তুষার বরণ হালদার
লেখক পরিচিতি
(তুষার বরণ হালদার নদীয়ার আড়ংঘাটা গ্রাম থেকে স্কুল শিক্ষা শেষ করে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি পান নদীয়া জেলার অসংগঠিত শিল্প ও শ্রমিকদের ওপর গবেষণা করে । গবেষণা কর্মের ওপর ভিত্তি করে দুটি বই এবং বিভিন্ন গ্রন্থ ও জার্নালে বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের জন্য তিন বার পুরস্কৃত হন। এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য। বর্তমানে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত দক্ষিণবঙ্গের একটি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক।)
মহামোহোপাধ্যায় যোগেন্দ্রনাথ বেদান্ততীর্থ (১৮৮৭- ১৯৬০)
উনিশ শতকের শেষার্ধে বঙ্গদেশের একজন অন্যতম ভারত তত্ত্ব বিশারদ ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ বেদান্ততীর্থ। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৮৭। তাঁর আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জে। যদিও কর্মসূত্রে তাঁর পিতা বাস করতেন দুর্গাপুরে। যোগেন্দ্রনাথের জন্ম এবং পড়াশোনা দুর্গাপুরে শুরু হয়েছিল। পরে তিনি তাঁর মামা পন্ডিত তারকেশ্বর চক্রবর্তী শিরোমনির চতুষ্পাটিতে পড়বার জন্য সিরাজগঞ্জে যান সেখানে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর তিনি রাজনাথ তর্কতীর্থের চতুষ্পাটিতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ব্যাকরণ পাঠ শেষ করার পর ময়মনসিংহ এবং বগুড়া জেলায় পড়তে চলে যান। এরপর তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের মহামোহোপাধ্যায় চন্ডীদাস ন্যায় তর্কতীর্থের টোলে ন্যায় শাস্ত্রের পাঠ শেষ করার পর ‘ তর্কতীর্থ ‘ উপাধি লাভ করেন। ওই টোলের অপর এক অধ্যাপক দুর্গা সুন্দর স্মৃতি রত্নের কাছে তিনি মীমাংসা দর্শন এবং অলংকার শাস্ত্র অধ্যয়ন করে সেই দুটি বিষয়েও খুবই পারদর্শিতা লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজের চতুষ্পাটিতে ভর্তি হন। এখানে তিনি প্রবল উৎসাহে অধ্যাপক গুরুচরণ তর্কদর্শনতীর্থের কাছে বেদান্ত শাস্ত্র এবং অধ্যাপক লক্ষণ শাস্ত্রীর কাছে সাংখ্যদর্শন এর পাঠ নিতে শুরু করেন। বেদান্ত শাস্ত্র এবং সাংখ্য দর্শনের ছাত্র যোগেন্দ্রনাথের অসাধারণ ব্যুৎপত্তিতে চমকৃত হয়ে অধ্যাপক লক্ষণ শাস্ত্রী তাকে ‘ সাংখ্যতীর্থ ‘ উপাধি এবং অধ্যাপক গুরুচরণ তর্কদর্শনতীর্থ তাকে ‘ বেদান্ততীর্থ ‘উপাধিতে ভূষিত করেন। কিছুদিন বারানসিতে গিয়ে মহামহোপাধ্যায় বামাচরণ ন্যায়াচার্যের কাছে ন্যায় শাস্ত্রের অধ্যায়ন করেছিলেন। এই হল তার উজ্জ্বল ছাত্র জীবন।
কর্মজীবনে দেখা যায় ১৯১০ সালে তাঁর প্রথম পেশাগত জীবনে প্রবেশ ঘটে জাতীয় শিক্ষা পরিষদে অধ্যাপনার দায়িত্ব নিয়ে। চার বছরের মতন সেখানে কাজ করে ১৯১৪ সালে চলে যান হরিদ্দারের গুরুকুল বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে। সেখানে সাত বছর পড়াবার পর তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন এবং সংস্কৃত কলেজের দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসাবে কাজ শুরু করেন। ইতিমধ্যে তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘ মহামোহোপাধ্যায় ‘ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। তিনি ১৯৪৩ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে তিনি অবসর গ্রহণের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধে কলকাতা সংস্কৃত কলেজের স্নাতকোত্তর বিভাগের দর্শন বিভাগে অধ্যাপনার দায়িত্ব নিতে বাধ্য হলেন। আমৃত্যু তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এই পেশাগত জীবনের মাঝেও তাঁর জ্ঞানচর্চার তরণী কখনো থমকে যায়নি। শুধুমাত্র দর্শন শাস্ত্রেই তিনি তাঁর চিন্তা মনন চর্চাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। রামায়ণ মহাভারত থেকে শুরু করে পুরাণ, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কালিদাস ভবভূতি এবং কলহনের কাব্য, নাটক, অলংকার, ন্যায় এমনকি আয়ুর্বেদ পর্যন্ত ছিল তাঁর চর্চার বিষয়। তাঁর আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল লুপ্তপ্রায় শাস্ত্র গুলির উদ্ধার এবং চর্চার বিশেষ আগ্রহ এবং ছাত্রদেরকেও তাতে উদ্বুদ্ধ করা।
সেযুগে কাশি ছিল অদ্বৈতবাদী পন্ডিতের এক বড় কেন্দ্র। সেখানকার বাঙ্গালী পন্ডিত মধুসূদন সরস্বতী ব্যসতীর্থের ন্যায়মৃত ‘ গ্রন্থের প্রচারিত মত খন্ডন করে ‘ অদ্বৈতসিদ্ধি ‘ নামে সংস্কৃত ভাষায় একটি অসাধারণ গ্রন্থ রচনা করে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত দর্শনকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেখানে টিকা টিপ্পনে যোগ করেছিলেন। এই মহামূল্যবান বঙ্গানুবাদটি পন্ডিত রাজেন্দ্র নাথ ঘোষের ইংরেজি টিকা সহ দুই খন্ডে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। শঙ্করাচার্য প্রচারিত অদ্বৈত বাদের প্রবক্তা মহামোহোপাধ্যায় যোগেন্দ্রনাথ বেদান্ততীর্থ অদ্বৈতবাদ যে ভারতীয় চিন্তায় ও মননের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে এদেশের সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে সে সম্পর্কে ভারতীয় শাস্ত্রে ও সাহিত্যে অদ্বৈতবাদ নামে একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যেটি তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি যখন সংস্কৃত কলেজে গবেষণা বিভাগের দর্শন শাস্ত্রের প্রধানের পথ অলঙ্কৃত করছিলেন তখন সেখানকার ‘ আওয়ার হেরিটেজ ‘ নামক গবেষণামূলক মুখপত্রে ‘ ব্রহ্ম পরিনামবাদ ‘, ‘ প্রামাণ্যবাদ ‘ এবং ‘ অদ্বৈত বেদান্ত অবিদ্যা ‘ ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর অনেক প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলি হলো ‘ মহামতি বিদুর ‘ তাঁর প্রয়াণের পর প্রকাশিত হয়েছে ‘ অদ্বৈতবাদে অবিদ্যা ‘ , ‘ বেদের মন্ত্রভাগে আধ্যাত্মবিদ্যা ‘ এবং ‘ মহারানী কুন্তী ‘ প্রভৃতি।
মহামোহোপাধ্যায় অধ্যাপক যোগেন্দ্রনাথ বেদান্ততীর্থ অত্যন্ত সহজ – সরল , আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করতেন। আবশ্যিক প্রয়োজন ছাড়া বাকি অর্থ প্রায় সমস্তটাই তিনি খরচ করতেন ছাত্র কল্যাণে। ঋষিসুলভ এই বাঙালি অধ্যাপক, পন্ডিত, ভারতবিদ্যাচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব যোগেন্দ্রনাথ বেদান্ততীর্থ কলকাতা শহরে ১৯৬০ সালের ১৫ই মে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দুর্ভাগ্যবশত প্রয়াণের ৬০ বছরের মধ্যেই তিনি বাঙালি মননের থেকে এক রকম বিস্মৃতই থেকে গেছেন। প্রতিভাস ম্যাগাজিন