সুতপন চট্টোপাধ্যায়
অতসী
সেদিন সকালে আকাশ কালো করে এসেছিল। ক’দিন গুমোট গেছে, বাইরে বেরলেই ঘামে পোষাক ভিজে সপসপে। মনে হচ্ছিল বৃষ্টি যে কোন সময় আসতে পারে। তারই আয়োজন এই সাত সকালে। চারিদিক অন্ধকার করে এসেছে। সুর্যের আলো তাকে ভেদ করে বাইরে আসতে পারছে না দেখে মাথায় টোকা নিয়ে মাঠের দিকে বেড়িয়ে গেল অতসী। তাল পাতার টোকা, বৃষ্টিতে মাথাটা না ভিজলেও, শরীর তো ঝাপটায়য় ভিজে যাবে। ছাতায় আটকায় না। টোকা ঝড়ে ওড়ে না, ছাতা উলটে যায়। এ সব অনেক দিনের অভিজ্ঞতা। এখন মাঠে যাবার সময়। সময় নষ্ট করার সময় কোথায়?
ইছামতী নদীর পাড় দিয়ে লম্বা রাস্তা চলে গেছে গোলপাতা ম্যানগ্রোভের দিকে। ম্যানগ্রোভের মধ্যে রাস্তা দু দিকে ভাগ হয়ে ইছামতী নদীতে পড়েছে। একটি রাস্তা গোলপাতা জঙ্গল পেরিয়ে, ইছামতী অনেক সরু হয়ে বইছে। গোলপাতা নামটি এসেছে গোলপাতা ফলের আকার থেকে। গাছটা নারকোল গাছের পাতা যেন মাটি থেকে লম্বা দাঁড়ানো। জঙ্গলে এই গাছ ছাড়া আরও অনেক গাছের আধিক্য। তারই এক দিকে চাষের খেত,। প্রধানত পাট ও ধান। মাঝে মাঝে অন্য সবজি এখানে সেখানে চোখে পড়ে। অতসী বিয়ে হয়ে আসা ইস্তক এই গ্রামে অনেক বছর। আগে সে গুরুপদর সঙ্গে যেত। গুরুপদ কয়েক বছর হল ছেড়ে গেছে তাকে। ঠিক ছেড়ে যায় নি। এমনি সাপের ছোবল যে তাকে দু মিনিট দেয় নি। টাকী হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই সে ইছামতীর ওপারে চলে গেছে। সেই থেকে অতসী একা। একা ঠিক নয়। শিখা, তাঁর এক মাত্র মেয়ে। পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে গাঁয়ের ইস্কুলে। শিখা কে নিয়ে অতসীর একটা গোপন ইচ্ছে আছে। তা সে মনের গোপনেই লুকিয়ে রাখে।
গুরুপদ খুব খরচে ছিল না। চাষের রোজগার থেকেই সে একটা কোটা ঘর করেছিল। বাড়ির পাঁচিলে পাট শুকোতে দিত। সব পাট চোখের সামনে থাকত। না হলে চুরি চামারি তো লেগেই থাকে । গুরুপদ মারা যাবার কিছুদিন আগে একটা স্কুটি কিনেছিল টাকী শহরে যাবার নামে। সব সময় শহরে যেত না। গুরুপদর পিছনে বসে অতসী নদীর ধার দিয়ে চলে যেত সোনার বাংলা রিসর্টের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে তিন জনে আইস্ক্রিম খেত ইছামতীর দিকে তাকিয়ে। উল্টো পাড়েই বাংলা দেশ। দূরে তাদেরি মত বাংলা দেশের সাতক্ষীরা গ্রামের টিম টিমে আলো দেখা যেত । রাতের অন্ধকারে বর্ষায় নদীর জল চোখে পড়ে না। মনে হয় হেঁটেই চলে যাওয়া যায় বাংলা দেশ। সে সব কেমন সিনেমা সিনেমা মনে হয় অতসীর।
গুরুপদর মৃত্যুর পর অতসী স্কুটি চলান শিখেছিল । এখানের রাস্তা খুব চওড়া নয়। রাস্তার দু ধারে অনেক গেস্ট হাউসে ছেয়ে গেছে। ভ্রমন পিপাসু মানুষের ভীড়। প্রচুর টোটো চলে । হোটেলের সামনে অনেক টোটো। হাত খুলে চালানোর অনেক অসুবিধা। তাতেও অল্প সময় সে শিখে ছিল।
বাড়ি থেকে বাইরে বেড়োতেই শিখার গলা। মা, আজ আমার ক্লাস আছে। মনে আছে তো?
অতসী বলল , মনে আছে। আমি মাঠ থেকে আগেই চলে আসব।
যদিও বর্ষা কাল, কালো মেঘ অনেকটাই ইছামতী পেরিয়ে বাংলাদেশের দিকে চলে গেছে। তবু আবার ভেসে আসতে পারে। এমনি তে দুই বাংলায় এই মেঘের আনাগনা লেগেই থাকে। ওখানে তো তারের বেড়া নেই! মাথা উঁচু করে একবার তাকাল আকাশের দিকে। না, তেমন জোরে আসবে না, ঝির ঝিরে তো চলবেই। জঙ্গল, নদী ও সবুজ শস্য ক্ষেত্র, এখানে বর্ষার রূপ ক্ষনে ক্ষনে বদলে যায়। অতসী দেখেছে। আর গুরুপদর সঙ্গে মাঠের আলে ঘুরতে ঘুরতে সে আকশটাও পড়তে শিখে গেছে। ধানের শিষে এই ঝির ঝিরে বৃষ্টি খুব উপকারী। বীজতলা থেকে কালো পালের ছেলে বলল, কী গো দিদি আজ এতো সকাল সকাল?
হাঁ, বিকেলে কাজ আছে।
-শুনেছ, আমাদের গ্রামে পুজোয় এবার জমিদার বাড়িতে তিন দিন ধরে নানান খেলার ব্যবস্থা করছে। জমিদার বাবু সপরিবারে আসছে। এবার তাদের চারশ পাঁচ বছরের পুজো গো।
অতসী বলল, তাই নাকি? তা কী কী খেলা হবে?
আমাদের গ্রামে ঘরে যা হয় আর কী? চু কিত্ কিত্, হা ডু ডু, এমনি সব।
মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল অতসীর। মনে মনে ঠিক করল আজই টাকী তে গিয়ে প্রস্তাবটা দিতে হবে। একবার যদি শিখা জিততে পারে সে বিখ্যাত হয়ে যাবে এই অঞ্চলে। তার সপ্তাহে সপ্তাহে শহরে নিয়ে যাওয়া সফল হবে। বর্তমান জমিদারের জমিদারি নেই। আছে আট মহলা একটা জমিদার বাড়ি। আর জমিদার সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত। পুজোর সময় প্রতি বছর আসেন। বাকি সময় কোলকাতায়। তার হাত থেকে পুরস্কার তো স্বপ্নের মত।
-কোন কোন দিন হবে জানো?
-সপ্তমী, অষ্ঠমী ও নবমী।
দুপুর বারটায় বেশ জোরে নামল বৃষ্টি। টোকায় কী আর শরীর বাঁচে? সারা শরীর ভিজে গেলে মাঠ থেকে উঠে এল অতসী। টিপ কলে মাথায় জল ঢেলে হাল্কা করে ঝেরে নিল সে। তারপর, হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে দেখল শিখা চৌকিতে বসে পড়ছে। মা না এলে সে ছুটির দিনে খেতে বসে না। অতসী কে দেখে সে রান্না ঘরে থালা ও রান্না নামাল মেঝেতে।
ঠিক বিকেল চারটে নাগাদ মেয়েকে পিছনে বসিয়ে রওনা দিল টাকীর উদ্দেশ্যে। আজ রবিবার, রাস্তার গেস্ট হাউস গুলির মুখে মুখে টোটোর ভীড়। তার সঙ্গে গাড়ি, অটো আর সাইকেল। অতসী এসে পৌঁছল ক্যারাটে ট্রেনিং সেন্টারে। স্কুটি থেকে নেমে শিখা চলে গেল নিজের ক্লাসে।
বেশ কিছু দিন হল গাঁয়ে বলেছে সে মেয়েকে টিউসান দিতে নিয়ে আসে শহরে। গ্রামে তেমন শিক্ষক নেই। তাই লোকের বুঝতে অসুবিধা নেই। শুধু পাশের বাড়ির সর্বমঙ্গলা চিমটি কেটে বলেছিল, কী হবে গো তোমার মেয়ে? ডাক্তার না উকিল।
উত্তর দেয় নি অতসী।
ক্লাসে ভর্তি করেছিল বছর খানেক আগে। গুরুপদর মৃতুর পরে পরেই। এটা তাঁর অনুভবের তারণায়। মনে হয়ে ছিল, নিজেকে বাঁচাতে হলে এমন একটা জিনিস শিখতে হবে যাতে কেউ আঘাত করতে এলে প্রথমেই রুখে দেওয়া যায়।ইস্কুলের ননী মাস্টার ্পরামর্শ দিয়ে ছিল। অতসী আর দেরি করে নি। গ্রামে ঘরে এক মেয়ে নিয়ে বিধবা, বিপদ যে কোন দিন যে কোন দিকে থাকে আসতে পারে। কী দিয়ে ঠেকাবে তাকে?
তাই শিখা কে সে ভর্তি করেছিল এখানে। সে মাকে না বাঁচাতে পারলেও নিজেকে তো বাঁচাতে পারবে? যে ভাবে মেয়েদের বিপদ বাড়ছে বাইরের জগতে? আর বেঁচে থাকলে তো বাইরে বেরোতে হবেই। সে অপেক্ষা করে রইল শিখার ক্যারাটে ক্লাস শেষের জন্য। ফিরতে ফিরতে ঠিক করল, জমিদার বাবু কে বলতে হবে পুজোয় ক্যারাটের প্রতিযোগিতা যেন এক দিন করে।