শরদিন্দু সাহা
লেখক পরিচিতি
বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।
বিষয় পরিচিতি
(রেভারেন্ড জেমস্ লঙ যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)
মনের মুক্তি আর মুক্তির ভাষা
অন্ধকারের পৃথিবী কী বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে আপন খেয়ালে, এমন রোহিনী রাতে বিষ্ময় জাগে বই কি। এমন ভাবনার জগতে এসে কত জিজ্ঞাসা আলোড়ন তোলে চুঁইয়ে পরা বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটার মতো, কত কিছুই তো আশ্রয় খুঁজে মরে, আবার বাকিটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমি জাপটে ধরতে চাই কিন্তু যে যার মতো একে অন্যটার সঙ্গে জুড়ে গিয়ে নতুন রূপ ধারণ করে, তখন না চিনতে পারে নিজেকে, না চেনাতে পারে অন্যকে। এই অবস্থাকে নিথর মাঝ সমুদ্রের তরঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা যায় কিনা সময় বলবে। তবে এই মুহূর্তে যে ভবিষ্যত সময়ের জন্ম হচ্ছে তার কোনো প্রকারেই সাম্প্রতিক সময় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এই জন্যই ঘুরে ফিরে আসে ‘প্রভাকর’ ও ‘ভাস্কর’ এর মতো সংবাদপত্র গুলির অনবদ্য ভূমিকার কথা যা কোনোভাবেই ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সঙ্গে তুলনীয় নয়। ‘জ্ঞানদর্পণ’ , ‘বঙ্গদূত’ ও ‘জ্ঞানসঞ্চারিণী’র পরস্পরের সঙ্গে চুলোচুলি বঙ্গদেশের সকলেরই জানা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে অনায়াসে ব্রাত্য করে দেবে সে কথা কষ্ট কল্পিত নয়। না হয় হরিশ মুখার্জির ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, রামগোপাল ঘোষের ‘বেঙ্গল স্প্যাক্টেটর’, কাশীপ্রসাদ ঘোষের ‘হিন্দু ইন্টেলিজেন্সার’, কিশোরীচাঁদ মিত্রের ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’ এর জন্ম নেবার প্রয়োজনই বা ছিল কি। ইয়ং বেঙ্গল এর যে মনস্বিতা আকাশ বাতাসে ম ম করে এখানে ওখানে ঢুঁ মারছিল তা কি এর এত সহজে গুমরে মরতে পারে, মাটি তো খুঁজে বেড়াবেই কোথায় পুঁতবে চেতনার মহিরুহ। নিজেদেরকে খুঁজে যে বেড়াচ্ছিল প্রকাশমান জ্যোতিষ্কের মতো, খানিকটা বিচ্ছিন্নও হতে চাইছিল চেনা শিকড়ের সঙ্গে আবার দোটানাও কি কম ছিল! ভাগ্যিস রাজেন্দ্র লাল মিত্রের ‘বিবিদার্থ-সংগ্ৰহ’ প্রকাশিত হয়েছিল বলেই না মাইকেল মধুসূদন দত্তের নব অমিত্রাক্ষর ছন্দে প্রণীত ‘তিলোত্তমা-সম্ভব’ কাব্য প্রকাশ পেয়েছে। বাঙালি জাতি এক নতুন ছন্দে আলোড়িত হয়েছে এই বিষ্ময়কর প্রতিভার প্রসাদ গুনে।
‘শর্মিষ্টা’ নাটক অভিনীত হচ্ছিল বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে। কবি মধুসূদন দত্ত পায়চারি করছিলেন কি এক অজানা আশঙ্কায়। মনের কোণে জেগে ওঠা ভাবনাকে প্রশ্রয় দিয়ে বলে উঠলাম মানুষটাকে একবার চোখের দেখা দেখব, দেখিই না এই নব্য বাঙালির সঙ্গে আমার কল্পনার মিলন ঘটে কিনা। খালি মনে হচ্ছিল এমন উদ্দীপনা নিয়ে যে মানুষটা বেঁচে আছে তাঁর জীবনদর্শন ভিন্ন মাত্রার না হয়ে যাবে না। পরখ করাটা অন্য দু-চারজন ব্যক্তিত্বের মতো অবশ্যই হবার নয়, নতুন এক দিশার খোঁজ মিলবেই মিলবে। আশাটা অমূলক হবে না জেনেই মির্জাপুর স্ট্রিট ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম। হাঁটার কষ্টটা আমাকে খুব যে বিড়ম্বিত করে তা নয়, আজ যেন আরও উদ্গ্ৰীব হয়ে পা চালালাম, দূরত্বটা মাথায় একেবারেই চেপে বসল না। গোধূলি বেলায় আলোটা ধীরে ধীরে মিশে যেতে চাইছিল আঁধারে, আমি সেই আঁধারে নিজেকে মিশিয়ে দিলাম। আলোটা নিবু নিবু হলে কেরোসিনের প্রদীপ দু-চার ঘরে জ্বলে উঠল। এমন অনুজ্জ্বল আলোতেও যে মানুষটির ভাবনায় চঞ্চল হলাম তিনি আর কেউ নন যিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের জাদুতে সকলকে মাতিয়ে তুলেছেন। এই মুহূর্তে তিনি আপাদমস্তক বাঙালি না খ্রিস্টান একবারের জন্যও মনে হচ্ছে না, বরং বেশি করে মনে হচ্ছে ইনি সেই বাঙালি যিনি ‘কেপটিভ লেডি’ পদ্যগ্ৰন্থের স্রষ্টা। বিশপস্ কলেজে তিনি হিব্রু, গ্ৰীক, লাটিন ভাষা রপ্ত করেছিলেন। একটা কথা মনের কোণে ঘুরে ফিরে আসত, আহা মানুষটা যদি নিজের ভাষায় মজে থাকতেন, বাঙালির ভাষা সাহিত্যের ভাণ্ডার কতই না পুষ্ট হতো। কথাটা যে ফেলনার ছিল না, তা অচিরেই টের পেলাম। কি জানি কোন উপলব্ধিতে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন। হয়তো এই মানুষটার সৃষ্টির পাগলামিতে আরও কত জন প্রাণিত হবেন কে জানে। এ-কথা অস্বীকার করি কি করে বিদ্যাসাগর ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ ও ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ লিখে যে নজির সৃষ্টি করেছেন মধুসূদন তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন নি। পৃথিবীতে অনেক কিছুর ক্ষেত্রে তথ্যের যোগাযোগ থাকে না কিন্তু তাই বলে সময়ের অভিঘাত থাকবে না এই কথা কি কেউ হলফ করে বলতে পারে? আঁধার যে আঁধারেই থাকবে তা কেমন করে সম্ভব, ঘুমন্ত আলোরা সেখানে হেসে খেলে বেড়ায় না এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। জীবনের নানা পর্বে পাক খেয়ে কখনও স্বদেশও বীদেশ মনে হয়, পরিবর্তন স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক সেই বিচার না হয় কালই করুক, মানুষের ধর্ম এগিয়ে যাওয়া এইটুকুই দায় স্বীকার করলেই ভূত ভবিষ্যৎ দুইই রক্ষা পায়। সম্ভবত মধুসূদন নিজের মাটিকে চিনতে শিখেছেন, ‘রত্নাবলী’ নাটকের বাংলা অনুবাদ সে-ও কি কম বড় ঘটনা – কেউ কেউ ছুঁতে পেরেছেন অনেকেই না চিনতে পেরে মুখ ফিরিয়েছেন। বাতাসে একটা গন্ধ ভেসে ভেসে আসছিল পূর্ণতা পাবে বলে সেই আঁচ লাগতে শুরু করেছে। মুৎসুদ্দিরা ভাবতে লাগলেন এই আবার হলো কী, এতকালের আয়োজনে কারা আবার এসে এত জোরে ধাক্কা মারছে যে সামলাতে গিয়ে হ্যাঁচকা টান লাগছে। ওরা ভাবতে শুরু করল এতো ভারি বিপদ, এখন হবেটা কী! সমাজটা কি রসাতলে যাবে? প্রশ্নটা আসলে আমি নিজেকেই নিজে করছিলাম। ভুলে গেলে চলবে না এখানে, যে সমাজ নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মোটেই মাথাব্যথা নেই, তাঁদের সাগরেদরা রুষ্ট হবেন, এতে আশ্চর্যের কী আছে!
‘কবিগন পাগলের সামিল’ ইংরেজ কবি সেক্সপীয়র বলেছিলেন বটে কিন্তু সত্যদ্রষ্টাকে অতীতের গর্ভ থেকে বর্তমানের ক্যানভাসে এনে দাঁড় করাবেন, এটা কি মুখের কথা! আপাত চঞ্চলতার মাঝেও যে স্ফুলিঙ্গ নীরবে বাসা বাঁধে না এই নিয়ে ভবিষ্যতবাণী করা, কাজের কথা নয়। মন চলে যায় নিজ নিকেতনে এই তো চাই, এত যে কর্মযজ্ঞ চলছে এর লক্ষ্যটাও আরও দূরে,এত দূরে যে কল্পনাও হার মানবে। এটা ঠিক কেউ কন্ঠস্বর শুনতে পায়, আবার কেউ বোবা কালা হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে থাকতে পারলে ভাবে এই যাত্রায় তো রক্ষা পাওয়া গেল, কিন্তু কালের ঘোষণা এড়াবে এমন দুঃসাধ্য কারো নেই। মধুসূদন নিজের পায়ে কুড়াল মারবেন, এমন ভাবনা তাঁর ছিল না, কিন্তু কখন যে কে পা পিছলে যাবেন কেউ বলতে পারে না। কলকাতা শহরের পথ চলতি জীবনটা বড় নির্লোভ, যৌবনের মদে মত্ত কিনা জানিনা কিন্তু শীতকাতুরে মানুষজন লেপ মুড়ি দেওয়া জীবন ছেড়ে জানালা খুলে সূর্যের মুখ দেখা শুরু করেছে তাতে গলা ছেড়ে গান নাই বা গাইলাম, সন্ধিক্ষণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব ভুবনের দরজায় আপন তাগিদে যে কড়া নাড়ছে, পাশ্চাত্য আর প্রাচ্যের ভাবনায় যে আদান প্রদান ঘটছে এই কথা না মানলে এই দেশীয়দের চিন্তা চেতনার সঙ্গে অবিচার করা হবে। মধুসূদনের কলম এমন দিকনির্দেশ করবে কিনা আমার মতো ভিন্ন দেশীয় পাদ্রীর পক্ষে বলা অনধিকার চর্চা হবে। কেউ আবার এই কথা ভেবে বসবেন না যে ধর্মান্তরিত হয়েছে বলেই মধুসূদনের জন্য আমার এত দরদ, আদপে তিনি কোন পথে হাঁটবেন, কতবার হোঁচট খাবেন, বাংলার মানুষ মাথায় তুলে রাখবেন কিনা এও বলতে পারব না। ধূমকেতুর মতো যার আবির্ভাব, সবকিছু ওলটপালট করে দেবার মতো যাঁর প্রাণশক্তি তিনি যে হলকর্ষণ করে সোনার ফসল পরাবেন এটা নিশ্চিত, না হলে শত শত হতভাগ্যদের মুখে বোল ফোটাবে কে। বিদ্যাসাগরের চিন্তা চেতনা ইতিমধ্যেই যে বীজ বপন করেছে, সেই ফসলকে সযত্নে লালন পালন করার উপযুক্ত প্রতিভার জন্যই এত দোদুল্যমানতাকে ক্ষমা ঘেন্না করে নেওয়া। বিদ্যাসাগর এটাও বুঝেছেন মধু কবির অচিরেই সাহিত্যের শিকড় ধরে টান মারবে। পথটা যে বড়ই এবড়ো খেবড়ো সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না, তাই বলে থেমে থাকলে তো চলবে না। পথটা মাড়িয়ে যেতে না যেতেই চাঁদের আলো ছড়াচ্ছে বাড়ির ছাদে, খোয়া মাখানো রাস্তায়, নেড়ি কুকুররা ঘেউ ঘেউ করে তেড়েও আসছে, সওদাগরী অফিসের কাজকর্ম সেরে বাবুরা ধুতি ফতুয়া পরে বগলে ছাতা নিয়ে ঘরে ফিরতে গিয়ে আনমনায় গা ঘষাঘষিও করে ফেলেছে। পথ যেন ফুরোতেই চায় না কিছুতেই। এই দিকটায় বিলিতি সাজগোজ পড়ে নি ঠিকই কিন্তু বাবুয়ানি ছুঁয়ে গেছে ষোলো আনা। কবির মুখোমুখি যে হতেই হবে, না হলে এত দূর আসা যে বিফলে যাবে। শ্যামবাজার স্ট্রিটের শেষপ্রান্তে এসে দিক্ভ্রান্ত হলাম। পথের ধারে এক মুচিকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ওহে বেলগাছিয়া রোড কোন দিকে বলতে পারো? মুচকি হেসে বলল, সাহেব এখনও আমাদের দেশ চেন না, কোথায় যাবে? বললাম, রঙ্গালয় যাবো? অবাক হয়ে ক্ষণিক তাকিয়ে থেকে বলল, সে আবার কী! মনে মনে ভাবলাম হায় হায় রে এই দেশের মানুষের কী গতি হবে। ইশারায় বলল, সোজা গিয়ে ডান দিকে গেলেই খুঁজে পেয়ে যাবে। নিচুস্বরে বলল, মানুষ কত অকাজই না করে। কথাটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হলেও ওর কাছে যে বড় ওজনদার। মানুষ নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে অনেক উঁচু কথাকেই না নিচু বলে হেলায় উড়িয়ে দেয়। ওকে বললাম, আরও অনেক পথ যেতে হবে! বলল, হ্যাঁ সাহেব। জানি না ও নিজের জন্য বলল কিনা।
মধু কবির ভাবনায় কত কিছুই না ঘুরপাক খাচ্ছিল। সৃষ্টির আনন্দে যিনি বিহ্বল হয়ে থাকেন, কে এল আর কে গেল এই নিয়ে উদাসীন থাকবেন সে তো স্বাভাবিক। তাই বলে মানুষকে উপেক্ষা করবেন এমন মানুষ তিনি নন। আচমকা যে আমি এমন প্রশ্ন করে বসব, ভাবতেই পারেন নি। বললেন, আপনি ‘রত্নাবলী’ নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন না। উত্তরটা আমি দিতে দ্বিধান্বিত বোধ করছি না। রামনারায়ণ তর্করত্ন সংস্কৃত থেকে ‘রত্নাবলী’ নাটকের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন সত্যি কিন্তু ওর নিজস্ব ধ্যানধারণা সেখানে যুক্ত করেন নি কে বলতে পারে যদিও তার জন্য পাঠক কিংবা শ্রোতাদের অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন, না হলে বাংলা রঙ্গমঞ্চ এভাবে কেঁপে উঠবে কেন! এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়ে গেল কিনা, কী বলেন। উত্তরে বললেন, আমার বলা না-বলায় কী আসে যায়। দর্শকদের হৃদয়কে নাড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই নাট্যকার আর অভিনেতাদের সাফল্য, কখনও হাসি, কখনও চোখের জল। রুশ দেশবাসী লেবেদফ সেই কবে ‘বেঙ্গলি থিয়েটার’ স্থাপন করেছিলেন, সে কি কেবলই বিনোদনের জন্য এই বিশ্বাস আমার হয় না। অনেক ভেবেছি ওঁর এই ভাবনার পেছনে মানুষের চেতনাকে উন্মোচনের দৃষ্টি ছিল প্রখর। বললাম, আপনি কি এসব কথাই ভেবে মরছেন। বললেন, না শুধু তাই নয়, আমাকে ‘রত্নাবলী’ নাটক প্রদর্শিত হওয়ার পর এই কথাই ভাবাচ্ছে বাঙালি জাতি কবে হাফ আখড়াই, পাঁচালি আর কবিগানের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসবে। পাইকপাড়ার রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ আর ভাই ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ভাগ্যিস বেলগাছিয়া নাট্যশালা তৈরি করেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এর চেয়ে বড় স্বপ্ন দেখেন? বললেন, দেখি বই কি। আপনি কি বলেন, নবজাগরণের ঢেউ কি এমনি এমনি আসবে, বাংলা, নাটক, উপন্যাস, কাব্য সৃষ্টিতে নতুন করে জাতির নাড়ি ধরে টান দিতে হবে, তবে যদি ঘুমন্ত জাতি নিজেকে চিনতে পারে, নিজের অন্তরাত্মার খোঁজ পেতে পারে। আপনি কি ‘ন্যাশনাল থিয়েটার’ এর স্বপ্ন দেখেন। বললেন, হ্যাঁ,আপনি ঠিক জায়গায় ছুঁয়ে গেছেন, এর চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখি। আমার অনেক ভুল ভেঙে গেছে। বললাম, আপনি কি ভাবছেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক আপনাকে সেই পথ দেখাবে? আবার একটু পায়চারি করে নিলেন। মঞ্চে তখন মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে মূল নাটক। হিমেল হাওয়ার কাঁপুনি ছুঁয়ে যাচ্ছে পথচারীদের। কে আর কার খেয়াল রাখে। কথার ফাঁকে ফাঁকেই উদাস হয়ে ছুঁয়ে দেখছেন নিজেরই দুই চোয়াল। ভাবছিলাম প্রশ্নোত্তরের ফাঁকে নতুন কোন পঙ্ক্তি তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে কিনা। বললাম, দীনবন্ধু মিত্রর সৃষ্টির কোন খবর তিনি রাখেন কিনা। কথাটা শোনা মাত্রই তিনি লুফে নিলেন। মিত্র মশাইয়ের সঙ্গে আমার সম্প্রতি সাক্ষাৎ হয়েছে। কথা বলে বুঝলাম, বাঙালি সাহেব আর বিলিতি সাহেবদের উনি একই বন্ধনীতে রেখে বিচার করে ওনার ক্ষোভ উগরে দিলেন। গরীব ছাপোষা কৃষকরা যে ভাবে শোষিত হচ্ছে তা তাঁকে চিন্তিত করে রেখেছে। আর জানালেন তা নিয়ে কলম ধরতে মোটেই তিনি পিছপা হবেন না। বললাম, ওঁর ভাবনা কি আপনার যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না? দেখুন লঙ সাহেব, সত্যি বলতে আমি পিছপা হই না। জীবন সম্বন্ধে আমার ভাবনা আর সাম্প্রতিক ঘটে চলা ঘটনাবলীর ঘাত প্রতিঘাত সম্পূর্ণটাই আমার অভিজ্ঞতার চেয়েও আমার চর্চিত জ্ঞানের নিরিখে দেখতে আমি অভ্যস্ত তা মোটেই দীনবন্ধু বাবুর সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা যাবে না। গ্ৰাম জীবনকে তিনি আত্মস্থ করেছেন তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। বললাম, আপনার শর্মিষ্ঠা নাটক নিয়ে যদি কিছু বলেন। দেখুন, আমি দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করছি ‘রত্নাবলী’ নাটক আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে কিন্তু এর দোষ ত্রুটি আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। বললাম, আপনি কী এই কারণেই ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক লিখেছেন? না, এই কথাটা স্বীকার করে নিলেন অর্ধসত্য বলা হবে। আমি একথা ভুলিনি, ‘ক্যাপটিভ লেডি’ লেখার পর মহাত্মা বেথুন ও আরও অনেক ইংরাজরা আমাকে বলেছিলেন, ‘এম.এম. ডাট্, বিদেশীয়ের পক্ষে ইংরাজী কবিতা লিখিয়া প্রতিষ্ঠালাভের চেষ্টা করা মহা ভ্রম। তদপেক্ষা আপনার মতো প্রতিভা স্বদেশীয় ভাষাতে নিয়োজিত হইলে দেশের অনেক উপকার হইতে পারে।’ সময় অনেক অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু কথাগুলো যে অনুরণন সৃষ্টি করেছে তা আমার মধ্যে সমানভাবে আজও জাগ্ৰত। বলতে পারেন, এই নাটক সেই ভাবনার ফসল।
তারপর আমি খানিকটা ধাতস্ত হলাম এবং আমার নিজের মধ্যেও যেন এই মুহূর্তে ভিন্ন এক চেতনার জন্ম হয়ে গেল। তবুও সকল দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে জিজ্ঞেস করলাম, এই নাটকের অন্তর্নিহিত ভাব নিয়ে যদি কিছু বলেন। তিনি আমার কথা শুনে এমাথা থেকে ওমাথা দুপাক ঘুরে নিয়ে বললেন, আপনার মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তির কাছে আমার বলতে সংকোচই হচ্ছে। বললাম, আমরা দুইজন দুই মেরুর মানুষ, আমাদের পরস্পরকে জানা উচিত। একই মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছি যে। বললেন, তা আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে কিনা ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক প্রথম বাংলা নাটক ঠিকই, কিন্তু সংস্কৃত নাটককে উপেক্ষা করবো এমন দুঃসাহস আমার নেই, মহাকবি কালিদাস মাথার উপর বসে রয়েছে, ‘কুমারসম্ভম মহাকাব্য, ‘মেঘদূত’ গীতিকাব্য এমন করে কে আর কবে লিখেছেন। ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ আমাকে তো নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু শুনলাম এই নাটক যা এই মুহূর্তে মঞ্চায়িত হচ্ছে তা তো আপনি পাশ্চাত্যরীতিতেই লিখেছেন। আবারও হাসলেন – সাহেব, যাঁরা নব্য শিক্ষিত হয়েছেন, তাঁদের রুচির কথা মাথায় না রাখলে সবই যে মাঠে মারা যাবে। বললাম, বিষয়বস্তু তো শুনেছি মহাভারতের আদিপর্ব থেকে নিয়েছেন। খানিকটা আশ্চর্য হয়ে বললেন, এটা জগৎবাসীকে না বোঝালে চলবে কেন – দেখ ভালো করে দেখ আমাদের ঘরের সাহিত্যের সম্পদ শেক্সপিয়ারের চেয়ে কম কীসে! এখানে প্রেম, সংঘর্ষ, বিরহ ও মিলন কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। আমাদের শোক দুঃখের গল্পগাথা যে কোনো মহাকাব্যকে হার মানাতে পারে। মনে মনে ভাবলাম তাহলে আর ইংরেজি ভাষার কবি হওয়ার সাধ হয়েছিল কেন? আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, আমাদের ভাণ্ডারে যে এত রত্ন মণি মাণিক্য আছে তা আগে তো বোঝার সুযোগ হয় নি। ভাবলাম, যত ধন সব তো আপনাদের ঘরেই সঞ্চিত আছে। পরে পরে বুঝলাম, আপনারা ধনবান হয়েছেন আমাদের সম্পদে বলীয়ান হয়ে, কিন্তু সময় এসেছে নিজেদের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে নিজস্ব সম্পদকে চেনানোর যেমন করে আপনারা বোঝেন। এই মধুকবিকে বোঝা এত সহজ নয় পাদ্রী সাহেব। কবির কথার মধ্যে এমন এক অদ্ভুত ঝাঁঝ দেখলাম এবং বুঝলাম এই মানুষটি আর পাঁচজন বাঙালির মতো শুধুশুধু সাহেব সাজতে যান নি, আরও অনেক চিৎসম্পদে ভরপুর হয়ে আছে, সেইজন্যই বোধহয় এত লাগামছাড়া, আগ্নেয়গিরির মতো ফুটন্ত আগুন নিয়ে ফুটছে, যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটবে। কল্পনা আর আবেগকে মেধায় মাখিয়ে সাজিয়ে দেবেন বঙ্গ জননীকে একদিন ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ঢঙে, তখন সকলে চেয়ে চেয়ে দেখবে। ভাবলাম এমন সব প্রশ্ন করবো, মধুকবির হাঁড়ির খবর টেনে বের করে নিয়ে আসবো কিন্তু আমাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গটগট করে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন দর্শকদের ভালোমন্দ আভাস আন্দাজ করবেন বলে।
মাতৃভাষার প্রতি মানুষের যে এত দরদ মধুকবিকে না দেখলে আন্দাজ করা কঠিন হতো। কি মিষ্টতা আর মাতৃস্নেহ যে ভাষার গায়ে লেপ্টে থাকে তা তো স্রোতস্বিনীর মতোই মনের বৃত্তে ঘোরাফেরা করে। আমি তাই তো এই ভাষার গন্ধে মোহিত হয়েছি। ‘ক্রিশ্চিয়ান ইন্টেলিজেন্সার’ পত্রিকার সম্পাদককে আমি আমার মর্মবেদনার কথা জানিয়ে বলেছিলাম – কি এক অপরিণত চিন্তা জমিদারদের বলে কিনা ‘প্রজাদের লিখতে পড়তে শেখানোর প্রয়োজন নেই, তাহলে বাকি খাজনা দেবে না, ভদ্রতা, শিষ্টাচার দেখানো ভুলে যাবে।’ সমাজের মাথাদের এইরকম অর্বাচীন মন্তব্যই জানিয়ে দেয় ছাপোষা মানুষগুলোকে নিয়ে ওরা কি খেলাটাই না খেলছে, শুধুই ভাবনা কখন নিজেদের আসনটা টলমল করে উঠবে। এদের অন্তরের বেদনাকে আমাকে জানতেই হবে, শিক্ষার প্রদীপ জ্বালাতেই হবে ঘরে ঘরে, তারা আমাকে পাদ্রী বলে দাগিয়ে যদি দিতে চায়, দিক। শিক্ষার খোলনলচে পাল্টে দিতে হবে, অজ্ঞানতা দূর করতে হবে। আমার স্বজাতিরা কেউ কেউ হয়তো রূষ্ট হবে। স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে লাঠি নিয়ে তাড়া করবে না সেও কী কখনও হয়! গুরুমহাশয়রা ধর্ম, অঙ্ক শেখায়, লিখতে পড়তে শেখায়, গরীব গ্ৰামবাসীরা বিনিময়ে উপহার দেয়, ইতিহাস ভূগোল শেখানো তো দূরের কথা। স্কুলের ছাত্ররা বলে ব্যবসায়ী, ক্যাপ্টেন আর পন্ডিত হওয়ার জন্য ব্যাকরণ শিক্ষার দরকার নাকি নেই। হায় হায় রে এতটা অন্ধকারে ডুবে এরা বেঁচে আছে কেমন করে! এদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই? বাংলার ইতিহাস, ভূগোল ও ক্ষেত্রবিদ্যার পাঠ না দিলেই নয়। লর্ড ডালহৌসি এই নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন বটে, ডা. মৌয়াটও এই বিষয়ে অবগত আছেন, মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব তো অস্বীকার করার প্রশ্নই আসে না। এই নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্ব আছে বটে, আমি কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই এই নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। লর্ড ডালহৌসির পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একজন বাস্তববাদী কুসংস্কারমুক্ত রাষ্ট্রনায়কের দৃষ্টিভঙ্গিই বলা যায়। তবে তাকে বাস্তবের মাটিতে প্রয়োগ করা নির্দেশের চেয়ে ঢের কঠিন। মি. হ্যালিডের চিন্তাধারাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। লর্ড ওয়েলেসলিও প্রাচ্য ভাষার অনুশীলনের জন্য কম চেষ্টা তো করেন নি।
ভাষার ব্যবধানটা আত্মীয় স্বজনের মতো, বন্ধনে এমন করে জড়িয়ে আছে ইচ্ছে করলেও দূরে ঠেলা যায় না, বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াতেই হয়, বিরোধী তো দূরের কথা, বন্ধু হলেই উভয়ের মঙ্গল। এফ. জে. হ্যালিডেও দ্বিমত করেন না। ডা. ডাফ মনে করেন মাতৃভাষা অনেক মানুষের জন্য আর ইংরাজি সামান্য কয়েকজনের জন্য অর্থাৎ কিনা যারা ইংরাজি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের জন্য জ্ঞান অর্জন করতে চান। হিন্দু প্রবাদটি ভুলে গেলে চলবে কেন ‘ সমুদ্রকে মিষ্টি করতে হলে কয়েক ফোঁটা দুধও তার মধ্যে ঢেলে দাও।’ আমাদের দেশের অর্থাৎ আয়ারল্যান্ডের বুদ্ধিমান ও অত্যাচারী জমিদারেরা লোহার ডান্ডার সাহায্যে শাসন করে এবং প্রজাদেরকে অজ্ঞতার মধ্যে রেখে দেয়। ফ্রান্সে প্যারিসের বৈঠকখানা ছিল পণ্ডিতদের আশ্রয়স্থল আর কৃষকেরা বাস করত অজ্ঞতার মধ্যে। ডা.জনসন মনে করেন ‘জ্ঞান সর্বদাই বৃদ্ধির আশা রাখে, কোনো বহিঃশক্তির প্রভাবে আগুনের মতো ইহার বৃদ্ধি হয়, কিন্তু পরবর্তীকালে ইহা নিজে নিজেই বিস্তার লাভ করে।’ ইংরেজ সরকার আইরিশ ভাষাকে দমন করার জন্য আইন আনে। জেলের খাদ্য ও ফাঁসিকাষ্ঠের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য স্কুলের প্রয়োজন। বার্ক মনে করেন ‘কোনো এক জাতির লোকগাথা তৈরির ক্ষমতা পেলে, উহার আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তোমায় দিতে পারবে।’ বাংলার হতভাগ্য কৃষকদের দুর্দশার জন্য দায়ী হলো নিজেদের দেশের অত্যাচারী লোক। লর্ড কর্ণওয়ালিশ চিরকালের জন্য তাদেরকে জমিদারের ভূমিদাসে পরিণত করে রেখেছে। শিক্ষা পরিষদের সভাপতি মি. মেকলে সাধারণ মানুষের সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না। অর্ধ ইংরেজ ভাবাপন্ন শহর কলকাতা ছিল একমাত্র গণ্ডি, বড়জোর তাঁর জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিল মারাঠা খাল পর্যন্ত। আমি মনে করি বাংলার মুসলমানদের যদি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে গণ্য করা হয় তা হলে ভারতের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা ও শাসন ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটাতে বাধ্য। বর্ণ ব্যবস্থার জন্য বিশেষ শ্রেণির মধ্যে জ্ঞানের একচেটিয়া অধিকার বজায় আছে – সংস্কৃত শাস্ত্রের জন্য ব্রাক্ষণদের মধ্যে আর ফারসির জন্য মুসলমানদের মধ্যে। মাতৃভাষায় জ্ঞানদানের অব্যবস্থাপনার জন্য সাধারণের মধ্যে প্রসার লাভ করা সম্ভব হয় না। আমি মনে করি মেয়েদেরও পুরুষদের জ্ঞান লাভের সমান অধিকার আছে। ইউরোপীয় শিক্ষা সম্পর্কে যারা উদাসীন তাদের বিচ্ছিন্নতা শুধুমাত্র তাদের জন্য দুর্ভাগ্যের নয়, দেশের সামাজিক উন্নতির পক্ষে প্রতিবন্ধক। বিদেশী ভাষার জন্য শিক্ষার মন্দিরকে কঠিন করলে একচ্ছত্র শিক্ষার দ্ধারা খারাপ ফলের সৃষ্টি হবে এবং সামান্য কয়েকজনের জন্য অনেকের উপর অত্যাচারের সামিল হবে।
সময়ের তালে তালে কত কিছুই না শিখিয়ে দেয়। বার বার করে ফিরে দেখার তাগিদ অনুভব করি নিজেরই কর্মচঞ্চলতাকে পুনর্জীবিত করার তাগিদে। অক্ষয়কুমার দত্তকে অস্বীকার করবো এমন বুকের পাটা আমার আছে নাকি। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা কখন যে সমাজ সংস্কৃতিকে আগলে বসে থাকেন নিজেরাই জানেন না। উত্থান পতনের দোলাচলকে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করলেই অন্তরাত্মা জেগে ওঠে, জীবনের আড়ালগুলো সরে সরে যায়। দত্ত মহাশয় এমন ভাব প্রকাশ করলে অবাক হবো কেন, তাঁর দৃষ্টির স্বচ্ছতা ক্রমশ প্রকাশমান হয় দ্বন্দ্বে আর অনুসন্ধিৎসায়, না হয় মাতৃভাষার তিজোরি সাজাতে কেইবা এমন উঠেপড়ে লাগে। অক্ষয় কুমার দত্ত ছাড়া এইসময়ে আর কাউকে ভাবা যায় নাকি। মানুষটাকে আগে দেখেছি ইদানিং তাঁর কাজকর্ম দেখে আবারও দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। ভোর না হতেই ছুটলাম। পালকি থেকে নেমে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে ব্রাহ্মসমাজের অফিসের মধ্যে উঁকি মারতেই দেখলাম একজন মানুষ ঘাড় গুঁজে লিখে চলেছেন। চুলগুলো উস্কোখুস্কো, শরীরে বয়সের ভারের চিহ্ন থাকলেও গভীর মনোযোগের এতটুকু অভাব ঘটছে না। কারও আসা যাওয়া নিয়ে এতটুকু ভ্রুক্ষেপ নেই। খানিকটা ইতঃস্তত হয়ে অফিসের অন্দরে গিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দু-একটা জুড়ি গাড়ি ঠক ঠক শব্দ করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মানুষটার তবুও নড়চড় নেই। অস্বস্তিতে চৌকাঠ ডিঙোতে গেলেই টের পেয়ে বললেন – কে?
উত্তরে বললাম, আমি লঙ। ঘোর কাটিয়ে জানতে চাইলেন – পাদ্রী জেমস্ লঙ! কী মনে করে? এককথায় এর উত্তর কী দেওয়া যায়। বিশেষত বঙ্গদেশের অন্যতম কাগজ তত্ত্ববোধিনীর সম্পাদকের যাঁর লেখা প্রবন্ধ ডিরোজিওর শিষ্যদের পর্যন্ত নাড়িয়ে দিচ্ছে আর যে মানুষটি কাউকে খুশি করবেন বলে পাঠক খাওয়ানো মুচমুচে লেখা পরিবেশন করেন না, যুক্তিনির্ভর রচনায় যার জুড়ি মেলা ভার, অন্য পত্র পত্রিকাগুলো যখন পাঠে অরুচি হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সাহস করে বললাম, একটা কথা জানার কৌতূহল নিয়ে এসেছি, আপনি এত সহজে বিজ্ঞান আর ধর্মকে সমান্তরাল রেখে প্রবন্ধ লেখেন কেমন করে! কলমটা সরিয়ে রেখে মাথা উঁচু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বললেন, আমার নামটা অক্ষয় কিনা। আমিও চোখে চোখ রেখে বললাম, শুনলাম আপনি নাকি বেদান্তবাদ ও বেদের অভ্রান্ত বাদ পরিত্যাগ করেছেন আর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আপনার যুক্তি সিদ্ধ মতকে মান্যতা দিয়েছেন, এমন অসম্ভবকে সম্ভব করলেন কেমন করে! স্তিমিত হেসে বললেন, অতি সোজা, নিজের উপর আস্থা আর বিশ্বাসকে বাস্তবসম্মত করে পরিবেশন করা। তাঁর বলার ভঙ্গি আর উচ্চারণ দুটোই যেন অনুকরণীয় মনে হলো। নিজেকেও এই সুযোগে একবার যাচাই করে নিলাম।
সারারাত ধরে লেখালেখির পর ক্লান্ত হয়ে চোখমুখ ধুয়ে এসে বসে বললেন, এবার আপনার মনের কথা খুলে বলুন, আমি মন দিয়ে শুনবো। রাতে আর দু চোখের পাতা এক করতে পারি নি। নানা চিন্তা এসে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে, কত যে কাটাকুটি করেছি আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না, অনেক গুরু দায়িত্ব মাথায় চেপে বসে আছে, কেবলই মনে হয় কিছুতেই পাঠককে বিভ্রান্ত করা যাবে না, শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে ষোলো আনা সচেতন থাকতে হবে, মনের ভাব ব্যক্ত করতে হবে মানুষের মুখের ভাষা বাংলাতে, না হয় মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছনোর উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। বললাম, আপনি তো ব্রাহ্মসমাজে সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলা ভাষায় প্রার্থনার প্রবর্তন করেছেন। আপনার মনে হয় নি সকলে উচ্চকিত রবে প্রতিবাদ করতে পারে। বললেন, তাতে কী আসে যায়, যেটা সময়োপযোগী তাকে আজ না হয় কাল মেনে নিতে হবে। আমি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক হতে পারি, কিন্তু এই পত্রিকার মাধ্যমে আমার প্রবন্ধে সেই কথাগুলোই বার বার বলি যাতে মানুষ কুসংস্কার মুক্ত হয়, মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠে, যুক্তিবাদী মন তৈরি হয়, কলা ও সংস্কৃতির বিকাশ হয়। আপনারা লক্ষ্য করেছেন, বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আমি বিধবা বিবাহের পক্ষে মত দিয়েছি। আমার বলতে দ্বিধা নেই ধর্ম ও তত্ত্বের বেড়াজালে আমি সময়ে অসময়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। শুনেছি মি. লঙ আপনি নিজেও মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার মাধ্যমে জোর দিচ্ছেন। বললাম, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন, অনুবাদ কর্ম নিয়ে আমার বিস্তারিত কাজ করার ইচ্ছা আছে, যাতে এই দেশীয়রা নিজের ভাষায় পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী হয়ে উঠতে সক্ষম হয়, তেমনি এই দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও কাব্যের সঙ্গে ইংরেজ সাহেবরাও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে, সেইজন্যই তাঁদেরও বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচয় ঘটানো জরুরি। পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব থাকলে ইংরেজ শাসকরা সুশাসন দেবে কী করে, এই দেশের মানুষের অভাব অভিযোগ জানবে কেমন করে। মি. লঙ আমি এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে সহমত পোষণ করি। আপনি এগিয়ে চলুন, আমি আপনার সঙ্গে আছি। বললাম, সে তো আমি জানি মি. দত্ত। আপনি তো ইতিমধ্যেই অনেক কাজ করেছেন – প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্যবিস্তার ভূগোল, চারুপাঠ, পদার্থবিদ্যা, ধর্মনীতি, বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার -এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই সমাজকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছেন এবং বাঙালি বুদ্ধিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছেন। সুর নরম করে লজ্জিত কন্ঠে বললেন, আমি কী এমন কাজ করেছি, কত কাজই তো বাকি থেকে গেল, মস্তিষ্কের ব্যামো হয়তো আমাকে আর সেই সুযোগ দেবে না। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এখনও সব দিক দিয়ে পিছিয়ে, আপনার মতো ভারত বন্ধুরা চেষ্টা করে দেখুন কিছু করতে পারেন কিনা, তাহলে আমার দেশবাসীর হয়ে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। ধর্ম নিয়ে পড়ে থাকবেন না, মানুষের মঙ্গলের কথা একবার ভেবে দেখবেন, এই জাতির মুক্ত চিন্তার বড় প্রয়োজন। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমি বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলাম যতদূর চোখ যায় আঁধার পরিবৃত হয়ে আছে বাড়িঘরগুলো, বিন্দুমাত্র আলোর দেখা নেই। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
