শিশির আজম

An Autumn Afternoon (1962)

‘এক শরতের বিকেল’ কি ওজুর লেখা এপিটাফ? হ্যা, সিনেমাটা ওজু ১৯৬২ সালে তৈরি করেন আর মারা যান ১৯৬৩ সালে। এটাই ওজুর শেষ সিনেমা। উল্লেখ্য, কুরোসাওয়ার পর বিশ্বচলচ্চিত্রে নিঃসন্দেহে সবচে সুপরিচিত জাপানি নাম ইয়াসুজিরো ওজু। বেঁচে থাকবার জন্য জীবনকে যেভাবে সহজ করে নেওয়া দরকার ওজুর সিনেমাও তেমন। আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের পরিধিতে যা আমরা দেখি ওজুর ক্যামেরা তাই আমাদের দেখায়। কেবল দেখায় না, মেঝে সমান উচ্চতায় চোখ রেখে দেখায়। সভ্যতা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে যত সমৃদ্ধ হোক বা উচ্চতায় উঠুক তাকে থাকতে হয় মাটির কাছাকাছি। ওজুর ক্যামেরা এভাবই জীবনকে দেখে, উপলব্ধি করে। যখন আমি প্রথম ওজুর সিনেমা দেখি, অবশ্যই তা Tokyo Story (1953) হবে, কোন নাটকীয়তা আমি অনুভব করিনি। এটা আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। তবে আমি বিস্মিত হইনি। কেন না জাপানি চিত্রকলার সঙ্গে আমি কিছুটা পরিচিত, বিশেষত ওদের প্রিন্টের কাজে।

ওজুর চলচ্চিত্রে যে নীরবতা আর ছোট ছোট দৃশ্য, এটা সময়ের অনিবার্যতাকে জোরালো করে তোলে। An Autumn Afternoon  সিনেমায় জীবনের স্বাভাবিক সরলতাকে আমরা ধীরে ধীরে এক গভীরতর উপলব্ধিতে পাই। এতে কোন তাড়াহুড়ো নেই, অস্থিরতা নেই, নাটকীয় সংলাপ নেই। জাপানের মানুষ ও প্রকৃতিতে যে সরলতা ও নিয়মনিষ্ঠতা আছে তা থেকে ওজুর ক্যামেরা আমাদের বঞ্চিত করেনি। আমরা জানি ওজুর সিনেমা টোকিওর নাগরিক জীবনকে বারবার তুলে ধরেছে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ের পার্সপেক্টিভে। আর দ্বিতীয় বিস্বযুদ্ধ পরবর্তী ক্ষতবিক্ষত জাপানকে নতুন করে নির্মাণেরও দরকার ছিল। কিন্তু ক্যামেরা কতটা পারে? ওজু জাপানকে দেখেছেন, বিশেষ করে টোকিওকে। টোকিও রয়েছে ওজুর অস্থিমজ্জায়। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানের এই ক্ষত আমরা দূর থেকে যেভাবে দেখি, অনুভব করি। ওজু সেভাবে দেখেননি। কেন না জাপানের ভিতরকার ক্ষত অতটা সহজ ছিল না। ভয়ংকর আঘাত সত্ত্বেও জাপানের বাহ্যিক উন্নতি থেমে থাকেনি। শিল্পায়নের অগ্রগতি বেড়েছে ঝড়ের গতিতে। কিন্তু মানুষের অন্তর্গত সত্তার মেরামত কীভাবে হবে? এর কোন সহজ চিকিৎসা কি আছে? জাপানি সমাজ কোন সময়েই এটা নিয়ে তেমন তোড়পাড় করেনি। সে চেয়েছে একটু একটু করে সুস্থির হতে। ওজু এটা অনুভব করেছেন। ওজুর সিনেমায় মহাকাব্যিক ব্যাঞ্জনা নেই, আছে ছোট ছোট পারিবারিক মুহূর্ত। যেমন এক কাপ চা, বাবা-মেয়ের মধ্যকার সংক্ষিপ্ত আলাপ, কারখানার চুল্লী বা এক মুহূর্তের নদী। দর্শক এগুলোকে স্টিল লাইফ ভেবেও ভুল করতে পারেন! হ্যা, ওজুর ‘এক শরতের বিকেল’ দেখতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পার্সপেক্টিভে দর্শকে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেন।

যেমন আমার মনে হয়েছে এই সিনেমা ওজুরই স্বদেশী আজকের জাপানের সবচে প্রভাবসঞ্চারী জগদ্বিখ্যাত কনটেম্পোরারি পেইন্টার ইয়ায়োই কুসামার অগুন্তি বিন্দুর সমষ্টি! এই বিন্দুগুলোকে আমরা আবার কবিতার একেকটা চিত্রকল্প ধরে নিতে পারি। কাঠামো-রুচি-প্রকৃতিতে এরা কত আলাদা। আবার সবটা মিলিয়ে একটা কবিতাসত্তা দাঁড়িয়ে গেছে। গেছে তো। যেমন আপাত বিচিত্র চরিত্র্যের ডটগুলো এক সুসমন্বিত টেক্সচারের মাধ্যমে যথার্থ এক পেইস্টিংয়ে রূপ পেয়েছে। এতে তত্ত্ব বা টেকনিকের কচকচি নেই, দার্শনিকতার গাম্ভীর্য নেই। সত্যি নেই? আছে। আর সেটা দর্শকের কাছে এতোটাই স্পর্শময় যে তা দর্সকের চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না, দর্শককে বিব্রত করে না, বিরক্ত করে না। হ্যা, দর্শক বিমুগ্ধ হন আর অবচেতনে জারিত হন গভীরতর দার্শনিক বোধে। আর এর সবটাতেই নিটোল সৌন্দর্যবোধের ব্যপার নেই। কেন না প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান একটু একটু করে সুস্থির হচ্ছিল। কিন্তু দু’দশকের ভিতরেই সে পড়ে যায় দ্বিতীয় বিস্বযুদ্ধের খপ্পরে। আর এই যুদ্ধ যে ক্ষত জাপানের বুকে বসিয়ে দিয়ে যায় তার সশ্রুষা তেমন সহজ ছিল না। এর ক্ষত মারাত্মকভাবে জাপানকে বয়ে বেড়াতে হয়। অর্থনীতির চেয়ে সামাজিক ও মনস্তাত্বিক বিপর্যয় জাপানকে প্রায় নিঃশেষ করে দেয়। রক্ষণশীল জাপানি মন ও মননের জগৎ অকস্মাৎ তছনছ হয়ে যায়। এর সহজ প্রতিকার ছিল না। এর সবটাই এসেছে ওজুর চলচ্চিত্রে। তবে উপরকাঠামোয় এর উল্লম্ফম তেমন তীব্র না।

যেমনটা সমসাময়িক বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে নির্মিত তার সমকালীন  সহকর্মী যেমন ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন বা রবার্তো রোসেলিনির কাজে আমরা দেখি। ওজুর ক্যামেরা যেমন মানুষের সমান উচ্চতায় চলে, তেমনি ওর ভেতরকার যন্ত্রণা-ক্ষত আর তিক্ত ইতিহাসবোধ বয়ে চলে ওর চলচ্চিত্রের অন্তঃসলিলে। যার উত্তাপ তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয় না। কিন্তু তার চলন বোধের অনেক গভীরে। শেষ অব্দি ওজুর ক্যামেরা মানুষের একেবারে কাছাকাছি থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, জীবনের ছোট ছোট ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের প্রতি তার রয়েছে আশ্চর্য অনুভব। বড় কিছুর প্রত্যাশায় জীবনের সরল সত্যকে হারিয়ে ফেলতে ওজুর অনীহা। একারণে ওজুর চলচ্চিত্রে বিপ্লবীয়ানা নেই, উল্লাস নেই, নাটকীয়তা নেই। যা আছে তা আমাদের সবার ভিতরেই আছে। হয় তো সবসময় তা আমরা দেখতে পাইনে। আমাদের বৈষয়িক উন্নতি আর ব্যাস্ততা হয় তো এক্ষেত্রে বাঁধা। হ্যা, ওজুর ক্যামেরা এই দেখাটা আমাদের দেখিয়ে দেয়। সময়ের প্রবাহ এবং প্রজন্মগত ফারাকের বিষন্ন উপলব্ধি ওজুর ক্যামেরা আমাদেরকে দেয়।

পুরনো প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ আর নতুন প্রজন্মের আধুনিকতার ভিতর রয়েছে এক বিশাল নীরবতা। এই নীরবতা অতি ভয়ংকর। কিন্তু এটা দেখাতে ওজু তার ক্যামেরাকে বাড়তি দায়িত্ব দেননি। এমন কি যখন উনি নদী বা নাগরিক নিসর্গের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন তখনও তার ক্যামেরাকে বড় জোর জানালা সমান উচ্চতায় দাঁড়াতে দিয়েছেন। মানে খুব সাধারণ মানুষের চোখ দিয়েই উনি জীবনের চলমানতাকে ধরতে চেয়েছেন। এই দেখাটার তুলনা চলে ক্লাসিক জাপানি পেইন্টাররা যেভাবে দিনের বিভিন্ন পর্বে অথবা বিভিন্ন ঋতুতে মাউন্ট ফুজিকে দেখেছেন সেভাবে। জাপানি চিত্রীদের এই বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে মাউন্টস্কেপ আঁকা আর ওজুর বিশ্বস্ত ক্যামেরায় সিটিস্কেপ ধরা একই। এই সিনেমার মূল চরিত্র একজন বাবা যে পেশাগতভাবে অবসরপ্রাপ্ত। তরুনী কন্যাকে নিয়ে তার বসবাস। মূলত বাবা-মেয়েকে নিয়েই কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। আহামরি বড় কোন প্লট নেই। আছে ছোট ছোট দৃশ্য যা গভীর মানবিক অনুভূতিতে প্রস্ফূটিত।

আমার তো কখনও কখনও মনে হয়েছে এটা সেজানের আঁকা এক নিঃসঙ্গ বাবার পোর্ট্রেট। ছোট ছোট কথা, হাসি আর বাস্তীর্ণ নীরবতা জীবনের গভীরতর উপলব্ধির কাছে আমাদেরকে নিয়ে যায়। এর ভিতর আছে বন্ধুত্ব আর মাতাল হওয়া। আমরা জানি ‘এক শরতের বিকেল’ ওজুর শেষ সিনেমা, শেষ রঙিন সিনেমা। কিন্তু রং তো বিষন্নতাকে, যন্ত্রণাবোধকে ঢাকতে পারে না। ওজু শরৎকে এক বিষন্নতাবোধের কাল হিসেবে দেখেছেন। ওজুর রংও অতি সাধারণ কিন্তু আলাদা চরিত্রের।  কেন না আমরা দেখি টেবিলে লাল মদের বোতল, জানালায় লাল পর্দা, দেয়ালে লাল আলো। আর এগুলো যেন একজন নিঃসঙ্গ বাবার বিষন্নতাবোধকে দর্শকের ভিতর চারিয়ে দেয়, অতি নিঃশব্দে। নীরবতাই ওজুর মূল অস্ত্র। আধুনিক জাপানে এক নিঃসঙ্গ বাবার বেদনাবোধকে কীভাবে আমরা উপলব্ধি করবো? এই কাজে ওজু নিজেকে শান্ত রেখেছেন। ওজুর ক্যামেরা এগোয় অতি ধীর গতিতে। যেন কোন তাড়াহুড়ো নেই। তার মনযোগ ছোট ছোট দৃশ্যে। মানে দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট কাজগুলো, দৃশ্যগুলো হয় তো আমরা গুরুত্ব দিইনে। অথচ এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই আমাদের জীবনের সারাৎসার। এগুলোকে বাদ দিলে দেখা যাবে জীবনের সবটাই ফাঁকা। ওজু এমনটা ভাবতে পেরেছেন। একারণে ওজুর চরিত্ররা বেশ নিস্তরঙ্গভাবে চলাফেরা করে, কথা বলে, হাসে, দৈনন্দিন কাজকর্ম করে। কিন্তু এতে উন্মোচিত হয় জীবনের গভীরতর সত্য। এই সত্য অমোঘ। আধুনিকতার চাকচিক্য, প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধি এই সত্যকে আড়াল করতে পারবে না। কোন সমাধান ওজু খোঁজেননি, দিতেও চাননি। কিন্তু একজন বাবার বেদনার্ত অনুভূতি আমাদের সবার ভিতর তো জারিত হয়ে যায়। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *