শরদিন্দু সাহা
লেখক পরিচিতি
বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।
বিষয় পরিচিতি
(রেভারেন্ড জেমস্ লঙ যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)
জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এ কোন ভাঙাগড়া
কলিকাতা শহরের অন্দরমহল নিয়ে কত গুঞ্জন-ই তো কানে আসে, কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরবো বুঝে উঠতে পারি না। তাই বলে কি দরজা বন্ধ করে বসে থাকবো, তা কেমন করে হয়, না ঝাঁকালে কেমন করে বুঝবো আলোর নীচে আঁধারটা কেমন, আলো-আঁধারিতে ভরা, না ঘুটঘুটে আঁধার। কত কিছুই যেন অধরা থেকে যাচ্ছে। উত্তাল তরঙ্গ কত দিকেই না মরা গাঙে জোয়ার এনেছে ঠিকই কিন্তু সবটাই যেন প্লাস্টার অফ প্যারিস ছাড়া দেয়ালে সরাসরি রং করার মতো। চকচক করছে বটে কিন্তু অচিরেই ফাটল বেরিয়ে উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। বাবু মশাইয়ের কীর্তিকলাপ দেখে লজ্জায় মুখ ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় আছে কী! এই শহরটার শরীরটাকে না বুঝলে যে অন্তর বোঝা দুষ্কর হবে। খালি মনে হয় ডোবা পুকুর নর্দমার গন্ধ যেন লেগে রয়েছে গায়ে গায়ে। পানা আর বদ্ধ জলের পুঁতি গন্ধ কী নাকে রুমাল চাপা দিয়ে এড়ানো যায়, ফাঁকফোকর দিয়ে ভকভক করে দুর্গন্ধ তো বেরিয়ে আসবেই কিন্তু তাই বলে সাফসুতরো করা যাবে না, এমনতো নয়। পরিবর্তনের এমন হাওয়া বইছে, কিন্তু সেই হাওয়া এমন অনেকেরই গায়ে লাগছে না। পশ্চিমি জ্ঞানের হাওয়া আর নিত্যনতুন ধর্মের ঢেউকে ঘিরে কত শিবির যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে তারই-বা খবর কেউ রাখে। তরজা, খেউড়, আখড়াই, হাফ-আখড়াই, কবিগানে মেতেছে এই শহর, তাকে কে যোগাবে এই খবর মানুষ খুঁজছে আসলে কাকে। চাপান উতোরের দাপটে কে যে কোন দলে গিয়ে ভিড়বে, কে জানে। শুনতে তো পাচ্ছি, ছিল তো আধ্যাত্মিক রস থেকে আদিরস সেই সব তরজায়। জোড়াসাঁকোর নবকুমার মল্লিকের আসরের কথা কত মানুষের মুখেই তো শোনা। বাগবাজারের দল জোড়াসাঁকোর দলকে রমণীরূপে ভজনা করে প্রেমের অনুরাগ জানায়। সংবাদ প্রভাকর ও চন্দ্রিকায় এই নিয়ে বিতর্কের সূচনা নাকি কম হয় নি। তারিফও করতো – প্রশংসার শব্দে বাড়ির থামও কেঁপে উঠতো। নিধুবাবুর আখড়াই গানের খেউড় – ‘ সাধের পীরিতি সুখে, দুখ পাছে হয়। তুমি হে চঞ্চল অতি, সদা এই ভয়।। গোপনে যতেক সুখ, প্রকাশে তত অসুখ, ননদী দেখিলে পরে প্রণয় কি রয়।। হাফ আখড়াই গানের মহড়া আর চিতেন তো কম চমৎকার নয়। বাগবাজার দলের মহড়া– কৃষ্ণ কৃষ্ণময় হয় ব্রজের সকলে। কৃষ্ণরূপ ভেবে কৃষ্ণরূপ, একি রূপ, অপরূপ, হয়ে যতনে কৃষ্ণপক্ষ, দিবসে কৃষ্ণপক্ষ, কৃষ্ণ হে রাধায় কৃষ্ণ করিলে।। চিতেন – কে সব কে শব দেখ, শ্যাম হে বিরহ তোমার। সুখ বৃন্দাবন, শ্মশান সম, কৃষ্ণ হে সাকার শবাকার।। জোড়াসাঁকোর দলের মহড়া – ওগো …য়ী শ্রীমতী তোমার ভাব দেখে হয়েছি বিস্ময়। বাজার শ্যাম গুণধাম, তোমার নাম বাঁশিতে, তুমি মন দিলে শ্যামের ঠাঁই, শ্যামের মন নিলে যাই তার সনে তোমার বিচ্ছেদ বিচ্ছেদ নয়।। চিতেন – শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদ, খেলে, শোকাকুল। গোপকুল, আর গোপীকুল, মিছে ভাবিয়ে আকুল।। আমরা জানি শ্যামের মন, কৃষ্ণ ছাড়া নহে এই বৃন্দাবন। হলে কি জন্যে এত উচাটন।। রাজা নবকৃষ্ণ দেব তো উৎসাহ দিতে কসুর করতেন না। ভাগ্যিস কুলুইচন্দ্র সেন রাগ-রাগিনী আর বাজনা জুড়ে খেউড় গানকে শুদ্ধ করেন। হরু ঠাকুর তো কবেই এই ধরাধামে ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন, ভোলা ময়রা বিদায় নিয়েছেন, বেশিদিন তো হয় নি। কার না মনে নাই সেই সব কবিগানের লাইন – আমি সে ভোলানাথ নই, আমি সে ভোলানাথ নই। আমি ময়রা ভোলা, হরুর চেলা, শ্যামবাজারে রই। চিন্তামণির চরণ চিন্তি ভাজনা খোলায় ভাজি খই, আমি যদি সে ভোলানাথ হই। লোকের মুখে মুখে ফেরে এইসব লাইন। ভোলা ময়রা আর এন্টনি ফিরিঙ্গির চাপান-উতোরের রস উপভোগ করেনি এমন মানুষ কলিকাতায় আছে নাকি !
বাগবাজার ছাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে অনেকটা দূর এগোলেই শ্যামবাজার আর শোভাবাজাররের মাঝেই শ্যামপুকুরেই রাজা স্যার রাধাকান্ত দেবের বাড়ি। রাজা রামমোহন রায়-এর ধর্মান্দোলনের সময় ইনিই কলিকাতার ব্রাক্ষণ পণ্ডিতগণের প্রতিপালক ও হিন্দুধর্মের রক্ষক হয়েছিলেন। ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে যখন স্কুলবুক সোসাইটি ও স্কুল সোসাইটিদ্বয় স্থাপিত হয় ১৮১৭-১৮১৮ সালে ইনি ছিলেন অগ্ৰগণ্য ব্যক্তি ও দ্বিতীয় সভার অন্যত্র সম্পাদক । ইনি ”স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক’ গ্ৰন্থ প্রণয়ন করেন। মনে সাহস সঞ্চয় করে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। শুনেছি দেব মহাশয় ইংরাজি, পারসী, আরবী ও সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন। এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য লাভের জন্য মনটা ছটফট করে উঠেছিল। একে তো মিশনারী পাদ্রী, খ্রিস্টান ধর্ম যাজক, জানি না আমার জন্য মনে মনে কী ধারণা পোষণ করে রেখেছেন। নিজ নিজ ধর্মের জন্য মত প্রকাশ করা ভুল কিছু নয় কিন্তু পরমত সহিষ্ণুতাও চিন্তা চেতনার মধ্যে রাখলে সত্য মিথ্যা যাচাই করা সহজ হয়। মানুষটাকে অস্থির চিত্তে পায়চারি করতে দেখে আমি প্রথমে ঘাবড়েই গেছিলাম – কি জানি কোনো ভুল সময়ে এসে পড়েছি কিনা। সকলেরই তো একলা থাকা কখনও না কখনও জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু এই মানুষটাই তো হিন্দুসমাজপতি হিসেবে সকলে মান্যগণ্য করে। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বললেন, এই বুড়ো মানুষটার সঙ্গে তর্ক জুড়তে চান জুড়ুন কিন্তু বিশ্বাস যে আমার হবে না পাদ্রী সাহেব। বললাম, আমি আপনার স্পর্শ পেতেই দক্ষিণ থেকে উত্তরে এলাম। আশ্চর্য হয়ে ওঠে আমার নিকটে এসে হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বললেন, বসুন, এতটা পথ, আপনার পায়ে ফোস্কা পড়েনি তো? বললাম, পড়লেই বা কী, এমন একজন মানুষের সাক্ষাৎ তো পেলাম যাকে বাংলার তাবৎ মানুষ মাথায় করে রাখে। মানুষটার চোখে মুখে একটা প্রশান্তির ভাব স্পষ্ট দেখতে পেলাম। যাক্ খানিকটা নিশ্চিত হলাম এই ভেবে যে আমাকে ব্রাত্য করে দেন নি। গোঁড়া হিন্দুদের কম বেশি আমি চিনি না এমন নয়, কিন্তু উদার পন্থীদের সঙ্গে কথা বলে মনের সুখ পাওয়া যায় না, এটা কেমন করে বলি। বললেন, আপনি বিশ্বাস করেন এই কথাটা – মানুষের জন্য ধর্ম, না ধর্মের জন্য মানুষ। কথাটা শুনে বড় ধন্দে পড়ে গেলাম। অস্তিত্ব শব্দটা কদ্দিন ধরেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কথাটা শুনে একটু আধটু মেলাবার চেষ্টা করলাম। আমি শুনতে চাইছিলাম মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডার নিয়ে অন্তত তিনি দু’চার কথা বলুন। জানি না তিনি আমার মনের কথা টের পেয়েছিলেন কিনা। তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই আপনমনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন এপাশ-ওপাশ। বইয়ের রেকের দিকে কিছুক্ষন উদাস হয়ে চেয়ে থাকলেন। তারপর স্বগতোক্তিই করলেন – বেদতত্ত্ব জানেন? বেদ হলো নিত্য শাশ্বত জ্ঞান ভান্ডার। জ্ঞানদীপ্ত মন নিয়ে আমরা যেন নিবিড় সত্যের উপলব্ধি করি, আমরা যেন তপঃশক্তির বিপুল প্রেরণা লাভ করি। জীবনের সকল কর্মে যেন শাশ্বত ছন্দ প্রাপ্ত হই, আমরা যেন পরম আনন্দ লাভ করি। … বাক্যে ও মনে আমরা যেন ভদ্রকে দর্শন করি। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এত গভীর উপলব্ধি যে ধর্মপুস্তকে জায়গা নিতে পারে, তার কাছে মাথা নত করতেই হয়। জীবন যে বটবৃক্ষের মতো ডালপালা মেলে রসে টইটুম্বুর হয়ে আছে, কোন অবসরে তার খোঁজ যারা পায়, তাদের কি এত সহজে মন ভরে। বললাম, এখানকার মানুষ ও প্রকৃতিকে কেমন করে সহজে ধরা যায় তা নিয়ে যদি কিছু ইঙ্গিত দেন। এবার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে জানতে চাইলেন – আপনারাই বলুন না এই দেশের মানুষের মুক্তি মিলবে কীসে! এই কথার জবাব দেবার মতো সহজ বাক্য আমি-ই বা কেমন করে খুঁজে পাবো।
রাস্তাটা আমার কাছে মসৃণ ছিল না। চিন্তা ও চেতনা দুটোই যে দুই মেরু তাকে মেলানো, আমার এমন কী সাধ্য আছে। হারিয়ে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়াতেও মন্দ লাগে না। এখানে পথে প্রান্তরে যে কত মণিমুক্তা ছড়িয়ে রয়েছে, কানে না শুনলে বিশ্বাস করাই যে দুষ্কর। ওরা নিজের মতোই নিজে বুঁদ হয়ে থাকে, অন্য কোনও পথের স্বাদ যে নেবে, ভরাপেটে কখনও কি খিদের উদ্রেক হয়? হয় না বোধ হয়, চারপাশে কত তো দেয়াল, এই দেয়াল যে ভাঙবে, শক্তসামর্থ্য লোক না হলে কী চলে! ভোলা ময়রার উত্তরসূরি জন্মাবে না তা কেমন করে হয়! তাই বলে কেউ ভেবে বসবেন না আমি নিজেকে সেই আসনে বসাচ্ছি। সেই সাধ্য কী আমার আছে! এই বাংলার রূপদর্শী সাজা কি আমার সাঁজে। তবুও কেন মনের এমন গতি, নিজেকে বোঝাতে পারি না, সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর, অন্তর্দশন করার আকুল ইচ্ছা আমার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বোঝানো যাবে না, তবুও আমি যাবো, যেতে আমাকে হবেই, কোথায় লুকিয়ে আছে মানুষের না-পাওয়ার ইতিহাস। কেমন করে এক এক করে গড়ে উঠল দালানকোঠা, এমন বর্ণমালা, নিজের মতো করেই নিজেদের সুখ-দুঃখের গল্পগাঁথা গড়ে নেয়, কত শব্দ কথা হয়ে ছড়িয়ে যায় দিনরাত। আমায় কারা যেন ডাকে, ডেকে ডেকে নিজেদের গায়ের গন্ধ শুঁকে নিতে বলে, আমার শোনা, আমার জানা সকল কিছুই এই অন্ধগলির মাঝপথে গিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে – নিজেকে গুটিয়ে রাখলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যেত। ওরা বোঝেই না নিজের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই আমার, তাই তো প্রতি পদে পদে হোঁচট খাওয়া। আমি প্রত্যাখ্যান করতে সহজেই যেন জানি, স্বীকার করে নেওয়ার আনন্দে সাঁতার কাটতেও আমি শিখে ফেলেছি, না হলে পর কখনও আপন হয়! আর যা হোক, ভণ্ডামি দিয়ে মানুষকে জয় করা যায় না, এই কথাটা মধ্য ঊনিশ শতকে যেমন সত্যি, আগামীতেও একই অনুপ্রাসে মানুষের হৃদয়কে চঞ্চল করে তুলবে।
দর্জিপাড়া পেরিয়ে হরিঘোষ স্ট্রিটে গিয়ে পড়লাম, সামনেই তো আহিরীটোলা ঘাট, কত ইতিহাস যে মুখ বুজে আছে এখানে কে তার হিসাব রেখেছে। কত জনপদই তো হেজে-মজে গেছে তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে। তবুও আদিকাল থেকে বাঙালি হিন্দুদের প্রণম্য মা গঙ্গা নিজের মতো করেই বয়ে চলেছে, কবে ভগীরথ গঙ্গাকে মর্তে নামিয়ে এনেছিল, এই বঙ্গজননীর সন্তান সন্ততিদের কোলে তুলে নিয়েছে, আগলে রেখেছে মা যেমন শিশুদের নাড়েচাড়ে, ওরাও তেমনি দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে লাফাচ্ছে ঝাঁপাচ্ছে মনের আনন্দে, কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে কী – কী হয়েছে আর কী হবে। এমন শান্ত ধীর প্রকৃতির জন্যই মানুষগুলো এত উদাসীন, এত নরম, এত সুর এদের গলায়, এত কথা এদের অন্তরে, এত আপ্যায়ন এত আতিথেয়তা এদের দিনযাপনে, কোনো দেশেই তো এমন দেখি নি। এত ভালো মানুষ বলেই কি ব্রিটিশরা এদের এত সহজে কব্জা করেছে। আরে বাপু নিজের সম্পদ নিজে রক্ষা করতে না পারলে তো অন্যরা লুটেপুটে খাবে, এতে আবার আশ্চর্য হওয়ার কী আছে! আসল মুশকিলটা হলো দেশী ইংরেজদের নিয়ে, যারা মুখোশ পরে ছদ্ম স্বদেশী সেজে আসল দেশীদের বোকা বানাচ্ছে, মজার ব্যাপারখানা হলো এই মানুষগুলো তা বুঝতেই পারছেন না। তাই তো আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি, জানতে চাইছি লোকগুলো সত্যি সত্যি কী চায়, জীবন সম্বন্ধে কোনো আকাঙ্খাই কী ওদের নেই! আমার বোঝার অসাধ্য আমার দৃষ্টি কতদূর গিয়ে পৌঁছচ্ছে, আমি গঙ্গার বুক থেকে ভেসে আসা বাতাসের শ্বাস গায়ে মেখে ধরে ফেলতে পারছি কিনা এই দেশের নাড়ীর টান। সুতানুটিতে জব চার্নকের জাহাজ এসে নোঙ্গর করেছিল কবে, সেই গ্ৰাম আজ কলকাতার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কত বণিক, কত লক্ষ শ্রমিক,মুটে-মজুর, কত অভিযাত্রীরা এই লোকালয়ে মিশে গেছে, হালিশহর থেকে বড়িশা পর্যন্ত নাকি একটা রাস্তাই ছিল উত্তর দক্ষিণের সংযোগের মাধ্যম, সবই তো সপ্তদশ শতকের শেষার্ধের সুতানুটি, গোবিন্দপুর, ডিহি কলিকাতার মানচিত্র। আজ যে বড় রাস্তা দিয়ে আমি হেঁটে চলেছি, কত সরু সরু রাস্তা এসে যোগ দিয়েছে, নতুন নতুন নামকরণ হয়েছে, বইয়ের পাতায় পড়া কলিকাতার সঙ্গে আকাশ পাতাল পার্থক্য, কত দালানকোঠা ইমারত নির্মিত হয়েছে দিনে দিনে, কত মানুষের পায়ের চিহ্ন মুছে গেছে, কেউ মনে রাখে নি।
পুরনো সংবাদপত্রের পাতা ওল্টাতে গিয়ে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। কী যে উত্তরাধিকার বহন করছে এই কলিকাতা। খবরের কাগজের পাতায় চোখ বোলাতেই লাইনগুলোতে গিয়েই বিহ্বল হয়ে গেলাম। টুকরো খবরটা এইরকম – ‘ বাবুদের নটবরবেশ, গলায় দোনরি, তেনরি, পাঁচনরি হার, বাহুতে সোনার কবচ, কোমরে সোনার চাবির শিকলি, কালাপেড়ে, রাঙাপেড়ে, ধুতি, বিদ্যা গোটাকতক বিলাতী অক্ষর লিখিতে শিখেন আর ইংরেজি কথা দুই তিনশত শিখেন, নোটের নাম লোক, বডিগার্ডের নাম বেনিগারদ, লৌরি সাহেবকে নৌরিসাহেব এই প্রকার ইংরেজি লিখিয়া সর্ববদাই গোটেহল, ডেনকের ইত্যাদি বাক্য ব্যবহার করা আছে আর বাঙ্গসাভাষা প্রায় বলেন না এবং বাঙ্গালী পত্রও লিখেন না, সকলকেই ইংরেজি চিঠি লিখেন তাহার অর্থ তাহারাই বুঝেন…।’ বুঝলাম এই মনোভাব আর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আর যাই হোক দেশ উদ্ধার হবে না। এনারা আবার হাজার দু’হাজার টাকা মাসোহারা দিয়ে নর্তকী পুষতেন। এই পোষা নিয়ে প্রতিযোগিতার অন্ত ছিল না। পুজো, বিয়ে, শ্রাদ্ধ কোনটাতেই ‘টিকটিকির নাচ আর ভেকের গান’ না হলেই যে নয়। ইংরেজ বণিকের এমন উঞ্ছ বৃত্তিদের জবাব নেই। ভাবলে অবাকই হতে হয়, সমাজের কুলশীলদের যদি জীবনযাপনের এমন দশা হয়, তাহলে সমাজটা টিকবে কেমন করে! এর খোলনলচে না পাল্টালে সমাজটা তো অচিরেই রসাতলে যাবে। শহরের বাবুদের এই কীর্তি দেখে গাঁ-গঞ্জের চাষী, কামার, কুমোররাও লজ্জা পাবে। তবুও আশায় আশায় পথচলা যদি এমন কারও দেখা মেলে বাবুদের বাবুয়ানি আর ইংরেজদের তাবেদারী ছেড়ে নিজেদের কথাগুলো শোনাবে, আলোয় আলোয় ভরিয়ে দেবে চারপাশ। পালকি থেকে কে যেন নামল মনে হলো। গোয়াবাগানের দিক থেকে কর্ণওয়ালিশ স্কোয়ারে এসে নামলেন কেন অসময়ে, রাজনারায়ণ বসু না! মনে মনে প্রণাম জানালাম। শুনেছি হিন্দু কলেজের ডাকসাইটে ছাত্র ছিলেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, প্যারিচরণ সরকার, আনন্দ কৃষ্ণ বসু, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্তর মতো সহাধ্যায়ীরা একসঙ্গে দাপিয়ে বেড়াতো। ওনার বক্তৃতা শুনিনি এমন নয়। বক্তৃতার মধ্যে অদ্ভুত এক ছন্দ ছিল, বৈপরীত্যও ছিল, দ্বন্দ্ব ছিল, ভিন্ন ধর্মের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও অন্যদের মতো নিজ ধর্মের মূল ছিন্ন করে ডুব সাঁতার কাটতে ওঁর আপত্তি যে ছিল তার আঁচ পেতাম। মানুষটা জন্মেছিল কলিকাতার পাঁচ ক্রোশ দূরে বোড়াল গ্ৰামে। নিজের ভাবনাকে যে ভিন্ন স্রোতে বইয়ে দিয়েছেন তাতে ডাক্তার ডফ-এর ধ্যান ধারণা যে পুষ্টির কাজ করেছিল বলাই যায়, না হলে যে মানুষটি ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যদের সঙ্গে মিলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন বেদই ধর্মবিশ্বাসের অভ্রান্ত ভিত্তি আবার তিনিই অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়কে নিয়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিচার উপস্থিত করেন এবং পরে এই অভ্রান্তবাদ ব্রাহ্মসমাজ থেকে পরিত্যক্ত হয়! এলেম আছে বটে কলিকাতার বাবুরা যখন সুরা আর বাইজিতে আসক্ত হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছেন তিনি ‘সুরাপান নিবারণী সভা’ স্থাপন করলেন! এমন মানুষের দেখা পেয়ে পিছমোড়া হয়ে অন্য পথে হাঁটবো তা কেমন করে হয়! তিনি হন্তদন্ত হয়ে এক ইমারতে প্রবেশ করলেন।
কলিকাতায় পুকুর ডোবা বুজিয়ে উঠতি জমিদাররা তাক লাগানো দালানবাড়ি তৈরি করেছেন, কারুকার্য আর রকম সকম বিলেতের ঢঙে, সম্প্রতি কারও কারও ভাগ্যে রায়বাহাদুর খেতাবও জুটেছে কিনা, তেনারা আবার ছোটলোকদের কুকুর বেড়াল ভেবে দূর দূর করে তাড়ান। মজার কথা হলো এরা আবার গাঁ-গঞ্জের গরীব-গুরবোদের মাথা ভেঙে খাজনা আদায় করেন, আবার দেনার দায়ে ওদের জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করে ক্ষেতমজুর বানান। গরীবের চোষা রক্তের গন্ধ এইসব দেয়ালে লেগে থাকলেও কিছু ঘরবাড়ির কর্মকাণ্ড আবার ফেলনার নয়, বিশেষ করে রাজনারায়ণ বাবুরা যখন দেশীয়দের চেতনা উন্মোচনে আদা কাঁচকলা খেয়ে লেগে পড়েছেন। তাই তো হবেই, যেদিকে তাকাই চূড়ান্ত বৈষম্য আর অবহেলা আম মানুষগুলোকে কুরে কুরে খাচ্ছে, কে যে কবে এই মানুষগুলোর দিকে চাইবে কে জানে। ভাবখানা এমন খুঁদকুড়ো যা পাচ্ছে তাই এদের প্রাপ্য, আর সবটার উপর অধিকার সাহেব-সুবোদের আর ইংরেজদের মোসাহেবদের। রাজনারায়ণ বাবু আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। বটেই তো একজন ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচারকের সান্নিধ্যে আসার এমন আকুতি একজন খৃষ্টধর্মের প্রচারকের, মেলাতে পারছিলেন না। ওনাকে প্রশ্নটা করেই ফেললাম, একজন হিন্দু কলেজের তাবৎ তাবৎ পাশ্চাত্য ভাবনায় ভাবিত মানুষজনের ভিড়ে আপনার এত ব্যতিক্রমী আচরণ কেন? উত্তরটা দিতে একটুও দেরি করলেন না – আরে সাহেব, দেখছেন না তাকিয়ে মা গঙ্গার বুকে কেমন জোয়ার এসেছে, চারপাশে কেমন এক অদ্ভুত চঞ্চলতা, এই সময় মানুষের আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলতে হবে তো। বললাম, আপনি কাদের কথা বলছেন? একটু হতচকিত হয়ে বললেন – দেখছেন না, বেনিয়া, মুৎসুদ্দিদের ঘরের ছেলেরা কেমন বই খাতা বোগলে নিয়ে ইস্কুলে আসছে। জ্ঞানের আস্বাদ পেয়েছে যে। এই রস টেনে একদিন পুরোপুরি তৃষ্ণা মেটাবে এই আশায় আশায় দিন গুনছি। বললাম, যদি তাই হবে তাহলে ধর্ম নিয়ে এত দ্বিধা দ্বন্দ্ব কেন? ক্ষণেক শান্ত থেকে বলতে আরম্ভ করলেন – শুনুন, রামতনু লাহিড়ী মহাশয়কে একদিন তর্কচ্ছলে বলেছিলাম, যখন সকল দেশে সকল সমাজে জাতিবিভেদ কোন না কোন প্রকারে আছে ও থাকবে তখন আমাদের দেশের জাতিবিভেদ কি দোষ করল? আপনাকেও বলছি সাহেব আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি যে পর্যায়ে রয়েছে যদি চটজলদি তাকে কেউ অমৃত সেবন করাতে যায়, বদহজম হবে, ছাঁকুনি দিয়ে ছেঁকে কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে ধীরেসুস্থে বের করে এনে গোটা সমাজের খোলনলচে পাল্টাতে হবে, বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহকে তাই তো আমি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছি। নিজেদের অস্ত্রে নিজেদের বুদ্ধিতে শান দিতে হবে, ধার করা জ্ঞানবৃক্ষে জল ঢাললে এই মাটিতে পুষ্ট হবে না, প্রয়োজনে যোগ করা যেতে পারে, নিজেরটা বর্জন করে নয়। আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি দেশের মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছে, অন্যের দাসত্ব আর বেশিদিন মেনে নেবে না। প্রশ্নটা সাহস করে করেই ফেললাম, আপনার স্বপ্ন কি এই গুটিকয়েক শহুরে শিক্ষিত লোকদের দিয়ে পূর্ণ হবে, বাকি প্রান্তিকদের না জুড়তে পারলে সবটাই যে অধরা থেকে যাবে। বললেন, কথাটা আপনি ভুল বলেছেন বলবো না, কিন্তু তাই বলে শুরুটা তো করতে হবে, অন্ধকার সরিয়ে আলো ফুটবে তো একদিন, এই আশা করা কি খুব অন্যায়। রাজনারায়ণ বাবুর কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিতে মন চাইল না। যদিও জানি তিনি এখনও কৌলিন্য প্রথা আর জাত্যাভিমান বর্জন করার মন পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারেন নি। তিনি স্বজাতীয় কায়স্থদের ক্ষত্রিয়বর্ণ বলে বিশ্বাস করেন। বাঙালি খ্রীষ্টানরাও অনেক সময় অসর্তকভাবে জাতি গর্বের পরিচয় দেন, এর সমূলে উৎপাটন করা এত সহজ ব্যাপার নয়। ওনারা এক সহাধ্যায়ী পাথুরিয়াঘাটার ব্যারিস্টার জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর প্রায়ই গর্ব করে বলেন, আই এম আ ব্রাহ্মণ খ্রীষ্টান। এই দেশে লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধ্বজা এখনও পতপত করে উড়ছে, এত সহজে কি সাধারণকে গর্ত থেকে টেনে তোলা সম্ভব হবে, উত্তর বোধ হয় ‘না’। ফরাসি বিপ্লবের ‘স্বাধীনতা সাম্য মৈত্রী’র আদর্শ উচ্চারণ করা যত সহজ, কাজে রূপ দেওয়া ততটাই কঠিন। হঠাৎই তিনি বলেন উঠলেন, আরে মশাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর দেশীয় বেনিয়াদের মধ্যে জাত আলাদা হলেও আদপে আছে কি কোন তফাৎ, সব এক গোয়ালের গরু, এরা সকলেই ছাপোষা মানুষগুলোকে মাড়িয়ে সিংহাসনে বসে পা দোলাতে চায়, শাসক আর বেনিয়া দুইই দুয়ের পরিপুরক। শুয়োরের খোঁয়াড় দেখেছেন তো, অনেকটা সেইরকম, ভাবছেন যাবতীয় কর্মকাণ্ড মানুষের কথা ভেবে, আসলে রাজার দণ্ড লাগু করার ফন্দি, ব্রিটিশ এই দেশের শাসক থাকুক কি না থাকুক, আগামী দু’শ বছরেও এর পরিবর্তন হবে না, বকলমে অশিক্ষা কুশিক্ষার জালে জড়িয়ে মূর্খ বানিয়ে খাঁচায় বন্দী করে রাখবে, এরা ছড়ি ঘোরাচ্ছে ওরাও ছড়ি ঘোরাবে, এই বলে রাখলাম, এই দেশ প্রকৃত অর্থে গোলামী থেকে কবে মুক্তি পাবে কেউ জানে না, শুধুই ধনের জন্য কামড়াকামড়ি, দেখে বুঝতে পারছেন না? রাজনারায়ণ বাবুর চোখ দুটো থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে, এক একটা শব্দ তো নয়, আগুনের গোলা। বললাম, আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? রাস্তার দিকে দৃষ্টি ফেললেন। একটি ঘোড়ার গাড়ি
খটখট আওয়াজ তুলে কোন বাঙালি বাবুকে নিয়ে গঙ্গার ঘাটের দিকে চলে গেল। বললেন সাহেব মনে মনে অনেক পরিকল্পনা করে রেখেছি জানি না কোনটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তবুও শোনালেন – ব্রাহ্মসমাজে নরপূজা নিবারণ, হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ, জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা স্থাপন, বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন। আরও কত কথা অনর্গল বলে গেলেন। সত্যিই তো যে বীজ এরা রোপন করে দিয়েছেন, তা চারাগাছ থেকে মহীরুহ হতে সময় নিবে নিক, কিন্তু কোথায় যেন দূরে আলোর রেখা আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে। আমার আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হলো না এই ভেবে বাঙালি জাতি একদিন নিজেরা জাগবে, অন্যদেরও পথ দেখাবে।
রামরাম বসুদের একেশ্বরবাদে বিশ্বাস মূর্তিপূজার ধারণাকে তো রাতারাতি পাল্টে দিতে পারে না। দক্ষিণের মাকালী আর দক্ষিণেশ্বরের মাতা ভবতারিণী কালিকা মন্দিরে কত অসংখ্য ভক্তদের সমাগম হয়, মানুষের এমন বিশ্বাসকে অস্বীকার করা কেমন করে সম্ভব। ওই তো অদূরেই এক মন্দিরে ঢং ঢং শব্দে ঘন্টা বাজছে। দোকানি, পথচারী, মুটে মজুর, নারী পুরুষ যাচ্ছে দেবী দর্শনে। কোনো যুক্তি কিংবা ভিন্ন মত এদের কী ভক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে! আমি জানি না ব্রাহ্ম সমাজের যে ঢেউ আছড়ে পড়ছে এই শহরের শিক্ষিত সমাজের অঙ্গনে, তা কেমন করে আম মানুষের ধর্ম হয়ে উঠবে! খৃষ্টধর্মের প্রচার করে পাদ্রীরাই বা কতটা এই দেশের মানুষের মনকে ছুঁতে পারবে, এই প্রশ্নের জবাব অন্তত এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের পিঠস্থানে ব্রাহ্মধর্ম ও খৃষ্টধর্ম হয়তো কিছু মানুষের মন পরিবর্তন করতে পারে কিন্তু সনাতন ধর্মের জমিতে ভাগ বসাতে পারবে না। এই আধ্যাত্মিকতা নস্যাৎ করবে এমন মানুষ এই বঙ্গে জন্মায় নি। গদাধর মুখোপাধ্যায় নাকি রামকৃষ্ণ পরমহংস হয়েছেন। তিনি তো আবার তার কথার জাদুতে সকলকে নাকি বশ করে নিচ্ছেন, এলেম আছে বটে, হাজার বছরের শব্দগুলো প্রাণ পেয়ে মানুষের মনের তরঙ্গকে জাগিয়ে তুলছে।
আবেগের জোয়ার এমন হয়েছে মানুষ তাকে ঈশ্বরের দূত ভাবতে শুরু করেছে, এমন উন্মাদনায় বাকি প্রচারকদের আশায় না জলাঞ্জলি হয়। এই সময় দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছে ধর্মকে সরিয়ে রেখে আরও গভীরে গিয়ে মনোভূমিকে জানা জরুরি। এই প্রাচীন সংস্কৃতির ভাণ্ডার ঝাঁকালে এমন অনেক সম্পদ পাওয়া যাবে যা গোটা পৃথিবীর মঙ্গলে কাজে লাগতে পারে। কোনো পরদেশী বীজ ছড়াবার আগে মাটিটা চেনা জরুরি, না হলে ফসল তো ফলবে না যতই গোড়ায় জল ঢালা হোক, ফলবে শুধু ঢেঁড়স। বৈষ্ণব সন্ন্যাসী চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাবে যে বঙ্গের মানুষ আলোড়িত, নাম সংকীর্তন ঘরে ঘরে অন্তরে গুঞ্জরিত সেই মানুষগুলোর ব্যথা যন্ত্রণাকে বুঝতে হবে। কত ধর্মের রস এই দেশের মানুষের শীরায় শীরায় বইছে, অন্য জীবন দর্শন এত সহজে থাবা বসাতে পারবে না। কৃষ্ণকে সরিয়ে যিশুকে বসালে এই দেশের মানুষ যিশুর দেহে কৃষ্ণকেই কল্পনা করবে, কৃষ্ণের জন্য কেঁদে কুল ভাসাবে। ভালো এই যে ওদের বিশ্বাস নিয়ে ওদের মতো থাকতে দাও তাতেই মঙ্গল। জীবনের সঙ্গে বিশ্বাসের সংযোগ ঘটে গেলে ছাল ছাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমার ভূমিকাটা না অচল পয়সার মতো গড়াগড়ি খায়। কেউ কেউ হয়তো মুখ তুলে চেয়ে আছে, আমাকে তো নতুন কথা বলতে হবে, তার আগে জেনে ফেলতে হবে এই দেশের জ্ঞান তপস্বীরা কোথায় গিয়ে শেষ করেছে আর কোন পাড়ে গিয়ে তরী ভিড়িয়েছে। এখানে এত যে জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, গাছ-গাছালির চুমোচুমি, ধুলোয় ছানাপোনাদের গড়াগড়ি, মেয়েদের হাসির বিস্ফোরণ অন্তরে অন্দরে, কথা আর সুরে জড়াজড়ি, আমি না দিতে পারি বাঁধ, না শোনাতে পারি বাণী, সবই যে মনে হয় ধার করা, ওদের চঞ্চলতা, আড়াল আবডালে ভেসে বেড়ানো কথাগুলোর সারাংশকে এনে বলতে হবে এটাই তোমাদের নিজের, যা শুনছো, তা পণ্ডিতদের পৃষ্ঠা উল্টানো বুলি।
ধুতি পরা মানুষগুলো আবার বাবুদের মতো নয়। নকলনবিশ সাজতে ওদের জুড়ি মেলা ভার। কত লোকই তো গায়ে ধুলোবালি মেখে মাথায় বস্তা ঝুড়ি চাপিয়ে গরানহাটার দিকে পা ফেলে ফেলে এগোচ্ছে। কেউবা মিশকালো, কেউ বা কুচকুচে কালো, দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে শরীরে। এত চড়া রোদ মাথায় নিলে ক্লান্ত হয়ে রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়বে এতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে। ধোপা পুকুর গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে নতুন বাজার। রাস্তার ধারে গাছগাছালি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। পাকা বাড়ির মধ্যিখানে কাঁচা টিনের চালের দরজা দিয়ে নেংটা শিশুরা এসে পাক খেয়ে নিচ্ছে এপাশ ওপাশ। আমার পোশাক আশাক, না সাহেবি চেহারা চোখ পাকিয়ে দেখে। সূর্য তখন মধ্য গগনে। ছাতু বিক্রেতাকে ঘিরে আবার সরবতও বিক্রি হচ্ছে দেদার। নিমতলা ঘাটে এসে নৌকা ভিড়লে যাত্রীরা লাফিয়ে লাফিয়ে পাড়ে এসে নামছে। এরা কেউই তেমন পুষ্ট ও সবল নয়, রোগা জীর্ণ হাড় ঝিরঝিরে দেহ সম্বল করে এসেছে রুটি রুজির আশায়। রাস্তার ডান পাশে একটা ডিসপেনসারি, জ্বরজারি, পেটের গোলমালের ঔষধ ছাড়া এর বেশি কিছু আছে বলে তো মনে হয় না। দু’চারটে কুকুর আমাকে অচেনা মানুষ ভেবে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এলে দু’চারজন পথচারী ঢিল ছুড়ে তাড়িয়েও দেয়। এত কষ্ট দুঃখের মধ্যেও এদেশীয়দের মানুষের জন্য দরদের এতটুকু খামতি নেই। জীবনের এই প্রবাহকে অস্বীকার করে এড়িয়ে যাবো এমন সাধ্য আমার নেই। তবুও গটগট করে হাঁটতে লাগলাম। বোঝার চেষ্টা করলাম রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষগুলোর জীবনের ছন্দ চালচলন কেমন করে ওদের উদাসীন করে তুলছে, পাওনা গণ্ডার কোনো হিসেব নিকেষ নেই, কাল পরশু কী ঘটবে তেমন করে জানার আগ্ৰহ নেই, সন্তান সন্ততির পেটে ভাত দিতে পারলেই যেন সবটুকু হলো, অথচ এরাই তো এই শহরের বেড়ে ওঠার কর্মযজ্ঞে হাত লাগাচ্ছে, এদের জীবনের বিনিময়েই গড়ে উঠছে এই নতুন সভ্যতা, কেউ তো ভাবছে না এই মানুষগুলোর কথা, কিন্তু বাকিরা সংখ্যায় অল্প হলেও ওদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের বহর তো দিনে দিনে বাড়ছে। মনের যন্ত্রণা মনেই পুষে রাখলাম। পোড়া চামড়ার গন্ধ শ্বাস প্রশ্বাসে জ্বালা ধরালে বুঝলাম নিমতলা শ্মশান ঘাটের কাছে এসে পড়েছি। কাঠের চুল্লি থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেয়ে চলে যাচ্ছে উর্ধ্বাকাশে। দেশের স্মৃতি এসে মনের উপর জাঁকিয়ে বসল। দূর্ভিক্ষের থাবায় কাবু হয়ে গিয়েছিল আয়ারল্যান্ডের শহরতলীর মানুষ। ঘরে ঘরে কান্নার রোল আর সারি সারি লাশ, কে কার সমাধি দেবে, পচাগলা শরীরের গন্ধ বাতাসে ছড়ালে মানুষ যেন পালিয়ে বাঁচে। আলু ফসলের উপর ‘লেট ব্লাইট’ রোগের প্রাদুর্ভাবে খাদ্যের অভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের দেহান্ত হয়। ব্রিটিশ ইংরেজরা উর্বর জমির ভোগ্যপণ্যের উপর অধিকার কায়েম করেছিল। ধর্মীয় বিভেদ ক্যাথলিক আয়ারল্যান্ডবাসী আর প্রোটেস্ট্যান্ট ব্রিটিশদের বিভাজনরেখা হয়তো প্রচ্ছন্ন মদত যুগিয়েছিল, রানি ভিক্টোরিয়ার সাহায্য ছিল খুঁদকুড়ো ছাড়া আর কি। উসমানি সাম্রাজ্যের তরুণ সুলতান আব্দুল মজিদ ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে ড্রাগেডার বন্দরে পৌঁছে যায়। তাইতো মৃত মানুষের শরীরের গন্ধের চেয়ে পোড়া হাড়ের গন্ধ নাকে আসলে আমার দেহমনে ভয় ধরিয়ে দেয়। আমার অন্তরাত্মা জেগে ওঠে, স্বদেশ বিদেশ এক হয়ে যায় সেই মুহূর্তে। আমার গলা ফাটানো চিৎকারের শব্দ কেউ শুনতে পায় না, কেবল আমি নিজেই শুনতে পাই, আমার মনের ভেতরটা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায়, পৃথিবীর সকল মানুষ তখন গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে থাকে হাত পা ছড়িয়ে। মরা হাঁড়ের মটমট শব্দ আর তিক্ত ঘ্রাণ আমার শরীরে জ্বালা ধরাচ্ছে এখন। তবুও কীসের টানে আমি সেই শশ্মানের দিকে ছুটে চলে যাই। ব্যান্ডন শহরের শত শত মানুষের মিলিত শব আমার দৃষ্টিকে আবছা করে দেয়। মরা শরীর ধীরে ধীরে ভষ্মে পরিণত হলে মনে হয়, এই আমি আছি, এই আমি নেই, নিজের শরীরটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি, ততক্ষণে আরও একটা মরা শরীর ‘হরিবোল’, ‘হরিবোল’ শব্দে মানুষের কাঁধ থেকে নেমে জায়গা দখল করে নেয় একটু পরে চিতায় উঠবে বলে। উপস্থিত শ্মশানযাত্রীর কেউ আর ডোমরা জ্বলন্ত কাঠ সরিয়ে ঘি ছড়ালে আগুনের লেলিহান শিখা লকলক করে উর্ধ্বমুখী হয়, ওরা বলে উঠে, শরীর বিলীন হয়ে যাচ্ছে পঞ্চভূতে, আত্মীয় স্বজনের চোখ দিয়ে জল গড়াতে দেখে আমি খ্রিস্টান ভেবে নিজেকে আলাদা করতে পারছি না, এই তো আমি ব্র্যান্ডন শহরের অন্দরে বসে চুপি চুপি কেঁদে ভাসাচ্ছি।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
