শিশির আজম

Nanook of the North (1922)

সংগ্রাম করেই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। জয়নুল আবদিন বা সুলতানের যে মানবমানবীকে আমরা প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাংলা ব-দ্বীপের প্রতিকূল পরিবেশে  টিকে থাকতে দেখি, সেই তারাই তো বেঁচে থাকবার লড়াইয়ে নিমগ্ন আফ্রিকায়, ওশেনিয়ায় অথবা উত্তর মহাসাগরের রুক্ষ বরফাচ্ছন্ন দ্বীপে। হয় তো জীবনধারা, সংস্কৃতি, ভৌগলিক অবস্থান আলাদা। কিন্তু ক্ষুধা, যৌনতা আর রক্তের স্ফূরণ তো এক। এটা জয়নুল-সুলতান যেমন জানেন, ফ্লাহার্টিও জানেন। সোমনাথ হোরের চাষীরা যখন ঘরের আলোআঁধারিতে রুদ্ধদ্বার আলোচনায় নিমগ্ন,  ভ্যান গঘের চাষীপরিবারের অস্বচ্ছল টেবিলের প্লেটে যখন আমরা কেবল কয়েকটা সেদ্দ আলু দেখি, অথবা বেলা তার (Bela Taar) তার The Turin Horse (২০১১) চলচ্চিত্রে পিতা-কন্যার ছোট্ট পরিবারের খাবারের টেবিলে যখন কয়েকটা মাত্র আলুসেদ্দই প্রতাদিনের খাদ্যতালিকায় দেখান, সেটা সাধারণ মানুষের প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকবারই প্রয়াস হিসেবে দেখা যায়। পিট সিগার যখন গেয়ে ওঠেন, ‘ফুলেরা সব কোথায় গেল?’ –এই হাহাকার তখন আমাদের সবার ভিতরেই জারিত হয়। কেন না পশ্চিমের অপরাসীম লোভ আর হিংস্রতায় এই ফুলেরা আমেরিকার দক্ষিণসহ ফাঁপা-জৌলুসময় ঝা-চকচকে নাগরিক সভ্যতা থেকেই হারিয়ে গেছে। সব ফুলই কি হারিয়ে গেছে। যায়নি হয় তো।  সেই ফুলগুলোকেই খুঁজে পেতে হবে আমাদের। এটাই আমাদের লড়াই। চলচ্চিত্রের ভিতর প্রচুর চিত্র থাকবে, সুসমন্বিতভাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চিত্রসমূহ কত দ্রুততম সময়ে দর্শকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবে, দর্শকের ভাবনা, চেতনা, অভিজ্ঞতায় নিজেকে যাচাই করে নেবে, সেটা বড় এক ব্যাপার। কথাগুলো বলছি যখন Nanook of the North (1922) আবার আমি দেখছি আর অনুভব করছি নিজস্ব বিশেষ প্রতিবেশ-পরিবেশে মানুষের জীবন যাপনের নিত্য লড়াই আর সংগ্রাম কীভাবে সেলুলয়েডের পর্দায় উঠে আসতে পারে, ভিন্নতর রূপবিন্যাস আর জ্যামিতিক শৃঙ্খলায়! হ্যা, এই ডকুমেন্টারিটা দেখতে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেছে পল গগাঁর তাহিতি দ্বীপের কথা। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ তাহিতি আর কানাডা অধ্যুষিত আর্কটিক কিউবেকের হাডসন বের নিকটবর্তী ইনুকজুয়াক তো ভৌগলিক ও জলবায়ুগত দিক থেকে একেবারেই আলাদা। শিল্প নির্মাণের দিক থেকে গগাঁ আর ফ্লাহার্টির এ্যাটিচ্যুডও আলাদা। কিন্তু সংগ্রাম তো একই। একই মানুষ, যারা আমাদের তথাকথিত সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। রবার্ট জে ফ্লাহার্টি (১৮৮৪-১৯৫১) মূলত আমাদের দেখান ইনউইট উপজাতির জীবন সংগ্রাম। আর্কটিক অঞ্চলে ১৯২০ সালের আগস্ট থেকে ১৯২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত ফ্লাহার্টি শুটিং করেন। এই কাজে উনি সঙ্গে নিয়েছিলেন ৭৫ হাজার ফুট র’ ফিল্ম, হলবার্গের ইলেকট্রিক লাইট, একটা প্রজেক্টর, দুটো একলে ক্যামেরা আর একটা প্রিন্টার। সিনেমাটা শুরু হয়েছে সিন্ধুঘোটক শিকার উৎসবের মধ্য দিয়ে। তারপর সিল মাছ শিকার, উত্তর মহাসাগরের প্রবল শীতে এস্কিমোদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয় ইগলু (বরফের ঘর) তৈরি। এ ছবির নায়ক নানুক। ইনউইট মিথ অনুযায়ী নানুক হলেন মেরুভল্লুকদের প্রভু। শিকারীদের সাফল্য-ব্যার্থতা তারই ইচ্ছাধীন। সেখান থেকে নামটি নেওয়া। নানুক চরিত্রে ফ্লাহার্টি পছন্দ করেছেন আল্লাকারিয়াল্লাককে। নাইলা আর কুনাইউ নানুকের দুই স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বাকিরা সবাই স্থানীয় ইনউইট। অনেক সমালোচক অভিযোগ করেছেন ফ্লাহার্টি প্রামাণ্যচিত্রের চিরাচরিত মূল্যবোধকে অবহেলা করেছেন। নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করতে বাস্তবচ্যূত হয়ে ইনউইটদের জীবনের রোমাঞ্চকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই এই সিনেমাকে ডকুমেন্টারি বলা যাবে কি না তা নিয়ে তারা সন্দিহান। এ কথা সত্যি, সাধারণ মানুষের জীবনের সত্য গল্পগুলো বলার ক্ষেত্রে যে অসাধারণ ন্যারেটিভ স্কিল  ফ্লাহার্টি দেখিয়েছেন তা বোদ্ধা দর্শককে বিস্মিত না করে পারে না। পরিচালক কিছু স্বাধীনতা নিয়েছেন। উনি দেখলেন ছবিটা অনেকটা ট্রাভেলগ ফিল্মের আবেশ ধরে আছে। তাই উনি চাইলেন এস্কিমো পুরুষ আর তার পরিবারের গল্প বলতে, গভীর ব্যাঞ্জনায়, মাল্টি-পার্সপেকটিভ বর্ণনারীতিতে। একাজে তাকে নানুক আর তার পরিবারকে দিয়ে কখনো কখনো অভিনয় করিয়ে নিতে হয়েছে যেটা ফিচার ফিল্মের চরিত্রের সঙ্গে মেলে। কিন্তু নানুকের পরিবারের যে সংগ্রাম ফ্লাহার্টি দেখাতে চেয়েছেন সেটাতে তো কোন মিথ্যে নেই। মিথ্যে ছিল না গগাঁর তাহিতি পিরিয়ডের চিত্রমালাতেও। সেটাও এক মহাকাব্যিক পরিভ্রমণ। প্যারির নাগরিক সভ্যতার প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে গগাঁ অনেকটা পালিয়ে গিয়েছিলেন ফরাসিদেরই কলোনি সুদূর তাহিতি দ্বীপে। আর সেখানে থেকে গিয়েছিলেন। বিয়ে করেছিলেন তাহিতি কন্যাকে আর তাহিতি কন্যার পিতাও হয়েছিলেন। বিনা চিকিৎসায় সেখানে মারাও গিয়েছিলেন। ফ্লাহার্টির ব্যাপারটা আলাদা। উনি ফরাসি অর্থ সহায়তায় রুক্ষ বরফাচ্ছন্ন আর্কটিক অঞ্চলে গিয়েছেন, ইনউইট উপজাতির বেঁচে থাকা আর লড়াইয়ে বিস্মিত হয়েছেন, বিশাল ক্যামেরা দিয়ে শুটিং করেছেন, আমেরিকায় ফিরে এসেছেন। বলা যায় পুরোটাই প্রফেশনাল ব্যাপার। ১৯২২ সালে সিনেমাটা রিলিজ হলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বিপুল পয়সা আয় করে সিনেমাটা। সেসময় অনেকে অভিযোগ করেন ফ্লাহার্টি দারিদ্র্য বিক্রি করে সফলতা অর্জন করেছেন। অবশ্য এ অভিযোগও তো নতুন না। ‘পথের পাঁচালী’র সফলতার পর সত্যজিৎকেও এমনটা শুনতে হয়েছে। এতোকিছুর পর শিল্পের ইতিহাস আলাদা। সেখানে ফ্লাহার্টি মায়েস্ত্রো। Nanook of the North সিনেমার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে প্রথম বিখ্যাত ডকুমেন্টারি।  এর পূর্বে আর কোন ডকুমেন্টারি সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও নন্দনতাত্বিক দিক থেকে দর্শকের চিত্তে এতোটা নাড়া দেয়নি। এমন কি পরবর্তীতে মোয়ানা (১৯২৬), ‘ম্যান অব এ্যারন’ (১৯৩৪), ‘টুয়েন্টি ফোর ডলার আইল্যান্ড’ (১৯২৭) বা ‘ল্যুজিয়ানা স্টোরি’ (১৯৪৮)-র মতো মাস্টারক্লাস ফিল্ম তৈরি করলেও তা কোনভাবেই ‘নানুক অব দ্য নর্থ’র সফলতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। অবশ্য ডকুমেন্টারির কথা বলতে গিয়ে সোভিয়েত ফিল্ম মায়েস্ত্রো ঝিগা ভের্তভের ‘Man with a Zmovie Camera (১৯২৯)-র কথা উল্লেখ না করলে সিনেমার ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সোভিয়েত চলচিত্রকরগণ সিনেমাকে মানুষের বেঁচে থাকা আর সংগ্রামের সঙ্গে যেভাবে মিলিয়ে নিতে পেরেছেন সেটা পৃথিবীর সব চলচ্চিত্রকর্মীকেই অনুপ্রেরণা দিয়েছে। ‘ম্যান উইথ আ মুভি ক্যামরা’ এর একটা উদাহরণ কেবল। এমন কি আইজেনস্টাইন যে Battleship Potemkin (১৯২৫) বা October (1928) নির্মাণ করলেন তাও কি প্রামাণ্যচিত্রের চিরাচরিত চলন থেকে খুব আলাদা? আসলে ডকুমেন্টারিতে জীবনের স্পন্দন প্রত্যক্ষভাবে যেমনটা পাওয়া যায় তেমনটা ফিচার ফিল্মের কাছ থেকে হয় তো আমরা আকাঙ্ক্ষা করিনে। হ্যা, তাজা জীবনবাস্তবতা ছাড়া কোন আর্টই যথাযথ রূপবিন্যাসে জ্যামিতিক শৃঙ্খলা পায় না। ফিচার ফিল্মও তাই। তবে কাহিনীচিত্রে চলচিত্রকারগণ সম্ভবত শিল্পের টেকনিক্যাল ও নন্দনতাত্বিক জ্বরগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যেটা ডকুমেন্টারিতে করতে গিয়ে দ্বিধান্বিত হতে হয়, হয় তো। ডকুমেন্টারিতে জীবনের উত্তাপ পাওয়া যায় সরাসরি। একারণে জহির রায়হান ক্যামেরায় তুলে আনেন Stop Zenocide আর জাফর পানাহিকে সৃষ্টি করতে হয় This is not a Film (2011)। ঋত্বিক ঘটকের ‘আমার লেনিন (১৯৭০) বা ‘দুর্বার গতি পদ্মা, (১৯৭১) বা ‘রামকিঙ্কর’-র কথা উল্লেখ করা দরকার। ল্যাতিন আমেরিকাকে ডকুমেন্টারির সূতিকাগার বলা যেতে পারে। এখনও ল্যাতিন আমেরিকা সম্ভবত সিনেমার সেই জোন যেখানে ফিচার ফিল্মের চেয়ে প্রতি বছর ডকুমেন্টারি তৈরি হয় দ্বিগুণ সংখ্যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী যে সাম্রাজ্যবাদের থাবা দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ওপর চেপে বসেছিল সেটাকে আক্রমণ করতে চাওয়া বা বুঝে নিতে পারাই কি এর কারণ? এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কি সাম্রাজ্যবাদের শকুনছায়া দক্ষিণে পড়ে নেই? বিপ্লব পরবর্তী কিউবাতে এই প্রক্রিয়ার শুরু। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে পরো ল্যাতিন আমেরিকাতে, বিশেষত আর্জেন্টিনায়, ব্রাজিলে, নিকারাগুয়ায়, ভেনেজুয়েলায় ও বলিভিয়ায়। The Hour of Funnaces (1968) যেন রক্ত দিয়ে লিখেছেন দুই আর্জেন্টাইন অক্তাভিও গেতিনো আর ফারনান্দো সোলানাস। এভাবে আমরা পেয়ে যায় The Motorcycle Diaries (২০০৪), The Edge of Democracy (২০১৯)সহ গণমানুষের তাজা রক্ত দিয়ে লেখা অসংখ্য তথচিত্র। এইসব প্রামাণ্যচিত্র কেন আমাদের এতো টানে? এর প্রধান কারণ সম্ভবত সত্যনিষ্ঠতা। ‘নানুক অব দ্য নর্থ’-য়ে এই সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ আমরা পাই ফ্লাহার্টির কাছ থেকে। কি নিবিড় শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় উনি এঁকে চলেছেন নানুক পরিবারের জীবনছবি! এই ছবি কি আমাদের নাগরিক সভ্যতার ফাঁপা জৌলুসকে প্রশ্ন করে না? এই মুভি দেখতে গিয়ে দর্শকের চেতনায় এই প্রশ্ন উঁকি দেওয়া স্বাভাবিক।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *