শিশির আজম

আন্দ্রেই রুবলভ (১৯৬৬)

‘আন্দ্রেই রুবলভ’ দেখতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে আমি কবিতা পড়ছি। তারকোভস্কির সিনেমা তো আসলে কবিতাই। ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’-এর পর ‘আন্দ্রেই রুবলভ’ তারকোভস্কির দ্বিতীয় ফিচার ফিল্ম। ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’ মুক্তি পায় ১৯৬২ সালে আর ‘আন্দ্রেই রুবলভ ১৯৬৬ সালে। প্রথম মুভিতেই কবিতা ছিল। আর দ্বিতীয় মুভি সুবিশাল সময় পরিসরের ‘আন্দ্রেই রুবলভ’ তো ১০ লাইনের ছোট্ট একটা কবিতা যার অনুরণন দর্শকের চেতনায় সর্বগ্রাসী। তারকোভস্কিকে বলা হয় ‘সিনেমার কবি’। আবার কেউ কেউ বলেন ‘সিনেমার বুদ্ধ’। হ্যা, আমরা জানি, তারকোভস্কির পিতা ইউক্রেন বংশোদ্ভূত আর্সেনি তারকোভস্কি ছিলেন রাশিয়ার একজন জনপ্রিয় কবি। এই কবি পিতার প্রভাব তারকোভস্কিকে জীবনভর আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এই পারস্পর্য থেকেই হয়তো রাশিয়ায় ১৫ শতকের আইকন পেইন্টার ও কবি আন্দ্রেই রুবলেভকে নিয়ে তারকোভস্কি নির্মাণ করেন ‘আন্দ্রেই রুবলভ’। তারকোভস্কির সেই আইকনিক দীর্ঘ দীর্ঘ শটের সমষ্টি এই সিনেমা যা চিত্রশিল্পী রুবলভের দুর্বিনীত সময়ের দাসত্বের মধ্যে লড়াই আর আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায়। রুবলভের ছিল শিশুর নিষ্কলুষ দৃষ্টি অথচ তার সামনে ঘটে চলছিল একের পর এক পাশবিক হিংস্রতা ও নারকীয় ভয়াবহতা। রুবলভ চেয়েছিলেন শুভচেতনা দিয়ে মানবিক পৃথিবী গড়তে। এর জন্য পঙ্কিল ও ব্যধিগ্রস্ত পৃথিবীকে পরিবর্তন করা দরকার। একাজে মানুষের ভিতর সহমর্মীতার উন্মেষ দরকার। এই আকুতিই রুবলভকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তাড়িত হয়েছেন তারকোভস্কি। এই সিনেমায় প্রথমেই আমরা গরম বায়ুচালিত একটি বেলুন ওড়ানোর কশরত দেখি। ইয়েফিম নামে একজন বেলুনের নিচের দড়িকে বর্ম হিসেবে ব্যাহার করে উড়তে চেয়েছিল। কিন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় কিছু অজ্ঞ মানুষের নিষ্ঠুরতায়। এখানে আমরা দেখি একটি বিষন্ন ঘোড়ার গড়াগড়ি। ঘোড়া প্রতীক তারকোভস্কির সিনেমায় আমরা বারবার দেখি। কিন্তু তা বাকুড়ার ঘোড়া বা ফিদা হুসেনের ঘোড়া থেকে অবশ্যই পৃথক। যদিও ট্র্যাডিশনের দিক থেকে রুশ আর ভারতের ঘোড়ায় মিল আছে। জয়নুলের চিত্রে যেমন কাক, দালির চিত্রে ঘড়ি বা পিঁপড়ে, তেমনি তারকোভস্কির ক্যামেরায় ঘোড়া। ঘোড়া মারাত্মক সব ইমেজ নিয়ে ওর সিনেমায় হাজির থাকে। বলে রাখা ভাল, ‘আন্দ্রেই রুবলভ’র অনেকগুলো ভার্সন বাজারে আছে। এটা হয়েছে রাষ্ট্র কর্তৃক শিল্পীর স্বাধিনতায় পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাবোধ না থাকার কারণে। একটানা সতেরো বছর তারকোকস্কিকে সিনেমার বাইরেও থাকতে হয়েছে। সশরীরে উনি ইউরোপকে কাজের ক্ষেত্র করেছেন জীবনের শেষ দিকে। যদিও ওর ডায়েরিতে আমরা উল্লেখ পাই, ওটা ছিল রাজনৈতিক উৎপাত থেকে মুক্তি পেতে উত্তপ্ত কড়াইতে ঝাঁপিয়ে পড়বার মতো অবস্থা অনেকটা। আমরা জানি তারকোভস্কি একাধারে ফিল্মমেকার, লেখক, ফিল্ম এডিটর ও ফিল্ম থিওরিস্ট। অনেক সিনেমাবোদ্ধার মতে আইজেনস্টাইনের পর তারকোভস্কিই রাশিয়ার সবচে বিখ্যাত ফিল্মমেকার। যা হোক, তারকোভস্কির অন্যান্য সিনেমার মতো এই সিনেমায়ও যে এতো এতো লং শট  আর মন্থর গতির স্বতস্ফূর্ত সিনেমাটোগ্রাফির ব্যবহার তা কি কেবলই কবি পিতা আর ধ্রুপদী চিত্রশিল্পী আন্দ্রেই রুবলভের আধ্যাত্মকতা থেকে প্রাপ্ত? আর লং শটের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার? আর অপ্রচলিত প্লট কাঠামোয় ক্যামেরার মন্থর চলন? এটার কারণ সম্ভবত সময়ের অনুভূতিতে দর্শকের মনোনিবেশ নিবদ্ধ করা। সাধারণত আমরা দেখি, পরবর্তীতে কী ঘটবে এই উত্তেজনায় দর্শক আবদ্ধ থাকে। তারকোভস্কির অভীষ্ট লক্ষ্য আলাদা। উনি চান বর্তমান সময়ের অনুভূতিতে স্ফূরিত হয়ে দর্শক কালের অচলায়তন ভাংতে অনুপ্রাণিত হবেন। দর্শক ঐ সময়ের ল্যান্ডস্কেপ বা পোর্ট্রেটের কালহীন অনুভূতিতে জারিত হবেন। এমন কি শূন্য ফ্রেমও হয়ে উঠবে অপ্রচলিত ও নিজস্বতায় তাৎপর্যপূণ। আমরা জানি, তারকোভস্কি অল্প সময়ের জন্য মিউজিক স্কুলে পড়েছেন,  ড্রইংয়ে হাত পাকিয়েছেন, গোপনে কবিতাও লিখেছেন। কবিতার প্রতি এই আগ্রহই তারকোভস্কিকে দিয়ে ক্যামেরার মাধ্যমে লিখিয়ে নিয়েছে ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’, ‘আন্দ্রেই রুবলভ’, ‘মিরর’, বা ‘স্টকার’র মতো একটার পর একটা কবিতা। অবশ্য ওর ফিল্মের সংখ্যা হাতেগোনা। ৭ টি ফিচার ফিল্ম, ১ টি প্রামাণ্যচিত্র। সবগুলোই কবিতা। হ্যা, ছোট্ট একটা কবিতা এইমাত্র আমি পড়ে শেষ করলাম, ২২৫ মিনিট সময়পর্বের। কবিতার নাম ‘আন্দ্রেই রুবলভ’। প্রতিভাস ম্যাগাজিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *