শরদিন্দু সাহা
লেখক পরিচিতি
বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।
বিষয় পরিচিতি
(রেভারেন্ড জেমস্ লঙ যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)
রূপের মাঝে অরূপ রতন
এই দেশের জল মাটি বাতাস গায়ে মাখতে গিয়ে আমি টের পেলাম আমার এতদিনের অনুভব ও বিদ্যাচর্চা কোথাও যেন আমাকে ভিন্ন এক প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছায় দিনে দিনে জুড়তে লাগল এমন অনেক রঙ যাকে চিনতে চিনতেই আমার দিন যায়, রাত যায়। আমি কখনও স্তম্ভিত হলাম আবার কখনও বুঁদ হয়ে ভাবতে লাগলাম এর গূঢ়রহস্য। শহরের শিক্ষিত মানুষের দোলাচল সংষ্কৃতি আর ধর্মের উত্তাপকে ঘিরে একপ্রকার ভিন্ন রুচি ও কল্পনার জন্ম দিতে লাগল গোপনে গোপনে মনের মণিকোঠায়। ভাবলাম পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যের হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব শুধুমাত্র প্রকৃতিকে ঘিরে নয়, মনেরও এক বিস্তর ফারাক। একে পূরণ করা তো সহজ কর্ম নয়। যত সময় গড়ায়, যেন এক মনের সঙ্গে আর এক মনের জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে যাওয়া। আমি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি আমার মনের চোরাগলি দিয়ে প্রবেশ করছে চুঁয়ে চুঁয়ে এমন কিছু রস যার কোনো ঠিকানা নেই, যার কোনো জবাব নেই। আমার এই আসা যাওয়ার ভাবতরঙ্গে আমি নিজেই যেন ঘড়ির পেন্ডুলামের মত দুলতে থাকি, কোনো কুলকিনারা পাই না। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন আমার যে পা ফেলা তা ছিল কেবলমাত্র আমার চেনা জগতের বৃত্তে ঘোরাফেরা করা, আমার জ্ঞানগম্যের পাতা ওল্টালেই প্রতি অক্ষরে অক্ষরে তাই পেতাম চেনা ছকেরই গন্ধ, উত্তরের অপূর্ণতা ছিল না তাই বা কী করে বলি। নিজের ধর্মকে নিয়ে প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ ছিল না, এমন কথাই-বা বলি কী করে, তবে কিনা এক অজানা ছটফটানি যে তাড়া করে বেড়াত, তা যেন বঙ্গদেশের মাটিতে বসে প্রতি পলে পলে অনুভব করছি। এক ব্রাহ্মণ পন্ডিত প্রশ্নটা ছুঁড়েই মারল ‘ আপনি কী প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথের কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত?’ উত্তর দিলাম – না। ‘পাদ্রী সাহেব, তবে আর আপনার এদেশে থেকে ধর্মপ্রচার করে লাভ নেই।’
বুঝলাম এই দেশের জল হাওয়ায় এক জাদুকরি মায়া আছে যাকে চেতনায় ধারণ করা সহজ হবে না, জীবনের বাইরের হিসেব নিকেষ করে অন্দরে প্রবেশের অনুমতি নিতে হবে। হয়তো এটা এমন এক প্রক্রিয়া যাকে খুঁজে পেতে নিতে গেলে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়, একটা নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হয় এই আশায় কখন এসে ধরা দেবে, কেমন করে এসে ধরা দেবে। মানুষটার প্রশ্নটা নিয়ে আমার ভাবনার অন্ত রইল না, খুঁজছে তো সকলেই যার যার নিজের মতো, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও খুঁজছেন বুঝি ভারতআত্মার স্বরূপ। সকলেই বুঝি এমন করে খোঁজেন নিজের মতো। খ্রিষ্টান ধর্মের শরীর আর মনের সঙ্গে কোথাও কী দ্বন্দ্ব আছে ব্রাহ্ম ধর্মের, মিলনের কি কোনও উপায় নেই, জানতে হবে, বুঝতে হবে, ছেড়ে দেওয়া যাবে না। মানুষটা কিন্তু একটুও জায়গা ছাড়ল না, এমন প্রত্যুত্তর আশা করেছিল যাতে করে নিজেকেও একটু ঝালিয়ে নিতে পারে। বাজিয়ে নিলে মন্দ কী! জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করেন? প্রশ্নটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘কোন জন্মান্তরবাদ? আপনার দেশের মানুষদের কল্পনায় বিশ্বাসের রকম সকম আর আমার দেশের মানুষের বিশ্বাসের ধরনটা তো এক নয়। আমাদের বাঁচার পদ্ধতিটাই তো আমাদের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, কথা বলাকে প্রভাবিত করে।’ ওর জীবনদর্শন যেন মূহুর্তেই আমাকে জোর ধাক্কা দেয়। ঘরে যখন আগুন লাগে, চারপাশ নির্দ্ধিধায় অকপটে পুড়িয়ে দিয়ে চলে যায়, বাছবিচার করে না কী পোড়াচ্ছে, আমার মনে হলো জ্ঞানের স্রোতটাও তেমনি, যে পথ দিয়ে যায় তার মতো করেই সব হজম করে। আমরা রোজ কত কিছুই না শিখি। মানুষটাকে মনে মনে শিক্ষক বলে মেনেও নিলাম। বিলেতে বসে এই দেশের মানুষদের যারা মূল্যায়ন করছে আর নীতিমালা গাঁথছে, কোথাও ভুল করে ফেলছে না তো। আমার একটা প্রশ্ন উঁকি মারে এই দেশের মানুষরা এত কিছু বোঝে, নিজেদের রক্ষা করতে শিখল না কেন, পরের হাতে নিজেদের জমিনকে সঁপে দিল! তাহলে কী এরা নিজেদের প্রতি আস্থা হারিয়েছে? এই দেশটার জন্য মায়া হয়। ‘পাদ্রী সাহেব দরদ দেখালে কী আমাদের মুক্তি ঘটবে? চারপাশে অনেক অন্ধকার, সূর্যের আলো ডুবতে না ডুবতেই মাঠেঘাটে ঘুমিয়ে থাকা পোকামাকড়রা সব কিলবিল করে ওঠে, বিষধররা দংশন করবে বলে ওৎ পেতে থাকে।’ আপনাদের এত তো বেদেরা আছে, পারলো না ফণা তোলার আগেই বিষদাঁত ভেঙ্গে দিতে? ‘ আমাদের বেদেরা দেশীয় সাপদের জাত চেনে, স্বভাব চরিত্র জানে, দূর দেশের শত্রুদের রং কেমন করে চিনবে?’ বললাম, এই রঙ চেনানোর বিদ্যা যদি আমি শিখিয়ে দিই, পারবেন তো মোকাবেলা করতে? মানুষটা ভাবলো, লোকটা বলে কী রে!
জীবনে নতুন রঙ লাগেনি এ-কথা বলি কী করে! হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ কখন কীভাবে আসে কে বলতে পারে, কিশলয়ে রং লাগলে যেমনটা হয়, কত কিছু শিখিয়ে দিয়ে যায় মনের মতো করে। আমার স্ত্রী এমিলি ওরমা এই শহরতলীর জল হাওয়ায় কেমন সুন্দর হয়ে উঠেছে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখি দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে অপেক্ষা করে বসে আছে, আমি কখন ঘরে ফিরব। নির্জনতা মানুষের মনে কত পাল্টানো পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়, গোটা জীবনটাকে নতুন করে মেলে ধরতে কথা চালাচালি করে। এমন তো নয় আঁকড়ে ধরবার তাড়না ওর সকল ধ্যান ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। ওর প্রতিদিনের জিজ্ঞাসা সেই ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দেয় একটু একটু করে। জানতে চায় এক চঞ্চল উৎসাহে, ‘ কী শিখলে তুমি আজ, নতুন কী জানলে, কী দেখার আনন্দে তুমি বিগলিত হয়ে আছ?’ এত কথার জবাব আমি কেমন করে দেব। শুধু ওই ঘরের পাশে বাগানটার দিকে আঙ্গুল তুলে বললাম ওই চন্দ্রমল্লিকা গাছটা ঠিক তোমার মতো, সে প্রশ্নও করে, আবার কখন নিজের সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে থাকে, নিজেও জানে না। ওর বাগানে এমন ফুল ফুটেছে যা ও আগে কখনও দেখিনি, এই দেশের মাটি ওকে চিনাবে বলেই নিজে থেকেই বেড়ে উঠেছে। এই রং এই রূপ আর কোথাও নেই। অপরাজিতা, টগর, মালতি, গাঁদা ফুলেরা জানান দিচ্ছে নিজেদের সকল সুগন্ধ নিয়ে, আবার তুলসী, কনকচাঁপারা দু-একটা পাতা ছড়িয়ে অকালেই ঝরে গেছে, ও কেঁদে কেঁদে হয়রান হয়েছে, জানতে চেয়েছে ‘বলতে পারো, কেন এমন হলো ?’ তাই কি নানা কথার গুঞ্জনে ও গা ভাসায় – ‘দেখেছ কি এমন কোনো মুখ, যা আমাদের মানুষগুলোর চেয়ে আলাদা, শুনেছ কি এমন কন্ঠস্বর, যা আমাদের থেকেও সমধুর, জেনেছ কি এমন শব্দ যা কেউ আমাদের আগে কখনও চিনিয়ে দেয় নি?’ গম্ভীর স্বরে বললাম, যা বলছ ভেবে বলছ তো, না শুধু কথার কথা। খানিকটা রাগত স্বরে বলল, ‘ সাগর পার করে এসেছি ভারত ভূমিতে, সে কী এমনি এমনি, চৈতন্যদেবের দেশের মানুষরা কেমন আছে, ভাবছ আমি খোঁজ রাখি না? এক বৈষ্ণবী এসেছিল, ওদের মনের কথা শোনাল, আহা! কী হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা মিশেছে সেই গানে।’ ও দু’কলি শুনিয়েও দিল, বলল, কবি জ্ঞানদাসের পদ গাইছি গো। ‘নৌকাবিলাস’ থেকে শোন –
মানস গঙ্গার জল, ঘন করে কল কল
দুকূল বাহিয়া যায় ঢেউ।
গগনে উঠিল মেঘ, পবনে বাড়িল বেগ
তরণী রাখিতে নারে কেউ।।
দেখ সখি নবীন কাণ্ডারী শ্যাম রায়।
কখন না জানে কান, বাহিবার সন্ধান
জানিয়া চড়িনু কেনে নায়।।
ওর স্মরণশক্তি আর অপর ভাবের প্রতি এত গভীর আকুতি দেখে আমি যে মুগ্ধ হয়েছি শুধু এমন নয়, আমার দায়িত্ববোধ মুহূর্তে কয়েক গুণ বেড়ে গেল এই দেশের প্রতি, দশের প্রতি। নিজের কাছে জানতে চাইলাম পথটার কেন এমন অদল বদল হচ্ছে। কোন ঘটনার অভিঘাত এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করছে, যার থেকে আমার নিস্তার নেই। নিজের কাজের জায়গাগুলো যেন স্বপ্নের মতো জাল বিস্তার করে একে অন্যকে অনায়াসে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে আমাকে ভাববার নূন্যতম সুযোগ না দিয়ে। মানুষের মুখগুলো যে আমার কাছে অন্য কিছুর চেয়ে প্রিয় নয়। আমার স্ত্রী ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করল, ‘চারপাশ একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখ, কত তরঙ্গ উথাল পাথাল করে মিলিয়ে যাচ্ছে, একবার হারিয়ে গেলে কিন্তু আর পাবে না এদের খোঁজ, তোমার সব ইচ্ছেগুলোর আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না তখন। সময়ের মৃত্যু আছে, আবার নেইও।’
জন্ম মৃত্যুর হিসেব কষতে কষতেই দিন যায়। অঙ্কগুলো গুলিয়ে যায়, কোন পথ দিয়ে যাবো, কোন পথ দিয়ে যাবো না, কি যে দেখে ফেলেছি, কি দেখা বাকি রয়ে গেল কি জানি। নিরালোক দৃষ্টি এক অবচেতন মনে খেলা করে। ঠিক এমনি সময় কত নতুন মানুষ এসে নিজের মতো কথা বলে, কত প্রশ্নোত্তরের দামামা বাজিয়ে চলে, জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ায় নিজেদের চিন্তায় মুষ্টিবদ্ধ করে। অদ্ভুত পৃথিবীর অদ্ভুত জবাব এসে আক্রান্ত করে সমসময়ের নানা প্রান্তের মানুষকে, গোটা জগৎ সংসার আলোড়িত হয়। আমি ভাবতে বসে যাই কে বা কারা, কেন আসে, কেন যায়। যদিও আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে কেমন করে পথ চলতে হয়, হোঁচট খেলে উঠে দাঁড়াতে হয়, তাই বলে অন্যরা যারা ক্ষতস্থানে মলম লাগাচ্ছে সেই ঔষধটা যাচাই করে দেখব না, তাইবা কেমন করে হয়। এই তো সেদিন যে মানুষটা পুকুরে জাল ফেলছিল, আবার মাছ ধরা পড়ার পরে জাল গুটিয়ে আনছিল, দেখলাম কী আনন্দ ঝরে পড়ছে চুপড়ি ভর্তি হলে। বলল, ‘ পাদ্রী বাবা ধরবেন নাকি? জলের প্রাণী ডাঙায় দেখার মজাই আলাদা, কত জাতের, কত রঙের, কেমন একসাথে খেলে ধুলে বেড়ায়। কিন্তু দেখুন বাবা ওদের পৃথিবীতে ওরা জ্যান্ত, আমাদের পৃথিবীতে মরার মতো পড়ে থাকে।’ কথাটা যে ফেলনার নয়, নিজেকে দিয়ে উপলব্ধি করলাম। প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা পৃথিবী থাকা দরকার, বাঁচতে তো হবে, তাকে জোর জবরদস্তি করে বের করে আনলেই সমূহ সর্বনাশ। যার নেই সে-ও খুঁজে বেড়ায় আর যার আছে সেও ভাবে, এর বাইরে কী আছে। আজকাল দেবেন ঠাকুরের কথা খুব শুনি, তিনি নাকি খুঁজেই বেড়াচ্ছেন কীসে আত্মোপলব্ধি হয়, জীবের মঙ্গল হয়। জমিদারিতে মন টেকে না। বাবা প্রিন্স ছিলেন বলে, সেই উপাধির প্রতি সুবিচার করবেন, এমন মানুষ তিনি নন। নিজের জন্য একটা পথ আবিষ্কার করাতেই তো আসল পুঁজি, এই কথা নিজেও বুঝতে চান, অন্যকেও বোঝাতে চান। এই আশ্চর্য পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য তাঁকে টানে, তাই বলে ঠাকুরবাড়ি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন কেমন করে! এই দ্বন্দ্ব মিঠবার নয়। তাই বলে কি থেমে থাকলে চলবে, সময়টাকে নিজের মতো করে ধরতে হবে বই কী।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার কথা আর কে না জানে। এই দেশের যুবসমাজকে প্রতীচ্যানুরাগ থেকে প্রাচীন জ্ঞান-সম্পত্তির দিকে মনোযোগ আকর্ষণের জন্যই ছিল তাঁর যাবতীয় প্রয়াস। ধর্মসংস্কার করে ধর্মশাস্ত্র অনুশীলন তার ভিত্তি বলা যায়। সময়ের গোনাগুনতি হিসেব করে তো পা ফেলা যায় না। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ জন বয়স্যেদের নিয়ে প্রকাশ্যভাবে ব্রাক্ষ্মধর্মে দীক্ষিত হলেন। চারদিক তাকিয়ে দেখলাম ভিন্নখাতে বাতাস বইছে, নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে এক নতুন উত্তাপ। কে এগোবে আর কে পিছোবে, তাই নিয়ে কত কথা চালাচালি। যেখানেই যাই আমার উপস্থিতি নিয়ে কত জিজ্ঞাসা। গুটি গুটি পায়ে হেঁটেই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশ পেল অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়ের সম্পাদনায়। এই পত্রিকার লেখকগোষ্ঠীতে কে নেই। রাজেন্দ্র লাল মিত্র মহাশয় থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। উদ্দেশ্য একটাই ধর্মীয় চেতনাকে যুক্তিগ্ৰাহ্য করে আগামী প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা। কতদূর তার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ে সময় বলবে। সময়ের বিড়ম্বনা সহ্য করেই তো মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়, মানুষ কল্যাণ কামনায় ব্রতী হয়। কিন্তু এখানে আমার ভূমিকা কতদূর যুবসমাজের জীবনীশক্তিকে প্রাণবন্ত করে তুলবে ভেবে ভেবে আমি অস্থির হই। রাজা রামমোহন রায়ের অস্তিত্ব এখনও বাংলার মাটিতে গুঞ্জন তুলছে। ব্রাক্ষ্ম সমাজের আদি পর্বে প্রতিষ্ঠিকর্মে শুনেছি এই মানুষটি এক নতুনত্বের ছোঁয়া এনেছিল। লেখক ও পৃষ্ঠপোষকরা ছিলেন সংস্কারপন্থী। পত্রিকাটির উদ্দেশ্যই ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাঙালিদের অংশগ্রহণ আর নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত করে তোলা। এই পর্বে রাজনারায়ণ বসু ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুররাও হাতে হাত ধরে কাজে নেমেছেন। কী নেই এখানে, ব্রক্ষ্মবিদ্যা তো ছিলই, ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব ও দর্শন বিষয়ক রচনা আমাকে প্রলুব্ধ করছে বললে অত্যুক্তি হবে না। আমার মধ্যে একটা বোধ কাজ করছিল, আদৌ কি মরা গাঙে জোয়ার আসবে? কুসংস্কারের দেয়াল চূর্ণবিচূর্ণ করে এক নতুন ভাবনার উদয় হবে ? আমি আয়ারল্যান্ডের অস্থিচর্মসার দশা নিজের চোখে দেখেছি, পরাধীনতার জ্বালা আর রূদ্ধ বাকশক্তিতে ভরা চেতনাহীন মানুষের চেহারা কেমন হয় আমি পলে পলে উপলব্ধি করেছি। কিন্তু আঁচ করতে আমার মোটেই অসুবিধে হচ্ছে না সংস্কারমুক্ত হয়ে স্বাধীনতার ইচ্ছেটা জন্ম নিচ্ছে মানুষের মনে। এ যেন এক পূজা মন্ডপের শঙ্খধ্বনি আমার ঘরের দরজার কাছে এসে জানান দিচ্ছে – ওঠ ওঠ, এদের নিজের চিৎ সম্পদকে চিনিয়ে দেবার সময় হয়েছে। আমার ভেতরটা নেচে উঠল, কত কাজ বাকি আছে। এখনি না শুরু করলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। রাজা রামমোহনের অসমাপ্ত ইচ্ছেগুলোকে পূরণ করতে হবে বই কি। এই দেশ কি তাহলে আমারও দেশ, এদেশের মাটি আমারও মাটি এই দ্বন্দ্ব আমাকে তাড়া করে মারছে। গঙ্গার জল যখন পাড়ে এসে ছলাৎ ছলাৎ করে, বুকের পাঁজরে এক চিনচিনে ব্যাথা গোটা শরীরটাকে নাড়িয়ে দেয়। আহা! কার্বোনিফেরাস পাথরের উপত্যকা দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্যান্ডন নদীর কথা মনে পড়ে যায়। আমার জন্মভূমি ব্র্যান্ডন শহরের কী মহিমা! মাখানাক্লেরা পাহাড় আর কাহা ব্রীজ ছুঁয়ে পূব দিকে বয়ে চলে যায়, হিমপ্রবাহের প্রবাহ আর পলিমাটিতে ঢাকা এই শহরে আমার শৈশবের দিনগুলো। যৌবনের উচ্ছলতায় আমার কর্ম উদ্দীপনায় এই শহর কত অসমাপ্ত কাজের ইশারা নিয়ে আমায় ডাকে। আমার মন শুধু ছুটে বেড়ায়, জানতে চায় কোন কাজটাকে আঁকড়ে ধরলে এই দেশের অন্তরাত্মাকে ছুঁতে পারব।
মানুষ কথা বলে, কথার মধ্যে আরও কত কথা জমে থাকে। কার সাধ্য আছে তাকে খুঁজে নিয়ে আসল কথার রহস্য ভেদ করবে? এমন লোকও তো আছে যিনি নিজেকে মেলে ধরতে চান না, আবার জানান দিতে গিয়ে কত যে হোঁচট খান, মুখ থুবড়ে পড়েন, অথচ কত বলার কথা নিয়ে ওঁরা স্মৃতির ভারে আক্রান্ত হন, এই গোত্রের মানুষের ধমনীতে বইছে এমন রক্তের স্রোত যা জগৎ সংসারকে ওলটপালট করে দিতে পারে। কিন্তু কোথায় তাঁরা, কে তাঁদের চিনিয়ে দেবে? আমার চেনা জগতের বাইরে ওঁরা লুকোচুরি খেলছে। যারা ওঁদের খোলনলচে পাল্টাবে বলে দিনরাত প্রাণপাত করছে, ওই মানুষগুলোর অস্তিত্বেই হয়তো একটু হলেও তাঁরা সাড়া দেয়। তাঁদের রূপ রস গন্ধ নিয়ে ওরা যেন এই বিরাট গবেষণাগারে প্রতিনিয়ত চর্চা করছে। সেটাই কী আসল স্বদেশ না অন্য কোন অনাবিষ্কৃত জগত, এ-ও যেন কোন এক অন্তহীন জগতের সন্ধান দেয়। আচ্ছা, কোন ছোট্ট গণ্ডিকে দিয়ে বৃহৎ গণ্ডিকে ধরাছোঁয়া যায় আদৌ কখনও – এমন ধারণাও কোন এক দুপুরের শূন্যতায় ঝাপসা আলোয় মতো আসে আর যায়। আমি বুঝে উঠতে পারি না তখন আমার কী করা উচিত, আর কী করা উচিত নয়। তবুও এমন একদিন আসবে আমি এর সুলুক সন্ধান পেয়ে হয়তো যাবো। বিশ্বাস আরও গভীরভাবে জন্মালো যখন পাবলিক লাইব্রেরী মেটকাফ হলে স্থানান্তরিত হয়, নব্য বঙ্গের নেতা প্যারীচাঁদ মিত্র লাইব্রেরীয়ান পদে বসেন এবং রামতনু লাহিড়ী, তাঁরাচাঁদ চক্রবর্তী, রামগোপাল ঘোষ প্রভৃতি যুবকদের জ্ঞানালোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠে লাইব্রেরীটি। দ্বারকানাথ ঠাকুর কলিকাতা মেডিকেল কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে ডাক্তারি বিদ্যায় আরও পারদর্শী করার জন্য ইংল্যান্ডে নিয়ে গেলেন। কবি মধুসূদন দত্ত, রাজনারায়ণ বসু, ভূদেব মুখোপাধ্যায়রা হিন্দু কলেজে পড়ছেন। ডি.এস. রিচার্ডসন সাহেবের সেক্সপীয়ার পড়ানোর ভঙ্গিমায় ও বাগ্মিতায় ছাত্ররা মুগ্ধ হয়ে শুনছেন। গোলদীঘির পাড়ে বসে সুরা পান করে বাহাদুরি দেখে সংস্কারক সাজার প্রতিযোগিতা প্রাজ্ঞদের চক্ষুশূল হতে লাগলো। ঠাকুর বাবুদের দেওয়ানের ছেলে উমেশচন্দ্র সরকার খ্রীষ্টধর্ম গ্ৰহনের আশায় মিশনারিদের ভবনে আশ্রয় নিলে খ্রীষ্টিয় প্রচারক ডফের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয় তার বাবার। হিন্দুসমাজে তীব্র আন্দোলন হয়, অক্ষয়কুমার দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুররা প্রতিবাদ করে সামনের সারিতে আসেন, হিন্দু-হিতার্থী বিদ্যালয় স্থাপন হয়। খ্রীষ্টধর্মের সঙ্গে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার মাধ্যমে সংঘর্ষের সূচনা হয়। সামাজিক আন্দোলনের উগ্ৰতা শুধুমাত্র এলিট সমাজের মধ্যে গেল গেল রব ওঠে। কিন্তু নীচুতলার মানুষগুলোর এই নিয়ে উদাসীনতা খুব স্বাভাবিকই মনে হয়, এই দ্বন্দ্ব ওদেরকে খুব বেশি প্রভাবিত করে না।
পথেঘাটে এই নিয়ে কারও কারও কথা কাটাকাটি হয় না, এমনটাও নয়। ওরা বলতেই থাকে, বলতেই থাকে।
‘আরে বাপু এত জ্ঞানের কচকচানি আমাদের কোন কাজে আসবে, ওসব সমাজের মাথাদের কাজ।’
‘তাহলে আমরা কোন দিকে আর যাই, বালিতে মুখ গুঁজে বসে থাকি।’
‘যাই করি না কেন আমাদের কথার আর কী মূল্য আছে, ওরা যা নিদান দেবে তাই আমাদের মেনে চলতে হবে।’
‘সব দেশেই কি বাবু লোকদের হুকুম চলে? আমরা কাজ করি বলেই তেনাদের এত বিলাসীতা।’
‘আমাদের বুদ্ধিশুদ্ধি নেই এই কথা কেউ জোর গলায় বলুক দেখি, সমাজটা রসাতলে যাবে, ওদের মুখে পোকা পড়বে, তখন বুঝবে মজাখানা।’
ওদের এই রাগ আর যন্ত্রণার কথা আমি প্রতি পলে পলে অনুভব করছি। ওদের অস্ফুট কথার মধ্যেই শোনা যাচ্ছে বুক চাপড়ানোর শব্দ। ওরা দু’পা হেঁটে আসে আবার গালে হাত দিয়ে সাত পাঁচ ভাবতে থাকে। নিঃশব্দে বিপ্লবের হাতছানি ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কে কখন দেবে এই বেসামাল জীবনের খোঁজ। কত চিন্তা আর তার ফাঁকফোকরে ওদের মুখগুলো কেমন ম্রিয়মাণ। চড়া রোদের হলকা এসে শরীরে এসে ঝাপটা দিয়ে যায়, মাঝে মাঝে গঙ্গার বুক থেকে ভেসে আসা হালকা বাতাস ওই ঘেমো গায়ে একটু হালকা আমেজ আনে। তবুও কি ছটফটানি থামে, তা যেন চলতেই থাকে, অপেক্ষায় থাকে কখন ছায়া ছায়া ঠান্ডা বিকেল নামবে চালাঘরের নীচে। ওরা কেউ কাঁদে আবার কেউ আপন মনেই হাসে, মাটির গ্লাসে জল ঢেলে ঢক ঢক করে গিলে খায়। আমার ব্যান্ডন শহরের ছাপোষা মানুষগুলো এরকমই তো ছিল, কখনও গলা তুলে কথা বলার সাহস পেত না, পেট ভরে দুবেলা দুমুঠো খাবার আলু, বাদামি রুটি, সোডা রুটি, চাউডার কপালে জুটত না। আটলান্টিক মহাসাগরের আশপাশের বাতাস ওদের ছুঁয়ে যেত। বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যেন এক শ্রেণী সত্তাকেই চিনিয়ে দেয়। বর্ণ হতে পারে আলাদা রং, ভাষা হতে পারে ভিন্ন কিন্তু কল্পনার ঐক্য জানান দেয় এদের ওঠাপড়া, দিনযাপন কোথায় যেন একই সূত্রে গেঁথে রেখেছে। ওদের চোখের চাহনি আর দৃষ্টির আলো চোখে চোখ রেখে কত গল্প শোনাচ্ছে, কোথাও তো এতটুকু গোলমাল নেই। যে লোকসংগীত ওদের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসে, গানের কলি ওদের ঘুমিয়ে থাকা মনকে জাগিয়ে দেয়, তাকে বন্দনা করা ছাড়া আজও কোনও উপায় থাকে না। মানুষের দুর্দশাকে আত্মস্থ করা ছাড়া অন্য রাস্তাও যে খোলা নেই। তাই তো ওরা শয়নে স্বপনে গুনগুন করে কোনো এক ভরাক্রান্ত বিকেলে, পাখিরা যখন ডানা নাড়িয়ে পতপত শব্দ করে উড়ে চলে যায় হুই আকাশে। কেমন করে শোনা যায় সেই গান, গানের সুরেই মিশে গেছে না-পাওয়ার প্রতিবাদ :
……………..
তারা দড়ি টেনে ঝুলিয়ে দিল তাকে ঝুলিয়ে দিল
আ ওয়েলা ওয়েলা ওয়েলা
তারা দড়ি টেনে ঝুলিয়ে দিল তাকে ঝুলিয়ে দিল
সাইল নদীর ধারে
………………
কোথায় যেন মিশে যাচ্ছে হাতে হাত ধরার আকুতি। ওরা টেনে এনে শুনিয়ে দেয় নিজেদের বারোমাস্যা, নিজেদের আগুন ঝরানো উচ্চারণ আমার ভেতরটাকে গুলিয়ে দেয়। আমি শুনতে পাই সকলে উচ্চঃস্বরে কাঁদছে, বিষম খাচ্ছে থেকে থেকে, এও যেন আর এক জীবনকে নিজের জীবনের আত্মীয় করে নেওয়া। ওরা নিজেদের মনের আবেগকে প্রকাশ করে রামনিধি গুপ্তের টপ্পা গানের সুরে –
নানান দেশের নানান ভাষা
বিনা স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা
কত নদী সরোবর, কিবা ফল চাকতির
ধারা জল বিনে কভু ঘুচে কি তৃষা
কত সুর হারিয়ে গেল, কিছু শব্দ শোনা গেল না, তবু মনে হল এ-তো আমার মনের কথা যার জন্ম হয়েছে বহু দূরে ব্যান্ডনে যেখানে আর সেই কথাগুলো জমাট বাঁধে না, আমার কন্ঠস্বর পৌঁছয় না, ছন্দ হারিয়ে যায়। মানুষটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ওঁর কোঁকড়ানো চুল গানের তালে তালে দুলছে, শরীরও কেঁপে কেঁপে উঠছে যেন। কী মনে করে আবারো গাইল, নিজের আনন্দেই গাইল। আমার হৃদয়ের উষ্ণতা কি জানি ওঁকে ছুঁয়ে গেল কিনা। সেই জন্যই কি জানতে চাইল আবার গাইবে কিনা। এই এক অত্যাশ্চর্য অনুভূতি যা না উপলব্ধি করা যায়, আবার নিজের মনের সঙ্গে বাঁধতে গেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মানুষটা কেমন স্বচ্ছন্দে চারদিকের ছড়ানো আলো গায়ে মেখে নেয়, মাটির গন্ধে গন্ধে সুরের তাড়নায় মজে যায়। আমি তো কতকাল নিজের দেশের মানুষগুলোর মুখ দেখতে পাই না, এই মুখেরাই আমার তৃষ্ণা মিটায়। এদের হাসি কান্নার শব্দ আমার কানে বাজিয়ে দেয় আমার দেশের মানুষের যন্ত্রণা আর অভাব অনটনের সঙ্গীত, ওরাও হাঁটে, ওরাও নিঃশব্দে নিঃশ্বাস নেয়। দিন গোনে এমন দিনের যেদিন দেশটা ওদের মনের রঙে রঙিন হয়ে উঠবে, কথা বলে উঠবে নিজের ঢঙে, নিজস্ব চিন্তার অভিঘাতে নিজেরাই জেগে উঠবে। এমন কল্পনার জন্ম নেবে যা আগে কখনও জন্মা নেয় নি, এমন জীবনের সন্ধান পাবে, যার অপেক্ষায় দিন গুনছিল সেই দিন থেকে যেদিন পরাধীনতার শিকল পরে দিয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা, বাতাসে ছড়িয়েছিল ঘৃণার বারুদ, দম বন্ধ করে দিয়েছিল অত্যাচারের উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে। এই দেশেও ভেসে বেড়ায় সেই গোপন ছায়া, যার আড়ালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা পতপত করে উড়ছে নির্বিঘ্নে, স্ফুলিঙ্গের জন্মের হদিস তেমনভাবে আর আলোড়ন তুলেছে কই, মানুষের জীবন কেমন ছন্নছাড়া হয়ে কেমন এক অনাগত অজানা ভবিষ্যতের অপেক্ষায় দিন গুনছে। লোকটার অন্তরে দাউ দাউ করে জ্বলছে সেই আগুন। আমাকে সেই আগুন উসকে না দিলেই নয়। প্রতিভাস ম্যাগাজিন
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)