শরদিন্দু সাহা

লেখক পরিচিতি

বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই  বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।

বিষয় পরিচিতি

(রেভারেন্ড জেমস্‌ লঙ  যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)

আর কত রঙ্গ দেখব এই দুনিয়ায় 

নদী আমাকে নানা কথা বলে জীবনকে মিলিয়ে দেবার জন্য কলকল শব্দ করে। জোয়ার ভাটার অন্তরঙ্গ মুহূর্তে আমার মধ্যে সেই ঢেউগুলো যায় আর আসে। কত মানুষের পায়ের ধুলো এখানে উড়ে উড়ে বেড়ায়। কত গল্প আর গল্পের সূত্রগুলো দলা পাকিয়ে যায়, সময় অসময়ের তালজ্ঞান ঠিক রাখা দুষ্কর হয়ে পড়ে। আমার ভাবনাগুলো আমাকে কখনও এগিয়ে নিয়ে যায়, কখনও এমন করে পিছিয়ে নিয়ে যায় আমার বোধে আসে না ঘটনাগুলো এইমাত্র ঘটে গেল, না অতীতের কোন রৌদ্রজ্জ্বল দিনে কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির মায়াবী আলোয়। এই শহরটা আমাকে এমন সব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় ভূত ভবিষ্যত কোন কিছুরই অস্তিত্ব ধরা পড়ে না। আমার সত্তা জানান দেয় কেন এমনটা হলো? হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল, না কোন এক অস্বাভাবিক পরিক্রমায় সৃষ্ট ছায়াপথ? আমি কী দেখছি, কিংবা কী দেখার আকাঙ্খায় দিন গুনছি এই হিসেব অবান্তর মনে হয়। এই ঘাটে মৃত্যুমুখি মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসে, শোনা যায় নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে জীবনের শেষ বেলার নির্ভেজাল দৃষ্টিপাত। কত যে মন্ত্র উচ্চারণ, কেন যে এত আয়োজন, কে শোনে তার মর্মকথা। শরীর পড়ে থাকে শেষবেলায়, শব্দরা বাতাসের দোলনায় দুলতে দুলতে নিজের পথ ধরে। যারা লাশ হবে বলে সদ্য গঙ্গার ঘাটে শামিয়ানার নীচে শরীর ঝাপটাচ্ছে নির্বান্ধব হয়ে, তারা কি আমার উপস্থিতি টের পেয়েছে? এই গন্ধ সেই গন্ধ নয়, আমাকে ক্রমশ চিনিয়ে দিচ্ছে জীবনের আসল রূপ আসলে কেমন হওয়া উচিত, কোথায় গেলে কতদূর গেলে সেই অশ্রু ধ্বনি হয়ে সাড়া দেবে। অদ্ভুত মনে হয় এখানে সবকিছু। পুণ্য লোভাতুর মানুষ ঘরগুলো সাজিয়ে রেখেছে কোনো এক আগামী দিনে পাপের মুক্তি ঘটবে বলে। কোন আত্মীয়রা মুমূর্ষুর শরীর অন্তর্জলীর লিপ্সায় জলের ভিতর ডুবিয়ে দেয়।

মৃত মানুষের সৎকার নিয়ে কত যে রীতি রেওয়াজের চাল ঠোকাঠুকি তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। শবকে দাহ করা শাস্ত্র সম্মত হলেও এক দুঃস্থ পরিবার চোখের জল ঝরিয়ে গঙ্গার ঘাটে উপস্থিত হলে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে মারা গেল?  মাঝনদীতে নিয়ে যাচ্ছে কেন? উত্তর এল, ‘সাহেব-বাবা, তুমি কি কানা নাকি? দেখতে পাচ্ছ না, ডুবিয়ে দিয়ে আসব, সাপে কাটা মড়া যে।’ মনটা অস্থির হয়ে উঠল, নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবলাম, ‘হিন্দুরা গঙ্গা নদীকে মায়ের মতো পূজা করে, তাই বোধহয় এমন বিধি। আর একটা মড়া কাঁধ থেকে নামিয়ে এক দল লোক খই ছড়িয়ে ‘হরিবোল হরিবোল’ ধ্বনি তুলে চারপাশ কাঁপিয়ে তুললো। মুহূর্তে মরা শরীরটাকে কাঠের বাক্সে ভরে নিল। শবযাত্রীদের একজন অতি উৎসাহে জানালো, ‘সন্ন্যাসী যে, আমাদের সমাজে এটাই নিয়ম।’ উল্টো দিকে তখন শকুন, হাড়গিলে, শেয়াল, কুকুরদের মোচ্ছব শুরু হয়ে গেছে, গঙ্গার পাড়ের আকাশে ওরা গোত্তা খাচ্ছে, সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে কিংবা ছোঁ মেরে গরু মোষ ছাগলের মাংসের টুকরো তুলে নিয়ে উদর পূর্তি করবে। একটু আগেই কারা যেন গরুর গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে গেলে মুচিরা ছাল ছাড়িয়ে শরীর গুলো টুকরো করে কাদা মাটিতে ছড়িয়ে রেখেছে। ওদের পায়ের আঙ্গুলের ছাপ গেঁথে রয়েছে সারি সারি। মানুষ কিংবা পশু সকলের শেষ মুহূর্তে এমনই পরিণতি হয়! শব হয়ে গেলে মানুষ পশু তফাৎ খুঁজতে গেলে লাভ লোকসানের হিসেবটা এমনি করে গুলিয়ে যায় যে। বাতাসে তখনও কোনো কোনো মরার পোড়া শরীরের ছাই গন্ধ মেখে কুন্ডলী পাকিয়ে নিজের মতো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাকিদের দেহ মরে ডুবছে কিংবা গর্তের নীচে সদ্য নতুন বাসস্থানে শুয়ে আছে দু’বছরের কম বয়সের ও মৃত ভূমিষ্ট শিশুরা, বোষ্টমরা, যুগীরা, কখন পচে গেলে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে কে জানে, ওদের পঞ্চভূতে বিলিন হয়ে যাওয়ার ভাগ্য কপালে জুটল কই?

প্রকৃতি যে গোপনে গোপনে একটা নিয়ম বেঁধে দিয়ে বাকিটা মানুষের হাতে ছেড়ে দিয়ে দুচোখ মেলে আছেন সে আর কে খেয়াল রেখেছে, কার কপালে কতটা সুনাম দূর্নাম জোটে তার উত্তর সহজে মেলে না। কত মানুষ যে এল আর গেল তার কোন ঠিকানা আছে! নিমতলা ঘাট, চাঁদপাল ঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট, কাশীনাথবাবুর ঘাট, গ্ৰেট বাজার ঘাট আরও কত ঘাট গড়ছে আর ভাঙছে, নজরে পড়ছে আবার পড়ছেও না, কত জাহাজ নোঙর করছে, কত নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে, কত সাহেব-সুবো, বাবু-চাকর, মুটে-মজুর দিনরাত এই নদীর ঘাটের আলো-বাতাসে গা তাতাচ্ছে। আমার মনের মধ্যে কত যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব, কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, আমি শুধু খুঁজেই বেড়াচ্ছি, মেলাতে পারছি না।‌ মিশন গির্জা, সেন্ট জন্‌স গির্জা আবার নোঙ্গরেশ্বর মহাদেবের মন্দির, কালীঘাটের কালীমন্দির, ফকির জুম্মা পীরের সমাধি সব যেন মিলেমিশে একাকার। কে কাকে সামলায়, কার যে কি চাহিদা, নানা গল্প ছড়ানো রয়েছে মুখে মুখে, কে যাচাই করবে তার সত্যতা, কাটরা বাজার নামে বিখ্যাত হচ্ছে, সুন্দরবন থেকে এই শহরে চলে আসছে কুচিলা, হর্তুকী, মধু, মোম ও কাঠ, বিক্রিবাটা চলছে অহরহ, ছন্দ আছে কোথাও, আবার ছন্দহীনতায় ভুগছে আম মানুষ, জানে না কেমন করে নিজেদের গড়েপিঠে নেবে। কোন জাদুবলে সব যেন একদিন ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। খালি মনে হচ্ছে এক যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ চাপাতে চাইছে, আবার কেউ ভার বহন করার যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমি অনুভব করছি, বোধ হয় এটা জরুরি জানা, বাইরের এই দখলদারী সবটাই এই দেশের দূর্বলতা, না প্রকৃত অর্থেই জলপ্রবাহের মতোই ঘটেছে সব আনাগোনা, এটাই এই দেশীয়দের ভবিতব্য! মনে হয় এরা দূর্ভাগা, যারা মাটির মানুষ হয়েও আজও মানুষ বলে গণ্য হলো না, না সাহেবদের কাছে, না জমিদার সামন্ত প্রভুদের কাছে। এই জিজ্ঞাসাই তো আমাকে কুরে কুরে খায়।

মানুষটাকে আমি দেখেছিলাম রাতের অন্ধকারে। চারদিকে থমথমে ভাব। আচ্ছন্ন হয়ে পথচলাকে থামিয়ে দিয়ে নিজেকে নিশ্চিত বিপদের মুখে টেনে নিয়ে দেখলাম লোকটা ঘর ছেড়ে বাইরে এসেছে। কোথাও কী কিছু হারিয়ে ফেলেছে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। মানুষটা তখনও আমার উপস্থিতি টের পায় নি। মানুষের চোখে এখন আর ঘুম নেই। দিনের আলোয় এখন সবকিছু বুঝে ওঠা দুষ্কর হয়ে উঠেছে।  নিশ্চুপ হয়ে মাথা নত করে চলাফেরায় মানুষ কুঁজো হয়ে গেছে, গলা উঁচিয়ে যে কথা বলবে সেই  সাহস আর নেই। মানুষের কাছে মানুষের এই পরাজয় আর মানা যায় না। মহাজন নিদান দিয়েছে ওর সম্পত্তি ক্রোক করবে। বললাম, চাঁদের আলোয় ঢেউ গুনছ বুঝি। ওর ভেজা চোখেও একটুখানি হাসির ঝলক দেখে অবাকই হলাম। এই দুঃসময়ে যে কেউ এমন অহেতুক মন্তব্য করতে পারে, এটা নেহাত কৌতুক ছাড়া আর কি। বলল, গতকাল সকালে আমার ছেলেটা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। কয়দিন ধরে শাক কচু খেয়ে পেট পচে গেছে। বাপ হয়ে ছেলের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে পারিনি, এমন দুঃখ আমি কেমন করে সামাল দেব, বলতে পারেন? ঘরে সোমত্ত মেয়ে রয়েছে, তের বছর পার করেছে, আর কদিন ঘরে রাখব, গ্ৰামের লোক ছ্যা ছ্যা করছে। কথাটা বড় কানে বাজল। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে গেলে ধীরে ধীরে মুখটা অস্পষ্ট হল। জলের ঢেউটা দুলতে দুলতে মিলিয়ে গেল পাড়ের মাটিতে। মানুষ হয়ে মানুষের দুঃখ মোছাব এমন অক্ষমতায় নিজের কাছেই যেন নিজে লজ্জা পেলাম। মানুষ সত্য না ঈশ্বর সত্য,  ঈশ্বরের জায়গায় মানুষের অধিষ্ঠান যেন দিনে দিনে মুখ্য হয়ে উঠছে। কলকাতা শহর জুড়ে পুরাতনকে নতুন করে গড়ার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত যারা জুড়ে রয়েছে, তাঁদের দৃষ্টি কবে এসে মেঠো পথে পড়বে কে জানে। মানুষটাকে সান্ত্বনা বাক্য শোনানো সেও-তো এক অপরাধ তবুও সঙ্কুচিত হয়ে বললাম তোমাদের ব্রাত্য করে রেখে যারা উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে, তাতে আর যাই হোক, এই দেশের কোনো উপকার হবে না। চোখ ফিরিয়ে রাখা তো অপরাধ ছাড়া আর কি। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে অস্বীকার করব এমন আস্পর্ধা আমার নেই। বঙ্গের কবিকুল তাঁর ‘প্রভাকর’ ঘিরে উত্তাল। শুনতে পাচ্ছি এক নবযৌবনের জোয়ার এসেছে, কবিতার উৎসব চলছে বঙ্গদেশের আনাচে কানাচে। নতুন কবিরা তাঁর কবিতার ছাঁচেই কবিতার প্রকাশ করেন। কত যে শিষ্য-প্রশিষ্য তাহাকে অনুসরণ করতে শুরু করল। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিমোহন সেন, মনমোহন বসুদের কথা না বললেই নয়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত’র ‘কৌলীন্য’ কবিতা আমি বার বার করে পড়েছি, মনে গেঁথে গেছে –

             মিছা কেন কুল নিয়া কর আঁকাআঁকি

             এ যে কুল কুল নয় সারা মাত্র আঁটি

             কুলের গৌরব কর কোন্ অভিমানে

             মূলের হইলে দোষ কেবা তারে মানে

সামাজিক চেতনার বিস্ফোরণ যে অচিরেই ঘটতে চলেছে এমন ভাবনায়  এক উষ্ণতার জন্ম হচ্ছে, মনে হলো পথটা খুঁজে পেতে আর বেশি দেরি লাগবে না। কোথায় যেন মিল পাচ্ছিলাম, সময়ের ঘ্রাণ এখন গ্ৰামের মানুষগুলোও শুঁকতে শুরু করেছে। ওরাও কথা বলবে, শুধু যন্ত্রণার সলতেটা পাকিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায়। মানুষটা মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল কিছুক্ষণ, তারপর বাপ ঠাকুরদাকে কর্মফলের জন্য দায়ী করে আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মানুষ বোধ হয় এরকমটাই হয়। খারাপ লাগল এই ভেবে কেউ এদের এখনও চোখের জলের হিসেব রাখছে না।

কাউকে কাউকে দেখলে মনে হয় চালচুলোহীন মানুষগুলো এমন আচরণ করে যা প্রতি মুহূর্তে গিয়ে মনের সঙ্গে গিয়ে ধাক্কা খায়। জনে জনে গিয়ে জানতে চাইলে ওরা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলে, সাহেব বাবা তোমার কথার মাথামুন্ডু আমরা কিছুই বুঝি না। তোমরা যে ঢঙে আমাদের ঘরের ভিতরের কথা জানতে বুঝতে চাও, কই আমরা তো তাই চাই না। আমাদের সুখ দুঃখ নিয়ে আমরা তো জড়িয়ে রয়েছি, ভালো মন্দের হিসেব রাখতে গেলে কোনো হিসেবই তো মিলবে না। আমাদের নিয়ে এত যে নাড়াঘাটা কর, কী সুখ তোমরা পাও? তাঁতীর প্রশ্নটা যে ফেলনার নয় সেটা বুঝতে কিছুটা সময় নিলাম। তবে কী আমার এতকালের শিক্ষাদীক্ষায় কোনো গোলমাল ছিল, নাকি বইয়ের পাতা আর মানুষের উপলব্ধির মধ্যে কোনো অন্তর আছে? আমি নিরুত্তর হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে জানার চেষ্টা করলাম, বলার সময় ওর মুখের অবয়বটা এমন করে পাল্টে যাচ্ছে কেন? সকাল সন্ধ্যা মাকু চালিয়ে ওর হাতের শিরাগুলো ফুলে ফুলে উঠেছে, ঘন ঘন নিঃশ্বাসের ওঠানামায় কেঁপে উঠছে গোটা শরীর। গত মাসের শাড়ি আর গামছার দাম বাজারের কারবারিরা দেয় নি, ওদের নাকি লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়েছে, মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া ধারে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে। কথাটা আমার কানে লেগে গেল। কত দূর্দশার কথা একটুও চোখের জল না ফেলে সহজভাবে এমন করে বলল, যে কেউ ইচ্ছে করলে ছোঁ মেরে তুলে নিতে পারে। মাকড়সার জাল ঘিরে রয়েছে এ-কোনা থেকে ও-কোনা। কালি-ঝুলি মাখা দরমার ঘরটায় ফাঁটা বাঁশের ফাঁকে অন্ধকার লুকিয়ে ঘর বেঁধেছে নিজের মতো। কোথাও আমার এই তাঁতি বেচারার সঙ্গে আত্মীয়তা ফেঁদে ফেলেছি। এ-ও বোধহয় জীবনের আর একটা রূপ। ঘরের পশ্চিমে মাটি লেপটানো তেকোনা উনুন থেকে উঠছে গলগল করে ধোঁয়া। উস্কোখুস্কো চুলের পিচুটিমাখা চোখে শিশুটি থপথপ করে বেরিয়ে এসে আমার ছায়া মাড়িয়ে বিড়বিড় করে মনের কথা বলে চলল। আমার আকার আকৃতি চেহারা সুরত কোনোটাই ওদের সঙ্গে মিল খুঁজে না পেয়ে চোঁ করে দৌড় মারলো।  আমাকে আপন করে নেওয়ার ইচ্ছেটা ওর কোনোভাবেই জাগলো না। আত্মীয় হয়ে ওঠা যে কত কঠিন আমি এই শিশুকে দেখেই হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। প্রকৃতিই যখন নিজের হাতে এই বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছে তখন আমি তো কোন্ ছাড়, সামান্য ধর্মযাজক বই তো নয়। এই দেশের মানুষদের অন্তরের সন্ধান আমি এত সহজে পেয়ে যাবো, ভাবলাম কী করে! নিজেই নিজের পরাজয় মেনে জিবে দাঁত চাপা দিয়ে স্বগতোক্তি করলাম, ‘আরও অনেক দূর যেতে হবে।’ পথটা আঁকা বাঁকা, খালের ধারে গজিয়ে উঠেছে ঘাস, মরা ঘাসের বুকে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে গঙ্গা ফড়িং। এই দেশের পোকামাকড় গুলোর চলন বলনও অদ্ভুত। ওদের শরীরের গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে জঙ্গলের বাতাসে। তাঁতীরা ঘরের মাটির মেঝেটা আমার দৃষ্টি থেকে সরে যাচ্ছে না, যেমন মুছে যাচ্ছে না ঘোমটার আড়ালে গোল গোল চোখে তাঁতি বউয়ের লজ্জা লজ্জা ভাবের অচেনা মূর্তি। ঘরের ধারে সুন্দর পাতায় পাতায় সেজে ওঠা বেদীর ওপরে গাছটি, গাছের পাশের লোকদেবতা ডমরু বাজানো শিব ঠাকুরের পায়ের কাছে বাতাসা’র থালা। পিঁপড়ারা সারি বেঁধে কোথায় যে খাবার খুঁজতে চলেছে যেদিকে, ঝরাপাতা ছড়িয়ে রয়েছে এধার ওধার, লিচু গাছের পাতাগুলো উড়ে উড়ে এসে পড়েছে।

এমন এক দিনে কে কাকে দেখে। ক্ষেত্রটি যে পাল্টাতে হবে, এই অনুভব আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগলো দুদিন ধরে। স্ত্রী বলল, এ তোমার জন্মভূমি নয়, কর্মভূমি, তবুও এত চোরা টান! সত্যিই তো, এই দেশ কী তবে আমাকে আমার নিজের কথা ভুলিয়ে দিচ্ছে! এ-তো ভালো কথা নয়, কখন মন আমায় কোন দিকে টানছে, নিজেই টের পাচ্ছি না! দেয়া-নেয়ার সম্পর্কটা ভারী অদ্ভুত, কোনো বাঁধই যেন মানতে চায় না। আমগাছের ডালটা তখন দুলে উঠল, পাতার ফাঁকফোকর থেকে ভেসে আসছে ঘুঘু পাখির ডাক, কেমন ঢঙে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে, ছানাপোনাকে নিয়ে সুখে সংসার পেতেছে। হাতে কোদাল, মাথায় ঝুড়ি আর গায়ে কাদা মাটির দাগ চন্দনের ফোটার মতো ছোট ছোট হয়ে লেগে রয়েছে মানুষেরই বুকে পিঠে হাতে পায়ে। মানুষের শরীরটা আর মানুষের নেই, এই কোন বহুরূপী! এই দেশের মানুষদের যতটা না মানুষ দেখি, তার চেয়ে বেশি দেখি মানুষের ঢঙে অন্য এমন জীব, লক্ষ্যও নেই, স্থিরতাও নেই, দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটাতেই হাড়ভাঙা খাটুনিতে জীবন বয়ে যায়। রোদের ঝাঁঝ, বৃষ্টির দাপট দুয়ে মিলে এরা  তালপাতার টোপর মাথায় দিয়ে কোথায় যেন চলে যায়, কোন নিশানা মাপে না। ওরা হাত জোড় করে জানতে চায়, ‘ তুমি বাপ, সরকার বাহাদুরকে গিয়ে জানাবে তো আমাদের পেটে ভাত নেই, রোগের ঔষধ নেই। পড়ালেখার কথা আর শুনিও না, ওসব শহুরে বাবুদের ছেলেপুলেদের জন্য, আমাদের ওসবে কাজ নাই।’ ওরা চলে গেল, নিজের মতো করে চলে গেল মাথা নীচু করে জোরে পা চালিয়ে। কী জানি গ্ৰামের জমিদার বাবুর একবার যদি কুনজরে পড়ে যায়, বেতের গায়ে মূর্ছা যাবে, গ্ৰাম ছাড়া করবে। ওরা বলে, ‘আপনা হাত জগন্নাথ, পরের হাত এঁটোপাত।’ আরেকজন ওর কথা পেছনে ফেলে নিজের কথাটা আমাকে শোনাতে  গলা চড়িয়ে বলে, ‘আপন দোষে খেয়েছি মাটি, বাপে পুতে কামলা খাটি।’  ওদের কথার ধরনে যে নিজেদের উচ্ছ্বাস আর আবেগ ছিল, এটা বুঝব না। কিন্তু যে ভাষা বা রীতি ব্যবহার করল, এমন প্রকাশের ভঙ্গি আমি রাশিয়াতেও শুনেছিলাম জারের অত্যাচারের নির্মমতায় অতিষ্ঠ হয়ে ওরা এই স্বরেই বলে উঠতো, ‘ছোট দাবীতে বড় তালা খোলে না।’ কিংবা ‘জমীদার হংসের মত, তাহার হৃৎপিণ্ড ছোট যকৃৎ বড়।’ এমিলি বলল, যতটা সহজ হবে খ্রীষ্টধর্মের প্রতি মানুষকে প্রভাবিত করা, ঠিক ততটা নয়। কেন বলছ একথা? সমস্যায় জর্জরিত মানুষকে ধর্মের কথা শোনালে তারা শুনবে কেন? ধর্ম এদের কাছে কোনো গুরুত্ব পাবে না। তবে কী সাধারণ শিক্ষা? না, তা-ও নয়। তবে? এর কোন উত্তর হয় না, হাঁটতে হাঁটতে দৌড়তে দৌড়তেই ওদের মনের হদিস খুঁজতে হবে। বুঝলাম, ওরা দিনভর যখন দৌড়চ্ছে ওদের ছুঁতে গেলে গোল্লাছুট খেলা অভ্যাস করতে হবে।

চারপাশে অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে। দূরের পথে এমনটাই হয়। প্রতি পদেই হোঁচট খাওয়া। তবু প্রশ্ন জাগে, উত্তরগুলো ভীমরুলের মতো উড়ে উড়ে আসে। লর্ড ডালহৌসি এমন এক বিশ্বাস আমদানি করেছেন – পাশ্চাত্যের জ্ঞান আর পাণ্ডিত্যই শেষ কথা, এই দেশীয়রা যা অকম্মার ঢেঁকি, এরা পারবে না কোনো পরিবর্তন আনতে, যা একমাত্র পারে ব্রিটিশরা, ওরাই তো বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। স্বত্ববিলোপ নীতির পশ্চাতে তার বিশ্বাস ঠিক জায়গায় আঘাত করেছিল কিনা সময় বলবে কিন্তু আমি এখনই তাঁর বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিতে পারি – ‘ভারতকে পাশ্চাত্যের আদলে গড়ে তোল।’ আমার সঙ্গে বিশপস কলেজের বারান্দায় খিলানে হেলান দিয়ে উদাসীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। কীসের এক অমোঘ টানে কিম্বা চৌম্বকীয় আকর্ষণে এসেছি জানি না। এরকমটা আমার জীবনে বহুবার হয়েছে। কেন করি, কীসের কারণে মানুষের জন্য টান অনুভব করি, কোনো কারণ খুঁজে পাই না। এই মানুষটি ইংরেজিতে প্রথম ভারতীয় নাটক দ্য পারসিকিউটেড, অব ড্রামাটিক সিনস ইলাস্ট্রেটিভ অফ দ্যা প্রেজেন্ট স্টেট অফ হিন্দু সোসাইটি ইন কলকাতা লিখেছেন। হ্যাঁ মানছি আমি হিন্দু সমাজে ব্রাক্ষ্মণ্য আধিপত্য রয়েছে। এটাও ঠিক তিনি আলেকজান্ডার ডাফের কাছে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাই বলে তিনি নিজের সমাজের প্রতি সমস্ত দায়-দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন একথা কেমন করে বলতে পারি। ওঁর নিজের সমাজ যাতে করে সংস্কার মুক্ত হয়ে আধুনিক শিক্ষা গ্ৰহনে উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে, এই তো ওঁর লক্ষ্য। বললাম, কৃষ্ণ মোহন আপনাকে এত বিমর্ষ লাগছে কেন, আপনার কিসের এত দুঃখ, এত যন্ত্রণা? বলল, আমার সমাজ আমার দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাতে আমার দুঃখ নেই, কিন্তু দুঃখ এই সমস্ত অবৈজ্ঞানিক চিন্তা নিয়ে সমাজটা রসাতলে যেতে বসেছে। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ যখন ডানা মেলে খোলা আকাশে পতপত করে উড়ে বেড়াবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, আমার দেশের মানুষ নিজেদের শামুকের মতো খোলসের মধ্যে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে। আমি ধর্মান্তরিত হয়েছি বলে আমাকে যত খুশি গাল মন্দ করছে করুক কিন্তু জাতের নামে বজ্জাতি করে বেড়াচ্ছে যারা তাদের কী শাস্তি হওয়া উচিত বলতে পারেন? ভাববার মত বিষয় বটে কিন্তু এর সমাধান খুঁজে বের করে আনা তো এত সহজ নয়। আমি আপনাদের সমাজের কাঠামোয় যতটা নাড়াচাড়া করে দেখেছি, এ তো অনেক অন্ধকারকে জুড়তে জুড়তে এসেছে, কেউ তো আলো ফেলে নি। সমাজটা তো কলকাত্তাইয়া দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরদের ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলনের চোখ দিয়ে দেখলে চলবে না, আরও অনেকটা পথ মাড়িয়ে যেতে হবে, অনেক মানুষ তো গভীর ঘুমে  আচ্ছন্ন হয়ে আছে, তাদের জাগাবে কে! কৃষ্ণ মোহন এই অ্যা‌ংলো-আইরিশ মিশনারি সোসাইটির ধর্মযাজকের কথাগুলো শিক্ষক হয়েও মনোযোগী ছাত্রের মতো মন দিয়ে শুনলেন। জবাব দেবার মতো কথা জমা থাকলেও তিনি দিলেন না, কোনো এক অনাগত ভবিষ্যতের জন্য জমা করে রাখলেন।

লর্ড ডালহৌসিকে নিয়ে কৃষ্ণমোহনের মনে নানা প্রশ্ন। ভারতীয় রাজন্যবর্গদের এইভাবে উৎখাত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আধিপত্য বিস্তার আসলে আগ্ৰাসী মনোভাবের এক ঘৃণ্য ছবি নয় কী! শুধু কী তাই, উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করা কোন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব – এই প্রশ্ন কৃষ্ণমোহনকে করেছিলাম, আপনি কি এই নীতির সমর্থক? ভারতীয়রা সজ্ঞানে কি সমর্থন জানাতে পারেন? অবশ্য গভর্নর জেনারেল ভারতীয় চাওয়া পাওয়াকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনলেন না। কৃষ্ণমোহন লর্ড ডালহৌসি’র সাহসী পদক্ষেপ গুলোকে সাধুবাদ জানাতে ভুললেন না। বললেন, জেমস্ লঙ,  হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহকে বৈধতা দিয়ে যে তিনি আইন প্রণয়ন করলেন, গোঁড়ামিতে ভরা হিন্দু সমাজের বিধবাদের শৃঙ্খল মুক্তি হলো কিনা তাতে, কোনটাই-বা আপনি ছোট করে দেখবেন – টেলিগ্ৰাফ যোগাযোগ, পূর্ত বিভাগ প্রতিষ্ঠা, গণশিক্ষা, রেললাইন স্থাপন এসব কী শুধু ইংরেজদের স্বার্থ ছিল, ভারতীয়দের জীবনের উত্তরণ ঘটলো না নাকি? কৃষ্ণ মোহনের নজর যে এড়ায় না কিছুতেই, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তিনি শাসক ও নিজ দেশের সম্পর্ককে মূল্যায়ন করতে চান, সেটা কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়ে দিলেন। কৃষ্ণমোহনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আমার দ্বিগুন হয়ে গেল। আমি যেন সামনের পথচলায় নতুন এক দিশা খুঁজে পেলাম। পাশ্চাত্য মতাদর্শে দীক্ষিত যুবকরা যে উন্মাদনা ও নবজাগরণের আকাঙ্খা নিয়ে দিনযাপন করছেন তাতে কতটা নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের দেয়ালকে চুরমার করে অন্য ঘরানায় পা দেওয়া যায় সেই সংশয়কে অস্বীকার করা যায় না, তেমনি পরিবর্তনের উত্তাপে চারপাশ যে গরম হয়ে উঠছে তা নিয়ে চর্চা যে জরুরি সে অনুভব ও তো ফেলনার নয়। জোয়ার ভাটার খেলা চলছে, আমি পারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম এক দল ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে আর এক দল আগলে রাখছে প্রতিবাদে পত্র পত্রিকায় সভা সমিতিতে, কবিতায় ও সংগীতে। সে পঙক্তি ও সুরে কি কান পাতা যায়! উত্তরটা নিজের কাছে রেখেও বলতে পারি ব্যঙ্গের ছলে নয়, প্রয়োজনের তাগিদে এতটা অবহেলা কাম্য নয়, লর্ড ডালহৌসির একতরফা ক্রিয়াকলাপ যতই প্রশংসিত হোক, সংস্কারের তোপধ্বনি তুলে চারদিক মাতিয়ে দিক, গ্ৰহণ বর্জনের খেলায় একটা সীমারেখা তো টানতে হবে নাহলে এমন একদিন আসবে নিজের চেহারা ভারতীয়রা নিজেরাই চিনতে পারবে না। নিজেদের সত্তাকে নিজেদেরই খুঁজে নেওয়ার বিদ্যাটা রপ্ত করতে হবে আপন অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। আমি দেখেছিলাম আমার দেশবাসী আয়ারল্যান্ডে ধুঁকতে ধুঁকতে লড়াইটা চালিয়ে গেছে শুধুমাত্র শিকড়ের টানে। এই দেশের শিকড় যে প্রোথিত অনেক গভীরে তা কোনো এক ভাইসরয় আধুনিকতার নাম করে উপড়ে ফেলতে পারে না তাহলে সেই উন্নয়ন অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এক অসাম্যের জন্ম দেবে।

জেমস মিলের হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অন্য অনেক ইউরোপীয়দের মতো ভারতবর্ষে আসার আগে বন্ধুদের পরামর্শে আমার পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এখানকার সংস্কৃতি ও পরিবেশ নিয়ে যে কতটা মিথ্যাচার করা হয়েছে যা প্রতি পলে পলে টের পাচ্ছি এবং অমিল হওয়ায় এমন হোঁচট খাচ্ছি আমাকে খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে আসল নকলের তফাতটা আসলে কোথায়। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম বেথুন সোসাইটির জন্ম হচ্ছে মেডিকেল কলেজ থিয়েটারে। কে নেই ওখানে! দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড.সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী, মেডিক্যাল কাউন্সিল ও কলেজের সচিব ড. হোয়াট, প্যারীচাঁদ মিত্র ও আরো গুণীজনেরা। আমি আসলে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েছিলাম, মিলে যদি যায়। কত উত্তরই তো নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, ওই লোভও আমাকে পেয়ে বসে। প্যারীচাঁদ মিত্র আমাকে হাত দুটি ধরে অভ্যর্থনা জানায় – আপনি যে এমন এক কর্মযজ্ঞে উপস্থিত হবেন, আমি জানতাম। বললাম, আপনি পণ্ডিত মানুষ তাই কল্পনাশক্তিও বেশি। 

আরে না না, তা নয়, এই বঙ্গদেশের জন্য এখনও 

অনেক কাজ বাকি।

আমি আপনার লেখা ‘হিন্দু প্যাট্টিয়ট’, ‘ক্যলকাটা রিভিউ’, ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ডস’ পত্রিকায় খুব মনোযোগ দিয়ে আপনার লেখা পড়ি।

আপনার মতো পাঠক পাওয়া তো সৌভাগ্যের কথা।

বেথুন সোসাইটি, স্কুল বুক সোসাইটি, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটিতে আপনার ভূমিকা স্মরণ না করে পারা যায়! বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিয়ে আপনার সোচ্চার বক্তব্য আমাকে মুগ্ধ করে।

আমি শুনেছি অন্য অনেক পাদ্রীরা এমনকি বাংলার গভর্নর জেনারেল আপনার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন লঙ্। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আপনি ধর্মান্তরিত করণের দায়িত্ব পালন না করে এই দেশের মানুষের শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে আজকাল মন্তব্য করছেন, দিনরাত ভাবছেন।

টেকচাঁদ ঠাকুরের কথায় খুশি হবো, না বাস্তব পরিস্থিতি ব্যখ্যা করবো বুঝে উঠতে না পেরে বললাম ‘বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা’-তে শীঘ্রই যাবার ইচ্ছে রইল। এই সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে আরও অনেক আলোচনা আছে, যা আপনার মতো লেখক ও সমাজ সংস্কারকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *