পাতাউর জামান
পুকুর থেকে খাড়াই উঠে যে ঢালটা রাস্তাতে মিশেছে রাজহাঁসের গলার মতো বাঁক নিয়ে, ঠিক সেখানেই, মাসকুরা বিবির উঠোন। উঠোনে বটনে কাঠের উপর মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে মাসকুরা বিবি। বসবে নাইবা কেন? রাগের মাথায় কত কথাই না বলেছে মইদুলকে। কিন্তু যখন বলেছিল মর মর মর, তখন কী তার হুঁশ ছিল। সোমত্ত ছেলে, এই সেদিন হল দুধের দাঁত ভেঙেছে, এখন থেকেই কথা শোনে না, কি জানি কী আবার করে বসে। ডান হাতে রজনের ডাঁটা অর্ধেক কোটার পর তালুবন্ধী হয়ে পড়েছিল দাফন করার আগের লাশের মতো। সকালে গুলিবুড়ির কাছ থেকে কয়েকটা চারাপোনা চেয়ে এনেছিল। ডাঁটা দিয়ে চারাপোনার ঝোল খেলে শরীরে বল আসে, গায়ে রক্ত হয়, ব্যাথা ব্যাদনা সারে। গতকাল রাত থেকে দানাপানি ঠিক পড়েনি। তারপর সেই…
ঠিক সেই সময় সম্রাট এসে আচাড় খেয়ে পড়ে, চাচী মইদুল গলায় দড়ি দিয়েছে।
মাসকুরা বিবির জাহান অন্ধকার হয়ে যায়। উঠোনের রোদটা কেমন যেন একটা ঘসা কাঁচের দৃষ্টির মতো দুলছে। বটির উপরে ফালফালি হওয়ার আগে সম্রাট গিয়ে ধরে ফেলে।
লকডাউনের বাজারে হাতে কাজ না থাকায় দুই বন্ধু প্রায় রাতে জলকরের পাড়ে ফোন ঘাটতে ঘাটতে সেই একই পরিকল্পনা করত। লকডাউন ছাড়লে দোলন আর মইদুলের সম্পর্ককে কীভাবে ম্যানেজ করবে। আদিবাসী পাড়া আর মোল্লা পাড়ার মধ্যে ব্যবধান একটা সরু প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনা মাত্র। ব্যাস এইটুকু। গেল ভোটে যতই আলাদা আলাদা করে প্রচার করো হোক না কেন –‘আদিবাসীপাড়া আর মোল্লাপাড়া আলাদা’, ওটা ছিল আসলে মাইকের আওয়াজ মাত্র। যদিও কয়েক জন বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। কিন্তু মইদুল আর সম্রাট বিশ্বাস করেনি। করেনি কারণ ক্রমশ মিথ্যা আওড়ালে সেটা আর যাই হোক, সত্যি হয় না।
পরিকল্পনাটা সেরে ফেলেছিল বর্ধমান থেকে সাইকেলে করে বাড়ি ফেরার সময়। সম্রাটকে বলেছিল, তুমি তোমাদের পাড়াটা দেখ। আমি আমারটা বুঝে নেব।
সম্রাট বলেছিল, তা নয়া হয় করলুম দোস্তো। কিন্তু ভেবে দ্যাখো দোলনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেউ মানবে না। একে অন্য ধর্মের, তার উপর সরদার।
মইদুল বলেছিল, সরদারের রক্ত নীল আর মোল্লার রক্ত লাল – তাই না!
সম্রাট আর কথা বাড়ায়নি। কোনো যুক্তি এখানে খাটে না। হাইওয়ের পাশে যেভাবে নীল মেঘগুলো ওদের মাথার উপর সঙ্গী হয়ে দুলে দুলে যাছে, যেভাবে পিছন থেকে হালকা বাতাস ওদের সাইকেলকে ঠেলে ঠেলে দিচ্ছে – এসবের যেমন কোনো যুক্তি হয় না।
মইদুল গলা ছেড়ে গান ধরে, মাহি ম্যানো স্যাদিও না কে তেরে বিন দিল নইও ল্যাগদা।
এই গান দিয়েই মইদুল কিস্তিমাত করেছিল। সেবার চাঁদরাতে খেলার মাঠে সবাই ফিস্ট করছিল। এমনিতে মইদুলের গানের গলা ভালো। সবাই চেপে ধরে মইদুলকে গান করতে। মইদুল শুরু করেছিল কুমার শানু দিয়ে, জি তা থা জিসকে লিয়ে। মাঠ ভর্তি লোকের সে কি হল্লা। মইদুল লজ্জা পেয়ে, একটু আসছি বলে সম্রাটকে নিয়ে চলে এসেছিল। রাস্তায় দোলনের সঙ্গে দ্যাখা। কী ভালো গানই না গাস তুই, বলে দোলন দমকে হেঁসেছিল।
দোলনদের বাড়ি সম্রাটদের বাড়ির পেছনে, ভানুকাকার মেয়ে। মইদুলের বাপ ও ভানুকাকা এক সঙ্গে হাড়িয়া খেত, মাঠে কাজ করত। মায়ের মুখে শুনেছে, বিয়ের সময় ভানুর খাওয়া দেখে তোর নানা তাজ্জব হয়ে গেছিল। একদমে আশিখান মিষ্টি খেয়ে নিয়েছিল। যতবার সম্রাটদের বাড়িতে গেছে, ততবার দোলন চলে এসেছে ওদের বাড়িতে। সম্রাটদের একই ঘরে খাওয়া বসা শোওয়া। সেখানে বসে সবাই কত গল্পও না করেছে। জুব্বারের ভটভটিতে এক সঙ্গে হাড়োয়ার মেলাতেও গেছে।
রাস্তায় আলোর কোনো বালাই নেই। খেলার মাঠের হ্যালোজেনের আলোর তীব্রতায় এদিকটার অন্ধকার অনেক হাল্কা। মইদুল ফোনটা বের করে। সম্রাটকে বলে দোস্তো একটু এগিয়ে চলো, আমি আসছি, বলে দাঁড়িয়ে যায়। সম্রাট মইদুলের সব কথা জানে।
দোলনও হাঁটার গতি কমিয়ে ছিয়েছিল। সম্রটের চলে যাওয়াতে আর দোলনের হাঁটার গতি আরো কমে যাওয়াতে, দুজন দুজনের কাছাকাছি চলে আসে। এদিকটাতে কেউ ছিল না। ছিল শুধু আলো আধাঁরির একটা নীরবতা, দুজনের প্রতীক্ষা আর নিঃশ্বাসের শব্দ। মইদুল খুব দ্রুত দোলনের সামনে চলে আসে। শক্ত করে জড়িয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরার আগে আইলাবয়ু বলে। একটা দীর্ঘ সম্মতিতে দোলন জড়িয়ে থাকে যেভাবে মাধবিলতা সুপুরি গাছে জড়িয়ে থাকে। সময় দেশ কালের অনুভুতি শূন্য হয়ে কতক্ষণ দুজনেই জড়িয়ে ছিল, জানে না। সামনের বাঁকে একটা সাইকেলের ঘন্টি বেজে ওঠে। তড়াৎ করে দোলন ঘাই মেরে অন্ধকারে মিশে যায়। একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, কে?
মইদুলের মনে কোনো ভয় নেই। বলেছিল, আমি।
- আমি কে?
- আমি? মইদুল। লতিফ মোল্লার ছেলে।
সাইকেলটা সামনে চলে এসেছিল। মইদুল আবছায়ায় বুঝতে পারে ওপাড়ার হারানচাচা। সরদার পাড়ায় নাপিতের বৌতের কাছে হাড়িয়া খেতে গেছিল বোধ হয়।
- আর এক জনকে চলে যেতে দেখলাম যেন!
মইদুল বলেছিল, চাচা ডাক্তার দেখাও। কে আর থাকবে, আমিই ছিলাম। বলে পকেট থেকে ফোন বের করে হাঁটা লাগায়। জোর গলায় গান ধরে, ও মধু, ও মধু, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ।
ঝোপের আড়ালে দোলন বসে অন্ধকারকে সঙ্গে নিয়ে হাঁসছিল। মইদুল তখন গান শেষ করে ফোনে, দোস্তো কোথায় তুমি। দোলন মইদুলের গানের রেশ কোথায় রাখবে ভেবে পাচ্ছিল না।
পরেরদিন সকাল বেলা যখন মইদুল সম্রাটের বাড়ি গেছিল, দোলন এসে বসেছিল। সম্রাটের মায়ের হাতের কাজে সাহায্য করছিল। সম্রটের মা বলেছিল, যা তো দোলন, উনোনের ভাতের হাড়ির সরাইটা আগলে দিয়ে আয়। বাইরের উনোনে বসানে হাঁড়িতে উপরের তালপাতার ছাঁয়া এসে পড়ছিল। সম্রাটের মায়ের কথা মতো সরাই আগলাতে গিয়ে হাতে ছ্যাকা খায় দোলন। আও বলে আঙুলটা মুখের মধ্যে পড়ে। মইদুল থুড়কি লাফে উনোনের কাছে এসে দোলনের হাত ধরে। হাতের বুড়ো আঙুল ভাতের ফ্যান পড়ে লাল হয়েছে।
মইদুলের হাত ধরাতে ঠিক ততটাই লাল হয়েছিল লজ্জায় দোলন, যতটা নতুন বৌএর রাঙা হওয়া সাজে। দোলনের সরু কোমর ঝুঁকে চিকন নাক দিয়ে গরম ভাতের ভাপের থেকেও গরম নিশ্বাস পড়ছিল। সম্রাট আসতে মইদুল হাত ছেড়ে দিয়েছিল। ঘরের ভেতর থেকে সম্রাটের মা ডাক দেয়, আয় আবাগী একটু সর্ষের তেল হাতে মেখে নে। কপাল যখন পুড়িয়েছিস, তখন হাত পুড়িয়ে কী লাভ।
মইদুল সম্রাটের দিকে তাকায়, সম্রাট দোলনের দিকে। দোলন তখন পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে উঠোনের মাটি খুঁটছিল।
তারপর পাঁচ কান হতে আর বেশি সময় লাগেনি। মইদুলের মা, মাসকুরা বিবির কানে সেবার গুলিবুড়ি পান খেতে খেতে কথাটা পেড়েছিল, হ্যাঁ গা মইদুলের মা কী কথা শুনছি তোর ছেলের নামে!
মাসকুরা বিবি যেন জানে না, এমন মুখ করে বলে, কী কথা গো গুলিবুড়ি?
- অই তোমার ছেলে নাকি সরদার মাগীর সাথে ইন্টুপিন্টু করছে!
মাসকুরা বিবির ব্রহ্মতালু জ্বলে গেছিল, কে বলল তোমায়?
– ছেলানি রাখ। যেন কিছুই জান না। নাকি তোর সম্মতি আছে এতে।
– দ্যাখ শাশুড়ি সম্পর্কে হও, শাশুড়ি থাক। বেশি বাজে কথা বলতে এস না। ছেলের বাপ নেই বলে যা মুখে আসে তাই বলবে। আজ মইদুলের বাপ বেঁচে থাকলে পাড়ার কারো সাহস থাকত একথা বলার।
– দ্যাখ বৌ অতশত বুঝিনে। যা শুনলুম তাই বলছি। তা সত্যি না হলে তোর এত গা জ্বলছে কেন!
– জ্বলবে না, ছেলে যে আমার। আর আমারই সামনে আমার ছেলের বদনাম গাইছো…
গুলিবুড়ি পরে আর কথা বাড়াইনি। মাসকুরার চরিত্র গুলিবুড়ি জানে। একবার ঝগড়া বাঁধালে গোটা পাড়া মাথায় তুলবে। গুষ্টির তুষ্টি করবে। তার থেকে মানে মানে আর একটা পান খেয়ে গুলিবুড়ি কেটে পড়েছিল।
ছেলের বদনামে মাসকুরা বিবির মাথা ঠিক থাকে না। সোনার টুকরো বাপ আমার। কোনো কাজে রা নেই। বাপ মারা যাওয়ার পর থেকেই সংসারের হাল ধরেছে। বাপ মারা যাওয়ার সময় মইদুল ক্লাস ফাইভে পড়ত। আর যেতে পারেনি। জমিজমা বলতে ভিটেবাড়ি শুধু। মাসকুরা এরকাছ থেকে ওর কাছে থেকে চেয়ে চিনতে, জলকরের ভূমিহীনের অনুদানে সংসার চালাচ্ছিল। কিন্তু এভাবে আর কতদিন। বড়োভাই, উত্তরঘেরির মালিক, একদিন ধরেছিল, ছেলেটাকে আমার বাড়িতে মাইনে রাখ। হাজার টাকা করে পাবি। ছোটো ছেলে কী আর পারবে। টুকিটাকি আমার বাড়ির কাজ, মাঠে পান্তা নিয়ে যাওয়ার করবেখন।
মাসকুরা কিছু বলেনি। মইদুল তখন স্কুল থেকে ফিরে আমানি দেওয়া ভাতে লঙ্কা লগড়াচ্ছিল। ভাতের থালা ফেলে রেখে, বুক চিতিয়ে বলেছিল, আমি সব পারি চাচা।
সেই মইদুল এখন দামড়া, জোয়ান। কুলোরমতো চ্যাটালো হাত। পায়ে দশ নম্বর জুতো লাগে। নাকটা টিয়া পাখির মতো। গায়ের রং পুড়ো তামাটে হয়ে গেছে। শরীরে একটুকুওও মেদ নেই। এক সময় লাগছিল, যখন বড়োভার বাড়িতে ফাই ফরমাসির কাজ করছি। আঠেরো বছর বয়েসেও সেই হাজার টাকা। একদিন মা বড়োভার কাছে বলেছিল, এবার মাইনে বাড়ান কিছু।
বড়োভাই হেঁসে বলেছিল, ছেলেকে খাইয়ে খাইয়ে দামড়া করে দিয়েছি, এবার তো বলবেই। তাই বলি, ছোটোলোকের মন সব সময় ছোটো হয়।
মইদুল তখন গোয়ালে গরু বেঁধে ম্যাচলাতে জাবনা দিচ্ছিল। সব ফেলে এসে, খুব শান্ত অথচ প্রচণ্ড রেগে বলেছিল, চাচা ছোটোলোক কাকে বলেন? ও মা আমার। মুখ সামলে।
বড়োভাই হাসছিল। বলেছিল, দেখলি তো! এক ছোটোলোক ডাকলে আর এক ছোটোলোক ডাকে। অনেকটা শেয়ালের মতো।
মইদুল মায়ের অপমান সহ্য করতে পারে না। চাচা মুখ সামলে। না হলে ছোটো বড়ো মানব না। হাত চলে যাবে।
মইদুলকে সামলাতে পারছিল না মাসকুরা বিবি।
- যা যা তোর অওকাত দেখা গেছে। ছোটোলোক একটা।
মইদুল হাত ঝটকা মেরে মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে বড়োভাইকে এক ধাক্কা মেরেছিল। উল্টে পড়ে হাত ভাঙে। গ্রামে বিচার বসেছিল। মইদুলের কথা আর কে শোনে! বড়োভাই পঞ্চায়েত মেম্বার, পার্টি থানা সব বড়োভার। তবু মইদুল বিচারে মাপ চাইনি। শুধু এই বলে উঠে গেছিল, সব মেনে নিতি পারব, কিন্তু ছোটোলোক বলে মার আপমান মেনে নিতে পারব না।
মইদুলের মা বিচারে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে সে যাত্রায় রক্ষে পেয়েছিল।
স্কুলের সময় থেকে সবাই দেখে এসেছে, মইদুল আর সম্রাটের গলায় গলায় ভাব। মোল্লাপাড়া আর সরদার পাড়ার মাঝ খানের প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনা কখনো দুজনের মধ্যে ফাটল ধরাতে পারেনি।
কয়েক দিন ধরে খুব জোর কদমে কানা ঘুষো চলছিল গ্রামের মধ্যে। অথচ মইদুল আর দোলনের সে দিকে কোনো ভ্রক্ষেপ ছিল না। থাকবেই বা কেন। দুজনে তখন আকব্বর মোল্লার ঝিঙে ক্ষ্যাত নিড়োতে নিড়োতে গল্পে মশগুল। দুপুরের সূর্যের তেজ দুজনকে ম্লান করতে পারে না। পটলখেতে ফুল ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে দুজন দুজনকে ছুঁয়ে ফ্যালে। মদ্দ্যা ভাটি থেকে পটলের ফুল তুলে ক্ষেতের সমস্ত মেয়ে ফুলের বোঁটায় ছোঁয়ালে তবেই পটল ফলে।
ভোর সকালে সেদিন মাঠে গেছিল। আকব্বর মোল্লা পটল ক্ষেতে ফুল ঠেকানোর জন্য সম্রাট আর দোলনকে বলে রেখেছিল। সরদারদের মজুরি কম দিলেও কিছু একটা বলে না। আসলে এই লকডাউনের বাজারে কাজ বড়ো কথা, কাজ থেকে যা আসুক সেটাই আসল লাভের। ভোর বেলা যেতে হবে। সন্ধ্যে সম্রাটের বাড়িতে বসে গুড় দিয়ে লাল চা তৈরি করে সবাই খাচ্ছিল। পাশে কখন দোলন দাঁড়িয়ে ছিল ঘাপটি মেরে বুঝতেই পারেনি। সম্রাট দেখেছিল কিন্তু কিছু বলেনি। সম্রাটের মা দেখতে পেয়ে বলেছিল, কীরে নতুন কুটুম বাড়ি এলি বলে মনে হচ্ছে। আয় আয় ভেতরে আয়। তোকে আবার নেমতন্ন করতে হবে নাকিন!
দোলন ঘরে ঢুকেছিল। সবার মধ্যে টুকিটাকি কথা হয়। বি পি এল তালিকার চল্লিশ ওয়াটের এল ই ডি ডুম গোটা ঘরর মধ্যে আলোর বন্যার ঢেউ তুলছিল।
সম্রাটের মা বলেছিল, যাই একটু কলতলা থেকে চায়ের বাটিগুলো ধুয়ে আনি। তোরা বোস।
দোলন বলেছিল, কাকী আমাকে দাও, আমি ধুয়ে দিচ্ছি।
কাকী বলেছিল, না থাক। আরো কিছু কাজ আছে। তোরা কথা বল। বলে মইদুলের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, মইদুল বাড়ি যাবিনে!
মইদুল চমকে গেছিল। তার বাড়ি যাওয়ার খবর কাকী এর আগে কখনো নেয়নি। বরং খেয়ে যাওয়ার জন্য, থেকে যাওয়ার জন্য সব সময় বলত।
মইদুল বলেছিল, এই যাই, বলে উঠে দাঁড়ায়।
সম্রাট বলেছিল, দাঁড়াও দোস্তো। কথা আছে। মা আমি কাল কাজে যাবো না। গা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে।
সম্রাটের মা কথাগুলো শুনতে শুনতে, কিছু না বলে চায়ের বাটিগুলো গুছিয়ে নিয়ে বের হয়ে গেছিল।
আকব্বর মোল্লাকে ম্যানেজ করে পরের দিন ভোর বেলা দুজনে পটলের ফুল ছোঁয়াতে বের হয়েছিল। ঝুক্কোভোরে সবার ক্ষেতে প্রায় কেউ না কেউ আছে। তিন বিঘে পটল ক্ষেতে ফুল ছোঁয়াতে দুজন পরিকল্পনা করে ফেলেছিল।
মইদুল বলেছিল, তালাবন্দী উঠলেই বিয়েটা সেরে নেবো রে দোলন।
দোলন হেঁসেছিল, বলেছিল, এত সহজে সব হবে?
– ক্যানো হবে না?
– এখন তো আইন আদালত আছে। আমরা রেজিস্ট্রি বিয়ে করব। দেখিস নি, সিনেমাতে নায়ক নায়িকা কেমন বিয়ে করে।
– তোমার মা মেনে নেবে আমাকে? আমি যে সরদারদের মেয়ে।
– আমার মাকে তুমি চেন না। আমার অমতে যেতেই পারবেই না।
– গ্রামের লোক?
– আমরা কী গ্রামের লোকের খাই না পরি?
দোলন কথা বাড়ায় নি। ছেলে ফুলের পাপড়ি মেয়ে ফুলের পাপড়িতে চেপে ধরেছিল।
মইদুল হেঁসে ওঠে।
– হাঁসলি ক্যানো?
– না এমনি! মুইদুল তখনো হাঁসছিল।
দোলন মুখটা গোমড়া করেছিল।
মুইদুল বলেছিল, কী হল?
দোলন কথা বলেনি।
মইদুল বলেছিল, আসলে আমি তোমার ঐ মেয়ে ফুলের পাপড়িতে ছেলে ফুলের পাপড়ি ছোঁয়াতে দেখে, আমাদের ফুল শয্যার রাতের কথা চিন্তা করছিলাম।
দোলন ধ্যাত বলে আর একটা মেয়ে ফুলের পাপড়িতে ছেলে ফুলের পাপড়ি চেপে ধরে।
মুইদুল তখন গান গাচ্ছিল, চুম্মা চুম্মা দে দে।
দোলন ডায়ে বামে তাকিয়ে চকাস করে মইদুলের গালে একটা চুমু খায়। এমন আকস্মিকতায় মইদুলের গান থেমে গেছিল। দোলন খিলখিল করে হাঁসতে হাঁসতে পেছন ঘুরতেই দেখেছিল আকব্বর মোল্লা খ্যাতের পিছনের আলে দাঁড়িয়ে।
দোলনের হাঁসি পাথর হয়ে যায়। পা ভারি ভারি। মইদুলের মুখে রা শব্দ নেই, গান তো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছিল। কোনো রকম করে ফুল ঠেকানো শেষ করেছিল।
সেদিন বিকেলে ক্লাবে বিচার বসেছিল, দোলন আর মইদুলের। বড়োভাই এখন পঞ্চায়েত প্রধান। বিচারেরও প্রধান। সব শোনার পর বলেছিল, না গ্রামে এমন বেলেল্লাপনা সহ্য করা হবে না। কী বল সবাই? বলে সবার দিকে তাকায়। সবাই না না করে ওঠে।
দোলনের বাপকে বলে, কী মেয়েকে যে রাস্তায় ছেড়ে দিলে, বলি দোকান খুলে বস না এর থেকে।
দোলনের বাপ ভানু কিছু বলে না। মইদুল গর্জে ওঠে, মুখ সামলে চাচা। দোলন আমার বে করা বৌ। আমরা রেজিস্ট্রি বিয়ে করেছি।
মইদুলের উপস্থিত বুদ্ধি আর মিথ্যের জোরে সবাই চুপ মেরে যায়।
বড়োভাই গর্জে ওঠে, চুপ ছোটোলোকের বাচ্চা। রেজিস্ট্রি কিসের রে। গ্রামে থাকতে গেলে গ্রামের আইন মেনে চলতে হবে। বলি, সমাজ বলে কিছু আছে নাকি। মানি নে তোর ছোটোলোকি বিয়ে।
মইদুল বাঘের মটো গর্জন করে ওঠে। ছোটোলোক বলবে না চাচা।
বড়োভাই মুখ ক্ষিচিয়ে বলে, ছোটলোককে ছোটলোক বলব না তো কী বলব। তুই যে কাজ করেছিল, তা একেবারে তস্য ছোটোলোকামি কাজকারবার। একবার পার পেয়েছিস, আজ আর পার পাবি না ছোটোলোকের বাচ্চা।
সম্রাট এতক্ষণ মইদুলকে সামলাচ্ছিল। কিন্তু সম্রাটের হাত ছাড়িয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বাঘের মতো লাফ দিয়ে বড়োভার কলার চেপে ধরে। মুখ দিয়ে বের হয়েছিল, মেরেই ফেলব আজ।
কিন্তু ততক্ষণ অনেকগুলো কঠোর হাত মইদুলের গলা কব্জি বাহু কোমর খামচে ধরে ছাড়িয়ে নিয়ে ছিল। আর কিল ঘুসির একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। প্রথম প্রথম ব্যাথা পাচ্ছিল, পরে যেন আর কিছু মালুম হচ্ছিল না। শুধু একটা তর্জন শুনছিল, দে শালার খাল খিচে। শালা পঞ্চায়েত প্রধানের গায়ে হাত তোলে। ওই মেয়েকে যদি বিয়ে করে তবে ওর যেটুকু জমি আর ভিটে বাড়ি আছে, তার দখল পার্টি নেবে। মইদুলের কানে আরো সব কী যেন শব্দ যাচ্ছিল, কিন্তু বুঝতে পাচ্ছিল না। কে যেন ওকে আড়াল করছে, সম্রাট! মইদুল দেখতে পায় না। নেতিয়ে পড়ে।
মইদুলের জ্ঞান ফিরে দ্যাখে ঘরে শুয়ে আছে। মাথার কাছে মা বসে। সম্রাট পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। মইদুল ওঠার চেষ্টা করে। সমস্ত গা ব্যাথা। কথা বলতে গিয়ে ঠোঁটে জিব লাগতে জ্বলে ওঠে। তাও বলে, কী হল কারেন্ট নেই!
সম্রাট কিছু বলে না। মইদুলের মা বলে, আছে। তবে আমাদের নেই। ক্লাবের ছেলেরা এসে লাইন কেটে দিয়ে গ্যাছে। বলে গ্যাছে কাল বিকেলে সবার সামনে নাক ক্ষত দিতে হবে বড়োভাইয়ের কলার ধরার অপরাধে। আর দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে গ্রামে থাকা চলবে না।
মাসকুরা বিবি ফুকরে কেঁদে ওঠে। এই বুড়ো বয়েছে আমি আর ক্ষমা চাইতে পারব না। মুখে কাপড় দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। উঠোনে বসে মাসকুরা বিবি প্রলাপ কাঁদে, ওরে আবাগীর ঢ্যামনারা আমার কচি ছেলেটাকে ধরে মারলগো। যে হাত দিয়ে আমার ছেলেকে মেরেছিস, সেই হাত ক্ষসে পড়বে গো। আমার ছেলের কোনো দোষ নেই, ঐ গতরখাকী ভানুর মেয়ে কী যাদুটোনা করে আমার ছেলেটাকে ফাঁসালো গো। আমার এখন কী হবে গো। আমি আমার স্বামীর ভিটে ছেড়ে কোথায় যাবো গো।
মইদুল ঘর থেকে চিৎকার করে ওঠে, সম্রাট মাকে বল গাল থামতে। তাও মাসকুরা বিবি গাল পেড়ে দোলন, ক্লাবের ছেলে আর পঞ্চায়েত প্রধানের গুষ্টির তুষ্টি করছিল। মইদুল আর থাকতে না পেরে এক ঝটাকায় উঠে ঘর থেকে বেরোয়।
মায়ের সামনে গিয়ে বলেছিল, তুই থামবি মা?
মাসকুরা বলেছিল, থামবো কেন? ওই ছেনাল মাগীর জন্য তুই কেন মার খাবি!
মইদুল বলেছিল, থাম মা তুই। ও তোর হবু বৌমা।
মাসকুরা বিবি তিড়িং করে লাফিয়ে মইদুলের মুখের সামনে মুখ এনে বলেছিল, কী বললি! সরদারের মেয়ে আমার ঘরে বৌ হবে। কক্ষনো না। মর মর, তুই ওই মাগী নিয়ে মর, আমি থাকতে কক্ষনো এ হবে না।
মইদুল বিশেষ কোনো কথা বলেনি আর। শুধু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়, ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, মরব। আর একবার ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে, সম্রাট দরজার সামনে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে। সম্রাটকে বলেছিল, বেরিয়ে আয় দোস্তো। আমার মায়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তা না হলে ছেলেকে মরতে বলে।
মইদুলের এক ফোটা চোখের জল উঠোনে পড়েছিল। পিছনে থেকে তখনও শুনছিল, মর মর না, মরতে পারিস না…
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
