র ওপর দাঁড়াতে গিয়ে যদি পায়ের পাতাটাই কেটে দু’টুকরো হয়ে যায়!’
বলতে বলতে দুটো চোখ জলে ভরে এল ওর। কথা শুনতে শুনতে একমনে পেয়ারা গাছটার ডালে বসে কাঠবেড়ালির ঠুকে ঠুকে পেয়ারা খাওয়া দেখতে লাগল সুচেতা।
এই গাছে তরমুজী পেয়ারা হয়। বাইরের দিকটা সবুজ। ভেতরটা লাল। ছুঁচলো ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে কাঠবেড়ালিটা কী এক অদ্ভুত ছন্দে পেয়ারার শক্ত সবুজ খোলস ভেদ করে ভেতরের লাল নরম রসালো অংশে হানা দিচ্ছে। শুষে নিচ্ছে সব রস। অমৃত। রসানুভূতি।
ভাইয়ের মনের ভার কমাতে ওকে নিয়ে তখনই অগ্রণীর মাঠে ছুটল সুচেতা। পাড়ার খেলার মাঠ। এবার এই মাঠেই বসবে আসর। চড়ক পুজো। চড়কের মেলা।
মাঠে পৌঁছে দেখা গেল, চারদিকে সাজো সাজো রব। ব্রতধারী ছাড়াও ওদের সঙ্গীসাথী সহ হাত লাগিয়েছে আরও অনেক লোক।
মাঠের একপাশে পোঁতা হয়েছে একটি বেশ বড় গোলাকৃতি চওড়া গাছ। তার অনেকটা অংশ লাল শালুতে মোড়া। এর ঠিক সামনে বেশ কয়েকটি ছোটবড় হাড়ি পাতিল ইতস্ততঃ রাখা রয়েছে।
বড় গাছটার বুকে আড়াআড়ি করে লাগানো হয়েছে একটি বিশেষ ধরণের মোটা কাঠের টুকরো। পোক্ত। পুরুষ্টু। সেটাকে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে চড়কগাছের সঙ্গে।
শোনা যায়, চড়কের এই বিশেষ গাছটি নদীতে ভেসে ওঠে। সবার হাতে সবসময় ধরা দেয় না এই গাছ। বাবা মহাদেবের কৃপা থাকলে তবেই হাত লাগে দলনেতার। তখনই বোঝা যায়, এবার বাবার দয়া হয়েছে।
জোর করে গাছ এনে পুঁতে চড়ক পুজো করলে নাকি বিপদ অনিবার্য। কিছু না কিছু অশুভ ঘটনা ঘটবেই।
এই গাছটা নাকি ভেসে আসছিল কাটাখাল নদী পেরিয়ে গোদামঘাটে। চড়কের দলনেতা মহেশ বৈষ্ণব নদীতে নৌকো নিয়ে মাছ ধরছিল। তার নৌকোতেই আচমকা এসে ধাক্কা দিল গাছটা। তাই এবারের পুজোয় বিপদের কোনও আশঙ্কা নেই।
ফেরার পথে বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিল বাসু। বিড়বিড় করে সুর ভাজছিল।
“শিব নাচে, গৌরী নাচে রে……..
আরও নাচে কে…….!
নাচে নন্দী ভৃঙ্গি তারই সাথে রে …….”
ভেবেছিল বাড়ি ফিরে দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বেশ নিশ্চিন্তে ভাতঘুম দেবে সুচেতা। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে দেখা তরমুজী পেয়ারার ভেতরের লাল অংশটা তাকে অস্থির করে তুলল।
দু’মিনিট ভেবে সুচেতা সোজা চলে গেল তার ছোটোবেলার বন্ধু মিতাদের বাড়ি। এরপর তাকে নিয়ে সোজা মালিনী বিল।
নিতাইয়ের কচি মুখের সঙ্গে বাসুর মুখটাকে বারবার গুলিয়ে ফেলছিল সে। লোকায়ত আচার, নিজস্ব সংস্কৃতি। ভাব আর ভাবনা। ভালো লাগা আর অন্ধ সংস্কার। বিজ্ঞান ও যুক্তি। কাকে ছেড়ে কাকে নিয়ে ভাববে ! সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। একবার যদি ধরা যায় ছেলেটাকে। যদি বুঝিয়ে সুঝিয়ে কিচ্ছু করা সম্ভব হয় !
(৭)
চড়কের আগের দিন গোটা মালিনী বিল, তপোবন নগর এলাকায়ও ভীষণ ব্যস্ততা। ছোটো-বড়, মেয়ে বুড়ো সবাই উৎসবের শেষবেলার কাজে হাত লাগিয়েছে। বেশিরভাগ বাড়িতেই বারো ঘর এক উঠোন। এক একটি উঠোনে এক দঙ্গল করে লোক। সবাই যে যার কাজে মেতে রয়েছে।
প্রথমেই যে বাড়িটার দিকে চোখ পড়ল সুচেতার, দেখল উঠোনের কোণায় আমলকি গাছের তলায় জটলা করে বসে আছে এক দঙ্গল বাচ্চা। মাটিতে ত্রিপল পাতা। মাথার উপরে চাল নেই। চারদিকে বেড়া বা অন্য কোনও আড়াল নেই। এখানে সবাই যেন উদার আকাশের দিব্যজ সন্তান।
তাদের এক হাত দূরে তিনটে ইট দিয়ে তৈরি উনুনে বিশাল মাটির হাঁড়িতে কিছু একটা রান্না হচ্ছে। আর ছেলেগুলো হা-মুখ করে প্রাণভরে এই রান্নার গন্ধ টেনে নিচ্ছে। মনে ও শরীরে।
এমন সময় আচমকা সুচেতার জামার খুঁট ধরে কঁকিয়ে কেঁদে উঠল কেউ। তাকে দেখে ওরা দু’জন যেন আকাশ থেকে পড়ল।
‘আরে বাসু ! তুই কখন এলি ? কিভাবে এসেছিস?’
কোনও জবাব না দিয়ে সে আঙুল তুলে ঐ বাচ্চাগুলোকে দেখিয়ে দিল। চাপা অথচ গভীর স্বরে ডেকে উঠল, ‘নিতাই !’
কতটা আর্তি ও আকুলতা ছিল সেই ডাকে, বলা মুশকিল। তবে ভিড়ের মধ্যে থেকে চোখ খুলে ঘাড় ঘুরিয়ে একটি দশ এগারো বছরের ছেলে ওদের দিকে তাকাল। অদ্ভুত বিষণ্নতা মাখা অসহায় সেই চাহনি।
চোখ গিয়ে মগজকে খবর দিতে যেটুকু সময় লাগে, সেইটুকু সময়ের মধ্যে দৌড়ে ছেলেটি ওদের সামনে এসে হাজির ।
নিতাই। এক চিলতে শালু কোমরে জড়ানো। খালি গা। চিমসে যাওয়া পেট। দোমড়ানো মুখ। জ্বলজ্বলে চোখ। শীর্ণ দুটি হাত বাড়িয়ে বাসুকে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল। খানিকক্ষণ পর বছর তিরিশের আদুল গায়ে শাড়ি জড়ানো রোগা মেটে রঙের একজনকে সঙ্গে করে দুই বন্ধু বেরিয়ে এল। মহিলাটি নিতাইয়ের মা।
এই মাসে সেলাই করা কাপড় পরতে নেই বলে এক কাপড়ে গুটিসুটি হয়ে এসে দাঁড়ালেন ওদের সামনে। মুখে তাঁর প্রশান্তির হাসি। নিতাই বায়না ধরেছে বাসু তার সঙ্গে বসে ভোগের প্রসাদ খাবে।
সবাইকে দেখে মহিলা খুব খুশি। বললেন, ‘গোটা চত্তির মাস আমাদের ঐ নিয়ম রে মা। চড়কের এই বচ্ছরের সব ব্রতধারী ও তাদের গুরু চ্যালা সবাই মিলে একসাথে মাগন মাঙ্গে। সূজ্জি ওঠা থেকে ডোবা পজ্জন্ত। এইটুকু সময়ের মধ্যে যা জোটে, তাই দিয়ে বেলা ডুইবলে রান্না হয়। ভাতে ভাত। কোনো তেল মশলা নেই। দেওয়া যাবে না লবণও। সৈন্ধুক লবণ খাইবার পারবা। মাগন করে আনা চাল, ডাল, শাক, সবজি সব ঐ এক হাঁড়িতে সেদ্ধ করে সূজ্জি ডোবার পর খাতি হয়। এইডাই নিয়ম।’
‘এইটুকুনি ছেলেকে এ্যাতোখানি কৃচ্ছ্রসাধনা করতে কেন পাঠালেন ?’
মিতার এই সটান প্রশ্নে দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল সদু । আঁচলের খুঁটটা আঙুলের ডগায় পেচাতে পেচাতে বলল, ‘ সব বাবা ভোলানাথের ইচ্ছে। তিনি চাইলেন বলেই হল। একরত্তি ছেলেটা পুরো মাসডাই তো শুদ্ধ আচার মেনে চইলতে পেরেছে মা। সঙ্গে কত রকমের পূজা পালি। মন্ত্র তন্ত্র। রাইজ্যময় চরকিপাক খাওয়া। ছেলে আমার সব পরীক্ষাই পাশ কইরছে।’
‘কিন্তু মাসিমা! আগামীকাল যে আসল পরীক্ষা। কত কষ্টের সেসব নিয়ম। যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়!’ এবার কথা বলল সুচেতা।
নির্বিরোধী প্রত্যয়ী মহিলাটির চোখে তখন শপথের দৃঢ়তা। বলে, ‘আরে না না। ঐসব কিচ্ছু হইব না। তোমরা শুধু আশীব্বাদ করো আমার নিতাইরে প্রাণ ভইরা। তা’লেই দ্যাখবা সব ঠিকঠাক হইয়া যাইব।’
ততক্ষণে মিতারও রোখ চেপে গেছে।।
‘এই কচি বাচ্চাটাকে ব্রতের কাজে না পাঠিয়ে আপনারা মানে ওর বাবা মা-ও তো সেটা করতে পারতেন। ‘
কথাগুলো শুনে আচমকাই দুচোখ জলে ভরে এলো তার।
‘ দুইমাস আগে ব্যাডার আমার মরো মরো অবস্থা। দুইদিন তিন রাত ওরে নিয়া যমে মাইনষে টানাটানি। ডাক্তারের কোনো ওষুধেই কাজ হইতে আছিলো না। রোগ তো আর সারে না। পোলা আমার দিন দিন খালি বিছনার সাথে লেইপ্টে যাচ্ছে। কুনু পথ না পেইয়ে আমার শাউড়ি হত্যে দিয়া পড়লেন বাবা ভোলানাথের থানে। একলগে তিন দিন তিন রাত মাথা খুইড়লেন বাবার পায়ে। চারদিনের মোড়ে পোলাডা আমার চৌখ খুইলা চাইলো গো ! সেই দ্যাইখে ঠাকমা তার নাতিকে আসছে বছর চড়কের ব্রত করাবে বলে মান্নত করছে।’
বিরাট উঠোনের একদিকে বড়শির মুখগুলো আরও ছুঁচলো করার জন্য শান দেওয়া হচ্ছে। কোথাও বা বড় বড় কাঠকয়লা শুকোতে দেওয়া হয়েছে। যাতে কাল চটজলদি আগুন জ্বালানো যায়। অন্যদিকে মোটা মোটা দড়ির গায়ে মাঞ্জা মেরে দড়িগুলোকে আরও শক্ত করা হচ্ছে। কেউ এককোণে বসে লম্বা সাইজের রাম দা ধারালো করছে। শালুর টুকরো, ধোঁয়া রঙের মিলের কাপড়ের ছোটবড় টুকরো ধুয়ে শুকোতে দেওয়া হয়েছে। যাপনের কী অদ্ভুত বৈচিত্র্য !
নিতাই ও বাসুর মিলন ভোজন দেখতে দেখতেই সুচেতাদের কথা হচ্ছিল সৌদামিনীর সঙ্গে। নিতাইয়ের একটি ছোট বোন ছিল। যশোধরা। টাইফয়েড তার দু’বছরের মেয়েটিকেও ছিনিয়ে নিয়েছে।
কাঁপা কাঁপা গলায় কথাটা বলে মুখে আঁচল চাপা দিল সৌদামিনী। কোনও মতে নিজেকে সামলে নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়াল সে।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা সুচেতার হাতে একটি বাটিতে করে সাদা সর্ষে ভাজা, কাঁচা হলুদ ও গুড় বাবা ও ভাইকে দিতে পাঠিয়েছেন মা।
বাবার পাশে বসে বাটিটা হাতে নিয়ে আঙুলের ডগায় সর্ষেদানা গুনছিল সুচেতা। ‘সুরমা বরাকের ঐতিহ্য’ বইটি থেকে মুখ তুলে মেয়ের দিকে তাকালেন তিনি।
মেয়ের এই ভঙ্গি ভালো করে চেনেন সুচেতার বাবা। ও এরকম করছে মানে কোনও একটা বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড তোলপাড় চলছে মনের গভীরে। তীব্র যন্ত্রণায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে ভেতরটা।
মেয়েকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে রে মা? মনে হচ্ছে খুব কষ্টে আছিস !’
-‘কই… কিচ্ছু হয়নি তো বাবা।’
-‘আরে… আমার কাছে লুকিয়ে কী লাভ বল। বলে ফেল, বলে ফেল। আর জানিস তো মা, আনন্দ ভাগ করলে সেটা যেমন বাড়ে তেমনি দুঃখ ভাগ করে নিলে সেটা অনেকটাই কমে যায়।’
বাবার স্নেহের পরশে বুকের ওপর চেপে থাকা জগদ্দল পাথরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে হালকা হয়ে যায় সুচেতার। সব কথা খুলে বলে। জানায়, নিতাই ও তার পরিবার, পারিপার্শ্বিক সবকিছু নাড়িয়ে দিয়েছে তাকে। ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর লোকায়ত সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এ্যাতো এ্যাতো মাশুল দিতে হবে! গত কয়েকদিন ধরে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে সারাক্ষণ।
মেয়ের কথা শুনে গম্ভীরমুখে উঠে দাঁড়ালেন বাবা। পাশের আলমারি খুলে কয়েকটি বই হাতে দিয়ে বললেন -‘আরো বড় হও। নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।’
হাতে আটকড়ইয়ের বাটি নিয়ে মা এসে সেটার সঙ্গে আগামীকাল চৈত্র সংক্রান্তির পুজোর বাজারের ফর্দ দিয়ে গেলেন। বাটি হাতে যথারীতি বেগড়বাই শুরু বাসুর।
‘আবার এটা কেন খেতে হবে?’ একরাশ বিরক্তি।
‘ সব আচার অনুষ্ঠানের পেছনে কিছু কারণ তো থাকে বাবা। তুই খেয়ে নে। আমি এর পেছনের গল্পটা বলছি।’
বাসু-সুচেতা দুজনেই গল্পের গন্ধ পেয়ে বেশ জুত হয়ে বসল। বাবা বলতে লাগলেন,’বিন্নি ধানের চাল, ছোলা, মটরদানা, বাদাম, সিমের বীজ, ফরাসের বীজ, কাঁঠাল বীজ, মিষ্টি কুমড়োর বীজ এই আট রকমের দানা শস্য শুকনো খোলায় ভেজে আজ এই হাড়িবিষুর দিনে খেতে হয়। কথায় বলে, এতে হাড়মটমট রোগ পালিয়ে যায়। আর ধারেকাছেও আসতে পারে না। সঙ্গে অবশ্যই সাদা সর্ষে ভাজা, কাঁচা হলুদ আর গুড় খেতে হবে।’
এবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসলে এসব শস্যবীজ সঞ্চয় করে রাখা মেয়েদের বহু প্রাচীন রীতি। তুই তো জানিসই, চাষবাস শুরু হয়েছে মেয়েদের হাত ধরে। কাজেই এই অঞ্চলে নবান্নের মরসুম শেষ হবার পর চাষের উপযুক্ত পরিবেশের জন্য অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়। মৌসুমি বায়ুপ্রবণ এই অঞ্চলে বন্যা, অতিবৃষ্টি নিত্যসঙ্গী। তাই মেয়েরা আগামী চাষের জন্য বীজ সঞ্চয় করে রাখত। বাড়ির ভাড়ারে সঞ্চিত ফসলের পাশাপাশি আলাদা করে তুলে রাখত উৎপাদিত ফসলের সিকিভাগ। পরের বছরের বীজের জন্য। আবার খরা, বন্যা, আকাল, মারী ইত্যাদি দেখা দিলে প্রাথমিকভাবে নিজেদের বাঁচাতে এই সঞ্চিত ফসলই হতো পরিবারের লোকজনের খাবারের উৎস। সেসব বিবেচনা করেই বোধকরি এই আচারটিকে চৈত্র সংক্রান্তির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।’
বাবার কথা শুনতে শুনতে কখন যে সন্ধে পেরিয়ে রাত ঘনিয়ে এসেছে, খেয়ালই নেই। হঠাৎ মৃগীরোগীর মতো কেঁপে উঠলো বাসু। ঠিক সেই সময়ে রাতের ঘন আঁধারের মায়ায় ভর করে বাবা হরের চেলাদের ঢাক পেটানো আওয়াজ কানে এল সবার।
‘হরগৌরী প্রাণনাথ
মাথার উপরে জগন্নাথ
এইবার উদ্ধার করো
শিবো শিবো শিবো বোম !’
আধ-খাওয়া আট কড়ইয়ের বাটি ফেলে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় লাগালো বাসু।
সংক্রান্তির আগের রাতে শ্মশানে আজ ধুন্ধুমার কাণ্ড। চিতার ছাইভস্ম, শবদাহের খড়ি, মাটি চাপা দেওয়া শিশুর মরদেহের হাড়গোড়, খুলি সংগ্রহ করা হবে আজ। এরজন্যেই দৌড়ঝাঁপ চলছে। আফিম, গাঁজার নেশায় বুঁদ ওই চার ব্রতধারী তখন ছুটছে আর ছুটছে। ওদের কারো পরনে লাল কাপড়ের বল্কল। কারো বা নীল, সবুজ, কালো। বাসুর ভাষায় লাল কালী। নীল কালী। ইত্যাদি।
এদের কেউ তুলে আনছে শ্মশান চুল্লীর পোড়া কাঠ। কেউ ছাইয়ের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তুলছে আধপোড়া হাড়, খুলি।
ঢাকের আওয়াজ যত তীব্র হচ্ছে, তার সঙ্গে বোম বোম বোম গানের দমকও বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্রতধারীদের খোঁজাখুঁজি। মাটির তলায় পুঁতে রাখা শিশুদেহের ভগ্নাবশেষও টেনে তুলছে ভাবের আবেশে।
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে শ্মশানের মিটমিটে বৈদ্যুতিক আলোয় বাসুর হঠাৎ চোখ গেল নীলকালীর দিকে। আধো অন্ধকার শ্মশানের টিমটিমে ধূসর আলোয় চুল্লীর বাঁ পাশের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা জুড়ে খুব ছোট বাচ্চাদের সমাধি। নীল রঙের কাপড় পড়ে গোটা শরীরে নীলচে রং মাখা নিতাই দু’পা ছড়িয়ে বসে আছে বাঁশের ঘেরাও দেওয়া এরকমই একটি সমাধির সামনে।একটি একটি করে বাঁশের খুঁটি তুলছে। তারপর অদ্ভুতভাবে নিজের দুই হাত ও মুখ দিয়ে আঁচড়ে কামড়ে সেই জায়গাটার মাটি খুঁড়তে লাগলো। চোখে মুখে অস্বাভাবিক এক আকুতি । খুঁড়ছে তো খুঁড়েই চলেছে। হাত দুয়েক খোঁড়ার পর বেরোতে লাগলো কচি হাড়ের ভগ্নাবশেষ।
গেল বছরের টাইফয়েডে নিতাইয়ের ছোটবোন, মাত্র দুবছরের যশোধরা চলে গেল। এটা যশো’র সমাধি। দুহাতে হাড়সুদ্ধ এক খাবলা মাটি বুকে নিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো নীল কালী নিতাই।
আজ মহাবিষু । চৈত্র সংক্রান্তি । চড়কের কালী এসেছে শ্মশানে। পুরসভা নিয়ন্ত্রিত শ্মশানটি তৈরি হয়েছে সেই পঞ্চাশের দশকে।
লাগোয়া পাড়ার লোকজন সবার দুপুরের খাওয়া হয়েছে কি হয়নি। বাচ্চা বুড়ো, বৌ ঝিয়েরা ভীড় করেছে শ্মশান চত্বরের চারদিকে। চোখে ভালো থাকার একরাশ নীল স্বপ্ন নিয়ে হাতে চুল্লী থেকে কুড়নো আধপোড়া একটা চ্যালাকাঠ নিয়ে ছুটে আসছে নিতাই। বন্ধুর সাহসে বীরবিক্রমে বাসুও আজ ছুটছে নিতাইয়ের পাশে পাশে। মুখে উচ্ছ্বসিত চিৎকার, ‘কালী আআআইছেএএ…!’
★★★★
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সবকিছু এই সেদিনের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে সুচেতার। অথচ হিসেব বলছে, সময়ের আলপথ্ বেয়ে
তিরিশ বছর পেরিয়ে এসেছে তারা।
একদার কিশোরী সুচেতা এখন নিজেই মা। তার মেয়ে সৃজা জেএনইউ’তে পড়ছে। বাসুও আর সে বাসুটি নেই। তার মেয়ে পড়ে ক্লাস নাইনে।
শিশুমন্দির স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সুচেতাদের নজরে পড়ল, তাদের কৈশোরে দেখা মালিনী বিলটাও লীন হয়ে গিয়েছে কালের গর্ভে। এক দুই তিন করে পাহাড়, মাঠ, বিল ছুঃমন্তর করে সবদিকে শুধু বাড়ি আর বাড়ি। ইটভাটা, গোডাউন, ফ্যাক্টরি মায় গাড়ির শোরুম, বিবাহ ভবন।
এতক্ষণে হালকা বাতাস বইতে শুরু করেছে।
বৃষ্টির পূর্বাভাস নয়তো !
বাসুকে পা চালাতে বলে সুচেতা। বাড়িমুখো হাঁটতে হাঁটতে বেশ বুঝতে পারে, বেলা শেষের নিজস্ব একটা বিষণ্ণতা আছে। আবছা অন্ধকার এসে সেই বিষণ্ণতার চাদর বিছিয়ে দিচ্ছে তাদের চারপাশে। দু’জনের মধ্যে কথা না হলেও নিতাইয়ের জন্য বুকটা হুহু করে ওঠল দু’জনেরই।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
